নয়.
১৯২৮ সালে নজরুল যখন ঢাকায় আসেন প্রিন্সিপাল মৈত্র তাঁর গান শোনেন। একজন উঁচুদরের সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তিনি বুঝতে পারেন যে, নজরুলের গানের একটা পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বিভিন্ন অলঙ্কার মীড়, গমক, বঁদ, মুর্ছনার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধ্বনিব্যঞ্জনা সেতারে এবং কণ্ঠ সঙ্গীতে ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে নোটনকে সাহায্য করতে তিনি নিয়মিত নজরুলকে তাঁর বাড়ীতে আমন্ত্রণ জানান। নোটন সেতার বাজাতেন অপূর্ব সুরের দ্যোতনা ফুটিয়ে, এবং নজরুল অর্গানের রিডে সুনিপুণ আঙুলের মৃদু স্পর্শে সূক্ষ্মতম সুরের ব্যঞ্জনা, ফুটিয়ে, — নোটনের পক্ষে সেতারে যা ফোটানো সম্ভব হত না— কণ্ঠ মিলিয়ে গান করতেন, আর মিস্টার ও মিসেস মৈত্র সেই অপূর্ব সঙ্গীতের শিল্প সুষমার মাধুর্য তন্ময়চিত্তে উপভোগ করতেন। নজরুল যতদিন ঢাকায় ছিলেন তিনি নিয়মিত প্রতিদিন প্রায় দু’ঘণ্টা করে মনোরম সঙ্গীত চর্চায় নিমগ্ন থাকতেন। নজরুল জানতেন দিলীপ কুমারও নোটনকে তাঁর নিজস্ব ঢঙে বাংলা গানের কায়দা-কানুন শিখিয়েছেন। ঐসব গান ছিল খানিকটা টপ্পার ধাঁচে লেখা বিশেষ ধরনের ঠুংরী — পিঝাকাটোর নোটের গিরগিটি কিংবা “প্যাসেজে” এর দ্রুত লয়সম্পন্ন। দিলীপকুমারকে ডিঙিয়ে যাওয়ার সংকল্প করেন নজরুল এবং সিদ্ধি লাভও করেন। ভারতীয় এই দুই সুপরিচিত সঙ্গীত শিল্পী সঙ্গীতাঙ্গনে সঙ্গীত শিক্ষাদানের কৌশলে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীটি যদি হতেন প্রিয়দর্শিনী। কুমারী মৈত্র নিঃসন্দেহে ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী এবং অভিজাত মহিলা। স্বভাবে তিনি ছিলেন খুবই শান্তশিষ্ট এবং যে কোনো ওয়ার্ডস্বার্থের চোখে কাব্যপ্রেরণাদায়ী আনন্দের নির্ঝরিণী — Phontom of delight, নজরুল তাঁর গানগুলিকে যে গভীর আবেগে মূর্ত করে তুলতেন তারই পরিচয় তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর “চক্রবাক” কাব্যের ‘গানের আড়াল’ কবিতায়
তোমার কণ্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কণ্ঠের গান —
এইটুকু অধু রবে পরিচয়? আর সব অবসান?
অন্তরতলে অন্তরতর যে-বাধা লুকায়ে রয়,
গানের আড়ালে পাও নাই তার কোনদিন পরিচয়?
হয়তো কেবলি গাহিয়াছি গান, হয়ত কাহিনী কথা,
গানের বাণী সে শুধু কি বিলাস, মিছে তার আকুলতা?
হৃদয়ে কখন জাগিল জোয়ার, তাহারি প্রতিধ্বনি
কণ্ঠের তটে উঠেছে আমার অহরহ রণ রণি, –
উপকূলে বসে শুনেছ সে-সুর, বোঝ নাই তার মানে?
বেঁধেনি হৃদয়ে সে-সুর, দুলেছে দুল হয়ে শুধু কানে?
হায় ভেবে নাহি পাই —
যে-চাঁদ জাগালো সাগরে জোয়ার, সেই চাঁদই শোনে নাই।
সাগরের সেই ফুলে ফুলে কাঁদা কূলে কূলে নিশিদিন?
সুরের আড়ালে মূর্ছনা কাঁদে, শোনে নাই তাহা বীণ?
দশ.
