সম্প্রতি সংসদে দেশের পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়করি জাতীয় সড়কে দুর্ঘটনার যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তা চমকে ওঠার মত। তার হিসেবে ২০২০তে জাতীয় সড়কে পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ৪৮ হাজার মানুষ। মন্ত্রী তো দুর্ঘটনার হিসেব পেশ করেই খালাস, কিন্তু কেন পথ দুর্ঘটনা বাড়ছে সে ব্যাপারে তিনি নীরব! কোন দুর্ঘটনা ঘটার পর কর্তাব্যাক্তিরা অবস্থার উন্নতি করতে হবে, দোষীদের শাস্তি দিতে হবে জাতীয় অর্থহীন বিবৃতি দিয়ে নিজেদের ‘দায়িত্ব’ পালন করেন। কিন্তু এই ঘটনা ঘটছে যে তাদেরই ব্যর্থতাতে তা কবুল করেন না। ট্রাফিক আইন না মানা, মদ খেয়ে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল না মানা, পুলিশের অসতর্কতা, বেআইনি সামগ্রী পাচারকারী চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ইত্যাদি নানা কারণে পথ দুর্ঘটনা ঘটে। বিবৃতি দেওয়ার আগে এই কারণগুলির মূল উৎপাটন করা জরুরি। সে কাজটাই করা হয়না। আমাদের সবকিছু বিবৃতিতে শুরু আর বিতর্কে শেষ।

সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়ে কেউ বলতে পারেন ২০১৯ এ মারা গিয়েছিলেন ৫৩ হাজার ৮৭২ জন মানুষ। তাহলে একটু কমেছে বলতে হবে। এটাকে যারা অগ্রগতি বলছেন তাদের সবিনয়ে বলি, পথ দুর্ঘটনার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা বস্তুত অসম্ভব। কারণ বহু ঘটনা পুলিশ ও প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকে। বহু মৃত্যুর প্রকৃত কারণও জানা যায়না। দুর্ঘটনায় রাজপথে পরে থাকা মৃত ব্যাক্তিকে শারীরিক অসুস্থতায় মৃত বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। দেশের জাতীয় সড়ক ও এক্সপ্রেস ওয়েগুলিতে পুলিশ টহল ও নজরদারি প্রয়োজনের তুলনায় কম। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পড়ে আছে মধ্যযুগে। বহু থানা তাদের এলাকায় ঘটা দুর্ঘটনার দায়িত্ব নিতে চায় না। অন্য জেলা বা থানায় ঘটেছে বলে চালিয়ে দেয়। তাই প্রকৃত ছবি সামনে আসা দুষ্কর।

বিশেষজ্ঞদের মতে পথ দুর্ঘটনার নানা কারণ আছে। এই কিছুদিন আগেই পশ্চিমবঙ্গে পথ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন শবযাত্রায় যাওয়া একদল মানুষ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে চালক মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিল। বেশকিছু দিন সে ছুটিও পায়নি। প্রশ্ন হল, এই সমস্যার সমাধান করা যাবে কি করে? মদ্যপান করে গাড়ি চালানো বন্ধ করা কিংবা চালকদের ছুটি বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারে গাফিলতির প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়।

মদ বা ড্রাগ খেয়ে গাড়ি চালানো তো ছিলই, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ম্যানিয়া। চালক ও পথচারী দুজনের কানেই মোবাইল। জগৎসংসার ভুলে পথ চলছেন তারা। তাছাড়াও রয়েছে খারাপ রাস্তা, পথচারী ও ড্রাইভারদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, প্রয়োজনের তুলনায় সড়কের সংখ্যা কম থাকা, বাতিল ও খারাপ গাড়ির চলাচল বন্ধ করতে না পারা ইত্যাদির সমস্যা। সব মিলিয়ে এটা একটা সামগ্রিক সমস্যা।

এটা রোখার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের কোন সামগ্রিক নীতি রয়েছে বলে জানা নেই। ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরওয়ারি একটা দুর্ঘটনার হিসেব পেশ করেই নিজেদের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। ২০১৬ – ১৮ সময়কালে দেশের জাতীয় সড়কগুলিতে মোট ৫৮০৩টি দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই চিহ্নিত করাতেই কাজ শেষ। এই জায়গাগুলিতে যান নিয়ন্ত্রণ ও পথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। জাতীয় সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ হল এই দৃষ্টিভঙ্গি। এই মনোভাব না বদলালে দুর্ঘটনা বাড়বেই।