পনেরো.
১৯৩০ সালে কবিকে বাঙালী জাতির তরফ থেকে কলকাতা এলবার্ট হলে জাতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সভায় বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় সভাপতিত্ব করেন। অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন ব্যারিস্টার এস, ওয়াজেদ আলী এবং কনিষ্ঠতম রাজনৈতিক নেতা সুভাষচন্দ্র বোস, যিনি আই. সি. এস. হলেও রাজনীতিতে আরোহণ করার জন্য সরকারী চাকুরীতে যোগ দেন নি, প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করেন। আমি দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম।
১৯৩১ সালের দিকে নজরুল সিনেমা ও থিয়েটার জগতে প্রবেশ করেন। আমার মনে আছে ঐ সময় যখনই আমি কলকাতায় গিয়েছি তখনই নজরুল আমার ও আমার স্ত্রীর জন্য টিকেটের ব্যবস্থা করতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও অভিনয়ে অংশ নিতেন — যেমন ‘ধূপছায়া’ ছায়াছবিতে তিনি বিষ্ণুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
এই সময় ঠুংরী সম্রাট ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খান সাহেবের মৃত্যু হলে ফোন কোম্পানী তাকে হেড কম্পোজার ও সঙ্গীত শিল্পীদের ট্রেনার হিসাবে নিযুক্ত করেন। অনেক দফা নজরুল ইসলাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে দমদম রেকর্ডিং অফিসে গিয়েছেন। সেখানে আমি কবিকে আঙুরবালা, ইন্দুবালা, আশ্চর্যময়ী, বেদানাদাসী, কমলা ঝরিয়া, কাননবালা (পরবর্তীকালে কাননদেবী), কানা কেষ্ট (কৃষ্ণচন্দ্র দে), কে. মল্লিক (মুহম্মদ কাসেম)-এর মত প্রথম শ্রেণীর শিল্পীদের এবং অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের শিল্পীদেরকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতে এবং তদারক করতে দেখেছি। রেকর্ডিং-এর জন্য শিল্পীদের নিয়ে প্রাথমিক রিহার্সাল তিনি কখনো তাঁর নিজের বাসায় অথবা ১০৬ আপার চিৎপুর রোডে সমাধা করতেন।
এর থেকে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে “নজরুল কি এত উঁচুদরের সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন যে ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খানের স্থলে ঐসব নামজাদা অভিজ্ঞ শিল্পীদের সঙ্গীত শিক্ষাদানের তিনি উপযুক্ত?” উত্তর হল : নজরুলের সঙ্গীতের মান প্রশ্নাতীতভাবে সুন্দর এবং যখন তিনি করাচীতে ৪৯নং বাঙালী পল্টনে সৈনিকতা করছেন তখন একজন সুদক্ষ বংশীবাদক বলে তিনি খ্যাত ছিলেন। ঐ করাচীর পল্টন জীবনে তিনি একজন পশ্চিমা ওস্তাদের কাছে দ্রুপদ ও খেয়াল শিখেছিলেন। আমি তাঁকে ওস্তাদ মঞ্জু সাহেবের কাছেও সঙ্গীতের পাঠ নিতে দেখেছি। মঞ্জু সাহেব মুর্শিদাবাদের অধিবাসী ছিলেন, পরবর্তীকালে কলকাতার এন্টালীতে এসে স্থায়ীভাবে বাস করতেন। নজরুল তখন পানবাগান লেনে ঐ একই জায়গায় বাস করতেন। এরপরে তিনি মেটিয়া বুরুজের ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খান এবং পরে মহান ওস্তাদ ফৈয়াজ খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পাঞ্জাবী ফৈয়াজ খাঁ তখন কলকাতায় এসে বাস করছিলেন।
ঢাকাতে ১৯২৭/২৮-এর দিকে একবার নজরুলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঢাকার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওস্তাদদের (যাদের মধ্যে খেয়াল, ঠুংরী ও টপ্পার অভিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞ আমার ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরীও ছিলেন) সঙ্গে তুলনা করলে সঙ্গীত জগতে আপনার স্থান কোথায় হতে পারে বলে আপনি মনে করেন। নজরুল তখন এই বলে উত্তর দেন : আপনার ওস্তাদজী সঙ্গীতে বি. এ. এবং আমি সম্ভবতঃ একজন ম্যাট্রিক কিংবা বড় জোর আই. এ.। অন্যান্য ওস্তাদদের মত মোহম্মদ হোসেনের তাল, লয় এবং বিশুদ্ধ রাগের উপর পুরোপুরি দখল আছে। অতি সহজে বাদী সম্বাদী থেকে উড়ব, খাড়ব এবং সম্পূরণ রাগাদি প্রদর্শনে তানের আরোহণ ও অবরোহণে তাঁর ঐতিহ্যগত স্বাভাবিক ক্ষমতা তর্কাতীতভাবে সুন্দর, কিন্তু আমার এমন কতকগুলো মৌলিকতা আছে যা সঙ্গীত শাস্ত্রে এম. এ. ডিগ্রীপ্রাপ্ত এইসব ওস্তাদেরা তার ধারে কাছেও কোনোদিন পৌঁছতে পারবেন না। এইসব ওস্তাদেরা গানের অর্থ, ভাব এবং আবেদনকে শ্রদ্ধা করেন না এবং সে জন্যেই প্রয়োজনবোধে যেখানে বিশেষস্থানে নাটকীয় শৈল্পিক অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন হয়, আন্তরিকতার সুযোগে সঙ্গীতকে মর্মস্পর্শী করার দরকার হয়, সেখানে তাঁরা ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তাঁরা মনে করেন রাগের কাঠামোর বাইরে শিল্পীর কোনো স্বাধীনতা নেই। কিন্তু আমি এমন কিছু স্বাধীনতার প্রশ্রয় দিই যাতে গানটি আরও জীবন্ত হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। গানের অন্তরানুভূতি শারীরিক রূপলাভ করে।
আমার মনে হয় কবির এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণভাবে সত্য এবং এই প্রশ্ন আমি কবির ব্যাপারে আমার ওস্তাদজীকে (যার কাছে আমি দু’বছর ধরে কণ্ঠসঙ্গীত শিখেছিলাম। এবং পরে যিনি আমাকে তিনবছর ধরে সেভারের গোপন রহস্য শিখবার পরামর্শ নিয়েছিলেন) জিজ্ঞাসা করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন: কবি নজরুলের কণ্ঠ তেমন উচ্চাঙ্গের কিংব সুরেলা নয়। তবে তাঁর কণ্ঠ বেশ জোরালো পৌরুষময় (বুলন্দ)। তাছাড়া তাঁর গলাতে অপ্রত্যাশিতভাবে এমন কতকগুলো কাজ ফুটে উঠতে দেখা যায় যার সঙ্গে আমার আদৌ পরিচয় নেই। যদিও সঙ্গীতের মহত্তম শিল্পীরা এই ধরনের কলাকৌশল কখনও কখনও দেখিয়ে থাকেন; তবু তারা আবার মূল রাগের কাঠামোর মধ্যে ফিরে আসেন। বলাবাহুল্য রাগের এই রস কিংবা আত্মার উপর অসাধারণ দখল ছাড়া এমনটি করা কারও পক্ষে সম্ভব না। মোটকথা তিনি তাঁর পথে চলেন আর আমরা চলি আমাদের পথে।