কিন্তু নোটনের কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া-শব্দ পাওয়া যায় নি। তাঁর মুখের ভাবে স্বীকৃতির বিন্দুমাত্র চিহ্ন ফুটে উঠেনি কখনো। যেন দা ভিঞ্চির মোনালিসার মত তিনি ছিলেন সকল ধরা-ছোঁয়ার বাইরের এক মূর্তিমতী রহস্য। কারও কারও হয়ত মনে হতে পারে উল্লিখিত কবিতাটি প্রতিভা সোম ওরফে রানুকে উপলক্ষ করে লেখা; কিন্তু আমার আদৌ- সন্দেহ নেই যে কবি তাঁর কাব্যপ্রেরণাদাত্রীর পরিচয়টিকে যথাসাধ্য গোপন করার চেষ্টা করেছেন। কেবল নোটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অন্তরঙ্গতার জন্য নির্বাক আবেদনের যতটা প্রয়োজন ছিল অন্যের বেলায় ততটা ছিল না। কেননা অন্য মেয়েদের সঙ্গে মিশতে কবির স্বাধীনতা ছিল অনেক বেশী ।
রানুর সঙ্গে পরিচয়ের ভূমিকা-স্বরূপ শুধু এইটুকু বলতে পারি : রেনুকা সেন নাম্মী টিকাটুলির এক কুমারীর সঙ্গীত শিক্ষার ভার নিয়েছিলেন দিলীপ রায়, গ্রামোফোন রেকর্ডে অতুলপ্রসাদ সেন লিখিত “পাগলা মনটারে তুই বাঁধ” গানটি গেয়ে তখন রেণুকা দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি দিলীপের শিক্ষকতার গুণে এই দুর্লভ খ্যাতিলাভ করেন। এই সময় “শনিবারের চিঠির সম্পাদক রসিক সজনীকান্ত দাস দিলীপ ও রেণুকার সম্বন্ধের বিকৃত রূপ দান করে দিলীপের নাম দিলেন “কানুরে”। নজরুল তাঁর শিষ্যা রানুকে দিয়ে রেণুকার চেয়েও সুন্দরভাবে তাঁর স্বরচিত গান রেকর্ড করবার সংকল্প করেন। কারণ এমনিতেই রানুর কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত সুরেলা, চড়া পর্দাতেও তাঁর গান খুবই মিষ্টি শোনাত। [রানুর বাবা, মা, অধ্যক্ষ সুরেন মৈত্র, প্রফেসর সত্যেন বোস আমাদের বাসায় প্রায়ই আসা যাওয়া করতেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য প্রফেসর সত্যেন বোস কেবল একজন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন না, একজন সুদক্ষ বেহালাবাদকও ছিলেন।] যা হোক, পরে ফিরে আসা যাক নজরুলের সঙ্গীত ভাণ্ডারে সুরের রাগরাগিনীর যত গভীর সূক্ষ্ম কলা-কৌশল ছিল রানুর কণ্ঠে তা তুলে দিতে তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করেছিলেন। এই উপযুক্ত শিক্ষার্থিনীটি তাঁর সকল বিখ্যাত গানকে সে সময় আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষ করে রানুর কণ্ঠে নিম্নলিখিত গানটি (মিশ্র ভৈরবী ও আশাবরী) অপূর্ব দ্যোতনায় রূপলাভ করত :
কে বিদেশী বন উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে। সুর-সোহাগে তন্দ্রা লাগে কুসুমবাগের গুলবদনে।।
***
সহসা জাগি আধেক রাতে শুনি সে বাঁশী বাজে হিয়াতে।
বাহু-সিখানে কেন কে জানে কাঁদে গো পিয়া বাঁশীর সনে।।
বৃথাই গাঁথি কথার মালা লুকাস কবি বুকের জ্বালা
কাঁদে নিরালা বনশীওয়ালা তোরি উতালা বিরহী মনে।।
তাঁর কণ্ঠে পিলুতে (কাহারা দাদরা) গাওয়া আরেকটি নজরুল-গীতি উল্লেখযোগ্য :
ভুলি কেমনে আজো যে মনে বেদনা-সনে রহিল আঁকা
আজো সজনী দিন রজনী সে বিনে গণি তেমনি ফাঁকা।
আগে মন করলে চুরি মর্মে শেষে হানলে ছুরি,
এত শঠতা এত যে ব্যথা তবু যেন তা মধুতে মাথা॥
চকোরী দেখলে চাঁদে দূর হতে সই আজো কাঁদে,
আজো বাদলে ঝুলন ঝোলে তেমনি জলে চলে বলাকা॥
বকুলের তলায় দোদুল কাজলা মেয়ে কুড়োয় লো ফুল,
চলে নাগরী কাঁখে গাগরী চরণ ভারি কোমরে বাঁকা।।
তরুরা রিক্ত পাতা আসলো লো তাই ফুল-বারতা,
ফুলের গলে ঝরেছে বলে ভরেছে ফলে বিটপী-শাখা ॥
ডালে তোর হালে আঘাত দিস রে কবি ফুল-সওগাত,
ব্যথা-মুকুলে অলি না ছুঁলে বনে কি দুলে ফুল-পতাকা ॥
এগার.
