ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল যে, ইতিহাস পড়ে আমাদের দেশের পড়ুয়ারা স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোয় তা আসলে কাটাকাটি, মারামারি আর ক্ষমতা দখলের ইতিহাস। পাঠান, মোগল, পর্তুগিজ, ফরাসি ইংরেজ সকলে মিলে যেন এই ইতিহাসের গতিকে আরও জটিল করে তুললো। এর মধ্যে থেকে ভারতের ইতিহাসের খোঁজ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন, এত দুর্বিপাকের মধ্যে সন্ত তুকারাম, কবীর, চৈতন্য, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জন্ম হলো কোথা থেকে? কবি বলেছেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শত, সহস্র শিকড় ভারতবর্ষের মর্মস্থান অধিকার করেছে। এই শিকড়ে মিশেছে নানা জাতি, নানা ধর্মের বিবিধ ঐতিহ্য। কবি কিন্তু বার বার গীতাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী ভাবনার তীব্র সমালোচক। প্রত্যেক ধর্মকেই তিনি খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। খোলামনে ভেবে দেখেছেন। কোনওটি কারও চেয়ে ছোটো নয় বা বড়ো নয়। শ্রেষ্ঠত্বের কোনও দাবি কবির কাছে মূল্যহীন। বরং রাজনীতি, ধর্মনীতি সম্পর্কে তাঁর সাফ বক্তব্য, রাজনীতির প্রয়োজনে ধর্মকে মিশিয়ে নিজেদের আখের গোছানো আসলে দেশের সমূহ সর্বনাশ করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি আজ যখন গোটা দেশজুড়ে বিভাজনের রাজনীতি , বিপুল শক্তি নিয়ে মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেই সঙ্গে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ ক্রমশ শক্তি বৃদ্ধি করছে, তখন রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম প্রবন্ধটি নিঃসন্দেহে দিক নির্দেশকারী। তা ছাড়া এই প্রবন্ধের এ বছর শতবর্ষ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। তাঁর লেখা গান ওপার বাংলারও জাতীয় সংগীত। এমনকী শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের রচনায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রয়েছে।
১৯১২ সালেই রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনালিজমকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রশান্ত মহালনবিশ এক দীর্ঘ চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনওভাবেই ন্যাশনালিস্ট ছিলেন না, ন্যাশনালিজমকে সমর্থন করেননি, এমনকী স্বদেশী আন্দোলনের সময় যখন তিনি নিজেও সেখানে কিছু দাবি নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন তখনও তিনি তাঁর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সকলের সামনেই প্রকাশ করেছেন।
তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থানের কারণে তাঁকে অনেকেই ইংরেজ শাসকের সমর্থক বলে প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁর সময়ের দেশনেতাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মতবিরোধ বার বার স্পষ্ট হয়েছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রয়াত হন ১৯১২ সালে। তাঁর স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিপিনচন্দ্র পাল যা বলেছিলেন, তা কার্যত নাম না করে রবীন্দ্রনাথকেই তুলোধোনা করা। চরিত্র গঠন, নৈতিকতা এই সব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ যেসব উদাহরণের উল্লেখ করছিলেন তা কিন্তু দেশনেতাদের বক্তব্যের বিরোধীই ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলন আদতে যেন ক্ষমতা দখলের লড়াই হয়ে উঠছে— এই আশঙ্কা রবীন্দ্রনাথ বার বার ব্যক্ত করেছেন। যে কোনও রাজনৈতিক প্রয়াস ক্রমশ যদি ক্ষমতাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় তাহলে মানুষের কল্যাণ কতটা হবে, এ নিয়ে তাঁর সংশয়কে তিনি খোলাখুলিই প্রকাশ করেছেন।
