তিনি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বলে কথা, তাই জন্মদিনে তিনি মানে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করলে অথবা তাঁর মুখে নিজের প্রশংসা শুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গদগদ হয়ে পড়েন। কেবল তিনি নন তাঁর দলের ভক্তরাও তো সেটা ঢাক ঢোল বাজিয়ে প্রচার করেন। গোটা ব্যাপারটা যেন এটাই পতিপন্ন করে, অনেক দূরে সরে যাওয়া বন্ধু ফের কাছে ফিরে এসেছে। লক্ষনীয় ট্রাম্প বিগত কয়েক মাস ধরে অন্তত পঞ্চাশ বার পাক-ভারত সামরিক সংঘাত বন্ধে নিজের প্রভাব খাটানোর কথা বলেছেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে আর সেকথা তিনি বলছেন না। এতে অবশ্য বন্ধু মোদীকে তিনি বেজায় এক অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচিয়েছেন। এরপর চিত্রনাট্য বদলায়; ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর প্রথমে ২৫ শতাংশ পরে রাশিয়ার খনিজ তেল কেনার ‘শাস্তিস্বরূপ’ আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। ফলে মোট রফতানি শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। কিন্তু এরপরও মোদী ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া আলোচনা ফের শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখতে শুরু করেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী, বিদেশ মন্ত্রী এবং বিভাগীয় সচিবরা ট্রাম্পের চাপানো বানিজ্য শুল্কের খাঁড়া সরে যাবে বলে নানাভাবে আশ্বস্ত করতে শুরু করেন। শুধু কি তাই, তাঁরা বলতে শুরু করেন, নভেম্বর মাসের শেষ দিকে নাকি দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তিও সম্পন্ন হবে এবং তাতে নাকি দু’দেশেরই উপকার হবে। কিন্তু আচমকা আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো এইচ-১বি (H1B) ভিসার দাম বাড়িয়ে মোদীর স্বপ্নের সাজানো বাগান একেবারে ছারখার করে দিলেন।
এইচ-১ বি ভিসা আদতে কী? সংক্ষেপে এটি হল একটি অ-অভিবাসী ভিসা, যা দিয়ে প্রায় প্রতিটি দেশের যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীরা আমেরিকার গিয়ে এবং সেখানে থেকে সেখানকার বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করতে পারে। আমেরিকা এই ভিসাটি ১৯৯০ সাল থেকে চালু করেছিল। এই ভিসার জন্য তিনি আবেদন করতে পারবেন যদি তাঁর কোনও বিষয়ের উপর নূন্যতম স্নাতক ডিগ্রি থাকে। প্রাথমিকভাবে এই ভিসার মেয়াদ থাকে এক বছর। কিন্তু পরবর্তীতে তা এদন করে সব থেকে বেশি ছ’বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া যায়। তাছাড়া এই ছ’বছরের মধ্যে কেউ যদি আমেরিকায় গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করে এবং সেই আবেদন মঞ্জুর হয় তাহলে এইচ-১ বি ভিসার মেয়াদ ইচ্ছেমত বাড়িয়ে নেওয়া যায়। আর এই ভিসার মাধ্যমে একজন বিদেশি কর্মীর বেতন ও আমেরিকার স্থায়ী কর্মীর বেতন হয় সমান।
কিন্তু ট্রাম্প আচমকা মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়ে আমেরিকায় কাজের সূত্রে যাওয়া বিদেশিদের জন্য এইচ ওয়ান বি ভিসার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন। এর আগে যেটা হাতে পেতে লাগতো মাত্র দু’হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডলার সেটা নতুন নিয়মে পেতে লাগবে এক লক্ষ ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা। একেই তো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক তুঘলকি সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন দেশ পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। যদিও ট্রাম্প বরাবরই শুল্কনীতি ও অভিবাসন নীতি নিয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে অতি তৎপর। কিন্তু গত শুক্রবার আচমকা ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসার দাম চড়িয়ে দেওয়ায় বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মনে হচ্ছে এতে সবচেয়ে বেশি ভারতীয়দেরই ভুগতে হবে। প্রসঙ্গত, এইচ ওয়ান বি ভিসা নিয়ে যেসব বিদেশিরা আমেরিকায় কাজ করতে যায় তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ভারতীয়। বর্তমানে ৫ লক্ষের বেশি এমন ভারতীয় আমেরিকায় কাজের কারণে আছেন। এছাড়া যেসব ভারতীয় বেশি বেতন পান তাঁদেরও এক লক্ষ ডলার ভিসার জন্য দিতে হলে নিজের হাতে আর কিছুই প্রায় থাকবে না। অন্যদিকে এই অবস্থায় যেসব কোম্পানির হয়ে তাঁরা আমেরিকায় কাজ করতে যান সেইসব কোম্পানি যদি তাদের ভিসার টাকা দিতে সম্মত না থাকে তাহলে ভারতীয়দের পক্ষে আমেরিকায় চাকরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে বন্ধু ট্রাম্পের নতুন এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে সবথেকে বড় ধাক্কা খেতে হবে মোদীর ভারতকে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ায় ভারতের বানিজ্য ও অর্থনীতি দুনিয়ার অন্দরমহলে ত্রাহি মধুসূদন রব উঠেছে মোদী কি তা শুনেও শুনতে পারছেন না।
মোদীর নিজের দেশে কাজের সুযোগ নেই ফলে আমেরিকায় কাজের জন্য পাড়ি দেওয়া মানুষদের পড়তে হবে মহা মুশকিলে। তাছাড়া যারা ইতিমধ্যেই আমেরিকায় কাজ করছেন তাঁরা কি সেখানে বহাল হতে পারবেন নাকি তাঁদের মধ্যে অনেককে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরতে হবে? যদিও এখনও সেটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু যদি দু-তিন লক্ষকেও ফিরতে হয় তাহলে কি এদেশে তাঁদের কাজ জুটবে, কীভাবে? নাকি নতুন করে বেকারির স্রোত বইতে শুরু করবে। অন্যদিকে তাঁদের পাঠানো ডলার আসাও তো বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রার জোগান কমবে। তেমনি যেসব সংস্থা ভারতীয়দের আমেরিকায় কাজের জন্য পাঠায় তাঁদেরও আয় যাবে কমে। সব মিলিয়ে মোদীর বন্ধু এমন ঘা মেরেছে যাতে শুধু এক ভিসার ধাক্কাতেই বহু ভারতীয়দের ‘আমেরিকা-স্বপ্ন’ চুপসে যাবে। শুধু তাই নয়, চাপে পড়বে বহুজাতিক সংস্থাগুলিও। এতে ট্রাম্পের বন্ধু মোদীর তেমন সমস্যা না হলেও সমস্যা বাড়বে এদেশের অর্থনীতির, অন্যদিকে কমবে উচ্চ শিক্ষিতের হার এবং উচ্চমানে দক্ষদের রোজগার।