রবীন্দ্রনাথের রঙ্গমঞ্চ প্রবন্ধটির কথা অনেকেরই হয়তো মনে আছে। নাতিদীর্ঘ সেই লেখায় কবি ভারতীয় নাট্যের আদিকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ে বাস্তববাদী নাটকের কথা বলেছেন। যাত্রার কথা লিখেছেন, আমাদের নাট্যের বিভিন্নরকম চলনগুলোর কথা মনে করিয়ে কবি আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, এসব সত্ত্বেও ঐ বাস্তবিকতার ভূত কেন আমাদের ঘাড়ে চেপেই রইলো।
কথায় বলে সাহেবরা যেখানেই যায়, কফি হাউস আর থিয়েটার সঙ্গে করে নিয়ে যায়। আমাদের দেশে থিয়েটারের এবং নাট্যকলার বিস্তৃত ইতিহাস যদি কেউ জানতে চান, সেই জানাকে উপভোগ করতে চান, তাঁকে অবশ্যই যেতে হবে সল্টলেকের নাট্যশোধ সংস্থানের ভবনে। একদিকে লোকনাট্য, যাত্রা এবং ভারতীয় নাটকে এত ভালো আর্কাইভ ও লাইব্রেরি ভারতবর্ষে ক-টা আছে তা বলা কঠিন। মঞ্চসজ্জার নানা সরঞ্জাম, থিয়েটারে ব্যবহৃত বস্তু বা প্রপস্, বিভিন্ন নাটকের মঞ্চসজ্জার মডেল এসব তো আছেই, সেই সঙ্গে রয়েছে ভরত নাট্যশাস্ত্রে বর্ণিত নাট্যশালা মডেল থেকে শুরু করে লোকনাট্যের মুখোশ এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র। বলা যায়, গোটা ভারতবর্ষে সাংস্কৃতিক মানচিত্র দেখা যাবে এই কেন্দ্রে। এই বিশাল দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুব থেকে পশ্চিম সব রাজ্যে লোকনাট্য থেকে শুরু করে বিবিধ নাট্যশৈলী অসামান্য উপস্থাপন রয়েছে এই কেন্দ্রে।

এই কেন্দ্রের প্রধান স্থপতি প্রতিভা অগ্রবাল। ভারতবর্ষে নাট্যজগতের মানুষ তাঁকে এক নামে চেনেন। বেনারসের মানুষ প্রতিভা অগ্রবালকে সকলেই চেনেন তাঁর অভিনয়, অনুবাদ কর্ম, সম্পাদনা ইত্যাদি নানা কারণে। তিনি হিন্দিতে নাট্যরূপ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাস, শরৎচন্দ্রের দেনা পাওনা কিংবা ফণিশ্বরনাথ রেণুর ময়লা আঁচলের মতো উপন্যাস। এ ছাড়া তিনি বাংলা নাটক হিন্দিতে অনুবাদ করেছেন। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের শেষরক্ষা, বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ, বল্লভপুরের রূপকথা, পাগলা ঘোড়া, সারারাত্রি, উৎপল দত্তের টিনের তলোয়ার প্রভৃতি। এ ছাড়া তিনি নন্দলাল বসু, সুকুমারী ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র—এঁদের লেখাও হিন্দিতে অনুবাদ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে উঠেছে নাট্যশোধ সংস্থান এই প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৮১ সালের ১৯ জুলাই এই প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরু, তখন ঠিকানা ছিল ১১ প্রিটোরিয়া স্ট্রিট। পরে ১৯৮৫ সালে লি রোডে চলে আসে এই প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৬ সালে সল্টলেকের করুণাময়ীর কাছে এক খণ্ড জমিতে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন কিংবদন্তি নাট্যকার গিরিশ কারনাড।

২০০০ সালের ১২ অগাস্ট নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। তারপর থেকে এখানেই কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সভাপতি কবি শঙ্খ ঘোষ। প্রতিভা অগ্রবাল তো এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণস্বরূপ। সেই সঙ্গে রয়েছেন ইয়ামা শ্রফ, বিদিশা রায়, মধুছন্দা চট্টোপাধ্যায়, শুভ্র মজুমদার প্রমুখ।
এই প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে রয়েছে, ভারতবর্ষের কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্বদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। কে নেই সেখানে! শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাদল সরকার, হাবিব তনভীর, তৃপ্তি মিত্র, শাবানা আজমি, গিরিশ কারনাড, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, মনোজ মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, এরকম আরও কত নাম করা যায়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস শুনিয়েছেন গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাস—সেই বক্তব্য অডিও রেকর্ডিংয়ে রয়েছে। শম্ভু মিত্র বলেছেন আবৃত্তি নিয়ে, অন্নদাশঙ্কর রায় বলেছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে—এরকম কত উদাহরণ দেওয়া যায়। থিয়েটার মিউজিয়ামে রয়েছে দুর্লভ সব আলোকচিত্র। শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার তো আছেনই এমনকী রবীন্দ্রনাথের নটির পূজা-সহ বিভিন্ন নাটকের দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র রয়েছে নাট্যশোধে।

পুরোনো থিয়েটারের বুকলেট থেকে শুরু করে নানা সামগ্রী এরা সংরক্ষণ করেছে। বহু নাটকের ভিডিও রেকর্ডিংও রয়েছে। ভারতবর্ষের প্রায় সব প্রদেশের লোকনাট্যে মুখোশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র রয়েছে নাট্যশোধ সংগ্রহশালায়। একইসঙ্গে গড়ে উঠছে হেরিটেজ লাইব্রেরি। এই গ্রন্থাগারে থাকছে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ছাড়াও ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব-সহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ বই। এ ছাড়া নাট্যশোধের লাইব্রেরি এবং রিডিংরুম তো অতুলনীয়। একদিকে হাজার বছরে লোকনাট্যের পরম্পরা—যাত্রা, পালাগান, পাঁচালি গান এসবের নানা উপাদান রয়েছে, সেই সঙ্গে রয়েছে আধুনিক যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।