১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের লন্ডন যাত্রা নিছক দুর্ঘটনা নয়। অনেকেও এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে থাকেন যে, যেহেতু তিনি স্বদেশে নিজের স্বীকৃতি পাচ্ছিলেন না, তাই স্বীকৃতির আশায় বিলেত ভ্রমণে বের হন। এই ব্যাখ্যা অতি সাধারণীকরণ করে করা হয়েছে। এতে করে এই যাত্রায় তাঁর যে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই যাত্রায় তার যে সংকল্প ছিল তাঁর স্বরূপ পাওয়া যায় তাঁরই লেখা ইংরেজি প্রবন্ধসম্ভারে, এই সংখ্যা নেহাত কম নয়। এই প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে, দি মডার্ন রিভিউ এবং তাঁর ম্যকমিলান থেকে প্রকাশিত বইগুলোতে। সেই লেখাগুলোতে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার এক ধারাবাহিক বিবরণ লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় সভ্যতা, ন্যাশনালিজম ও ব্রিটিশ শাসন, উপনিষদ ও বেদ প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সমালোচনামূলক পরিবেশ তৈরি করেন । অনেক মনে করেন, এই লেখাগুলো আরও স্পষ্ট করে যে তিনি হেগেলের মতই বিশ্ব ইতিহাসকে দেখেছেন, History as a Steady unfolding of an idea. হেগেলের সাথে তার ভাবনার পার্থক্য এখানেই যে তিনি তার ভাবনার কেন্দ্রে রেখেছেন ভারতবর্ষকে। তিনি যে মর্ডানিটি বা আধুনিকতার যে বিকল্প চিন্তা প্রকাশ করেছেন সেখানে পশ্চিমের ধারণা, রাজনীতি এবং প্রযুক্তিকে ইতিহাসের বিবর্তনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নয় বরং কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ উপনিবেশগুলিতে উন্নয়ন বা প্রগতির যে ধারণা তৈরি হচ্ছে তা একান্তভাবেই ইউরোপের সাপেক্ষে। সেই সঙ্গে কবির তীব্র প্রতিক্রিয়া যে, প্রত্যেক উপনিবেশই
নিজেদের শরীরে ইউরোপের দেওয়া ক্ষতচিহ্ন বহন করছে। সেই সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ইউরোপীয় ধারণা যেগুলো সহজভাবে গ্রহণ করা কঠিন আবার বাতিল করাও শক্ত। কেন শক্ত? যেহেতু ইউরোপই সভ্যতার মাপকাঠি। আবার আধুনিক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার যে বৈপ্লবিক অগ্রগতি হয়েছে তা স্বীকার করতে কবির এতটুকু দ্বিধা নেই। কিন্তু এসবের মধ্যে দিয়ে সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার আদর্শ যদি কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়, সে বিষয়ে কবির ধিক্কার বার বার বর্ষিত হয়েছে।
১৯১৬ সালে ইউরোপ যখন যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে, রবীন্দ্রনাথ তখন জাপান সফরে যান। উদ্দেশ্য ছিল জাপানবাসীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেওয়া। উল্লেখ্য, সেই সময় জাপানকে বলা হতো এশিয়ার ব্রিটেন। তখন তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বর্ণযুগ চলছে। রবীন্দ্রনাথকে পশ্চিম যেহেতু সম্মাননা দিয়েছে (নোবেল পুরস্কার) তাতে তো আর জাপান পিছিয়ে থাকতে পারে না। সেখানে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো করেই স্বাগত জানানো হয়েছিলো। তাঁর সফরের খবর প্রধান প্রধান প্রত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপানো হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাপানে দেওয়া রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি বক্তৃতার বিষয় ছিল ন্যাশনালিজম। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বক্তব্য রীতিমতো র্যা ডিক্যাল। ওই সময় তা ছিল একেবারেই আনকোরা ও উত্তেজক। জাপানে এক বক্তৃতা সভায় কবি বলেন, যে ভাষায় আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি (ইংরেজি) তা আপনাদেরও ভাষা নয়, আমারও ভাষা নয়। আমি যদি আপনাদের ভাষা জানতাম, নিশ্চয়ই সেই ভাষাতেই বলতাম। আবার আমি যদি নিজের ভাষায় বলার চেষ্টা করতাম তাহলে নিশ্চয়ই আরও ভালো করে বলতে পারতাম।
এই বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ শুধু ন্যাশনালিজমের সমালোচনাই করেননি, একই সাথে তা কেমন করে সামরিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিকাশে প্রত্যক্ষ মদত দিয়ে থাকে তার স্বরূপ নিয়ে কথা বলেছিলেন। এই বক্তব্যে স্পষ্ট উঠে এসেছিল যে, ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ সবসময়ই এলিয়েন, আদার বা অপরকে ব্যতিরেকে গড়ে উঠতে পারে না। অমুক দল বা গোষ্ঠীর বাড়বাড়ন্ত হয়েছে অতএব আমরা এবার কোমর বাঁধি। ১৯১৭ সালের অক্সফোর্ডে ন্যাশনালিজম বক্তৃতায় এ কথা আবার কবি উল্লেখ করেন। প্রতিযোগিতা, যার মধ্যে হিংসার মিশেল আছে সেটাই এই ন্যাশলিজমের অন্যতম বুনিয়াদি বিষয় বলেও কবি আক্রমণ করেন। এবং স্পষ্টই বলেন, ন্যাশনালিজম অভিশাপ।
