তালেগাঁওয়ের মন্টুর সবজির দোকানের সামনে দেখি খন্ড খন্ড বিশালাকার হাত পায়ের গড়াগড়ি।
এই মন্টু এগুলো কি রে! রাবণের বডি? দশেরাতে রাবণ জ্বালাস নি তোরা?
মন্টু আধা কিলো ভিন্ডি ওজন করতে করতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, — এ আন্টি, তুমি দেখছি কিছুই জানো না। রাবণ কেন হবে! আমরা নরকাসুর বানাচ্ছি। নরকচতুর্দশীতে একে জ্বালানো হবে। আমরা ডান্স করব। তুমি দেখতে আসবে তো!
গোয়ার নরকাসুরের ব্যাপারটা ঠিক জানা ছিল না। আমি আমতা আমতা করলাম।
একটু খোঁজখবর করতেই দেখি দীপাবলির আগে গোয়ার অলিতে গলিতে নরকাসুর জেগে উঠছেন। খুব ব্যস্ততার সঙ্গে চলছে তাদের সাজসজ্জার প্রস্তুতি পর্ব।

মাসলম্যান, সুমো পালোয়ান, রাক্ষস-খোক্কস, ড্রাকুলা, হাল্ক, হারকিউলিস, সুপারম্যান… দেশী-বিদেশী সব হি ম্যানেরা নরকাসুর রূপে অবতীর্ণ হবেন ভূত চতুর্দশীতে। তারা লম্বায় প্রায় বারো /চোদ্দ ফুট। তাদের নিয়ে শোভাযাত্রা, প্রতিযোগিতা, নাচাগানা। ভক্ষক কখনো কখনো রক্ষকের তুলনা লাইমলাইটে বেশি চলে আসেন!!!
গোয়ার ভূত চতুর্দশীর নায়কের গল্পটা তাই একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক।
মনোরম, নয়নলোভন ক্ষুদ্র গোমান্তক দেশ। সিন্ধুসাগর নিত্য তাহার চরণ প্রক্ষালন করে। সহ্যাদি পর্বতমালা সে সুন্দরের কিরীট হইয়া বিরাজমান। হরিৎ বনভূমি তাহার কটিতট বেষ্টন করিয়া মেখলা হইয়া শোভা দেয়। অঘনাশিনী, মান্ডবী নদীর জলতরঙ্গ গোমান্তকের পদপ্রান্তে নুপূর হইয়া রুণুঝুনু বাজিতে থাকে।
ঊর্বর মৃত্তিকা, পর্জন্যদেবের কৃপাধন্য এ দেশ। দেশবাসীরা ধান্য উৎপাদন করে। বৃক্ষে ফলমূলাদি, সাগরে-নদীতে মৎস্য অতি সুলভ। অন্নমৎস্যভোজী গোমান্তকের অধিবাসীদের তাই নিশ্চিন্ত দিনযাপন। নিদ্রায় সুখস্বপ্ন।

অকস্মাৎ এ সুন্দর স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়ে অতিকায় এক দানবের আগমনে। সে ভয়ঙ্কর, দুর্দম, ক্ষমতালোভী, অত্যাচারী। সমস্ত পৃথিবী সে করায়ত্ত্ব করিতে চাহে। গোমান্তকের ন্যায় ক্ষুদ্র-সুন্দর দেশ, সে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, সুন্দরী রমণী সবই তার লালসার লক্ষ্য। গোমান্তকের ষোলো হাজার নারীকে সে হরণ করিয়া আপনার কুক্ষিগত করিয়াছে।
সে প্রবল শক্তিধর অসুর। ভূদেবী এবং বিষ্ণুর বরাহবতারের পুত্র। তাহার নাম নরকাসুর। মর্ত্য অধিকার করিয়া সে ইন্দ্রের স্বর্গের পানে দৃষ্টিপাত করিয়াছে। স্বর্গ মর্ত্যের সকল অধিবাসী নরকাসুরের অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হইলেন।
ভক্তের কাতর আহ্বান ভগবান উপেক্ষা করিতে পারিলেন না। তিনি গরুড়পৃষ্ঠে গোমান্তকে অবতরণ করিলেন। সঙ্গে প্রিয়তমা পত্নী, সাহসিনী সত্যভামা। তিনিও রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইলেন। কার্তিকী অমাবস্যার অন্ধকার রাতে ভয়ঙ্কর, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হইল। নারায়ণ সুদর্শন চক্রদ্বারা নরকাসুরের মস্তক কর্তন করিলেন। মৃত্যুর পূর্বে নরকাসুর শ্রীকৃষ্ণের সদৃশ প্রার্থনা করিল, “আমার মৃত্যুৎসব প্রতিবৎসর গোমান্তকে বাগাড়ম্বরে পালিত হইবার আশ্বাস দিন প্রভু। নচেৎ আমি মরিয়াও শান্তি পাইব না”।
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, “তথাস্তু। তাহাই হইবে।” এ আশ্বাসবাণী শুনিয়া অত্যাচারী নরকাসুর মৃত্যুবরণ করিল।

শ্রীকৃষ্ণ সিন্ধুসাগরে পুণ্যস্নান করিয়া শরীরের ক্লেদ দূর করিলেন। গোমান্তকবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল। অত্যাচারিতা ষোলো হাজার রমণী বিপদমুক্ত হইয়া আপন আপন গৃহ দীপমালায় সজ্জিত করিল (মতান্তরে এই ষোলো হাজার ধর্ষিতা রমণীকে শ্রীকৃষ্ণ বিবাহ করিয়াছিলেন)। নরকাসুর বধের পথ ধরিয়া গোমান্তক বা গোয়ায় এক নতুন আনন্দোৎসব, দীপাবলীর সূচনা হইল।
(এ গল্প চলিত ভাষায় ঠিক জমল না, তাই সাধুভাষার আশ্রয় নেওয়া। সুধী পাঠকরা মাফ করবেন)