নরেন্দ্র মোদি স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী, যিনি তাঁর শাসনকালের সাত বছর পেরিয়ে আটে পা রাখলেন। কিন্তু একাধিক কারণেই তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা নদী বাঁধের মতো ভাঙতে ভাঙতে কিনারায় এসে ঠেকেছে। প্রসঙ্গত, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও তার ক্ষমতাকালে রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়েছিলেন। কেরালায় নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকারকে বরখাস্ত করা থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালে চীনের আক্রমণ পর্যন্ত। ইন্দিরা গান্ধীর নিয়তি হামাগুড়ি দিয়ে এগলেও জরুরি অবস্থা জারির পরই তিনি প্রথমবার ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০১১ সালে দুর্নীতি এবং নানা কারণে মনমোহন সিং-এর মতো ভদ্র লোককেও বিব্রত হতে হয়েছিল। যার জেরে সরকারের শেষ দিন ঘনিয়ে এসেছিল দ্রুত। নরেন্দ্র মোদিও তার শাসনকালের সাত বছর পেরতে না পেরতেই প্রবল চাপের মুখে।
তিনি নিজেও মনে হয় অবাক হন ভেবে, এক বছর আগে তাঁর আহ্বানে যে জনতা থালা-বাসন বাজালো, আজ তারাই কিনা তাঁকে বিদ্রুপ আর কটাক্ষ করছে! করোনা নিয়ে তাঁর আবেগে গলা রুদ্ধ হলে, চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলে, তাকে কুমীরের কান্না থামিয়ে টিকা, অক্সিজেন জোগান দেওয়ার কথা বলছে বিরোধী থেকে শুরু করে আপামর দেশবাসী। তার কাছের মানুষজনও এই সময়ে নিষ্ক্রিয়, তাদের প্রতিবাদের ভাষাও ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। একরকম চুপিচুপি নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল সাত থেকে আটে পা দেওয়া বর্ষপূর্তি। কোনও রকম উদযাপন হল না। উলটে দিন দিন বিদ্রুপ কটাক্ষ যেমন বাড়ছে তেমনি দেশজুড়ে বাড়ছে অসন্তোষ ও জনবিক্ষোভ। কেবল তার নিজের দেশেই নয় এত দিন যেসব দেশ ও সংবাদপত্র নেতা হিসেবে মোদির ভাবমূর্তি তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল আজ তাদের সমালোচনায় মোদিকেবিদ্ধ হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
অথচ এই মোদির সফল কর্মের লম্বা তালিকায় উল্লেখ করতে হয় ৪৯২ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। ৭৩ বছর পর সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে জোড়া। শিখধর্মাবলম্বীদের পাকিস্তানের নানকানা সাহেব এলাকায় যাওয়ার জন্য কারতারপুর ও হিন্দুদের জন্য কাশী বিশ্বনাথ করিডর তৈরি। নতুন সাজে কেদারনাথকে সাজানো এবং অবশ্যই নাগরিকত্ব সংশোধন আইন। কিন্তু এত বড় সাফল্যযাত্রার পরও সাত বছর পেরিয়ে আটের সন্ধিক্ষণে তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। জনপ্রিয়তা গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। আমেরিকার ডেটা ইন্টেলিজেন্স সংস্থা মর্নিং কনসাল্ট-এর রিপোর্ট অনুসারে, এখন মোদির জনপ্রিয়তা ৩৯ শতাংশ, যা ৯ মাস আগে ছিল ৪৬ শতাংশ! দেশের জনমত সমীক্ষা সংস্থা ‘সি ভোটার’-এর কথা অনুযায়ী মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ মোদির কাজে ‘খুব সন্তুষ্ট’, যা এক বছর আগে ছিল ৬৪ শতাংশ। উল্টো দিকে ‘একেবারেই সন্তুষ্ট নন’, এমন মানুষের সংখ্যা ১৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ।
