এসো মা লক্ষ্মী বোসো মা লক্ষ্মী, এইটুকুতেই যদি আমাদের লক্ষ্মীর সব লেনদেন মিটে যেত তা হলে বেশ হত। কিন্তু তা তো আর হয় না, তা তো হবার নয়। থাকো মা লক্ষ্মী ঘরে। এ দিকে তিনি ওইটেই পারেন না। তাঁর পা দু’খানি দিনরাত নিশপিশ করছে পালানোর নেশায়। মন বসিয়ে কোথাও টিকে থাকার পাত্রীই নন তিনি। অথচ লক্ষ্মী শুনলেই মনে হয় ঠিক তার বিপরীত স্বভাব। মিষ্টি, ঠাণ্ডা, ভদ্র আর গৃহকর্মনিপুণা একটি ঘোমটা-টানা বউ। কিংবা পেতলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিতা ক্ষুদ্র এক পেতলের দেবীমূর্তি বা রঙিন মাটির পট, যিনি প্রতি বৃহস্পতিবারে পূজিতা হন, বাতাসা, কাঁঠালি কলা ও শশা সহযোগে।
আর লক্ষ্মী মেয়ের চেহারাটা একটু আলাদা, সে ফ্রক পরে ব্যাগ নিয়ে ইসকুলে যায়, কামাই করে না, ফার্স্ট সেকেণ্ড হয়, অবাধ্যতা করে না, শাস্তি পায় না, ঘরে বাইরে সমান ভদ্র। লক্ষ্মী মেয়েরা বড় হয়ে আরও লক্ষ্মী হয়ে যায়, ঘরে মাকে সাহায্য করে, প্রেম-ট্রেমের ধার ধারে না, বাবা মায়ের এনে দেওয়া পাত্রকে বিয়ে করে সুখে থাকে। শাশুড়িরা তাদের ভালবাসলে ভাল, না বাসলেও ক্ষতি নেই, তারা খুব শাশুড়িভক্ত হয়। তাদের স্বামীদের খুব মজা, সাত চড়েও তারা স্বামীদের মুখে কথাটি কয় না। লক্ষ্মী মেয়েদের জীবনে কোনও অশান্তি কেউ কোনও দিন দেখতে পায় না। হঠাৎ কেবল মাঝে মাঝে বিনা কারণেই তারা গায়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরে যায়। কেউ বোঝে না কেন লক্ষ্মী মেয়েটার অকস্মাৎ এই অলুক্ষুনে মতি গতি হল। দেবা না জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ! (শাস্ত্রে মনুষ্য মানে অবশ্য শুধু পুরুষ মানুষ, কেন না মেয়েরা মেয়েদের মন দিব্বি বুঝতে পারে, দেবতারা পারুন আর নাই পারুন।) লক্ষ্মী ছেলে কথাটাও যে নেই তা নয়। বাধ্য আর শান্ত, এই দুটো তথাকথিত মেয়েলি গুণ থাকলে সেই ছেলেকে আদর করে লক্ষ্মী ছেলে বলা হয়। কী আশ্চর্য, লক্ষ্মী নিজে কিন্তু বাধ্যও নন, শান্তও নন। চপলা, চঞ্চলা। লক্ষ্মী মেয়ের লক্ষণগুলি তাঁর মধ্যে নেই। তবে কেন লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী মেয়েদের হেন নামে ডাকা হয়?
যাই বল, এই লক্ষ্মী ঠাকুরানিটি বড় গোলমেলে দেবী কিন্তু বাপু! একেই তো তিনি শ্রী এবং হ্রী দুটি বস্তুরই ইন চার্জ, মেয়েদের খুব কাজে লাগত এক কালে এই সব বুনিয়াদি সম্পদ। এখন আর আমাদের মেয়েরা সেটা মানতে চাইছে না। ওরা ভাবছে এটা পুরুষদের আবিষ্কার করা একটা ছক, মেয়েদের বেঁধে রাখবার একটা ফন্দি। তাই আজকাল তাদের বিশ্রী হতে আপত্তি নেই। তারা আর লক্ষ্মী মেয়ে হতে চায় না। শান্ততা, বাধ্যতা, এমনকী বেশি বেশি ভদ্রতাতেও তাদের অ্যালার্জি এসেছে। অবশ্য পুরুষরাও তাদের এই না-মানাটা মানতে চাইছে না। তারা আসলে এখনও সেই শ্রী আর হ্রীর খোঁজে মিস ইণ্ডিয়া, মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ইউনিভার্স ইত্যাদি উচ্চ স্তরের বৃত্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করে চলেছে।
লক্ষ্মী ঠাকুরানি তো আসলি চিজেরও ইন চার্জ কিনা? জ্ঞান নয়, মান নয়, ধন আর ধান। ধনই তো আসল সম্পদ, সেই আসলি মাল, এই জগতে হরগিজ যার জিত কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর মা লক্ষ্মী তাঁর বটুয়ার মধ্যে, যার অন্য নাম ঝাঁপি সেই ফুসমন্তরটা রেখেছেন। যে তাঁকে প্রসন্ন করতে পারবে, তারই মিলবে সেই ঝাঁপির প্রসাদ। (যেমন লক্ষ্মী মিত্তলের মিলেছে। নামের গুণপনা কি কম?)
এত দিন মা লক্ষ্মীরই শুধু এই বদনামটি ছিল, তিনি বড় চঞ্চলা, আজ এর বাড়িতে, তো কাল ওর বাড়িতে। নামে লক্ষ্মী হলে কী হবে, স্বভাবে তিনি লক্ষ্মী মেয়ে মোটেই নন। ভক্তদের এক পায়ে খাড়া করিয়ে রাখেন, এই বুঝি পালিয়ে গেলেন! সদাসর্বদা ধর ধর গেল গেল ভাব! অত ডাঁট কি আজকালকার ছেলেমেয়েরা সইতে পারে? তাদের নিজেদেরই ডাঁট রাখবার ঠাঁই নেই। তারা চায় আর একটু রিল্যাক্সড রিলেশনশিপ। তাই আজকের যুগে ভক্তরাই চপলমতি, চঞ্চলচরণ হয়ে পড়েছে, ফ্লোর ক্রসিং-এ লজ্জা পায় না। আরাধ্যা লক্ষ্মী ঠাকরুনকে ছেড়ে তাই এক দল ভক্ত ছুটেছে মোটাসোটা থপথপে স্থাণু গণেশঠাকুরের পদতলে, কুবেরের নতুন ঠিকানার হদিশ তিনিই বেশি ভাল রাখেন।
গণেশের মুডটা বরং শান্ত হয়ে থেবড়ি খেয়ে গদিতে পার্মানেন্টলি বসে পড়ার পক্ষে মানানসই বেশি। মনে হয় না তিনি তেমন ছটফটে। সর্বদা উড়ু উড়ু মা লক্ষ্মী বুঝি তার লক্ষ্মীপেঁচার পিঠে ইদানীং কিঞ্চিৎ ওল্ড ফ্যাশণ্ড হয়ে পড়েছেন। (যদিও হ্যারি পটারের কল্যাণে লক্ষ্মী পেঁচা এখন বেশ ইন-থিং। বলা যায় না, মা লক্ষ্মীর হঠাৎ কোনও আশাতীত দিক থেকে কপাল খুলে যেতেও পারে!) সব দিক থেকে ব্যবসার কথা ভেবে ভক্তি ইনভেস্ট করতে হলে গণপতি বাপ্পাই বেশি সেফ। ভালবেসে মা লক্ষ্মীকে আমরা বাঙালির ঘরে ধরে রাখব ঠিকই, তবে অল ইণ্ডিয়া রেকগনিশন তাঁর আর তেমন করে হবার চান্স নেই। ওই বাঙালির প্রবাদে প্রবচনেই তার প্রতিপত্তি টিকে থাকবে। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো কি কোনও দিন গণেশ চতুর্থীর আড়ম্বর দেখবে?
দুর্গামায়ের আঁচল ধরে দুই কন্যে আসেন, দু’জনে দু’রকম। দুর্গা নিজে মনে হয় লক্ষ্মীর দিকেই আছেন, তাঁরই মতো সোনার বরণ, তারই মতো লাল বেনারসি পরনে, লক্ষ্মীকে দেখলেই চেনা যায় মায়ের মেয়ে। আর সরস্বতী? মা দুর্গার সর্বশুক্লা কন্যেটি যেন অন্য ধাতু দিয়ে গড়া, বাইরের লোক। আউটসাইডার। শুনেছি নারায়ণের স্ত্রী লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠধামে সংসার করেন। সরস্বতীর কি সংসার আছে? তিনি থাকেন কোন ঠিকানাতে? কখনও শুনি পিতা ব্রহ্মার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে কী সব মন্দ কথা, (সে সব অবশ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়, ফ্রয়েড আমাদের বড্ড মন্দ বুদ্ধি দিয়ে গিয়েছেন। বেদের যুগেও কি কোনও ফ্রয়েড ছিলেন?) কখনও শুনি নারায়ণের পত্নী তিনিও। তবে কি তিনি মা লক্ষ্মীর সতীন? তাই বুঝি সরস্বতীর বরপুত্রেরা লক্ষ্মীর কৃপা থেকে বঞ্চিত হন? লক্ষ্মীর ভাইবোনেরাই দেখছি তাঁর পথের কাঁটা। ও দিকে গণেশ এ দিকে সরস্বতী। দু’দিক থেকে দু’জনে তাঁর বিস্তৃত এলাকাটা অধিগ্রহণ করে নিচ্ছে।
আসলে মা লক্ষ্মীর সমস্যাটি তৈরি হয়েছে বহু যুগ আগেই। তিনি নিজেই এর জন্য দায়ী। যেই তিনি অমৃতের ভাণ্ডখানি হাতে নিয়ে সমুদ্র থেকে উঠলেন, অমনি দেব, দানব, মানুষ সকলের মনের সব শান্তি ঘুচে গেল। সেই থেকে মানুষের কোনও কিছুতেই আর তৃপ্তি নেই, মৃত্যুর শাসন মেনে চলতেও তার ঘোর আপত্তি। শুধু দেবতারা কেন অমরত্ব পাবে, মানুষ বুঝি কেউ নয়? সেই থেকে শুরু হয়েছে মানুষের তৃপ্তিহীন দৌড়, অমৃতের দিকে।
মৃত্যুকে হার মানানোর এই বিষম জেদের দৌড়ে মা লক্ষ্মী না ভেবেচিন্তে নিজেই আমাদের লাগিয়ে দিয়েছেন বটে, শেষের দিনে কিন্তু আমাদের অঞ্জলি পেতে গিয়ে দাঁড়াতে হয় অন্যত্র, মা সরস্বতীর পায়ের কাছে। আসল অমৃতের সন্ধানটি যে তাঁরই কাছে আছে! তাঁর ওই বীণা পুস্তক রঞ্জিত, দোয়াত কলম ধরা হস্তটিতে তিনিই ধরে রেখেছেন অমৃতের চাবি। হাজারখানা লক্ষ্মীর ঝাঁপি খালি করে খুঁজলেও সেই অমৃতের সন্ধান মিলবে না, যার দ্বারা মৃত্যুকে, মৃত্যুভয়কে হার মানানো সত্যিই সম্ভব। সে ম্যাজিক স্বর্ণ জানে না। জানে শুধু জ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য। মা লক্ষ্মী নিজেও সেটা জানেন। তাই তিনি এত চঞ্চলা, এত অস্থির। আজ মায়ের কোলে পাশাপাশি দু’জনে থাকলেও এক দিন হয়তো বিদ্যাকেই বেদি ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হবে, লক্ষ্মীর তাই শান্তি নেই।
প্রথম প্রকাশ : ২০ আশ্বিন ১৪১৩ শনিবার ৭ অক্টোবর ২০০৬