এই সমালোচনায় তিনি জাপানের ন্যাশনালিজমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নয়া রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ পরিণতি যে শুভ হবে না তা নিয়েও সতর্ক করেছিলেন। তার মতে জাপানের জন্য সব থেকে বিপজ্জনক বিষয় ছিল ‘Not the imitation of the outer features of the west but the acceptance of the motive force of the western nationalism as her own’. রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা জাপানিদের যারপরনাই বিরক্ত ও রাগান্বিত করেছিল। জাপানের পত্রিকাগুলো ওই সময়ে কবির বক্তব্যকেও পরাজিত সভ্যতার এক হতাশ কবির বিলাপ হিসেবেই অবিহিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে, ১৯২৪ সালে যখন তিনি চীন ভ্রমণ করেছিলেন তখনও প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল। ভারতবর্ষে ন্যাশনালিজমের জোগান নতুন ছিল না। অনেক ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম সম্পর্কিত বক্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রত্যাশিত বলেই মনে করতেন। তিনি ইতিমধ্যে ভারতীয় ন্যাশনালিস্টদের আন্দোলনে ভায়লেন্স-এর ব্যবহারের যুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর তিন রাজনৈতিক উপন্যাস, যথা — গোরা (১৯০৯), ঘরে বাইরে (১৯১৬) ও চার অধ্যায়-এ (১৯৩৪), তিনি ভারতের গড়ে ওঠা কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ন্যাশনালিজমের প্রতি সমালোচনামূলক আক্রমণ ছুড়ে দিয়েছিলেন। ওই সময় রবীন্দ্রনাথ ভারতের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত জাতীয় কবি ছিলেন না। পরবর্তীকালেও তাঁর গান এদেশের জাতীয় সংগীত হলেও রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এ দেশের রাজনৈতিক চিন্তার মূল স্রোতে কোনওদিনই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতারা রবীন্দ্রনাথের কথা বললেও কোনও দলের কার্যসূচিতে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য গৃহীত হয়েছে এটা খুঁজে বের করা খুবই কঠিন হবে।
তাঁর লেখা শত শত দেশপ্রেমের গান স্বদেশী স্বাধীনতাকামীদের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল, তিনি নিজেও তাঁদের অনুপ্রেরণা ছিলেন। তাঁর এই গান গান্ধী থেকে শুরু করে সাধারণ জেলবন্দি বিপ্লবীর আত্মবিশ্বাস নির্মাণ করতো। ওই অবস্থায় তাঁর ন্যাশনালিজমবিরোধী অবস্থান তার জন্য অবশ্যই বিতর্কিত ও বিপদজ্জনক ছিল। কারণ স্বদেশী আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তীকালে তাঁর অবস্থান নিয়ে সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ এবং বিপ্লবীদের গুপ্ত গোয়েন্দা বিভাগ একইরকম ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ দেশপ্রেম বোঝাতে তাঁর লেখায় ১২/১৫ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন, দেশপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, দেশভক্তি, দেশাভিমান, স্বদেশচেতনা। কিন্তু এর কোনওটাই ন্যাশনালিজম শব্দের সমার্থক বা অনুবাদ ছিল না। তিনি যখন ন্যাশনালিজম বোঝাতেন, তখন তিনি ন্যাশনালিজম ভিন্ন অন্য কোনও শব্দ ব্যাবহার করতেন না।
রবীন্দ্রনাথের ‘নেশন’ ভাবনা
ই পি থমসন ১৯৯১ সালে প্রকাশিত Tagore’s Nationalism শিরোনামের গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রবীন্দ্রনাথ একজন কবি। এবং কবি মাত্রই সংজ্ঞায়নে বিশ্বাসী নন। একজন শিল্পী সবসময়ই নির্ধারণবাদী রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়াবেন। কারণ, সম্ভাবনা নিয়েই তাঁর মূল উদ্যোগ।