একজন প্রবল জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী কি শুধু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে না পেরেই এই অবস্থায় পড়লেন? তাঁর সরকার যে করোনা সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে তার জন্য কিন্তু মোদিকেই দায়ি করছে দেশের মানুষ। কয়েক দিন আগে করোনা থেকে সামলে ওঠার যাবতীয় কৃতিত্ব একাই নিয়েছিলেন তিনি। প্রথম ধাক্কার পরে যে ভাবে সরকার অতিমারি নির্মূল হয়ে গিয়েছে বলে ঢক্কানিনাদ শুরু করেছিল আজ তার খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা দেশকে। দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য যখন সারা বিশ্ব প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মোদি সরকার চিকিৎসা-পরিকাঠামো উন্নয়নের চূড়ান্ত গা-ছাড়া দিয়ে সোনার বাংলা দখলে মেতে উঠলো। সে বাংলাও তাদের দূর করে দিল। কেবলমাত্র বাংলা নয়, বিজেপিকে হতাশ করেছে উত্তর প্রদেশও। উত্তর প্রদেশের পঞ্চায়েত ভোটে ১ নম্বরে সমাজবাদী পার্টি। জেলা পরিষদের মোট ৩ হাজার আসনের মধ্যে বিজেপির পাওনা এক–চতুর্থাংশ। তার ঠিক আগেই বিজেপিকে হতাশ হতে হয়েছে কর্ণাটক পুরসভার ভোটে। সেখানে বিজেপি সরকার থাকা স্বত্বেও সেই রাজ্যের ১০টি বড় শহরের মধ্যে বিজেপির প্রাপ্য মাত্র ১টি। আর মাত্র সাত মাস বাকি উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও উত্তরাখন্ড বিধানসভা নির্বাচনের। কিন্তু তার আগেই কৃষক আন্দোলন ও করোনায় জেরবার হওয়া বিজেপি ওই তিন রাজ্যের ভোট নিয়ে প্রমাদ গুনতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে সংক্রমণ চার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে মৃত্যু বাড়ল। অক্সিজেনের অভাবেই মারা পড়ছেন বহু করোনা আক্রান্ত মানুষ। প্রতিষেধকের প্রশ্নও বিরাট, সেখানেও কেন্দ্রের ভ্রান্ত নীতির কারণে বিরোধীদের আক্রমণের মুখে প্রধানমন্ত্রী। দেশ জুড়ে প্রতিষেধকের হাহাকার, রাজ্যে রাজ্যে টিকাকরণ কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে শুধুমাত্র কেন্দ্রের ভুল টিকা নীতির কারণে। মোদির টিকা নীতির সমালোচনায় কেবল বিরোধীরাই সরব নন, মুখর একদা তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। নীতি আয়োগের প্রথম প্রধান হিসেবে মোদি যাঁকে বেছেছিলেন সেই অরবিন্দ পানাগড়িয়া থেকে শুরু করে মোদির প্রাক্তন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মানিয়ামও। মোদির টিকা নীতি দেখে মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের আরেক প্রাক্তন সদস্য রথীন রায়ও চুপ করে থাকতে পারেন নি।
এক বছরের মধ্যে দু’টি লকডাউনে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। কাজ হারিয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। এর পাশেই রয়েছে কৃষকদের লাগাতার বিক্ষোভ। গত নভেম্বর মাস থেকে মোদি সরকারের তিন কৃষি বিলের বিরুদ্ধে পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের একটা বিরাট অংশ রাজধানীর বুকে অবস্থান করছে। সেই বিক্ষোভ আন্দোলনও ছ’মাস পূর্ণ করল। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, পঞ্জাবের মতো একাধিক বড় রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। সেখানে বিজেপির ভাল ফল করা যে কঠিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে মোদির জনপ্রিয়তা কেবল তলানিতেই নয়, তিনি এতটাই ব্যাকফুটে যে অস্তিত্বের মহাসংকট তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। ভাবমূর্তি উদ্ধারে ৩০মে দ্বিতীয় মোদী সরকারের বর্ষপূর্তি উদ্যাপনের পরিবর্তে যে কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে যতই গ্রামীণ মানুষের হাতে শুকনো রেশন, স্যানিটাইজার, মাস্ক ও অক্সিমিটার তুলে দেওয়া হোক, তার থেকে কোনও সুফলই ফলবে না।
সঠিক বিশ্লেষণ, যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা। ধন্যবাদ জানাই।
লেখাটি অত্যন্ত ভাল লেখা, কিন্তু মোদির সঙ্গে কি জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, মনমোহন সিং-এর তুলনা মানায়?