উনিশ.
মহান রবীন্দ্রনাথের কাছে যে নজরুল ঋণী সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ঐতিহ্যসূত্রে তিনি যা পেয়েছিলেন সেগুলোকে আত্মস্থ করে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সঙ্গীতে যে নতুনত্ব সৃষ্টি করেছিলেন তার থেকে আরও এগিয়ে গেলেন তিনি। সংস্কৃত শব্দপ্রাচুর্যে শৃঙ্খলিত বাংলা ভাষাকে মুক্ত করে রবীন্দ্রনাথ সহজবোধ্য ভাষায় রূপান্তরিত করেন যে ভাষা হিন্দী, ফার্সী, আরবী, পর্তুগীজ, প্রাকৃত প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষা থেকে আহরিত শব্দে নির্মিত ভাষা হিসেবে জনগণের ভাষা হিসেবে প্রচলিত হয়ে উঠেছিল। নজরুল ইসলাম বিপুল সাহসের সঙ্গে নতুন নতুন আরবী-ফার্সী ও অন্য বিদেশী শব্দ যা বাংলা ভাষার সঙ্গে অশ্রাব্য না হয়ে মিশতে পারে — ব্যবহার করেন। একথা অবশ্য স্বীকার্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি হয়ত কিছুটা বাড়াবাড়ি করেছেন; কিন্তু এ-কথাও ঠিক ঐ শব্দগুলোই আবার পরিবর্তিত হয়ে আগামী ৪০/৫০ বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাবে – বাংলা ভাষার শব্দ সম্ভারকে সমৃদ্ধ করে। নজরুল ইসলাম যে-সব শব্দ ব্যবহার করেছেন তার অধিকাংশই ১৮শ শতাব্দীর পুঁথি- সাহিত্যে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু খ্রীস্টান মিশনারীদের সহযোগিতায় উন্নাসিক সংস্কৃত পণ্ডিতদের দ্বারা ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে অতি চাতুর্যের সঙ্গে মৌখিক ভাষাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংস্কৃত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়। নজরুল ইসলামের প্রকৃত কৃতিত্ব বিদ্বেষবশতঃ বিবর্জিত বিদেশী শব্দকে বাংলা সাহিত্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা।
বাংলাগানে নজরুল গজলকে জনপ্রিয় করে তুলেন। কিন্তু প্রকৃত গজলের সুরে একঘেয়েমীর যে-রেশ দেখা যায় নজরুল তাঁর গজলকে সেই প্রচলিত অনুশাসন থেকে মুক্তি দিলেন তাঁর গজলের মধ্যে শেয়র-এর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে। ‘শেয়র’ হ’ল গানের মধ্যে হঠাৎ কয়েকটি পংক্তির আবৃত্তি এবং আবৃত্তির পর পুনরায় গানের মূল তাল ও লয়ে ফিরে আসা। যেমন একটা উদাহরণ :
চেয়োনা সুনয়না আর চেয়োনা এ নয়ন পানে।
জানিতে নাই কো বাকি সই ও আঁখি কী যাদু জানে।।
একে ঐ চাউনি বাকা সুরমা-আঁকা তায় ডাগর আঁখি।
বধিতে তায় কেন সাধ যে মরেছে ঐ আঁখি-বাণে॥
কাননে হরিণ কাঁদে সলিল ফাঁদে ঝুরছে সফরী,
বাঁকায়ে ভুরুর ধনু ফুকে . অতণু কুসুম-শর হানে।।
(কুনাল কি পড়ল ধরা পিযুষ-ভরা ঐ চাঁদো মুখে,
কাঁদিছে নার্গিসের ফুল লাল কপোলের কমল-বাগানে।।
জ্বলিছে দিবস-রাতি মোমের বাতি রূপের দেওয়ালী,
নিশি-দিন তাই কি জ্বলি’ পড়ছে গলি অঝোর নয়নে।।)
মিছে তুই কথার কাটায় সুর বিধে হায় হার গাঁথিস কবি,
বিকিয়ে যায় রে মালা আয় নিরালা আঁখির দোকানে।।
