ষোলো.
আব্বাসউদ্দীন, প্রতিভা সোম এবং আরও অনেকে নবীন প্রতিশ্রুতিশীল কণ্ঠশিল্পীরা সঙ্গীতের পাঠ নিতে নজরুলের বাড়ীতে প্রায়ই যাতায়াত করতেন। নজরুল এজন্য মোটেই বিরক্ত হতেন না, তাঁদের সবাইকে বিনা পারিশ্রমিকে সাহায্য করতেন। এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, নজরুল তাঁর কতকগুলো বাছাই করা গানের গ্রামোফোন ও জেনোফোনের রেকর্ড (এক ডজনের বেশী) কুমারী ফজিলাতুন্নেসাকে উপহার দিয়েছিলেন; আমাকেও হিজ মাস্টার্স ভয়েসের খান পাঁচেক রেকর্ড দিয়েছিলেন।
বলাবহুল্য যে-গতিতে নজরুল একটি নতুন গান লিখে শেষ করতেন সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ব্যাপারটা এমনি বিস্ময়কর। হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রথমে তিনি বিষয় ছাড়াই একটি রাগের সম্পূর্ণ কাঠামোটা তৈরী করে নিতেন তারপর যে যে শব্দ ঐ সুরের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাপ খায় তেমনি বাছাই করা উত্তম সুরের সাহায্যে তিনি গানটি রচনা করতেন। নজরুল হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে গানটি গাইতে থাকতেন আর গ্রামোফোন কোম্পানীর স্ক্রিপ্ট লেখকেরা সেটা দ্রুতগতিতে লিখে নিতেন, অথবা কবি নিজেই গাইতেন এবং লিখতেন। এইভাবে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটি রাগের কাঠামোর প্রতটি অঙ্গের আকার অনুযায়ী সুন্দর সুন্দর পংক্তিগুলি রূপায়িত হয়ে উঠতো একটি সম্পূর্ণ গানের শরীরে। ১৪ নং ওয়েলেস্লি স্ট্রীটে অবস্থিত “সওগাত” অফিসে কবি অনেক সময় প্রতিশ্রুত সময়ে তাঁর লেখা লিখতে না পারলে সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন ঘরে আটকে লেখা আদায় করতেন। দেখা যেত আধঘণ্টা একঘণ্টার মধ্যে লেখক অতি মনোরম আবেগসমৃদ্ধ প্রবন্ধ কিংবা কবিতা লিখে দিয়েছেন।
তরুণ অথবা তরুণী লেখক-লেখিকাদের নজরুল সাহিত্যকর্মের জন্য উৎসাহ জোগাতেন। কখনও তাঁদের লেখা প্রয়োজনমত সংশোধন করে দিতেন অথবা কাউকে লক্ষ্য করে ছোট্ট একটি কবিতা লিখে তাঁকে প্রেরণা যোগাতেন। এইসব তরুণ-তরুণীর মধ্যে যাঁদের নাম সহজে মনে আসে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন : হাবিবুল্লাহ বাহার, শামসুন্নাহার, সুফিয়া এন. হোসেন (পরবর্তীকালে সুফিয়া কামাল), দক্ষিণ-কলকাতার মেটিয়া ব্রুজের জাহানারা বেগম, ফরিদপুরের সুফী মোতাহার হোসেন, কবি আবদুল কাদির (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)। হাবিবুল্লাহ বাহার ছিলেন নজরুলের বন্ধু এবং ইডেনগার্ডেন ও গড়ের মাঠের ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা দেখার সঙ্গী। সুফিয়া কামাল ও শামসুন্নাহার আমাদের বিখ্যাত লেখিকাদ্বয়; জাহানারা বেগম ছিলেন “বর্ষবাণী” নামক বার্ষিক সাহিত্য-পত্রিকার সম্পাদিকা; সুফী মোতাহার হোসেন হলেন অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র ও নজরুল ইসলাম প্রশংসিত বিখ্যাত সনেটকার আবদুল কাদির “দিলরুবা” ও “উত্তর বসন্ত” কাব্যযুগলের কবি – এবং নজরুল “নজরুল রচনাবলী” ও “নজরুল রচনাসম্ভারের” বিখ্যাত সম্পাদক। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা নজরুল নিরাময় সমিতির উৎসাহী সদস্য কবি আবদুল কাদির নজরুল সাহায্য তহবিল থেকে কিছু টাকা নিয়ে কলকাতায় কবিকে দেখতে যান নজরুলের চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য করতে। ফিরে এসে তিনি জানিয়েছিলেন নজরুল নাকি কয়েকবার ‘মোতাহার’ ‘মোতাহার’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন। যদিও তখন নজরুল সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রষ্ট। তবু তাঁর অবচেতন মনে হয়ত আজও কয়েকজন বন্ধুর নাম সাঁতরিয়ে ফেরে।
সতেরো.
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যকার সম্পর্কটি ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ছিল না, ছিল কিছুটা গুরু-শিষ্যের মত এবং তা শুধু কাব্য ও সাহিত্য ক্ষেত্রেই নয় সঙ্গীত ও সুরের রাজ্যেও। রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলকে কতটা স্নেহের চোখে দেখতেন তা “ধূমকেতু”কে আশীর্বাদ করে লেখা তাঁর কবিতা পংক্তিসমূহে সুস্পষ্টভাবে পরিস্ফুট:
আয় চলে আয় রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু!
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলক-রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধ-চেতন।
শুধু এই কবিতায় নয়। নজরুল যখন পুনরায় ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে স্বরাজ পার্টি কর্তৃক প্রকাশিত “লাঙলে”র সম্পাদনার ভার নেন তখনও রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উৎসাহমূলক এই আশীর্বাণীটি পাঠান :
জাগো, জাগো বলরাম ধরো তব মরু-ভাঙা হল
প্রাণ দাও, শক্তি দাও, স্তব্ধ কর ব্যর্থ কোলাহল ।
অনশন ধর্মঘট ত্যাগ করাতে হুগলী জেলে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে “অনশন ত্যাগ কর, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়” বলে যে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তার থেকে বোঝা যায় — বাংলা সাহিত্যের কাব্য-গগনে উদিত এই নতুন নক্ষত্রটির জন্যে তাঁর কী গভীর উৎকণ্ঠা ছিল। নজরুল সেই স্নেহের প্রতিদানে রবীন্দ্রনাথকে “গুরুদেব” সম্বোধন করে তাঁর হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন যে দেশের সবাই যখন তাঁকে পরিহাস করছিলেন রবীন্দ্রনাথই তখন তাঁকে যথার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। প্রথম যৌবনে নজরুল রাবীন্দ্রনাথের গানকে সবকিছুর উপর স্থান দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ নজরুলই আমাকে প্রথম কয়েকটি রবীন্দ্রনাথের গান শেখান। তার প্রথমটি হল :
কে যেন আমারে এনেছে ডাকিয়া এসেছি ভুলে।
তবু একবার চাও মুখপানে নয়ন তুলে।
দেখি, ও নয়নে নিমেষের তরে
সেদিনের ছায়া পড়ে কি না পড়ে,
সজল আবেগে আঁখিপাতা দু’টি পড়ে কি ঢুলে।
ক্ষণেকের তরে ভুল ভাঙ্গায়ো না এসেছি ভুলে।।
দ্বিতীয় গানটি হল :
তোরা পারবি নাকি যোগ দিতে সেই ছন্দেরে
খসে যাবার ভেসে যাবার মরবারই আনন্দে রে॥
এই দুটি সুপরিচিত গান ছাড়াও “গীতাঞ্জলি” ও “গীতিমাল্য” প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের আরও অনেক গান নজরুল গাইতেন। সুতরাং এই দুই দৈত্যতুল্য সুরস্রষ্টা ও সঙ্গীত-রচয়িতার মধ্যে কে শ্রেষ্ঠতর আমার পক্ষে সেটা বলা নাজুক ব্যাপার।
আঠারো.
রবীন্দ্রনাথ প্রায় হাজার তিনেক গান লিখেছেন। অপরদিকে নজরুল গ্রামোফোন রেকর্ডের গান নিয়ে প্রায় চার হাজারের মত গান লিখেছেন। দু’জনের সব গানই প্রথম শ্রেণীর নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান শিল্পের খাতিরে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে লিখেছেন আর নজরুল অধিকাংশ গান লিখেছেন জীবিকা নির্বাহের দায়ে পড়ে। তাই বলে নজরুলের গানগুলিতে তাঁর সমস্ত হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি শিল্প-সুষমা ফুটে উঠে নি, বলা চলে না। সঙ্গীতের গোটা পরিধির মধ্যে পুনরাবৃত্তি ঘটতে বাধ্য যদি পর্যায়ক্রমে চিন্তা ধারার পরিবর্তন না ঘটে। যেমন ধরুন আপনি কেবল বসন্তের সৌন্দর্য নিয়ে যদি অবিরাম লেখেন তো বিষয়-বৈচিত্র্যের অভাব ঘটবে। যদি রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল দশটি কবিতা লেখেন তা হ’লে চিন্তাধারার পুনরাবৃত্তি হবেই — প্রতিটি কবিতার আঙ্গিকগত ভিন্নতাসত্ত্বেও। পাঠক ও শ্রোতার কল্পনাকে আকর্ষণ করতে পারে এমন নন্দনতাত্ত্বিক প্রকাশ ভঙ্গিমাই কাব্যালোচনার মৌল বিষয়। জীবনের প্রথম পনর বছর বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথ ৬৫ বছর সাহিত্যসাধনা করেছেন। এই পরিমাপ অনুযায়ী নজরুলের সাহিত্যজীবন মাত্র ২৬ বৎসরের যা রবীন্দ্র-সাহিত্য-জীবনের পাঁচ ভাগের দুইভাগ মাত্র। যদি শুধু সঙ্গীতের বিষয় ধরা যায় তাহলে বলতে হবে নজরুলের সৃষ্টি ক্ষমতা অনেক বেশী। দেখে মনে হয় তিনি তাঁর বংশধরদের জন্য তাঁর পক্ষে যতটা দেওয়া সম্ভব তা উজাড় করে দিয়ে গেছেন। যদি উভয়ের সঙ্গীতের গুণগত দিকের বিচার করতে হয় তাহলে উভয়ের জীবনের বাল্য ও কৈশোর জীবনের অর্থাৎ পনর বছরে পৌঁছা পর্যন্ত প্রাথমিক জীবনের পরিবেশের কথা উল্লেখ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্র লাল রায়, নিধু বাবু (বিখ্যাত টপ্পার স্রষ্টা), রামপ্রসাদ ও রজনীকান্তের সঙ্গীতের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতে তাঁদের প্রতিফলন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সঙ্গীতকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ সুমার্জিত ও উৎকৃষ্ট করার সুযোগ পেয়েছিলেন। অন্যদিকে নজরুল রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সমৃদ্ধ তৈরী বাংলা ভাষা পেয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পূর্বসূরী ওস্তাদদের রাগের কাঠামোকে ভেঙে নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন, পূর্ববর্তীদের গায়কী ঢঙ বদলে দিয়ে ছন্দ বজায় রেখে রক্ষণশীল ঐতিহ্যগত ধ্বনি ও মাত্রার পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। এতে গায়কেরা রাগের ওস্তাদী রক্ষণশীলতার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে গানগাইবার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। বস্তুতঃ, সঙ্গীতের স্বীকৃত চারটি আঙ্গিক ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী, টপ্পার (তাদের বৈচিত্র্যসহ) সঙ্গে তিনি আরও একটি নতুন ঢঙ সংযুক্ত করেছিলেন। সঙ্গীতের এই নতুন ঢঙটি “রবীন্দ্র সঙ্গীত”। এতদ্সত্ত্বেও রবীন্দ্র-সঙ্গীতে তিনি ধ্রুপদ ও খেয়ালের গাম্ভীর্য বজায় রেখেছিলেন। সংক্ষেপে ব্রাহ্ম-সঙ্গীত, ভজন, কীর্তন প্রভৃতি রাগের চারিত্রিক পরিবর্তন না ঘটলেও একটি রাগের সংহতি থেকে ক্রমান্বয়ে তাদের মুক্তি ঘটলো। অন্য কথায় বলা যেতে পারে দু’তিনটি রাগকে তিনি একত্রে মিশ্রিত করেছিলেন যাদের নতুন নাম হল ‘সঙ্কর’ বাগ ও রাগিণী। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি বিদেশী সুরেরও মিশ্রণ ঘটান। বাংলা সঙ্গীতে এ-ছিল একটি অভিনব সাহসী পদক্ষেপ, স্বাস্থ্যকর অবদান। [ক্রমশ]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।