লোকসভা চব্বিশের আগে লোকসভার শেষ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দাবি, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একাই ৩৭০টি আসন পাবে। আর এনডিএ-র আসনসংখ্যা চারশ ছাড়িয়ে যাবে। এখানেই না থেমে মোদী আরও জানান, তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে তিনি বেশ কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নেবেন, যা আগামী এক হাজার বছরের জন্য ভিত তৈরি করে দেবে। যদিও কী কী বড় সিদ্ধান্ত নেবেন সে বিষয়ে কিছু না জানিয়ে তিনি বলেন, তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে তিনি দেশকে বিশ্বের তৃতীয় সবচেয়ে বড় অর্থনীতি করবেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার বা আইএমএফ-এর রিপোর্টে বলেছে, আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতের ঋণের বোঝা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি-র থেকে বেশি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সালে ভারতের ঋণের বোঝা ছাপিয়ে যেতে পারে জিডিপি-র ১০০%।
পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী মিলে মোট ৫৫ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাই ঋণ করেছেন ১৫০ লক্ষ কোটি টাকা। তার মানে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশের মাথায় উপর দেনার বোঝা ছিল ৫৫ লক্ষ কোটি টাকা। আর মোদী জমানার দশ বছরের মাথায় সেই বোঝা বেড়ে হল ২০৫ লক্ষ কোটি টাকা। ঋণ যত বাড়ে সরকারকে তা শোধ করতে আরও বেশি টাকা জোগাড় করতে হয়। জোগাড় মানে সাধারণ মানুষের উপর চাপাতে হয় আরও বেশি কর। তাতে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বাড়ে, অর্থনীতির ভিত হয় দুর্বল আর সরকার যা আয় করে তার বেশিরভাগটাই খরচ হয় ঋণ শোধ করতে। এটাই অর্থনীতির মূল কথা। আইএমএফের রিপোর্ট জানিয়েছিল, ২০১৯-২০ সালে ভারতের ঘাড়ে ঋণের বোঝা ছিল জিডিপি-র ৭৫%। চলতি অর্থবর্ষে তা বেড়ে হবে ৮২% আর ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষে সেটা ১০০% ছাপিয়ে যাবে।
দেশের ঋণের বোঝা এই ভাবে বাড়তে থাকলেও বাক্যবাগীশ মোদী সর্বদাই দাবি করে চলেন, বিশ্বে দ্রুত বাড়তে থাকা দেশগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য হল ভারত। কিন্তু তিনি প্রকৃত চিত্রটি সব সময়েই আড়াল করে রাখেন, তিনি কখনোই বলেন না যে এই বাড়তে থাকা গতির সঙ্গে ছায়ার মতো পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে ঋণের বোঝা। আরও একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, দেশের মাথায় যে মোট ঋণের বোঝা তার প্রায় ৫০.১৮ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে রাজ্যগুলির ঘাড়ে। পাশাপাশি আরবিআই, সিসিআই এবং সেবির তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, মোট ঋণের বেশিটাই; হিসান অনুযায়ী ১৬১.১ লক্ষ কোটি টাকা অথবা ৪৬.০৪ শতাংশ ঋণের ভাগীদার মোদী সরকার নিজে। প্রসঙ্গত, ভারতের ঋণের পরিমান এই হারে বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার বা আইএমএফ ভারতকে ইতিমধ্যেই একাধিকবার সতর্ক করেছে। কারণ ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু এ নিয়েও মোদী সরকার আইএমএফের যুক্তির পালটা জানায়, ঋণের অধিকাংশই দেশীয় মুদ্রা অর্থাৎ টাকার হিসাবে, ডলার কিংবা ইউরোয় নয় তাই ঋণের পরিমাণ ঝুঁকি পূর্ণ নয় বলে পাল্টা দাবি করে।
আসলে লগ্নির অভাবেই যে মোদি সরকারের আমলে ভারতের অর্থনীতির ভীত দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেকথা মোদী ধামা চাপা দিতে চান। বেসরকারি এবং বিদেশি দুই ক্ষেত্রেই কোনো লগ্নি নেই। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দু-এক বছরে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি। লগ্নি হলে তো দেখাই যেত দেশে কল-কারখানা তৈরি হচ্ছে, চাকরি-বাকরির নতুন নতুন সুযোগ ঘটছে কিন্তু সেসব কোথায়? আছে কেবল ফাঁকা বুলি আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতি। গত দশ বছরে দেশে দেশে বলার মতো একটাও কলকারখানা তৈরি হয়েছে কী? কোনো ক্ষেত্রে চাকরির কোনো সুযোগ? সরকারি কিংবা বেসরকারি সব জায়গাতেই বেকারত্ব একেবারে শীর্ষবিন্দুতে গেরে বসে আছে।
অর্থনীতি নিয়ে মোদীর মিথ্যা ভাষণ পাশাপাশি শাসক দলের প্রচার তা যতই উচ্চ কোটিতে পৌঁছাক আসলে তা অর্থনীতির ক্ষতগুলিকে আড়াল করে জিডিপি’র সংখ্যাতত্ত্বকে সামনে আনা। মোদী ও তার সরকারের প্রচার, ভারত আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাঁচ ট্রিলিয়ন অর্থনীতি অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে। অর্থনীতির মোট পরিমাণ নিয়ে যারা ঢাক পেটাচ্ছেন তারা মাথাপিছু আয় নিয়ে কোনও কথা কেন বলছেন না, বেকারি নিয়ে কেন কথা বলছেন না, সাধারণ মানুষের আয় নিয়েও কেন কথা বলছেন না? অন্যদিকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলি ব্যাঙ্কের দেনা না মিটিয়ে বহাল তবীয়তে রয়েছেন, কেউ কেউ আবার বিদেশে পালিয়ে রয়েছেন আর কর্পোরেট বান্ধব মোদী তাদের বকেয়া ঋণ মকুব করছেন আর সরকারের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে চলেছেন। পাশাপাশি কর্পোরেট সেবা অগ্রাধিকার পাওয়ায় কর ছাড়, ঋণমকুব, ছাড়াও বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, জলের দরে জমি ইত্যাদি দেওয়ার ফলে সরকারের আয় বাড়ছে না। উলটে বাড়ছে ঋণ। ফলে মোদী তৃতীয়বার ফিরে এলে আরও ঋণের দায়ে জর্জড়িত হবে দেশ।