এই প্রবন্ধটি লিখব ভেবে কথা বলছিলাম কয়েকজন পরিচিত বিজেপি নেতার সঙ্গে। তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার নিয়ে তাঁদের প্রায় সবারই প্রতিক্রিয়া হলো, আমরা বিভ্রান্ত। কেন যে অমন তাড়াহুড়ো করে বিল পাশ করানো হয়েছিল, কেন বিরোধীদের আলোচনারই সুযোগ দেওয়া হয়নি, পাশ হয়ে যাবার পরে যখন আন্দোলন শুরু হলো, তখন কেনই বা সে আন্দোলনের গায়ে কালি ছেটানো হচ্ছিল, সংগ্রামী কৃষকদের উপর সশস্ত্র হামলাই বা কেন হচ্ছিল, আর এসবের পরে হঠাৎ কেন যে খোদ প্রধানমন্ত্রী তিন আইন প্রত্যাহার করে নিলেন, এসবের কোনো সহজ উত্তর কারও কাছেই নেই। একজন তো বলেই ফেললেন, অতি দর্পে হত লংকা, সিএএ, কৃষি আইন, শ্রম আইন, কাশ্মীর নিয়ে সংবিধান সংশোধন, এসবই এমন ভাবে করা হয়েছে, যেন দেশবাসী সরকারের হাতের পুতুল। এবার সে ধারণা ভাঙতে শুরু করেছে। বিজেপির রাজ্য স্তরের নেতাও যে এমন ভাষায় বলতে পারছেন, সেটাও এই প্রতিবেদকের নতুন অভিজ্ঞতা।

বিজেপির ইতিহাস কিন্তু বেশিদিনের নয়। ১৯৮০ সালে দলটার জন্ম হতে দেখেছে আমাদের প্রজন্ম। পটভূমিকা অবশ্য আরও বছর পাঁচেকের পুরনো। দাপুটে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধি। তার উপর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দিয়ে, স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করিয়ে দেওয়াতে ইন্দিরার নেতৃত্বে ভারতের ভূমিকা অবশ্যই আজও উজ্জ্বল। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আগেই গরিবি হটাও স্লোগান দিয়ে ইন্দিরা লোকসভা ভোট জিতেছিলেন বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে। কিন্তু তাঁর পিতার তুলনায় ইন্দিরার সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা কম ছিল। জওহরলাল সারা জীবন নিজের দলের মধ্যেই বহু সমালোচক নিয়ে চলেছেন, বা বলা ভালো, চলতে হয়েছে। তবু স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জওহরলালকে মেনে নিতেন দলের অন্যরা। ইন্দিরার না ছিল সে ঐতিহ্য, না গণতন্ত্রের উত্তরাধিকার। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে বিরোধীদের আন্দোলনে তিনি সম্ভবত ভয় পেয়েছিলেন। বিশেষ করে যখন আদালত তাঁর নিজের লোকসভা কেন্দ্রে ইন্দিরার জয়কে নির্বাচনি বিধি না মানার জন্য বাতিল করে দিয়েছিল, ইন্দিরা সত্যিই ভয় পেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন গভীর রাত্রে জারি হয়েছিল অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা, কেড়ে নেওয়া হয়েছিল প্রায় সব গণতান্ত্রিক অধিকার। ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকে ইন্দিরার হয়তো ধারণা হয়েছিল, জেলে পুরে, কথা না বলতে দিয়ে বিরোধীদের জব্দ করা গিয়েছে, এবার ভোটটা করে নেওয়া যায়। ভারতবাসীর দৃঢ়তা, সংকল্প, প্রতিবাদের ক্ষমতাকে সেদিন বুঝতে পারেননি নেহরু-কন্যা। সমগ্র উত্তর ভারতে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছিল ইন্দিরার নেতৃত্বাঝীন কংগ্রেস, জিতেছিল জনতা পার্টি, মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিজয়ী জোটে ছিল বিজেপির পূর্বসূরি তৎকালীন জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, সমাজবাদীরা, জগজীবন রামের মতো কংগ্রেস-ত্যাগীরা। আর বামপন্থীরা বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল। সেবার অটল বিহারী বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদবানি জনতা সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কলহে সরকার পড়ে গেল বছর দুয়েকের মাথায়। কী নিয়ে প্রধান বিরোধ? জনতা পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বলেছিলেন, যেহেতু জনসংঘ নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করে জনতা পার্টিতে মিশে গেছে, তাদের ছাড়তে হবে আরএসএস সংসর্গও। রাজি ছিলেন না বাজপেয়ি-আদবানিরা। বিরোধের আরও নানা মাত্রা থাকলেও এটাই ছিল প্রধান আদর্শগত দিক। জনতা পার্টির সরকার পড়ে গেলে আবার লোকসভা ভোট হয়, ক্ষমতায় ফিরে আসেন ইন্দিরা। ভোট হয়েছিল ৫২৯ লোকসভা আসনে, ইন্দিরার কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৫৩টি আসন। হতাশ জনসংঘীরা সম্মেলনে মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি, দিনটি ছিল ৬ এপ্রিল ১৯৮০।