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ওস্তাদেরা সাধারণতঃ এইভাবে কাউকে স্বীকৃতি দেন না। সুতরাং আমার ওস্তাদ যে এই ঔদার্য দেখালেন সেজন্য তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধার অন্ত নেই। এই প্রসঙ্গে বলা অকারণ হবে না মোহিনী সেনগুপ্তা নাম্নী রবীন্দ্র-সঙ্গীত ও নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপিকার একজন মহিলা নজরুলের পরম হিতৈষিণী ছিলেন এবং তিনিই প্রথমে নজরুলকে ধ্রুপদ গানে কিভাবে অস্থায়ী অন্তরা আভোগ ও সঞ্চারী বিন্যস্ত করতে হয় তারই শিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করতে এবং ঐগুলো পৃথক পৃথক সঙ্গীতের পৃথক পৃথক স্থান এবং পংক্তিতে কিভাবে সন্নিবেশিত হবে এবং “ন্যাসম্বর” ও “গ্রহম্বর”-এর ভূমিকা গানে কতটা সে-বিষয়ে পরামর্শ ও জ্ঞানদান করেন। সঙ্গীতের এই আঙ্গিকগত কলা-কৌশল শিখবার পরামর্শ নজরুলকে অনুপ্রাণিত করে এবং গভীরভাবে সেগুলো অনুশীলন ও শিক্ষালাভে কৌতূহলী করে তোলে। ফলে তিনি বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে পরবর্তীকালে ঐগুলি শিখবার জন্যে উৎসাহিত হয়ে উঠেন। যদিও একথা সত্যি যে নজরুল অবিকলভাবে একাধারে সঙ্গীতের কোনো বিশেষ ধারা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চর্চা করেন নি; কিন্তু সঙ্গীতের সূত্রগুলো তাঁর অসাধারণ প্রতিভার আগুনে তিনি শোষণ করে নিতে পারতেন এবং অসঙ্গতিপূর্ণ গগুলিকে শিল্পীসুলভ আশ্চর্য ক্ষমতাবলে জোড়া লাগাতে সক্ষম হতেন। সুতরাং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিনয় করে তিনি নিজেকে সঙ্গীত-জগতে ম্যাট্রিক ও আই. এ-এর স্তরে পড়ি বললেও পরবর্তীকালে আরও অধিক শিক্ষা, সাধনা ও অধ্যাবসায়ের দ্বারা এবং তাঁর জন্মসূত্রে অর্জিত সঙ্গীত-প্রতিভার এম. এ ডিগ্রীর বদৌলতে তিনি তাঁর সময়কার সকল গুণী, বি. এ পাশ করা, কণ্ঠসঙ্গীতের ওস্তাদদের সমকক্ষতা অর্জন করেছিলেন। দমদম এবং চিৎপুর রোডের রিহার্সাল রুমে শিল্পীরা যখন কোনো গান গাইতেন কবি তখন সেই গান অনুসরণ করে মৃদুভার হাতের কাছে যেটাই থাকতো, হারমোনিয়াম কিংবা অর্গান, সেটাই বাজাতেন এবং শিল্পীদের গাওয়ার মধ্যে বিন্দুমাত্র ত্রুটিবিচ্যুতি হলে গানের ভাব, ভাষা ও সুর অনুযায়ী গানের শিল্পরূপটি যথাযথ না ফুটলে তিনি হাত তুলে শিল্পীদের থামবার ইশারা করতেন এবং স্বকণ্ঠে গেয়ে সেই স্থানটা সংশোধন করে দিতেন। এবং যেমনটা স্বাভাবিক, তার ব্যাখ্যা এতটাই বিশুদ্ধ হত’ যে পণ্ডিতেরা সেটাই অনুমোদন করতেন এবং তাঁর পদ্ধতি অনুসরণ করে গাইতেন। এইভাবে তাঁর গানকে যাঁরা কণ্ঠে তুলতেন তাঁরা বারংবার একটি গানকে সার্থকভাবে রূপায়িত না করা পর্যন্ত গেয়ে চলতেন। অবশ্য, বেদানা দাসী, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া এবং কানন দেবী নজরুলের গায়কীটা যত তাড়াতাড়ি ধরতে পারতেন আঙুরবালা, আশ্চর্যময়ী, কানাকেষ্ট, কে. মল্লিক, আব্বাসউদ্দীন এবং অন্যদের পক্ষে তা ধরতে একটু দেরী হ’ত। কেননা, আপন-আপন গাইবার ভঙ্গী ও একঘেঁয়ে অভ্যাস তাঁদের পক্ষে ত্যাগ করা কঠিন হত বলে নজরুলের যথাযথ প্রকাশভঙ্গিটা তাঁদের পক্ষে কব্জায় আনা সহজ হ’ত না।[ক্রমশ]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করেছেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।