মোদি সরকারের ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইনকে আগেই চরম জনস্বার্থ বিরোধী নীতি বলে আখ্যায়িত করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তারা ইতিমধ্যে কেন্দ্রকে অবিলম্বে এই নীতি প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে রাজ্যসভার চিফ হুইপ সুখেন্দুশেখর রায় বলেছেন, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সরকারি মালিকানাধীন যে শিল্পগুলিকে অলাভজনক, ঋণগ্রস্ত বলে বেসরকারিকরণ করার কথা বলেছেন, তা আসলে সরকারি সম্পত্তি কর্পোরেট সংস্থা ও পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা।
রাজ্যসভার সদস্য সুখেন্দুশেখর রায় সাংবাদিকদের বলেন মোদি সরকারের জাতীয় নগদীকরণ পাইপলাইন একটি ‘অত্যন্ত ভয়ঙ্কর জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, গত ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের বিজেপির দলীয় ইশতেহারেও এই পরিকল্পনার কোনও উল্লেখ ছিল না। এমনকি পার্লামেন্টেও এ নিয়ে আলোচনা হয়নি। দুদিন আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছিলেন যে কেন্দ্র সরকারের এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য রাজকোষে আরও অর্থ সংগ্রহ। তার মানে ‘দেউলিয়া’ নরেন্দ্র মোদি সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি ‘বিপজ্জনক নীতি নির্ধারণ’ করেছে যার মাধ্যমে আসলে ধীরে ধীরে রেল, রাস্তা, বিমানবন্দর এবং খনির মতো সরকারি সম্পত্তি কর্পোরেট সংস্থা ও পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিতে চলেছে।
রাজ্যসভার সদস্য সুখেন্দুশেখর রায় একথাও বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কোনও কেন্দ্রীয় সরকার কখনও এমন অসহায়ভাবে পুঁজিপতি বা কর্পোরেট সংস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। এই মুহূর্তে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার কোটিপতি, পুঁজিপতিদের দ্বারা এবং তাদের জন্যই পরিচালিত হচ্ছে। মোদি সরকার পুরোপুরি বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। এই সরকার যে দেউলিয়া তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। না হলে কখনোই এভাবে সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবত না। মোদি সরকারের আর্থিক দৈন্যতা এতটাই খারাপ অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে সামান্য মোবাইল, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে শুরু করে মাটির তলার পাইপলাইনও বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে। শুধু কি তাই, মোদি সরকার রেল থেকে শুরু করে বিমানবন্দর, নৌবন্দর এমনকী, জাতীয় সড়কগুলিও বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে।
বেশ কিছু তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে সুখেন্দুশেখর রায় বলেন, দেউলিয়া মোদি সরকারের এনএমপি কতখানি বিপজ্জনক পদক্ষেপ তা বোঝা যায় ২৬,৭০০ কিমি জাতীয় সড়ক, ৪০০ রেল স্টেশন, ১৫০ টি ট্রেন-সহ ৪২,৩০০ কিমি ট্রান্সমিশন লাইন, ৮,০০০ কিমি লম্বা গেইল পাইপলাইন, ৪,০০০ কিমি লম্বা তেল পাইপলাইন, বিএসএনএল এবং এমটিএনএল টাওয়ার তারা কর্পোরেটদের হাতে ২৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য লিজ দেবে পরবর্তীতে তা আরও বাড়ানো হবে। এছাড়াও ১৬০ টি কয়লা এবং অন্যান্য খনিজ খনির প্রকল্প, ২১টি বিমানবন্দর, ৩১টি বন্দর এবং দুটি ক্রীড়া স্টেডিয়ামও বেসরকারীকরণ করা হবে। এমনকি আইকনিক দার্জিলিং টয় ট্রেনও একটি বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রি করা হবে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে তারা দেউলিয়া করেছে ঠিকই। কিন্তু এর জন্য একমাত্র দায়ী মোদি সরকার। তাই আজ সরকার অর্থ সংগ্রহের জন্য সবকিছু বিক্রি করে দিচ্ছে, কিন্তু কেন কেন্দ্রীয় ভিস্তা প্রকল্পটি ব্যয় করা হচ্ছে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। উপ-রাষ্ট্রপতির জন্য একটি নতুন ঘর তৈরিতে ২০ হাজার কোটি এবং ১৯০ কোটি টাকা কেন ব্যয় করা হচ্ছে তার জবাব নেই। তৃণমূলের চিপ হুইপ সুখেন্দু শেখর রায়ের প্রশ্ন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার আগে মোদি সরকার কেন সংসদের অনুমতি নিল না? কেন সাধারণ মানুষের মতামত জানার চেষ্টা করল না?
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রীর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার কোনও জমি বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রি করে দিচ্ছে না। যেসব পরিকাঠামো তৈরি রয়েছে সেগুলোর উপযুক্ত ব্যবহারের জন্য বেসরকারি সংস্থাকে লিজ দেওয়া হচ্ছে। সরকার টাকা আয়ের জন্য মরিয়া নয়। যে সমস্ত সরকারি সম্পত্তি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে বা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না সেগুলি বেসরকারি সংস্থাকে চুক্তির ভিত্তিতে দিচ্ছে। এর ফলে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা আয় হবে তেমনই এই সমস্ত সম্পদগুলিকে বেসরকারি সংস্থা কাজে লাগানোর ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। কর্মসংস্থান হবে। অন্যদিকে এই এনএমপি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের ঘরে যে টাকা আসবে তা দিয়ে নতুন পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
যদিও কেন্দ্র সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগামী চার বছরে কেন্দ্রীয় সরকার ২৬৭০০ কিলোমিটার জাতীয় সড়ক থেকে ১.৬ লক্ষ কোটি টাকা, ৪০০ রেলস্টেশন এবং ১৫০ টি ট্রেন থেকে সরকারের ঘরে আসবে ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা। ৪২৩০০ কিমি পাওয়ার ট্রান্সমিশন লাইন বেসরকারি সংস্থার হাতে দিয়ে ০.৬৭ লক্ষ কোটি টাকা, ৮ হাজার কিলোমিটার জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন থেকে ০.২৪ লক্ষ কোটি টাকা সরকারের আয় হবে বলে জানাচ্ছে।
কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মসূচি বিষয়ে জানতে চাইলে সুখেন্দুশেখর রায় সাংবাদিকদের বলেন, তৃণমূল অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিবাদ করবে। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রের এই সংস্কারের বিরুদ্ধে। কেন্দ্র সরকার বিগত কয়েক বছরে যতগুলি সংস্কার এনেছে, সেগুলি মুদ্রাস্ফীতি এবং দারিদ্র্যের কারণ হয়েছে। এই সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এখন তহবিল সংগ্রহের জন্য সরকারী সম্পত্তি বিক্রির রাস্তা নিয়েছে।