সময়ক্রম মেনে এইভাবে লেখা যায় —
১. কবি নজরুল ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
২. ডা. ডি এল সরকার কবির চিকিৎসা করছিলেন। তিনি পারিবারিক কারণে ১৯ জুলাই মধুপুর যাবেন ও সেখানে অন্তত এক মাস থাকবেন।
৩. কবি ভাবলেন, যদি ১৯ জুলাই ডাক্তারের সঙ্গে মধুপুরে যাওয়া যায় তবে হাওয়াবদল হবে, সেইসঙ্গে ডাক্তারের সান্নিধ্যে চিকিৎসা চালানো যাবে।
৪. ডা. সরকারের পরিবারের দুটি বাড়ি ছিলো মধুপুরে, সুতরাং সেখানে কবির পরিবারকে স্থান দেওয়া যাবে। তবে বিনা ভাড়ায় বাড়ি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর বেশি কিছু তিনি করতে পারবেন না।
৫. ঘটনাচক্রে সেই ১৯ জুলাই তারিখে শ্যামাপ্রসাদ নজরুলকে দেখতে এলেন। শ্যামাপ্রসাদকে সামনে পেয়ে কবি নজরুল কম্পিত হস্তে কাগজে লিখে জানালেন, “আমার immediate অন্ততঃ এক হাজার টাকার দরকার।“
৬. সুভদ্র শ্যামাপ্রসাদ ঈষৎ বিব্রত হলেও, ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দিলেন সন্ধ্যার মধ্যেই।
৭. সেইদিন ১৯ জুলাই ১৯৪২ কবি সপরিবারে রাত্রি ৯টার ট্রেনে মধুপুর যাত্রা করলেন ও পরদিন ভোরবেলা পৌঁছে ডা. সরকারের বাড়িতে উঠলেন।
নজরুল-গুণগ্রাহী সুফী জুলফিকার হায়দার (যিনি ছিলেন নজরুল ও শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র) তাঁর বইয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সম্পর্কে লিখেছেন, —
“কবির কাছে টাকার প্রয়োজনের কথা শুনে তিনি যে পাঁচশো টাকা অবেলায় ধার করে যোগাড় করে দিলেন, নজরুলের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি দেখাবার এই যে মহান নজীর, তা আমি কার সাথে তুলনা করবো? কবির অসুখের দিন থেকে আমি অনেকের সঙ্গেই দেখা করেছি, সাহায্য করা দূরে থাকুক, তাঁর মতো এতখানি আগ্রহের সাথে ও বিচলিত হৃদয়ে আর কে-ই বা নজরুলের অসুখের কথা শুনেছে?”
বলা ভালো, কবি নজরুল অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বন্ধুর দল, তাঁর প্রকাশকেরা, তাঁর গানের জগতের সঙ্গীরা, গ্রামোফোন কোম্পানির লোকেরা সবাই নিস্পৃহ বসে রইলেন, তাঁদের প্রিয় ‘কাজীদা’কে একটিবার তাকিয়ে দেখার প্রয়োজনও মনে করলেন না।
বলা বাহুল্য, কবি নজরুল মধুপুর থেকে আরও খারাপ অবস্থায় ফিরে এলেন। ক্রমে তিনি বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হতে চলেছেন। তাঁর সাহায্যের জন্য জুলফিকার হায়দার বাংলার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের কাছে ক্রমাগত আবেদন করতে থাকলেন।
শ্যামাপ্রসাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় ‘নজরুল সাহায্য কমিটি’ গঠন করা হয়। সেই কমিটির সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, সম্পাদক সজনীকান্ত দাস ও জুলফিকার হায়দার, সদস্যেরা হলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, তুষারকান্তি ঘোষ, চপলাকান্ত ভট্টাচার্য, হুমায়ুন কবীর, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, গোপাল হালদার প্রমুখ। সেকালের রথী-মহারথী!