মনে পড়ে ১৯৮৪ সালের লোকসভা ভোটের কথা। ইন্দিরাকে নৃশংস ভাবে খুন করার পরে সে ভোটে কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজীব গান্ধি। রেকর্ড গরিষ্ঠতা নিয়ে রাজীব জিতলেন, বিজেপির ঝোলায় থাকল কেবল দু’টি আসন। সেসব দিনেও বিজেপির নেতা-কর্মীদের এত বিভ্রান্ত চেহারা দেখিনি।
মোদি জমানার শুরুয়াৎ হয়েছিল ২০১৩ থেকেই। আদবানিজি নন্, নেতা যে নরেন্দ্র মোদিই হবেন, সেটা পরিষ্কার হয় ওই বছরই। ২০১৪ সালের ভোটে গদিতে বসেন মোদি। এর পরেই বড় চমক নোট বাতিল, ৮ নভেম্বর ২০১৬। কেন নোটবন্দি করা হয়েছিল, তার কী সুফল পাওয়া গেছে, এসবের কোনো উত্তর বিজেপি নেতাদের কাছে নেই, সেদিনও ছিল না। কিন্তু তখনও ছিল মোদিজির উপর অগাধ বিশ্বাস। কালো টাকা জব্দ করতে, নগদের লেনদেন কমাতে, সন্ত্রাসবাদীদের কোণঠাসা করতে নোট বাতিল, এই বয়ানটা আজও তাঁরা বলে যান। অবশ্য সাফল্যের মতো সফল তো কেউই হয় না — ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে উত্তরপ্রদেশের ভোটে বিরাট গরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে মোদি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি ভোট জোগাড় করতে পারেন। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে পুলওয়ামায় জঙ্গি আক্কমণে অন্তত ৪০ জওয়ানের মৃত্যুতেও বিজেপির নেতা-কর্মীরা অবিচল ছিলেন। তাঁদের মুখে শুনেছি, মোদিজি হ্যায় না, দেখতে রহিয়ে আগে আগে ক্যায়া হোতা হ্যায়। হ্যা, হয়েছিল, পাকিস্তানে বিমান হানা, ভারতের সেনা অভিনন্দন বর্তমানের পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়া, পরে ছাড় পাওয়া এসব। ভারতের হামলার ফল ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই গিয়েছে, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদের পালে বাতাস লেগেছিল, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বড় জয় হাসিল করেছিল আরএসএস-এর রাজনৈতিক মুখ বিজেপি। করোনাকালেও হঠাৎ লকডাউন, দ্বিতীয় ঢেউ, গরিব মানুষের সাংঘাতিক দুর্দশা টলাতে পারেনি সাম্প্রদায়িক শিবিরকে। কিন্তু গত ছ’মাসে এই নিয়ে দু’বার দেখছি, সেই আত্মপ্রত্যয়ে যেন চিড় ধরেছে।

প্রথম ফাটল দেখা গিয়েছিল চলতি বছরের ২ মে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে এর আগেও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল জিতেছে বা হেরেছে। ১৯৮৭ সালে রাজ্য বিধানসভা ভোটে রাজীব গান্ধী খুব প্রচার করেছিলেন, বলেছিলেন, জ্যোতিবাবুকে রিটায়ার করিয়ে দেবেন। সিপিআইএম-ও পাল্টা দিয়েছিল। ভোটে গো-হারা হারে রাজীবের দল কংগ্রেস। পরেও তেমন ঘটনা ঘটেছে। তাতে সারা দেশ জুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সেটা কিন্তু এবার দেখা গিয়েছে। এবারের রাজ্য বিধানসভা ভোটে বিজেপির কৌশল ছিল, ভোটটাকে রাজ্য স্তরে না রেখে মোদি-অমিত শাহকে সামনে রেখে লড়াই। বহুবার এই নেতারা, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নাড্ডা ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা রাজ্যে যাওয়া আসা করেছেন প্রচারে, সংগঠন সাজাতে। বলা যেতে পারে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন। ফলে ভোটটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি-শাহ বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই। ফল বেরোতে তাই বিজেপি নেতাকর্মীরা চোখে সর্ষেফুল দেখেছিল। সেই যে শুরু হলো, রাজ্য বিজেপিতে ভাঙন আজও অব্যাহত। বিধায়ক বা নেতাদের কথা সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, স্থানীয় স্তরের কর্মীরা সে প্রচার পান না। গোটা রাজ্য জুড়ে বিজেপির স্থানীয় সংগঠন যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে, গেরুয়া বাহিনীতে বিভ্রান্তি কোন পর্যায়ে। এবং, এটা মোটেই রাজ্যের ব্যাপার নয়, সারা দেশে বিজেপির মর্যাদা কমে গেছে, ভোট ক্যাচার হিসেবে মোদিজির ক্যারিশমাতেও কালি লেগেছে।
সেই বিভ্রান্তি আবার ফিরে এল তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারে। সেই নানা আলোচনা, প্রশ্ন, নানা সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে বিজেপিরই অন্দরে। আবার স্বাধীন পর্যবেক্ষকরাও ঘটনাটাকে উল্টে পাল্টে দেখছেন।