এই গজলের মধ্যে বন্ধনীত পংক্তিসমূহই শেয়র। নজরুলের গানের অন্যান্য গুণ সম্পর্কে পূর্ববর্তী পরিচ্ছদে বলেছি। এখানে নজরুল রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন এমন কথা আমরা বলতে পারি না। বস্তুতঃ রবীন্দ্রনাথের বিশালতা ও গভীরতা নজরুলের চেয়ে কিছুটা বেশী। প্রকৃত পার্থক্য হ’ল দু’জনের রুচির ভিন্নতা এবং তারও কারণ সময়ের পার্থক্য, তারুণ্যের সঙ্গে বার্ধক্যের পার্থক্য, নবীনের সঙ্গে প্রবীণের পার্থক্য। আসলে কবিতায় কিংবা গানে নর নারীর দেহ-সম্পর্কিত প্রেম ও ভাষা বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের শালীন কৃষ্টি ও রুচি বিশেষ সীমা অতিক্রম করতে বাঁধ সেধেছিল। কিন্তু নজরুল তাঁর ভিন্নরুচির (যা অতটা মার্জিত নয়) জন্য রবীন্দ্রনাথ যে উদাহরণ আমাদের সামনে রেখেছিলেন তা নিঃসঙ্কোচে অতিক্রম করে গেছেন। এইসব কারণে, এবং যৌন-সম্পর্কিত বাস্তবভিত্তিক বর্ণনার জন্য, যা রবীন্দ্রনাথের পক্ষে প্রকাশ করা কঠিন ছিল, নজরুল হাল-জগতের মানুষকে তৃপ্ত করতে বেশী সক্ষম হয়েছিলেন। নজরুলের বাস্তব-সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা ও প্রজ্ঞাদৃষ্টি সাধারণ মানুষের অনুভূতি ও আবেগকে রূপদান করতে এবং এর ক্ষেত্র প্রসারণ করতে সাহায্য করেছিল।
কুড়ি.
এখানে আরও একটি বিষয় আলোচিত হতে পারে সেটা সঙ্গীতের স্বরলিপি-ঘটিত বিষয়। রবীন্দ্রনাথের অনুমোদিত প্রয় ছাব্বিশ খানা স্বরলিপি এবং মোহিনী সেনগুপ্তাকৃত “রবীন্দ্রসঙ্গীত স্বরলিপি” যা রবীন্দ্রনাথ অনুমোদন করেছিলেন সে-গুলোর কাঠামো-ভিত্তিক রূপ ছাড়া অন্যরূপে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে দিতে রবীন্দ্রনাথের প্রচণ্ড আপত্তি ছিল। অথচ নজরুলের অনুমতি নিয়ে যে-সব গানের স্বরলিপি তাঁর জীবিতকালে প্রকাশিত হয় উৎকর্ষ সাধন হেতু তার সামান্য রদবদলে তিনি তেমন আপত্তি করতেন না। এটা ভাবতে অবাক লাগে যে রবীন্দ্রনাথ, যিনি পুরনো রীতিকে ভেঙ্গে স্বাধীন রীতির জন্ম দিলেন, তিনিই স্ববিরোধিতা করলেন সঙ্গীতের শিক্ষকদের অভিনবত্ব দানের জন্য তাঁর গান গাইবার স্বাধীনতা দিতে অস্বীকার করে। যদিও সন্দেহ নেই আজকালকার সঙ্গীতবিদ্যালয় অথবা মহাবিদ্যালয়ে যেসব ভূঁয়ো সঙ্গীত-শিক্ষক আছেন তাঁদের অনেকেরই মধ্যে সঙ্গীত সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞানই অবর্তমান। প্রকৃতপক্ষে সেইজন্যই আজকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুল-গীতি উভয়ই এইসব তথাকথিত শিক্ষকদের দ্বারা এমনভাবে বিকৃত হচ্ছে যে অনেক সময় তাদের স্বরূপ চিনে উঠাই মুশকিল। কিন্তু এ মুশকিলের আসান হবে কি করে! যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ অভিজ্ঞ জ্ঞানবান শিক্ষক না পাওয়া যায় তাহলে ভণ্ড শিক্ষকের ইচ্ছারই জয় হবে। ব্যবহারিক সঙ্গীতকে অবশ্যই কার্যকরী হতে হবে। সময়ের গতির ও কায়দা-কানুনের বিরুদ্ধে না গিয়ে নজরুল ভালই করেছেন। তিনি নিজেই রবীন্দ্রনাথের মত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে নতুন নতুন রাগ সৃষ্টি করেছেন। অন্যমিকে এমন নাম দিলে অবহেলিত বিষয়কে আমরা এমনি করে মহাত্মা দান করি। বস্তুতঃ পরিবর্তনশীলতাকে স্বীকৃতি না দিলে একমাত্র আজকের ধ্রুপদ ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না। আধুনিক প্রবণতা হ’ল লোক-গীতিকেও স্বীকৃতি দেওয়া— যেগুলোকে সাধারণতঃ গীতি বলা হয়। বছর দশেক আগে ওস্তাদেরা রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন কিন্তু তাঁরা সঙ্গীতকে গীত অপেক্ষা অভিজাত বলে চিহ্নিত করতেন। কিন্তু আভিজাত্য জনগণের চাহিদার কাছে তেমন মূল্য পাচ্ছে না। সুতরাং এই প্রবণতাকে আর ঠেকিয়ে রাখা অর্থহীন।
একুশ.
রবীন্দ্রনাথ বহুদিন হল আমাদের মধ্যে নেই। নজরুল আজও আমাদের মধ্যে আছেন; কিন্তু জীবিত থেকেও তিনি আজ মৃত। ১৯৪২ সালে এক দুশ্চিকিৎসা রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। জগতের শ্রেষ্ঠ ডাক্তাররা ঘোষণা করেছেন যে তাঁর মস্তিষ্কের প্রধানতম অংশ Brain Cells শুকিয়ে গেছে। সুতরাং চিকিৎসা দ্বারা তাঁর রোগ নিরাময়ের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রথমদিকে দেখা যেত শিশুর মত তিনি বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছেন, টুকরো টুকরো করে ছিড়ছেন, সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার তাদের কুড়িয়ে তুলছেন এবং একটা একটা করে গুণছেন; মাঝে মাঝে উন্মাদের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে দর্শকদের দিকে মারমুখিভাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই রকম মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যেও আমি সব সময় দেখেছি ভগ্নস্বাস্থ্য পক্ষাঘাতাক্রান্ত তাঁর স্ত্রী প্রমীলা বিছানায় শায়িত থেকে তাঁর হতভাগ্য স্বামীকে সেবা করছেন। পায়ের দিকটা অবশ হয়ে যাওয়াতে তিনি উঠতে পারতেন না। কিন্তু সে অবস্থাতেও গৃহভৃত্যকে নির্দেশ দিয়ে একজন ভক্তিমতি সেবাপরায়ণা গৃহকর্ত্রীর মত স্বামীর হাওয়া, পরা, গোসলাদি সবই নিখুঁতভাবে সম্পাদন করতেন। আমি জানিনা ১৯৬২ সালে প্রমীলা যখন মারা যান তখন নজরুল তাঁর এই আনন্দে প্রোজ্জ্বল এবং বেদনার অন্ধকারে আক্রান্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী, এই প্রিয়তম বন্ধুটির শেষ বিদায় মহূর্তটিকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কি না। এই ভক্তিমতী সাদ্ধী-সতীর আত্মা আল্লাহর অসীম করুণা লাভ করুক। নজরুল আজও জ্ঞানহীন অবস্থায় আছেন — নিশ্চল, নিশ্চুপ! পরিবর্তনহীন!
হে আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা, সর্বশক্তিমান, সর্ববিরাজমান, সর্বদয়াল মহাপ্রভু, একবার তুমি তোমার হতভাগ্য বিদ্রোহী সন্তান নজরুলের প্রতি তোমার করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ কর। তোমারই দৃষ্টির আশ্রয়ে, তোমারই নিযুক্ত এই মহাসৈনিক, পৃথিবীর লাঞ্ছিত নিপীড়িত অবহেলিত অগণিত মানবসন্তানের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য, ন্যায্য অধিকার প্রাপ্তির জন্য শোষকের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। হে করুণাময়, তোমার এই বীর সন্তানের প্রতি তোমার রহমত বর্ষণ কর। তুমি গফুরুর রহিম, তুমি দয়ার সাগর! তোমার ক্ষমা ও দয়া প্রাপ্তির জন্য নজরুলের মূক প্রার্থনাকে তুমি কবুল কর। [সমাপ্ত]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।