চলতি বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তিতে বাংলাদেশে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে দিল্লিতে তিনি জেল খেটেছিলেন।
কী অভিযোগে তাঁকে বন্দি করা হয়েছিল? কোন জেলে তিনি বন্দি ছিলেন? গ্রেফতার হওয়ার তারিখ কী? এ নিয়ে অবশ্য তিনি তখন কিছুই বলেননি। এই সব তথ্য জানতে তথ্য জানার অধিকার আইনে একটি আবেদন করেছিলেন বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর রাজেশ চিরিমার। সম্প্রতি তার জবাব এসেছে। লিখিত ভাবে রাজেশ চিরিমারকে জানানো হয়েছে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার আগে তাঁর সম্পর্কে কোনও সরকারি তথ্য দফতরের কাছে নেই। যা রয়েছে সবই ২০১৪-র পরের। বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর রাজেশ চিরিমার তাঁর এই প্রশ্ন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্ডার সেক্রিটারি প্রবীণ কুমারের স্বাক্ষর করা জবাব তিনি তাঁর ফেসবুক পেজে পোস্ট করেন। তারপরই বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমের নজরে আসে। তাঁর কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে চিরিমার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শোনার পরেই আমার কৌতূহল হয়েছিল, তাঁর অপরাধ কী ছিল? কত দিন তিনি কোন জেলে বন্দি ছিলেন? এই সব প্রশ্নই জানতে চেয়েছিলাম। উত্তর অবশ্য পাওয়া গেল না’।
তথ্য নেই কথাটা তো কোনও জবাবই নয়। আসল ঘটনা কী ছিল, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সত্যি-ই কি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ১৯৭১ সালে, আরএসএসের সদস্য হিসেবে ২১ বছর বয়সে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আন্দোলন করে জেল খেটেছিলেন? তিনি কি সেই সময়ে জনসঙ্ঘের (জনসঙ্ঘই পরে বিজেপি নাম নেয়) ডাকা আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার বরণ করে্ছিলেন? সেই সময় জনসঙ্ঘ সত্যাগ্রহের মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপর চাপ দিচ্ছিল সেই মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। যে কাজ ভারত সরকার কৌশলগত কারণে তখনই করতে চাইছিল না। কারণ তাহলে রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য হিসেব পাকিস্তানের সুবিধা হয়ে যাবে ভারত বিরোধী অবস্থান নিতে। সুবিধা হয়ে যাবে আমেরিকারও। সিআইএ-ও তখন সক্রিয় ছিল ভারতকে ওই পথে ঠেলে দিয়ে বিপাকে ফেলতা। জনসঙ্ঘীদের সেই দাবি যদি তখন ইন্দিরা গান্ধী মেনে নিতেন, বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে সাফল্য অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারত।
ব্যাপারটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। ‘দ্যওয়্যার.ইন’ ওয়েবসাইটের পক্ষে শুদ্ধব্রত সেনগুপ্ত প্রভূত পরিমাণ গবেষণার পর এই বিষয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন, তাতে বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ সফরে গিয়ে গত ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, তিনিও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে জেলে গিয়েছিলেন। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কোনও কোনও মহলে মোদীর জয়জয়কার শুরু হয়, আবার সোস্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে যায় নানা ব্যঙ্গাত্মক কমেন্টে। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব টুইটও করেন এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি দাবি করে।
আমরা বরং এই সব বিতর্কে না জড়িয়ে সেই সময়ের ঘটনাক্রমের দিকে নজর দিই। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানে তখন ক্ষমতায় সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া খান। তিনি রাজি হয়েছেন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরে। পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করছে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনেরা তার প্রতিবাদে ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’, এই আওয়াজ তুলে নির্বাচনে নামল আওয়ামি লিগ। ভোটের পর দেখা গেল পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮ আসনের মধ্যে ৮১টি তে জয়লাভ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে তারা কোনও আসন পায়নি। অন্য দিকে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামি লিগ পায় ১৬০টি আসন। ফলে সারা দেশের বিচারে একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হয়ে ওঠে আওয়ামি লিগ। প্রধানমন্ত্রিত্ব তাদেরই পাওয়ার কথা। কিন্তু বাঙালিদের হাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে রাজি নয় পাকিস্তানের সেনার প্রতিনিধি ইয়াহিয়া খান। রাজি ছিলেন না জুলফিকার আলি ভুট্টোও। এখান থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।

সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়ক তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা যেমন এবারের ভোটে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদীদের বঙ্গ বিজয়ের প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছে, কারণ বাঙালিরা অনেকেই মনে করে, তারা আগে বাঙালি পরে হিন্দু-মুসলিম, একদম অন্য প্রেক্ষাপটে, একদা ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি করা পাকিস্তানকে অস্বীকার করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। নেতৃত্বে ছিলেন মুজিবুর রহমান। জিন্নার তত্ত্বকে অস্বীকার করে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ। যে দেশের জাতীয় সঙ্গীত, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
১৯৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। । মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হল অসহযোগ আন্দোলন। ১৯৭১-এর ২৪ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার আওয়ামি লিগের সর্বোচ্চ নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবা মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে রাওয়ালপিণ্ডি কারাগারে বন্দি করল। শুরু হয় পাকিস্তান সরকারের পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ। সেই কুখ্যাত হামলার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এই অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সংখ্যক বিদ্রোহীকে নির্বিচারে হত্যা করা। ২৫ তারিখেই হত্যা করা হয় বিপুল সংখ্যক নাগরিককে। হত্যা করা হয় বুদ্ধিজীবীদের, ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের। বহু সাধারণ মানুষকে।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে। ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া উর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার চার দিন পরে ভারতের সংসদে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটি প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেন। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, ভারত সর্বান্তকরণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পাশে আছে। এই প্রস্তাবের মধ্যে দিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ভারত বাংলাদেশকে তখনই স্বীকৃতি না দিলেও, তার পাশে আছে, বার্তা দিয়ে ভারত কৌশলে কার্যত স্বীকার করে নিয়েছিল সদ্যোজাত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’কে। যা ছিল স্বীকৃতিরই সামিল। তার আগেই অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা সেরে নিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের ভিতরে আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে এই যে গণতান্ত্রিক শক্তির উথ্বান, এই শক্তিকে সাহায্য করতে ভারত যে সব পদক্ষেপ করবে সেসব নিয়ে যেন ভারতে বিরোধীরা বিতর্ক সৃষ্টি না করেন। কারণ তেমন হলে পূর্ব পাকিস্তানের এই গণতান্ত্রিক শক্তিকে সাহায্য করাটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ইন্দিরা বলেছিলেন, পাকিস্তান যেহেতু রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য, ভারতে বিষয়টি নিয়ে হইচই হলে পাকিস্তান বিষয়টিকে নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে যাবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের সমর্থন পেতে অসুবিধে হতে পারে। এর পরেই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্টের যিনি অস্থায়ী প্রধান হয়েছিলেন, সেই তাজুদ্দিন আহমেদ দিল্লিতে এসে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ১৯৭১-এর ৩ এপ্রিল। ওই বৈঠকের পিছনে যাদের ভূমিকা ছিল তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন পরবর্তীকালে সিপিএমের সাংসদ, সেই সময়ে ইন্দিরার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক মিত্র, সেই সময়ের দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সের অধ্যাপক অমর্ত্য সেন, ইন্দিরার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি এন হাকসার এবং পূর্বপাকিস্তানের দু’জন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান এবং রহমান শোভান। দু’জনেই ছিলেন অশোক মিত্র এবং অমর্ত্য সেনের ঘনিষ্ট।
এই সময়েই তৎকালীন সেনা প্রধান, পরে যিনি ফিল্ড মার্শাল হয়েছিলেন, শ্যাম মানেকশ ইন্দিরা গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে সোজাসুজি জবাব দিয়ে বলেছিলেন, এই মুহূর্তে ভারত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়, তার জন্য কয়েক মাস সময় লাগবে। ইন্দিরা সেনাপ্রধানের এই পরামর্শ মেনে নিয়েছিলেন। আর নিয়েছিলেন বলেই পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রকাশ্যে সহায়তা দেওয়ার জন্য ইন্দিরার দরকার হয়ে পড়েছিল আরও কয়েক মাস সময়ের।