অনেকে বলছেন, পাঞ্জাবের ভোট কৌশলের কারণেই এই প্রত্যাহার। চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎই পাঞ্জাবে তীব্র হয় কংগ্রেসের গোষ্ঠী কোন্দল, যার পরিণতিতে অমরিন্দর সিংহকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরায় কংগ্রেস। পরে অমরিন্দর কংগ্রেস ছাড়েন, দেখা করেন ভারত সরকারের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে। এতে বিজেপি পাঞ্জাব দখলের গন্ধ পায়। অমরিন্দরের শর্ত ছিল, ফেরাতে হবে কৃষি আইন। গুরু নানকের জন্মদিনে শিখ কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে মোদি তাই এমন ঘোষণা করলেন, মত কোনো কোনো বিজেপি নেতার। এঁরা বলছেন, দেখুন না পাঞ্জাবে বড় চমক দেবো আমরা। কৃষি আইনের বিরোধিতা করেই আকালিরা বিজেপি সঙ্গ ত্যাগ করেছিল, তাদেরও আবার এনডিএ-তে ফিরতে সাহায্য করবে মোদির ঘোষণা। তখন বিজেপি, অমরিন্দরের দল ও আকালি দলের জোট হারিয়ে দেবে কংগ্রেসকে, সিধু কিসস্যু করতে পারবেন না। প্রসঙ্গত নভজোত সিংহ সিধু পাঞ্জাবে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি।
অন্য এক অংশের বিশ্লেষকরা মনে করেন, উত্তরপ্রদেশেও কৃষক বিক্ষোভের আকার বড় হচ্ছিল, বিশেষ করে জাঠ এলাকায়। কোথাও কোথাও হিংসাত্মক ঘটনাও ঘটছে। লখিমপুর খেড়ির হত্যাকাণ্ড দিখিয়ে দিচ্ছে, বিজেপির একটি অংশ মরিয়া হয়ে হিংসা দিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ ধ্বংস করতে চায়। এমন ঘটনা পরেও ঘটতে পারে, আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল সর্বভারতীয় নেতাদের মনে। সে রাজ্যেও, আসন্ন ভোটে ছাপ ফেলতে পারে তিন কৃষি আইন বিরোধী জনমত। এঁরা বলছেন, ভোটমুখী এই দুই রাজ্যে কৃষকের মন পেতেই মোদির এহেন ঘোষণা।

অন্য আরেকটি মত হলো, এমন আইন আরএসএস চাইছে না। এই মতটি অবশ্য তেমন গুরুত্ব পাবার যোগ্য নয়। সাম্প্রতিক কালে নয়া উদারবাদী সংস্কার, সরকারি সম্পত্তি বেচে দেওয়া, কৃষিতে কর্পোরেট পুঁজি ঢোকানো, সব কিছুই অনুমোদন করে আরএসএস। কেউ কেউ আবার মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের পরে আগের সে শক্তপোক্ত মোদি আর নেই। মোদি ভাঙতে শুরু করেছেন, ভাঙছেন।
উত্তরপ্রদেশে গত বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে চমক সৃষ্টি করতে মোদি নোটবন্দির ঘোষণা করেছিলেন। সে সময়ে চালু হয়েছিল জিএসটি-ও। উত্তরপ্রদেশে বড় জয় পেয়েছিল সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি। এবার কিন্তু অন্য মাঠে খেলা। কোভিডের ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকার। গণতন্ত্র ধ্বংস সহ নানা অভিযোগের তির দেশের সবথেকে বড় রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি পাঞ্জাবেও বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য, এমনটাই ছিল মাস ছয়েক আগের পরিস্থিতি। এই জায়গা থেকে শুরু করে গত ছ’মাসে তেমন একটা এগোতে পারেনি হিন্দুত্ববাদী দলটি। ভোটে জিততে মরিয়া মোদি-শাহরা জানেন, উত্তরপ্রদেশে হাত ছাড়া হওয়া মানেই দেশও হাত ছাড়া। তাই কি হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর এহেন পিছু ফেরা, ভাবাচ্ছে রাজনৈতিক মহলকে। অনেকে আবার মনে করেন, মোদির পশ্চাদপসরণে বিজেপির লাভ না হয়ে বাড়তে পারে ক্ষতির বহর। বিরোধীরা, যারা কিছুদিন আগে ভারত বন্ধও করেছিল, সাফল্য তো আসলে তাদেরই। এটার কি কোনো ছাপ পড়বে না ভোটে? যদি পড়ে, সেটা মোদি-শাহের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়াবে।