১৯১৯ সালে হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের “বাউণ্ডেলের আত্ম-কাহিনী” মাসিক “সওগাতে” প্রকাশিত হয়। আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। সেই তরুণ বয়সে আমার সাহিত্যজ্ঞান তখন কতটুকুই বা। একজন মুসলমানের, যাঁর আবার পদবী কাজী, বাংলা ভাষায় তাঁর দখল দেখে আমি রীতিমত উল্লসিত হয়ে উঠি । মনে মনে এই অদেখা বন্ধুটিকে আমার নিজের সম্প্রদায়ভুক্ত বলে অনুপ্রাণিত হলাম। তারপর ১৯২০ সাল থেকে “মোসলেম ভারত” পত্রিকায় একের পর এক তাঁর উদ্দীপনাময় কবিতাগুলি প্রকাশিত হতে লাগল । এই ঘটনা স্বপ্নের মত রোমাঞ্চকর বলে মনে হত আমার কাছে। ঐ কবিতাগুলির মধ্যে অনেকগুলোর প্রচলিত ধর্ম-নীতি বিরুদ্ধ কথাবার্তা যেমন আমি মেনে নিতে পারতাম না, তেমনি ধর্মাদর্শে সংরক্ষণশীল হয়েও সেগুলোকে যা-তা বলে উড়িয়েও দিতে পারতাম না । ফলে আমার আবেগ ও যুক্তির মধ্যে একটা তোলপাড় লেগে যেতো ।
বাংলা সাহিত্যাকাশের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রটির সঙ্গে দেখা করতে আমি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। শীগগীরই একটা সুযোগ এসে গেলো। আমার কলেজের সহপাঠী কাজী আকরম হোসেনের আত্মীয়-পরিবারের একটি মেয়ের সঙ্গে ১৯২০ সালের ১০ই অক্টোবর কলকাতায় আমার বিয়ে হয় । আমার শ্বশুর বাড়ী ছিল ১১ নং ওয়ালীউল্লাহ লেনে ওয়েলেসলি- -স্কোয়ারের পূর্ব দিকের গেটের দক্ষিণ কোণ বরাবর । তারিখটা ঠিক কবে এখন সঠিক মনে করতে পারছি না— তবে ১৯২০ কিংবা ২১-এর মধ্যে কোনো একদিন হবে। আকরম (আমার স্ত্রীর ইনসান মামু) ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটে নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে নিয়ে যান। তাঁর ঘরের সিঁড়িতে পৌছবার সরু গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নজরুল যে-ঘরে থাকেন সেই বাড়ীর দু’তলা থেকে আমরা তাঁর হাঃ হাঃ হাসির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। ঘরের মধ্যে ৬/৭ জন আগন্তুক পূর্বাহ্নেই উপস্থিত ছিলেন— কবি তাঁর স্বভাবগত প্রাণের উদ্বেল স্পর্শে সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রেখেছিলেন। ঘরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু’হাত বাড়িয়ে আমাদের দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন। এবং আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস আমরা কাজী কি কৈবর্ত তা নিয়ে তিনি আদৌ মাথা ঘামান নি। কিন্তু আমরা দু’জনই প্রফেসর –একজন কলেজের, অন্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইংরেজীর, অন্যজন ফিজিক্সের (তখনকার দিনে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-কোনো শিক্ষককে প্রফেসর বলা হত) শুনে তিনি সত্যিই খুশী হলেন। আমি লক্ষ করলাম যে প্রফেসরদের প্রতি বিশেষ করে মুসলমান প্রফেসরদের প্রতি তাঁর একটা অবিচল শ্রদ্ধা আছে— সে সময় যাঁদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য ছিল। বস্তুতঃ আমাদের এক কাপ করে চা এবং কয়েকটি সঙ্গীত দিয়ে আপ্যায়ন করা হ’ল । নিজেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে নজরুল গান করলেন । অপূর্ব নিখুঁত ভঙ্গিতে তিনি হারমোনিয়াম বাজাচ্ছিলেন; এবং সেইকালে যখন বাঙালী মুসলমান সমাজে সঙ্গীত হারাম না হলেও মকরুহ্ ছিল ।
দুই.