এদিকে ১৯৭১-এর এপ্রিলের ১০ তারিখে পূর্ব পাকিস্তানের বৈদ্যনাথতলায়, যার নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল মুজিব নগর, সেখান থেকে ‘প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্ট অফ বাংলাদেশ’ গঠনের ঘোষণা করা হল। নতুন সরকার কাজও শুরু করল মুজিব নগর থেকে। এপ্রিলের ১৭ তারিখে প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্ট অফ বাংলাদেশ’-এর মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করা হল। তার পর পরই, ইন্দিরার সহায়তায় সেই প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্ট অফ বাংলাদেশ’-এর নতুন ঠিকানা হল কলকাতার থিয়েটার রোড, এখন যে রাস্তার নাম শেক্সপিয়ার সরণী, সেই রাস্তার ৮ নম্বর বাড়িতে।
ভারতের কাছে খবর ছিল, যদি পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ বাধে, আমেরিকা এবং চিন পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াবে। সেই কারণেই ইন্দিরা গোপনে কলকাতায় প্রভিনসিয়াল গভর্নমেন্ট অফ বাংলাদেশ’-এর অফিস খুলতে দিলেও, সেই সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলনা তখনই। সরকারি ভাবে কখনও স্বীকারও করল না যে কলকাতায় অস্থায়ী বাংলাদেশের সরকারকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কারণ সেটা হলে পাকিস্তান বলতে পারবে ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। যদিও সেনার পোশাক না পরে ভারতীয় বাহিনীর বিভিন্ন শাখা সরসরি বাংলাদেশের মুক্তি যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সবটাই গোপনে। কোনও অফিসিয়াল ব্যাপার তখনও ছিল না।
এরই মধ্যে ইন্দিরা চলে গেলেন মস্কো সফরে। সেখানেই ইন্দিরা সই করলেন রুশ-ভারত চুক্তিতে। যেই চুক্তি ‘ইন্ডিয়া-ইউএসএসআর ট্রিটি অফ ফ্রেন্ডশিপ’ নামে পরিচিত। চুক্তিতে বলা হল, ভারতকে যদি কোনও দেশ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যেতে বাধ্য করে, সেক্ষত্রে বন্ধু দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে পাশে থাকবে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শক্তির পাশে সব রকম সহায়তা সহ ভারতকে সক্রিয় হতে অনেকটা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল এই চুক্তি। কারণ, সেই কোল্ড ওয়ারের যুগে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকা এবং চিনের যে সম্পর্ক ছিল, তাতে ভারতের একটা শক্তিধর বন্ধু দেশের দরকার ছিল। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এই সময় সক্রিয় হয়ে উঠেছিল ভারতকে অপ্রস্তুত অবস্থায় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য। ভারতে বেশ কয়েকজন বড় মাপের নেতা তখন ছিলেন আমেরিকার আস্থাভাজন রাজনীতিক। তাদের কথা পরবর্তীকালে বিভিন্ন মার্কিনি সংবাদপত্রে লেখাও হয়েছে। ইন্দিরার মন্ত্রিসভাতেও তাদের লোকজন ছিল। তারা তখনই এই মত প্রচার করতে শুরু করেছিল যে, ভারত সোভিয়েত চুক্তির ফলেই ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে পারছে না। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা চায় না। ভারতের এখনই এই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। আর মজার ব্যাপার হল, সেই সময়ে জনসঙ্ঘেরও এই একই মত ছিল। জনসঙ্ঘ এই সময়ে ১৯৭১-এর অগস্ট মাসে ইন্দিরার বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে নামে, তক্ষুনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে হবে, এই দাবিতে। নরেন্দ্র মোদী তখনও নরেন্দ্র মোদী হয়ে ওঠেননি। মাত্র ২১ বছরের যুবক। আরএসএসের কর্মী। তিনি কি এই সত্যাগ্রহে যোগ দিয়েই জেলে গিয়েছিলেন?
কারণ ওই সময়ে দিল্লিতে এছাড়া আর কোনও সত্যাগ্রহের খবর নেই। আর বিশেষজ্ঞদের মত ওই সত্যাগ্রহ থেকে যে দাবি তোলা হচ্ছিল, সেই দাবি মানা হলে আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সুবিধা হয়ে যেত ভারতকে কোনঠাসা করতে। ভারত সদ্যোজাত স্বাধীন বাংলাদেশকে তখনই স্বীকৃতি দিলে ভারতকে হয়তো অপ্রস্তুত অবস্থায় যুদ্ধে টেনে আনত পাকিস্তান। জেনারেল মানেকশর পরামর্শে ভারতের দরকার ছিল ক’য়েক মাস সময়। সেটা আর ভারত পেত না। সেই কারণেই, অগস্টে জনসঙ্ঘ এই দাবি করলেও, ইন্দিরা সেই দাবির কাছে মাথা নোয়াননি। জেনারেল মানেকশর পরামর্শ মতো ভারত যুদ্ধে গিয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে। যে যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনা ভারতের সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
ফলে, তরুণ নরেন্দ্র মোদী যদি জনসঙ্ঘের ওই সত্যাগ্রহে যোগ দিয়ে থাকেন, এবং ভেবে থাকেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি আন্দোলন করেছিলেন, তাহলে বলতেই হয়, বাস্তবে সেই আন্দোলনের দাবি মানা হলে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করত। সুবিধে হত আমেরিকার। যে আমেরিকা পাকিস্তানের বন্ধু ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী ছিল।