তিনি রবীন্দ্রনাথের কথা টেনে বলেছেন, ‘no man should let himself be at the mercy of his similes’, তবে ন্যাশনালিজম প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘A nation is understood in the sense of a political and economic union of a people and in that aspect a whole population assumes when organized for a mechanical purpose’। এখানে রবীন্দ্রনাথের শব্দের কৌশলগত ব্যবহার লক্ষণীয়। তাঁর কাছে নেশন এথনিক নয়, এমনকি সরাসরি ভাষা গোষ্ঠীর বা সংস্কৃতির সাথেও সম্পর্কিত নয়। তাঁর মতে, এগুলো হয়তো নেশন গঠনে উপাদান হিসেবে কাজ করে, তবে, নেশন তার গঠন উপাদানের থেকে বেশি শক্তিশালী। তিনি মনে করতেন, নেশন ও ন্যাশনালিজম একেবারেই আধুনিক ও পশ্চিমা ধারণা যার একটি যান্ত্রিক উদ্দেশ্য আছে, যার গঠনে মুল ভূমিকা রেখেছে ‘Instrumental Rationality’. তাঁর মতে নেশনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে। আর রাষ্ট্রও ঘোষিতভাবে কল্যাণকামী হলেও বশ্যতা এবং অবদমন এই দুটি বিষয়কে সঙ্গে নিয়ে চলে। সব নাগরিককে বশে রাখা এবং বিভিন্ন দিক থেকে অবদমনের মাধ্যমে তাঁদের মধ্যের কতগুলো ধারণা স্বাভাবিক বলে ঢুকিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তাই রবীন্দ্রনাথের নেশন সম্পর্কিত সমালোচনা আদতে নেশন স্টেটের সমালোচনা। লক্ষণীয় বিষয় হলো বিংশ শতাব্দীতে এসে নেশন ও ন্যাশনালিজমের প্রকৃতি নির্ধারণের বিতর্কে রবীন্দ্রনাথ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হচ্ছেন। দেশ-বিদেশের গবেষকরা বলছেন, যে সময় ন্যাশলিজম প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল তা আদতে সেই সময়ের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। আজকের জাতীয়তাবাদ বিষয়ের গবেষকরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ে রবীন্দ্রনাথকে তাঁদের পূর্বসূরি বলছেন।
ভারতীয় সভ্যতার ঐক্যের প্রশ্ন
রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম সম্পর্কিত সমালোচনামূলক ভাবনার সাথে সম্পর্ক রয়েছে ভারতীয় সভ্যতার ঐক্যের বিষয়টি। রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট বলেছেন, যেখানে পার্থক্য বা বিভেদ আছে তাকে যথাযথভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে বুঝতে হবে। কোনওভাবেই গোটা বিষয়টিকে তিনি মোটা দাগে মিলিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর সমসময়ে বিবেকানন্দ, শ্রীঅরবিন্দ, বালগঙ্গাধর তিলক থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে গান্ধীজি গীতাকে ভারতীয় ভাবধারার প্রধান উৎসই বলেছেন। এদিকে পারস্য রচনায় রবীন্দ্রনাথ গীতার যে তীব্র বিরোধিতা করেছেন তা আজও ভাবলে বিস্ময়কর লাগে। আকাশযান থেকে বোমা নিক্ষেপের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বাণীকে মিলিয়ে তাঁর কটাক্ষ আজও ভাবা বেশ কঠিন। গীতার পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথ ফিরে গেছেন মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলনের প্রবক্তাদের কাছে। কবি হাত ধরতে চেয়েছেন সুফি সাধকদের। তুকারাম, কবীর, নানক, চৈতন্য, নিজামুদ্দিন আউলিয়া, সেলিম চিস্তি এই সব সাধকদের গানের বাণীর মধ্যে কবি খুঁজেছেন বহুত্বের মধ্যে যদি কোনও ঐক্যের বার্তা খুঁজে পাওয়া যায়, সেটিকে।
সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ভারতবর্ষের মতন এমন বহুসংস্কৃতির দেশে ন্যাশনালিজমের এর আমদানি করা সুইৎজারল্যান্ডের নৌবাহিনী গঠনের মতন অবাস্তব ভাবনা।
রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতা
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিকল্প মডেলে দেশপ্রেমের ধারণার কথা বলেছেন। তার মতে দেশপ্রেম হলো প্রাকৃতিক, মতাদর্শগত নয় এবং ন্যাশনালিজম থেকে একেবারেই আলাদা। দেশপ্রেম ও ন্যাশনালিজম দুটো ভিন্নমাত্রার বিষয়। দেশপ্রেমের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে দেশের প্রকৃতি এবং ভারতের অগণিত মানুষের বহুবিধ জীবনধারাকে সম্যকভাবে বোঝার প্রশ্ন।
