দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেদিন ১০০ কোটির বেশি মানুষকে করোনা টিকা দেওয়ার জন্য কর্মসূচির দরোজা খুলে দিলেন, সেদিনও কিন্তু সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যার কাছাকাছি টিকা হাতে ছিল না। দেশের ১০০ কোটি মানুষকে টিকা দিতে লাগবে ২০০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন। তার থেকেও বড় ব্যাপার হল দেশে যখন করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ল এবং সতর্কবার্তা দেওয়া হল যে তৃতীয় আরেকটি ঢেউ আসছে, তখনই দেখা গেল টিকার ঘাটতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোদির সরকারের একাধিক ভুল নীতি ও পদক্ষেপ ভারতের টিকাদান উদ্যোগকে একটা বড় ধরণের অসম প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে। কেন্দ্র সরকারের সেই ভুল নীতির মধ্যে আছে পরিকল্পনার অভাব, বিচ্ছিন্ন ভাবে ভ্যাকসিন সংগ্রহ এবং টিকার দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা। যে কারণে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা ভারতে এখন টিকার গভীর সঙ্কট। টিকার অভাবে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বহু টিকাদান কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
আমাদের দেশে করোনার টিকা নেওয়ার জন্য অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করতে কে কত দ্রুত আঙুল চালাতে পারে তার খেলা। সবগুলো স্লট তিন সেকেন্ডেই ভরে গেল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হাসপাতাল তার স্লটটি বাতিল করে দিলো। তাকে জানানো হলো তাদের কাছে কোনও ভ্যাকসিন নেই। তার মানে আপনাকে আবার নতুন করে ভ্যাকসিন নেওয়ার সময় বুক করার কভেলায় নামতে হবে। ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সীকে টিকা নেওয়ার জন্য কো-উইন নামে সরকারি ওয়েবসাইটে নাম নথিভুক্ত করতে হবে। কিন্তু টিকা নেওয়ার চাহিদা ভ্যাকসিনের সরবরাহের থেকে অনেক বেশি।

অন্যদিকে, দেশে কোটি কোটি মানুষ আছেন যাদের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু টিকা পাওয়ার একমাত্র রাস্তা হল অনলাইনে সময় বুক করা। কিন্তু টিকার এই নিদারুণ অবস্থা হল কেন? ভারত ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য অর্ডার দিতে জানুয়ারি মাস লাগিয়েছিল। কেবল দেরি নয়, অর্ডার দিয়েছিল খুবই সামান্য পরিমাণ টিকার। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন, যা ভারতে সিরাম ইনস্টিটিউট তৈরি করছে কোভিশিল্ড নামে এবং ভারতীয় সংস্থা ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাকসিন। আমাদের দেশ ২০২১ এর জানুয়ারি এবং মে মাসের মধ্যে এই দুটি অনুমোদিত টিকার মাত্র ৩৫ কোটি ডোজ কিনেছে। এই পরিমাণ টিকা এ দেশের জনসংখ্যার জন্য কি যথেষ্ট? মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের জন্যও যথেষ্ট নয়। প্রতি ডোজ টিকার জন্য দাম ২ ডলার এবং এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুলভ মূল্যের টিকাগুলির অন্যতম। এই পরিমান টিকা কিনে প্রধানমন্ত্রী করোনায় মরে যাওয়া মানুষবদের জন্য দেশবাসীর সামনে চোখের জল ঝড়ানোর অভিনয় করছেন। যদি কুমীরের কান্নায় ক্ষান্ত দিতেন তবু মানা যেত কিন্তু তিনি সদর্পে ঘোষণা করে দিলেন যে, ভারতে করোনা পরাস্ত হয়েছে। এমনকি তিনি ভ্যাকসিন নিয়েও কূটনীতি করতে ছাড়লেন না। চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি তার দেশে যত মানুষকে টিকা দেওয়া হয়, তার থেকে বেশি পরিমাণ টিকা বিদেশে দান করে দিলেন।