প্রায় প্রতি বৎসর গ্রীষ্ম কিংবা হেমন্তের ছুটিতে সস্ত্রীক অথবা একা— যদি আমার স্ত্রী কলকাতায় থাকতেন কলকাতায় যেতাম। গেলেই “বিদ্রোহী” কবির সঙ্গে দেখা করাটা আমার যেন ফরজ ছিল। প্রতিদান স্বরূপ কবিও আমার শ্বশুর বাড়ীতে আমাদের দর্শন দিতেন। শীগগীরই আমি আবিষ্কার করলাম কবি একজন সুদক্ষ হস্ত রেখাবিদ। একবার ওয়ালিউল্লাহ লেনে (তালতলায়) তিনি আমার এবং আমার শ্যালকদের হাত দেখলেন। আমার বারো বছরের দ্বিতীয় শ্যালক খলিলুর রহমানের হাত দেখে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। যে সে বিদেশে যাবে । আমার নয় বছরের ৩য় শ্যালক সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন যে, অতি অল্পকালের মধ্যে সে অনেক অনেক দূরে যাত্রা করবে, কোথায় তা কেউ জানে না। ঘটনা অবিকল তাই হয়েছিল। পরবর্তীকালে খলিলুর রহমান উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যাণ্ডে যায়, এবং লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ডিগ্রীসহ বি.এ. পাশ করে ও পি. এইচ. ডি লাভ করে এবং ভারত ও পাকিস্তান সমেত অন্যান্য আরও অনেক দেশে ইউনেস্কোর এডুকেশন অফিসার হিসাবে চাকরি করে । আর আমার তৃতীয় শ্যালক বদরুল আলম এমন এক দুশ্চিকিৎস্য রোগে আক্রান্ত হয় যে কোনো ডাক্তার, কবিরাজ কিংবা হেকিম সে-রোগ নির্ণয় করতে পারেন না। সুতরাং বছর তিনিকের মধ্যে সে এমন এক অজানা দেশে চলে যায় কোন পথিক যেখান থেকে আর ফিরে আসে না। আর আমার সম্পর্কে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আমার ভাগ্যে সমুদ্র যাত্রা ঘটবে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে আমার ভাগ্যে প্রভূত সম্মান জুটবে। আমি অবশ্যই বলতে পারি না যে তেমন সৌভাগ্য আমার হয় নি।
তিন.
আমার মনে হয় কবির সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারে দু’চার কথা বলা আবশ্যক। ১৯২৫ সালে কলকাতায় ভারতব্যাপী একটি দাবার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগীদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়েন, সুতরাং তাঁর স্থানে আর একজন প্রতিযোগীর প্রয়োজন পড়ে। আমি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দিই। সবাই বিস্ময় অনুভব করেন, কিন্তু অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিযোগীরা খুব খুশী হন। ব্যাপার হ’ল নজরুল ছিলেন একজন কল্পনা শক্তিসম্পন্ন আক্রমণ প্রিয় দাবাড়ে। দারুণ রকমের কুশলী খেলোয়াড় যদিও তিনি ছিলেন না, তবু মধ্যম শ্রেণীর খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি মাঝে মাঝে বিস্ময়ের সৃষ্টি করতেন। প্রতিযোগিতার ফল হয়েছিল ভারী মজার। হাঙ্গেরীয় একজন অতুলনীয় দাবা খেলোয়াড় রবার্ট পিকলার ৯ পয়েন্টের সব কটিই জিতেছিলেন, কলকাতার চ্যাম্পিয়ান এস. সি. আড্ডি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন ৮ পয়েন্ট পেয়ে, নজরুল ইসলাম ১১%, পয়েন্ট এবং “কিংসপন” পেয়ে শেষ-বিজয়ী হন। আর আমি ৭ পয়েন্ট পেয়ে হই তৃতীয়। নিতান্ত অবহেলা করে আমি যদি একটি পয়েন্ট না ছাড়তাম তো মিস্টার আড্ডির সঙ্গে ৮ পয়েন্ট পেয়ে আমি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতাম। এই একটি পয়েন্ট হারবার অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি বুঝলাম যে দাবা প্রতিযোগীতায় দুর্বলতম প্রতিযোগিটিকেও অবজ্ঞা করা চলে না। এখানে অবশ্যই এ কথাটুকু আমি উল্লেখ করবো যে প্রতিদিন আমরা রাত্রি ৯-৩০ টায় প্রতিযোগিতা শুরু করতাম আর শেষ করতাম পরদিন বিকেল ২-৩০ টায়। প্রত্যেক প্রতিযোগী অপর প্রতিযোগীর সঙ্গে একটি করে গেম খেলেছিলাম। যে-কদিন প্রতিযোগিতা চলেছিল সে ক’দিন নজরুল ইসলাম ওয়ালীউল্লাহ লেনে এসে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে খেলার স্থান ষ্টেটসম্যান বিল্ডিং-এ যেতেন এবং মধ্য রাত্রিতে তাঁর গাড়ীতে করে আমার বাসায় পৌছিয়ে দিতেন। এখানে বলা আবশ্যক তিনি গাড়ী কিনবার পর পূর্বের ট্রামে চড়বার অভ্যাস ত্যাগ করেছিলেন। বলাবাহুল্য রাত্রি দ্বিপ্রহরে কলকাতায় ট্রাম পাওয়া যায় না।
চার.
