বাংলা সংগীত জগতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অতি উচ্চমাত্রায় সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প, উপন্যাস রচনার সাথে সাথে গান রচনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলা সংগীতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি সমুজ্জ্বল প্রভায় উদ্ভাসিত।
কাজী নজরুল ইসলাম পঞ্চকবি’র একজন। তিনি নিজেই গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীগান্ত সেন, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও অতুলপ্রসাদ সেন এই পাঁচজন হলেন পঞ্চ কবি হিসাবে খ্যাত। এই পাঁচজনের রচিত গানে নানা অনুসঙ্গ বর্তমান আছে।
আমাদের আলোচ্য নিবন্ধে কবি নজরুল ইসলামের রচিত গানের কথা, সুর ও বিষয়বৈচিত্র্যকে উপস্থাপন করার আগে রবীন্দ্রনাথ, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত ও দ্বিজেন্দ্রলালের গানের বিষয়বৈচিত্র্য সম্বন্ধে কিছু মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
তাদের মধ্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য ও সংগীত জগতে সর্বোচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, সুরকার, গায়ক ও বহুবিধ সুকুমার কলায় পারদর্শী অনন্যসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন মহান মানুষ। তার সঙ্গীত জগত বৈচিত্র্যময়তা তাঁর গান প্রেম, পূজা, প্রকৃতি, স্বদেশ প্রেম ইত্যাদি পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত। অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত ও দ্বিজেন্দ্রলালে গানেও নানা অনুষঙ্গ বর্তমান।
বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত কাজী নজরুল ইসলামের গানের ভাণ্ডার বিশাল। তাঁর লেখা গানের ভাণ্ডারে প্রেম-ভালোবাসা, দ্রোহ ছাড়াও ভক্তিরসের সংগীতের স্রোতধারা সমুজ্জ্বল ভাবে বহমান।
নজরুলগীতির শ্রেণি বিন্যাস করলে আমরা তাকে ১০টি ভাগে ভাগ করতে পারি।। এগুলো হলোঃ ভক্তিমূলক গান, প্রণয়গীতি, প্রকৃতি বন্দনা, দেশাত্মবোধক গান, রাগপ্রধান গান, হাসির গান, ব্যাঙ্গাত্মক গান, সমবেত সঙ্গীত, রণ সঙ্গীত এবং, বিদেশীসুরাশ্রিত গান। তিনি ভক্তিমূলক গানের মধ্যে হিন্দু ধর্মের তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন
নজরুল ইসলামের ভক্তিমূলক গানের মধ্যে হিন্দুধর্মের শ্রীকৃষ্ণ-রাধার লীলা কীর্তন, বৈষ্ণবপদাবলী, শ্যামা সংগীত ও অন্যান্য ভক্তিগীতি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে আজও সমুজ্জল মহিমায় উদ্ভাসিত।
পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে নজরুল ইসলাম হামদ-নাত আঙ্গিকের ইসলামী গান রচনা করেন এক সময়। এই প্রসঙ্গে আলোচনা করার আগে নজরুল ইসলামের লেখা হিন্দুধর্মের ভক্তি সংগীতগুলো কতটা জনপ্রিয় হয় তা তুলে ধরব কয়েকটা গানের প্রথম লাইন উদ্ধৃত করে।
হে গোবিন্দ রাখ চরণে, — সখী সে হরি কেমন বল —
নীল যমুনার জল — গোঠের রাখাল, বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন। — জাগো জাগো শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী —,
সখী গো,
আমি আমার সুখের গোধূলি বেলার —, আমি শুধাই ব্রজের ঘরে ঘরে
কৃষ্ণ কোথায় বল —, ফুটিল মানস
ফুটিল মানস মাধবী কুঞ্জে —, মম মধুর মিনতি
মম মধুর মিনতি শোন ঘনশ্যাম গিরিধারী —, ইত্যাদি রাধা কৃষ্ণ বিষয়ক নজরুল ইসলামের লেখা রসসিক্ত ভক্তিগীতি।
এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত জনপ্রিয় ভক্তিমূলক যেসব শ্যামা সংগীত রচনা করেছেন তারমধ্যে অধিকাংশই ভক্তদের মনে রেখাপাত করেছে। তার লেখা সেই সমস্ত শ্যামাসংগীত থেকে উদাহরণ দেব।
‘আমার কালো মেয়ে পালিয়ে বেড়ায় কে দেবে তায় ধ’রে
আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে —’
‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন —’
(আমার) মা আছে রে সকল নামে
(আমার) মা যে গোপাল-সুন্দরী
আমি মা ব’লে যত ডেকেছি
আমি সাধ ক’রে মোর গৌরী মেয়ের নাম রেখেছি কালি
আয় বিজয়া আয়রে জয়া —’
নজরুল ইসলাম এক সময় কালী মাতার ভক্তরূপে অসাধারণ সব শ্যামা সংগীত রচনা করেন। উদাহরণ তুলে ধরছি —
‘কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যা আলোর নাচন’।
তিনি কালী মাতাকে তাঁর আদরিনী মেয়ে হিসেবে বর্ণনা করেছেন তা দেখতে পাই এই গানটি থেকে —আদরিণী মোর কালো মেয়েরে কেমনে কোথায় রাখি’ —
তিনি অসংখ্য শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন। আমরা মৃণাল চক্রবর্তীর কন্ঠে তাঁর লেখা শ্যামসংগীতগুলো নিবেদিত কালী মাতার চরণে। তাঁর লেখা শ্যামসংগীতগুলোর শব্দ চয়ন অসাধারণ। ভক্তির আসে সিক্ত শ্যামাসংগীতগুলো মায়ের শ্রীচরণে নিবেদিত হতে হয় শ্রোতাদেরকে। নজরুল ইসলামের লেখা সুর দেয়া কৃষ্ণ বিষয়ক মোহাম্মদ রফির কন্ঠে গীত গানগুলো শ্রোতাদেরকে মুগ্ধ করে ভক্তি রসে জারিত করে নজরুল ইসলামের লেখা বাজাও। নজরুল ইসলামের লেখা — হে পার্থসারথি! বাজাও বাজাও পাঞ্চজন্য শঙ্খ
চিত্তের অবসাদ দূর কর কর দূর
ভয়-ভীত জনে কর হে নিঃশঙ্ক॥ —
গানটি চিরকালীন অনুষঙ্গে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে শ্রোতাদের কাছে।
আগেই বলা হয়েছে তিনি শুধু মাত্র কীর্তন আঙ্গিকের রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা, শ্যামাসংগীত রচনা করে খান্ত হননি। তিনি ভাওয়াইয়া গানের গীতিকার ও গায়ক আব্বাস উদ্দিনের অনুরোধে প্রথম যে ইসলামী গান লিখে কলকাতার গ্রামফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড করান। এই গানটি ছিল — ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ —। এই গানটি কতটা শ্রোতা প্রিয়তা লাভ করে তা বলে শেষ করার নয়। তারপর তিনি যেসব ইসলামী গান, হামদ — নাত গজল রচনা করেন, তার সবই ছিল ভক্তির রসে সিক্ত।
খোদা এই গরীবের শোন শোন মোনাজাত। — ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায় —
আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয় —
**
‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে।
মধু পূর্ণিমার সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে।।— ‘
নজরুল ইসলাম শুধুমাত্র কয়েকটি ইসলামী গান, গজল ও হামদ — নাত রচনা করেননি। তিনি অসংখ্য ইসলামী গান রচনা করে তার ভক্তি নিবেদন করেছেন, যা অসাধারণ।
পরিশেষে আমরা নির্দ্ধিধায় বলতে পারি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভক্তিমূলক কীর্তন , কৃষ্ণ বিষয়ক ভজন ও গান এবং ভক্তিমূলক ইসলামী গান, গজল ও হামদ,- নাত করেছেন তা উজ্জ্বল মহিমায় দীপ্যমান। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই।
মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।