অন্যদিকে, আমেরিকা এবং ইইউ ভ্যাকসিন বাজারে আসার প্রায় এক বছর আগেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ডোজ টিকা আগাম অর্ডার করে দিয়েছিল। ওই টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি তাদের সরবরাহ ও বিক্রির ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়েছিল, এবং ভ্যাকসিন উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে কোনও কোনও দেশের সরকার যাতে তাড়াতাড়ি প্রচুর পরিমাণ টিকা পেয়ে যায় তারও নিশ্চয়তা দিয়েছিল। সেখানে ভারত টিকা উৎপাদনে সিরাম ইনস্টিটিউট এবং ভারত বায়োটেককে সহায়তা করার জন্য ৬১ কোটি ডলার অর্থসাহায্য অনুমোদন করতে অপেক্ষা করেছে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। ততদিনে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে।
মোদি সরকারের আরেকটি ব্যর্থতা হলো ভারতে জৈব বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন বহু উৎপাদন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলিকেও এই উদ্যোগে সামিল করা যেত। তাদের টিকা তৈরির সক্ষমতাকে কাজে লাগানো যেত। কিন্তু সে ভাবনা করার মানুষ মোদি সরকারেঢ় নেই। তিনটি সরকারি মালিকানাধীন সংস্থা-সহ চারটি সংস্থাকে সম্প্রতি কোভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কোভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে তবে আংশিক সরকারি অর্থে।

অন্যদিকে, এপ্রিলের গোড়ার দিকে রাশিয়ায় স্পুটনিক-ভি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করে, যাদের ভারতে এই টিকাটি তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। জানা যায়, কেন্দ্রীয় সরকার একমাত্র ক্রেতা হিসাবে গোড়াতেই টিকার দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে একটা বড় ভূমিকা নিতে পারত। যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে ভ্যাকসিন কেনা হয়েছিল, সেক্ষেত্রে সরকার টিকার দাম ২ ডলারের নীচে নামিয়ে আনতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে দাম আরও বেড়ে গেল। তার কারণ, ১মে থেকে রাজ্যগুলি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে দর-দাম করছে। এর থবেকে একটা কলঙ্কজনক আর কি হতে পারে। আসলে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দায় দায়িত্ব ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলে রাজ্যগুলির মধ্যে একটা হতাশাজনক প্রতিযোগিতার দরজা খুলে দিয়েছে।
ফলে রাজ্যগুলিকে এখন কোভিশিল্ডের জন্য আর কোভ্যাকসিনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কেনা দামের থেকে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ডোজ কোভিশিল্ড তাদের কিনতে হচ্ছে ৪ ডলার দিয়ে, আর কোভ্যাক্সিন প্রতি ডোজ ৮ ডলার দামে। রাজ্যগুলিকে একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়তে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলির সঙ্গে। টিকার মজুত যেহেতু কম, তাই বেশি মূল্যে যে কিনতে পারবে টিকা সেই পাবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলি সুবিধা পেয়ে গিয়েছে; তারা বাড়তি দামটা তুলে নেবে ক্রেতাদের কাছ থেকে। বাজার খুলে দেওয়া হল ঠিকই, কিন্তু শবুরু হয়ে গিয়েছে অসম প্রতিযোগিতা। বেসরকারি হাসপাতালগুলি এক ডোজ ভ্যাকসিন বিক্রি করছে দেড় হাজার টাকায়।
লেখকের কথা অনুযায়ী মোদিও তার সরকারের ফাঁসি হওয়া উচিত। এরা চেয়েছিল বাংলা জয় করতে!
মোদি সরকারের লক্ষ্য হিন্দুত্ব, ফ্যাসিবাদ, ওরা দেশ বা মানুষের কোনও দায় নিতে রাজি নয়। অন্যদিকে একটার পর একটা
রাজ্য থেকে ওরা উৎখাত হচ্ছে-এই অবস্থায় ওরা পাগলা কুকুর হয়ে গিয়েছে।