একবার এক ব্যাপার ঘটল। স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধায় খুব দাবা খেলা পছন্দ করতেন। তিনি একদিন নজরুল ইসলামকে, আমাকে ও মিঃ আড্ডিকে নিয়ে তাঁর বাসায় যেতে বললেন আমাদের খেলা দেখবেন বলে। সুতরাং নজরুল ইসলাম মিঃ আঙ্গিকে তাঁর নেবুতলা এ্যাভেনিউ (বউ বাজার)-এর বাড়ী থেকে এবং আমাকে তালতলা থেকে তাঁর গাড়ীতে তুলে নিলেন গোধূলি-সন্ধ্যায় ঢাকুরিয়া লেক এরিয়া থেকে অর্ধ-মাইল দূরে অবস্থিত। শরৎচন্দ্রের শরৎচন্দ্র এভিনিউয়ের বাসায় পৌঁছলাম। আমরা দেখলাম বৃদ্ধ ঔপন্যাসিক একটি দাবার ছকের সামনে বসে আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। আমরা এক মুহূর্ত দেরী না করে খেলায় বসে গেলাম এবং রাত্রি সাড়ে বারোটা পর্যন্ত একটানা খেললাম। গৃহকর্তা শরৎচন্দ্র ও নজরুল সারাক্ষণ বসে খেলা দেখছিলেন আর নজরুল ইসলাম ও অতিথি খেলোয়াড়দের প্রচুর পান ও চা জোগাচ্ছিলেন। খেলার ফলাফল হয়েছিল সমান সমান। খেলার পর পূর্ব-ব্যবস্থা অনুযায়ী কিছু খানাপিনা হ’ল। তারপর নজরুল ইসলামের গাড়ীতে করে আমরা ঘরে ফিরে এলাম।
আড্ডি এবং আমি উভয়েই প্রায়ই নজরুলের বাড়ীতে যেতাম; এবং গৃহকর্তারও বাড়ীতে অবশ্য নির্দেশ দেওয়া থাকত যে, কবি বাড়ীতে উপস্থিত নেই, এমন মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যেন আমাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া না হয়। ব্যাপার হ’ল অনাহূত আগুন্তুকেরা এসে কবিকে বিরক্ত করতো বলে উদ্দেশ্যজনকভাবে তিনি তাঁর বাড়ীর প্রবেশ পথের উপর একটি “বাড়ী নেই” বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে রাখতেন। আমার মনে হয়, দাবা খেলোয়াড় হিসাবে নজরুল বড় জোর কলকাতার মাঝারি খেলোয়াড়দের সমান ছিলেন। সুতরাং ১৯২৫-এ কলকাতার দাবা প্রতিযোগিতায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি তেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, যদিও আমি ছাড়া অন্য একজন সাধারণ প্রতিযোগী থেকে অর্ধেক পয়েন্ট তিনি জিতে নেন। [ক্রমশ]
ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা ইংরেজী প্রবন্ধ Nazrul Islam : The singer and writer of songs লেখার অনুবাদ। লেখাটা নজরুল একাডেমী পত্রিকা ৪র্থ বর্ষ, ১ম (গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত ১৩৮১) সংখ্যায় ছাপানো হয়। অনুবাদ করছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।