অতি সাধারণীকরণের ফলে যাকে আমরা এক করে ফেলি। আসলে বিষয়টা জটিল। সেই জন্য দেশনেতারা নিজের স্বার্থে ন্যাশনালিজমকে হাতিয়ার করে সরলীকরণের পথে হাঁটেন।
মানুষের নাড়ির টান, তা নির্দিষ্ট মানচিত্রের সীমার ধারণার সাথে যুক্ত নয়। মানচিত্র তো চালু হলো সাহেবরা এদেশে আসার পর। তাহলে ভারতমাতার ছবি এঁকে তার পিঠে মানচিত্রের বোঝা চাপালে চলবে কেন? এমনকী এই সম্পৃক্ততা মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও বর্তমান আছে। অন্যদিকে ন্যাশনালিজম হলো মতাদর্শগত যা সচেতনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তা একই সাথে ইগো ডিফেন্সিভ, স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা ও নিজের সীমানার বাইরের মানুষের প্রতি বিরূপ ও শত্রুভাবাপন্ন সঙ্কীর্ণধারণা সচেতনভাবেই প্রচার করে থাকে।
নেশন শব্দটা রবীন্দ্রনাথের মতে অবিকৃতভাবে ইংরেজের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ভাবটাও এসেছে ইংরেজের কাছ থেকেই, অতএব ওই ভাষাটাও ইংরেজি রেখে দেওয়াই ভালো। নেশন স্টেট বিষয়টিকে জাতিরাষ্ট্র বলার পক্ষপাতী ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। হঠাৎই যখন চারিদিকে ন্যাশনাল কালচার, ন্যাশনাল ফেয়ার ইত্যাদি চালু হলো, তখন রবীন্দ্রনাথের এই ন্যাশনাল বিষয়টিকে যথাযথ প্রশ্নের মুখে কেন দাঁড়াতে হলো না এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ‘ন্যাশনাল কুজ্ঝটিকায় দেশের দশ দিক আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। আসলে যাহাদের কিছুই নাই মাঝে মাঝে গবর্নমেন্টের কোর্তা ধরিয়া যথাসাধ্য টান দেওয়া আবশ্যক, তাহারাই ন্যাশনালের ঝড় তুলিতে এমন উদ্দীপনা বোধ করে’।
স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বললেন, রামচন্দ্রকে হঠাৎ সর্বগুণসম্পন্ন ব্যক্তি বলে প্রতিষ্ঠা করার এমন সাংঘাতিক প্রয়োজন কী পড়লো? যাত্রায়, কথকতায়, পালাগানে আমরা যে শিক্ষা পেয়েছিলাম সে সব কথা ভুলি কী করে? আর ভুলবোই বা কী করে? এ বিষয়ে তাঁর সাফ বক্তব্য, পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে জগতের বিপুল বৈচিত্রকে অস্বীকার করে একমুখী, এককেন্দ্রিক ন্যাশনালের ধুয়ো ধরতে পারবো না।
আধুনিক ও ন্যাশনালের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিগত পুঁজিবাদ নগরায়ন এবং শিল্পায়ন-এর মাধ্যমে পুঁজিবাদকে জীবিত রাখা। এই পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাশনালিজম কাল্পনিক ঐক্য গঠনের মাধ্যম হিসেবেই কাজ করে। বিখ্যাত তাত্ত্বিক বেনেডিক অ্যান্ডারসন ‘ইমাজিন কমিউনিটি’ বলে অবিহিত করেছেন। তাঁর মতে, একটি ভৌগোলিক পরিসরে বসবাসকারীরা নিজেদের কল্পিত এক গোষ্ঠী হিসেবে ভাবে এবং তার সাপেক্ষে ন্যাশনালিজমের ধরন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে মানচিত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু আদতে ওটা যে কাল্পনিক রেখাচিত্র, এটাই ভুলতে বসেন ন্যাশনালিজমের প্রবক্তরা। রবীন্দ্রনাথ ‘আত্মশক্তি ও সমূহ’ লেখাগুলিতেও সব তফাতকে মুছে দিয়ে একজোট হয়ে ন্যাশনাল জিগির তোলার আপাদমস্তক বিরোধিতা করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁকে মর্মমূলে নাড়া দিয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর গীতার সমালোচনা, রামচন্দ্রের যোদ্ধারূপের সমালোচনা মনে পড়া স্বাভাবিক। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র আলোচনায় বৃন্দাবনের কৃষ্ণ এবং কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণকে পৃথক করারও তীব্র বিরোধিতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম প্রবন্ধটির শতবর্ষ। আমরা এই প্রতিবেদন জুড়ে ন্যাশনালিজম প্রবন্ধটিকে সামনে রেখে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ভাবনা এবং স্বদেশচিন্তা বিষয়টিকে বোঝার চেষ্টা করলাম। কবির যে কোনও উদ্যোগই ছিল বহু স্বরকে মন-প্রাণ খুলে স্বীকৃতি জানানো। আমরাও ন্যাশনালিজম বিষয়টিকে মন খুলে দেখতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ৫ মে ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত