পাঁচ.
১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজ”-এর প্রথম বাৎসরিক সভায় বিশিষ্ট সম্মানীয় অতিথি হিসাবে নজরুল ইসলাম আমন্ত্রিত হন। বিশেষ করে উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতে এবং “মুসলিম সহিত্যসমাজের তরুণ সদস্যদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিতে। গোয়ালন্দ থেকে লঞ্চে নারায়ণগঞ্জে আসার পথে “খোশ আমদেদ” (স্বাগতম) নামে উদ্বোধন সঙ্গীতটি তিনি রচনা করেন। করতালির মধ্য দিয়ে গানটি এইভাবে শুরু হয় :
আসিলে কে গো অতিথি উড়ায়ে নিশান সোনালী! ও চরণ ছুঁই কেমনে দুইহাতে মোর মাথা যে কালি!!
এখানে নজরুল অতিথিদের যে-কথা বলে সম্বোধন করেন বাঙালী মুসলমান সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় প্রবাদ অনুযায়ী তার তাৎপর্য হ’ল একটি নতুন শিশুর বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আসা মানে এক অবিনশ্বর (অতীত) কাল থেকে অন্য অবিনশ্বর (ভবিষ্যৎ) কালে যাওয়ার পথ পরিক্রমামাত্র। ঢাকার প্রগতিশীল তরুণ-তরুণীদের প্রতি এটি ছিল তাঁর আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। রাষ্ট্র অথবা আভিজাত্যের দ্বারা শোষিত নিষ্পিষ্ট সাধারণ মানুষের নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য, মুক্ত ও উদারনৈতিক চিন্তাধারার জন্য ভবিষ্যতের দিকে উন্নত আদর্শে বলীয়ান হয়ে কুসংস্কারকে পদদলিত করতে তাঁর এই শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। তরুণদের প্রশংসা করে এমন প্রাণমন মিশিয়ে আবেগ-উদ্দীপনার সঙ্গে গানটি তিনি গাইলেন যে সমস্ত দর্শক তো বটেই এমন কি গানকে দু’চোখে যারা দেখতে পারতেন না এমন দু’চারজন লোক, যারা সভা পণ্ড করতে এসেছিলেন, তাঁরাও কথা ও সুরের মাদকতায় বিহ্বল হয়ে পড়লেন ।
ছয়.
বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, উক্ত সভায় আমি “সঙ্গীতে মুসলমানের অবদান” শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করি। অধিকাংশ দর্শকের মতে আমি নাকি একটা বিস্ময়কর তথ্য উদ্ঘাটন করেছিলাম। আমার সৌভাগ্য এই যে, আমাকে কোনো বিক্ষোভের সম্মুখীন হ’তে হয়নি । এটা অত্যন্ত স্পষ্ট, যা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, নজরুলের সঙ্গে কমপক্ষে তিনটি ব্যাপারে আমার সাধারণ মিল ছিল। প্রথমতঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম পর্যায়ে আমাদের জন্ম দ্বিতীয়তঃ দাবা খেলার প্রতি ঝোঁক এবং তৃতীয়তঃ সঙ্গীতের প্রতি অনুরক্তি। যতটা মন পড়ে ১৯২৭ সালে নজরুল যখন ঢাকাতে আসেন তখন তিনি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের একটি কক্ষের নীচের তলার পুর্বদিকের অর্ধাংশে আস্তানা গাড়েন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউস টিউটর হিসেবে উক্ত গৃহের বাসিন্দা ছিলেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বড় ডাইনিং হলে সাহিত্য সমাজের প্রথম অধিবেশন বসে। যা হোক, সভাশেষে নজরুলের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ সাধারণ পরিচয় থেকে বন্ধুত্বে পরিণত হয়। ঢাকাতে সে যাত্রা তিনি তিনদিন অবস্থান করেন। ঐ সময় উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট ডক্টর রমেশ চন্দ্র মজুমদার জগন্নাথ হলে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। কবি সেখানে তাঁর কতকগুলি জনপ্রিয় গান পরিবেশ করেন। যার একটি হল :
কে বিদেশী বন উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে?
সাত.
১৯২৮ সালে সাহিত্য-সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মিলনীতে তিনি আবার আমন্ত্রিত হন— তাঁর উদ্দীপনামূলক সঙ্গীত ও বক্তৃতা দিয়ে আমাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য। এই সময় তিনি তাঁর বিখ্যাত মার্চ সঙ্গীতটি গেয়েছিলেন—যার শুরুটা হল এমনি :
নিম্নে উতলা ধরণী- – তল
চল্ চল্ চল
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল
অরুণ প্রাতের তরুণ-দল
চলরে চলরে চল্ ॥
এগিয়ে চলার এই অগ্ন্যুদ্দীপক আহ্বান বাঙালীর গোটা ইতিহাসকে পুনর্জাগরণের মন্ত্রে উদ্বোধিত করে তুলেছিল। সভাশেষে কবির নিকট আমন্ত্রণ এল বুড়িগঙ্গা তীরের জমিদার রূপবাবুর বিশাল অট্টালিকা থেকে, পুরানো হাইকোর্টের অঙ্গনে অবস্থিত অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রের গৃহ থেকে এবং আরও বহু বুদ্ধিজীবি কৃষ্টিবান নাগরিকদের কাছ থেকে, বিশেষ করে কবির কল্লোল-গোষ্ঠীর বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে, যাঁদের মধ্যে প্রধানতম উদ্যোক্তা ছিলেন বুদ্ধদেব বসু।
এই সময় নজরুল ইসলাম বর্ধমান হাউসের (বর্তমান বাংলা একাডেমী) নীচের তলায় আমার সঙ্গে একসঙ্গে থাকতেন। আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউস টিউটর হিসাবে তখন ওখানে বাস করছিলাম। এই সব নিমন্ত্রণে অধিকাংশ সময়েই আমি নজরুলের সঙ্গে যেতাম এবং তাঁর গান ও কথাবার্তা উপভোগ করতাম।
রূপবাবুর বাড়ীতে তিনি অনেকগুলি গান গেয়েছিলেন কারণ ঐ সময় ঢাকার সকল অভিজাত ব্যক্তিরাই সেখানে জমা হয়েছিলেন। গানটি হল :
বসিয়া নদী কূলে এলোচুলে কে উদাসিনী।
কে এলে পথ ভুলে এ অকূল বন-হরিণী ॥
কলসে জল ভরিয়া চায় করুণায় কুলবধূরা।
কেঁদে যায় ফুলে ফুলে পদমূলে সাঁঝ-তটিনী ॥
হারালি গোধুলি-লগনে, কবি কোন নদী কিনারে,
এ কি সেই স্বপন চাঁদ পেতেছে ফাঁদ প্রিয়ার সঙ্গিণী।
বুড়িগঙ্গার বাড়ীতে ঐ গান প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে এক আশ্চর্য সঙ্গতির সৃষ্টি করেছিল। আরও যে একটি গান তিনি গেয়েছিলেন সেটি হল :
জাগো অনশন বন্দী ওঠরে যত
জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত।
যত অত্যাচারে আজি বজ্ৰহানি
হাঁকে নিপীড়িত জনমন মথিত বাণী
নব জনম লভি অভিনব ধরণী
রে ঐ আগত ॥
এটা তাঁর কাব্যের একটি প্রধানতম বিষয় যা নজরুল ইসলামকে কাব্যরাজ্যের রাজসিংহাসনে বসিয়েছিল ।
আট.
[ঢাকার ত্রয়ী : ১, নোটন; ২. রানু এবং ৩. লোটন]
ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র একজন ভাল কবি ছিলেন। তিনি অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর সনেট ও গান লিখেছিলেন। খুব ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইতে পারতেন তিনি। তাঁর স্ত্রী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্রাজুয়েট ছাড়াও একজন চিত্রশিল্পী ও পিয়ানো-বাজিয়ে ছিলেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা কুমারী উমা মৈত্র ওরফে নোটন সেতার ও পিয়ানোর একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। সে সময় তিনি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই. এস. সি পরীক্ষায় পাশ করে বেরিয়ে এসেছেন এবং দাবা খেলায় মোটামুটি শিক্ষালাভ করেছেন। বলাবাহুল্য লন টেনিস খেলাতেও তিনি তখন চমৎকার পারদর্শিতা লাভ করেছেন । কিন্তু কোন রহস্যজনক কারণে জানি না তাঁকে বি. এ. কিংবা বি. এস. সি. পড়তে দেওয়া হয় নি, অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থিত) ছিল কলেজ রোড নামক প্রধান সড়কের অপর পাশে।
প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় এবং প্রফেসর সত্যেন বসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যক্ষ) এই পরিবারের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। দিলীপ রায় ঘন কলকাতা থেকে ঢাকাতে আসতেন এবং নোটনকে শুধু ব্রহ্মসঙ্গীতই নয় তার নিজের লেখা এক ধরনের উচ্চাঙ্গ রাগ সঙ্গীতও শেখাতেন। মৈত্র পরিবারটি ছিল সবদিক দিয়ে উদার; এবং তাঁদের কাছে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন কথা ছিল না। উভয় সম্প্রদায়ের সুধীজনেরা তাঁদের বন্ধু ছিলেন। যেমন উদাহরণতঃ প্রফেসর সত্যেন বোস (একজন হিন্দু), অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (একজন মুসলমান), প্রফেসর বঙ্কিমদাস ব্যানার্জি (অঙ্কের প্রফেসর, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ চালু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদলী হয়ে তিনি সেখানে যান) এবং শহরের অনেক গুণীজ্ঞানীজন অধ্যক্ষ মৈত্রের বাড়ীতে উদার অভ্যর্থনা পেতেন। পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও খেলাধূলা ও সঙ্গীতের প্রতি অধ্যক্ষ মৈত্রের বিশেষ অনুরাগ ছিল। আমিও সময় সময় হাইকোর্টের অন্তর্গত অধ্যক্ষের পারিবারিক লনে আমার প্রফেসর বঙ্কিম বাবু, তাঁর ছেলে অজিত, অন্য একজন প্রফেসর সুরেন ঘোষ (পদার্থ বিদ্যা) এবং তাঁর দুই ছেলে ডাকু ও টুকুর সঙ্গে টেনিস খেলতাম। দিলীপ রায় দাবা খেলতে ভালবাসতেন এবং তিনিও আমার একজন দাবা খেলার বন্ধুত্বে পরিণত হন। আমি নোটনকে দাবা খেলা শিখিয়েছিলাম। দিলীপ রায়ও নোটনের সঙ্গে মাঝে মঝে দাবা খেলতেন। বিখ্যাত ওস্তাদ হায়দার খান নোটনকে তিন-চার বছর ধরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখান। নোটন তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ সঙ্গীত গাইতেন এবং সাথে সাথে সেতারও বাজাতেন। তাঁর মাতাপিতা এই কুমারী কন্যাটিকে কতটা স্বাধীন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন উপরের বর্ণনাটি তারই মোটামুটি খসড়া। [ক্রমশ]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।