এমন অবস্থায় ‘শনিবারের চিঠি’র রসিক সম্পাদক সজনীকান্ত কেমন করে আর নীরব থাকেন? এই যে দিন নেই, রাত নেই, সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই— গভীর মনযোগের সঙ্গে নজরুল প্রতিদিন রানুকে সঙ্গীতের পাঠ দিয়ে চলেছেন, এতে সজনীর মত ব্যক্তির পক্ষে স্থির থাকা কেমন করে সম্ভবপর? একি দিলীপ রেণুকার সম্পর্কের চেয়ে আরও গায়ে জ্বালা ধরানোর মত মারাত্মক ব্যাপার নয়? এমনি জল্পনা-কল্পনায় উত্তেজিত হয়ে নজরুলকে শায়েস্তা করার জন্য তিনি উপযুক্ত রকমের একটি প্যারোডি লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। যে-গানটির প্যারোডি লেখা হয় উপরে তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে— “কে বিদেশী বন-উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে”। সজনীকান্তের প্যারোডিটি এখানে উদ্ধৃত করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কিন্তু প্যারোডিটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিণতির ফল শীগগীর পাওয়া গেল। একদিন রাত্রি ১১টা পর্যন্ত আমাদের অতিথি নজরুল ইসলামের জন্য আমরা বর্ধমান হাউসে অপেক্ষা করছিলাম। আরও আধঘণ্টা খানেক পর আমরা সিঁড়িতে দ্রুত মনুষ্য পদধ্বনি শুনতে পেয়ে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম না তাঁর ঘরে ঢুকছেন হাতে একটি নতুন পাঠি, শায়ের কুর্তায় রক্তের দাগ এবং শরীরে লাঠির আঘাতের চিহ্ন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর এবং কোনরকমে ক্ষতস্থানে পরিয়ানি লাগানোর পর তার কাছ থেকে নিম্নোক্ত ঘটনা শোনা গেল:
সোম মশায়ের বাড়ী থেকে আমি কেবল বেরিয়ে এসে পথে নেমেছি এমন সময় জনের একটি যুবকের দল আমাকে চারদিক থেকে আক্রমণ করলো। প্রথমটা আমি হকচকিয়ে গেলাম কিন্তু পর মুহূর্তেই একজনের হাত থেকে এই বেতের ছড়িটা ছিনিয়ে নিয়ে কেমন করে আঘাত ফিরিয়ে দিতে হয় তা একটু তাদের বুঝিয়ে দিলাম। আমার কাছাকাছি যে দু’তিন জন ছিল ঐ হায়দরী মায়ের দু’চারটা খেয়ে সেখানেই সুরে পড়ল। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং কাছের নবাবপুর স্ট্রীটের পাহারাদার পুলিশের আগমন ভয়ে তারা সব দ্রুত পালিয়ে গেল।
ঘটনাটা ঘটেছিল বনগ্রাম লেনে। এই গলির উপরেই ছিল সোম মশায়ের বাড়ী। স্থানীয় হিন্দু-যুবকেরা সজনীকান্তের প্যারোডিটি সম্ভবতঃ পড়েছিল। এতে তাদের মনে সন্দেহ বিগুণ হয়ে ওঠে। তারা একটা কেলেঙ্কারীর কথা আঁচ করে তার একটা বিহিত করার চেষ্টা করেছিল। রানু হিন্দুর মেয়ে আর নজরুল মুসলমানের ছেলে। সুতরাং তাদের হিন্দু-রক্ত এই সম্পর্কটিকে একেবারে সহ্য করতে পারছিল না। এ যেন ছিল তাদের পৌরুষের উপর আঘাত।
যাহোক ঐ গল্পের ঐখানেই শেষ। এর দু’একদিন পরে নজরুল আমাকে তাঁর সেই ঐতিহাসিক ছড়িটা উপহার দিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। আট ন’বছর যাবৎ ছড়িটা আমার সঙ্গেই ছিল । দুর্ভাগ্যবশতঃ রাঁচী থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত লোহার দাগা নামক এক জায়গায় আমার ঢাকা কলেজের সহপাঠী রুক্ষিনীর বাড়ীতে এক সাপ মারতে গিয়ে ছড়িটি ভেঙ্গে যায়। ঘরের মেঝেতে শুয়ে আমরা দুই বন্ধু ঘুমাচ্ছিলাম এমন সময় সাপটি আমাদের দু’জনের উপর দিয়ে চলে যায়। রুক্ষিনী আমাকে জাগিয়ে দিয়েছিল; ঝক ঝকে মেঝের উপর শুয়ে থাকা সাপটিকে মারা আমার পক্ষে তেমন কঠিন হয় নি।[ক্রমশ]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।
লেখক কাজী মোতাহার হোসেনের খানিকটা পরিচয় জানতে পারলে আরও ভাল লাগত।
দেব শেষ কিস্তিতে। তবে ছোট করে। ইংরেজিটা দেব না। ওটা ২০২৫ বইমেলায় বের করার ইচ্ছে আছে।