সেই কমিটি চাঁদা তুলে প্রতি মাসে কবির পরিবারকে ২০০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু ৫ মাস টাকা দেওয়ার পরেই অর্থসাহায্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। — কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর অমানবিক কাহিনী, যা আজকে আমার আলোচ্য নয়। যাঁরা আগ্রহী, তাঁরা সুফী জুলফিকার হায়দারের “নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়” পড়ে দেখতে পারেন।
***
নজরুলের মধুপুর গমন ও তাঁকে শ্যামাপ্রসাদের ৫০০ টাকা অর্থসাহায্যকে কেন্দ্র করে এতদিন পরে কতো কল্পিত কাহিনী পল্লবিত হয়ে পত্রপত্রিকায় ও ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।
এবছর গত ২২ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকায় মোহিত রায় লিখেছেন, “১৯৪২ সাল, ঋণগ্রস্ত নজরুল ইসলাম, অসুস্থ নজরুল ইসলাম, তাঁর অসুস্থ স্ত্রী শয্যাশায়ী। সাহায্যের হাত বাড়ালেন না কেউ, এগিয়ে এলেন হিন্দু মহাসভার কার্যনির্বাহী সভাপতি। নজরুলকে শুশ্রূষার জন্য নিয়ে তুললেন তাঁর মধুপুরের (ঝাড়খণ্ড) বাড়িতে, ঋণমুক্ত করলেন। নজরুল তাঁকে মধুপুর থেকে চিঠি লিখছেন, “শ্রীচরণেষু, আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন। মধুপুরে এসে অনেক relief & relaxation অনুভব করছি। মাথার যন্ত্রণা অনেকটা কমেছে। জিহ্বার জড়ত্ব সামান্য কমেছে। আপনি এত সত্বর আমার ব্যবস্থা না করলে হয়ত কবি মধুসূদনের মত হাসপাতালে আমার মৃত্যু হত। আমার স্ত্রী আজ পাঁচ বৎসর পঙ্গু হয়ে শয্যাগত হয়ে পড়ে আছে। তাকে অনেক কষ্টে এখানে এনেছি।… আপনার মহত্ত্ব, আপনার আমার উপর ভালবাসা, আপনার নির্ভীকতা শৌর্য সাহস আমার অণুপরমাণুতে অন্তরে, দেহতে মিশে রইল। আমার আনন্দিত প্রণাম, পদ্ম শ্রীচরণে গ্রহণ করুন। প্রণত নজরুল ইসলাম”।“
কিন্তু ওই চিঠিতেই কবি নজরুল লিখেছিলেন, “পাঁচশো টাকা পেয়েছি। আরও পাঁচশ’টাকা অনুগ্রহ করে যত শীঘ্র পারেন, পাঠিয়ে দেবেন বা যখন মধুপুরে আসবেন, নিয়ে আসবেন।’’ — সেই লাইনগুলো বাদ দিয়েছেন মোহিত রায়। কারণ, শ্যামাপ্রসাদ আরও ৫০০ টাকা পাঠাননি, চিঠির উত্তরও দেননি।
মোহিত রায় আরও কারচুপি করেছেন। মধুপুর থেকে নজরুলের বাঁধভাঙা আবেগে কৃতজ্ঞচিত্তে লেখা চিঠির মাথায় প্রেরকের ঠিকানায় লেখা আছে, ‘বাহান্ন বিঘা মধুপুর’।
কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পিতৃদেবের বাড়ি ‘গঙ্গাপ্রসাদ হাউস’ তো ছিলো শেখপুরায়। তাহলে শ্যামাপ্রসাদের মধুপুরের বাড়িতে কীভাবে নজরুল রইলেন?
কিছুদিন আগে, আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি চিঠিতে তথাগত রায় লিখেছেন, ১৯৪২ সালে কাজী নজরুল ইসলাম প্রচণ্ড আর্থিক ও শারীরিক দুর্দশায় পড়লে কবির ধার শোধ করে এবং মধুপুরে নিজেদের বাড়িতে রেখে তাঁর শুশ্রূষার ব্যবস্থা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
আসলে নজরুল ছিলেন ডা. ডি এল সরকারের বাড়িতে, কিন্তু তথাগত বা মোহিত রায়েরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নজরুলের অবস্থান শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিদের পৈতৃক বাড়িতে দেখাতে চাইছেন।
‘স্বস্তিক’ পত্রিকায় (৪.৭.২০১৬) লেখা হয়েছে, “শ্যামাপ্রসাদ কবির দৈন্যদশা সহ্য করতে না পেরে কবিকে সাহায্য করার জন্য তাঁকে আর্থিক সাহায্য ছাড়াও স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য মধুপুরে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।”
bengali oneindia তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালে লিখেছে — “নজরুলের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। মধুপুরে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অসুস্থ নজরুলের চিকিৎসা করিয়েছিলেন ড. মুখার্জি। সেখানেই প্রায় ছ-মাস স্বস্ত্রীক ছিলেন নজরুল।এখানেই শেষ নয়। এরপরও অবশ্য বহুবার শ্যামাপ্রসাদের প্রকাশ্য প্রশংসা করেছেন কবি নজরুল। এরপরও ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সাম্প্রদায়িক বলা চলে কিনা সে বিতর্ক এখনও জীবিত রয়েছে৷”
সংবাদপ্রভাকর টাইমস নামে একটি অনলাইন পোর্টাল ৭ জুলাই ২০২০ তারিখে লিখছে — নবদ্বীপে এক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে হাজির ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক শিবপ্রকাশ। ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ ড. স্বপন দাশগুপ্ত, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর ড. অনির্বাণ গাঙ্গুলি, রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকার-সহ অনেকে। সেই নেতার ভাষণ উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লিখছে —
“শুধু অর্থ সাহায্যই নয়, মধুপুরে ড. মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়িতে নজরুলের পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করেন শ্যামাপ্রসাদ৷ এরপর মধুপুরের স্বাস্থ্যকর আবহাওয়াতে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত বসবাস করেছেন নজরুল।
“শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি — তিনি বলেছিলেন — ‘নজরুলদা, তোমার ঋণের টাকা আমি শোধ করব।’ তিনি নিজের টাকা দিয়ে নজরুল ইসলামের ঋণ শোধ করেছিলেন। শুধু এটুকুই ছিল না, কাজী নজরুল ইসলাম যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সেইসময় মধুপুরের ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির যে বাসভবন ছিলেন সেখানে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন কবি।”
উইকিপিডিয়া লিখছে, “কাজী নজরুল ইসলাম আর্থিক অনটনের কারণে ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে ডঃ মুখার্জীর শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ডঃ মুখার্জী’র পৈতৃক বাড়ি মধুপুরে সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা করেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য।“
এই ভুল তথ্য উইকিপিডিয়াকে কে দিলো? ফুটনোটে রেফারেন্স দেওয়া আছে — (“শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জীবনী : স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী — স্বামী বেদানন্দ।) এইভাবে একটি ভুল তথ্য দিক-দিগন্তে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে।
মধুপুর-গিরিডি-দেওঘর নিয়ে সবচেয়ে অথেন্টিক বই “ছুটির নিমন্ত্রণে : পশ্চিম”, লিখেছেন অনাথবন্ধু চট্টোপাধ্যায়। সেখানে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, “নজরুলের ওই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রথম প্রকাশ কি তাহলে এই মধুপুরে, কলকাতায় নয়। ….বলি, ঘটনাধারা, দিনক্ষণের হিসেবমতো তো তাই হয়।”
এটা সম্পূর্ণ তথ্যপ্রমাদ।
কারণ, নজরুল কলকাতার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলেই তিনি অসুস্থ অবস্থায় মধুপুরে এসেছিলেন। কলকাতায় অসুস্থতা দেখা না গেলে, কবি কেন খামাখা মধুপুরে আসবেন? সেটা অনাথবন্ধুবাবু ভালোভাবেই জানেন, কেন না, তিনিই পরক্ষণেই লিখেছেন, “নজরুলকে সুস্থ করে তোলার জন্য শ্যামাপ্রসাদের ঐকান্তিক আগ্রহ, তাঁকে অর্থসাহায্য, চেঞ্জে মধুপুরে পাঠানো এই সবই বোধহয় ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।” — তবে এখানেও তথ্যের ভ্রান্তি। কারণ, মধুপুরের যাওয়ার ব্যাপারে শ্যামাপ্রসাদ কোনও উদ্যোগ নেননি, আগ্রহও দেখাননি, তিনি নজরুলকে মধুপুরে পাঠাননি — শুধু ওই ৫০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করা ছাড়া।
শ্যামাপ্রসাদের অর্থসাহায্য ও সেইকারণে কাজী নজরুলের উচ্ছ্বসিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অতি সত্য কাহিনী। এইটুকু অংশ জলজ্যান্ত সত্য। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের কাছে নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধুরা গেছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা ব’লে নয়। ‘প্রধানমন্ত্রী’ ফজলুল হকের রেফারেন্সে অবিভক্ত বাংলার গুরুত্বপূর্ণ অর্থমন্ত্রী হিসেবেই। এবং সহৃদয় শ্যামাপ্রসাদ নিজের পকেট থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে চরম উপকার করেছিলেন।
কিন্তু মধুপুরে চেঞ্জে পাঠানোর জন্য কোনও পরিকল্পনা, প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ নিতে হয়নি শ্যামাপ্রসাদকে, নিজেদের ‘গঙ্গাপ্রসাদ হাউসে’ থাকার ব্যবস্থা করাটা তো অনেক দূর।
ছবি : স্বামী নজরুল ইসলামের সঙ্গে অসুস্থ প্রমীলা।
সমাপ্ত