আধ্যাত্মিক জগতে অতিপবিত্র তিথি এই গুরু পূর্ণিমা। অন্ধকারকে নাশ করে যিনি জ্ঞানালোকের সন্ধান দেন তিনিই গুরু। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে তার অবস্থান। সনাতন ধর্মের সব সম্প্রদায় শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে আজকের দিনে শ্রীগুরুকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। গুরু পূর্ণিমা পালনের উদ্দেশ্যে মনের শান্তি বা আনন্দ লাভ। “অশান্তস্য কুতো সুখম” অর্থাৎ অশান্ত মন কি করে সুখ লাভ করতে পারে? সুখ পেতে হলে যাই শান্তভাব। আসলে মন সর্বদা কোন না কোন বস্তুর আকাঙ্ক্ষা করে —সেটি ভালো হোক বা মন্দ। সেটি না পাওয়া পর্যন্ত সে অশান্ত। দীর্ঘ সময় ধরে আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকলে মনের মধ্যে রোগ, রাগ দুইয়ের সৃষ্টি হয়।তাই মনের স্থিরতা প্রয়োজন। এই মনকেই শান্ত করার পথই দেখান গুরু।
গুরু শিষ্যকে মন্ত্রদীক্ষা দেন। মন্ত্রদীক্ষা হলো এমন এক আধ্যাত্মিক সংকেত সূত্র যা অজ্ঞানের বন্ধন থেকে, জন্ম মৃত্যুর পরম্পরা থেকে মুক্তিলাভ করার একটি পথ। শিষ্য বিপথে গেলেও তাকে আবার সৎপথে ফিরিয়ে আনার জন্য গুরু লৌকিক অলৌকিক নানা পথ অবলম্বন করেন। গুরু শংকরাচার্য থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীশ্রীমা সারদা, রামদাস কাঠিয়াবাবা, বামাক্ষ্যাপা, বালানন্দ ব্রহ্মচারী, স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী, রাম ঠাকুর, বরদাচরণ মজুমদার প্রমুখের শিষ্যকে কৃপাদানের নানান কথা শোনা যায়।আজ বরদাচরণ মজুমদারের প্রাণপ্রতীম শিষ্য “কাজী ভায়া” — কাজী নজরুল ইসলামের অশান্ত শোকাতুর মন কিভাবে শান্ত করেছিলেন, সেই গল্পই বলবো।
১৯৩০ সালের আগস্ট মাস থেকে অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল যখন গোটা দেশ, সেই ঝড় উঠল নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনেও। ছোট ছেলে বুলবুলকে হারালেন মাত্র চার বছর বয়সে। নজরুল তাঁর সাধ্যমতো চিকিৎসার চেষ্টা করেছিলেন বুলবুলের বসন্ত রোগ সারাতে, কিন্তু অসহায় পিতাকে হার মানতে হয়।
গভীর শোক যখন গ্রাস করছে নজরুলকে এমন সময় নিমতিতা গ্রামের এক বিয়ের আসরে পরিচয় হলো লালগোলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরদাচরণ মজুমদারের সঙ্গে।বরদাচরণ মজুমদারের মাতা মাতঙ্গিনীদেবী, পিতা দক্ষিণাচরণ জঙ্গিপুর মুর্শিদাবাদের মানুষ। ঠাকুরদাদা রামচরণ ছিলো দেব দ্বিজে ভক্তি। এক যোগীবর দক্ষিণাচরণকে বলেছিলেন যে , তাঁর বংশে জন্ম নেবে এক মহাযোগী। বরদাচরণের যখন আট বছর বয়স, তখন গ্রামের বটতলাতে এসে উপস্থিত হলেন জটাধারী সন্ন্যাসী। তিনি দেখতে পেলেন এক কিশোর বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল, তাকে ডেকে কানে মন্ত্র দিয়ে সন্ন্যাসী ফিরে গেলেন। শুরু হলো কিশোরের হৃদয়ে চৈতন্যের আলোড়িত দশা।
আট বছর বয়সে উপনয়নের সময় অলৌকিকভাবে বরদাচরণ পেলেন শিবদীক্ষা।স্বপ্ন সমাহিত অবস্থায় দেখলেন, উর্ধ্বাকাশ থেকে এক বিশাল জ্যোতি জ্যোতির্লিঙ্গ নেমে এসে রূপ নিলো ভগবান শঙ্করের। তিনি বালক বরদাচরণকে বুকে জড়িয়ে কানে ফের মন্ত্র দিয়ে জ্যোতিরূপে বিলীন হয়ে গেলেন।
বরদাচরণ মুর্শিদাবাদের নিমতিতা গ্রামের গৌড়সুন্দর দ্বারিকানাথ উচ্চ ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে টানা পাঁচ বছর ছিলেন। পরে তিনি লালগোলা হাইস্কুলে যান শিক্ষকতা করতে।এই লালগোলাই হয়ে ওঠে বরদাচরণের ঈশ্বর সাধনার তীর্থক্ষেত্র। প্রচার নয়, খ্যাতি নয়, অর্থ নয় যোগশক্তিকে অর্ঘ্যরূপে ব্যবহার করে তিনি আত্মনিবেদিত হলেন আর্ত মানবের সেবায়।
বরদাচরণ এসেছিলেন কন্যা পক্ষের আমন্ত্রণ পেয়ে আর নজরুল এসেছিলেন বরযাত্রী হিসেবে। নজরুল বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন সেই সময় , বরদাচরণও গৃহযোগী হিসেবে যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন। তার সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী যোগাযোগ ছিল, আসতেন ঋষি অরবিন্দ, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এমনকি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কলকাতায় এলে দেখা করতেন তাঁর সাথে। নেতাজির যোগ নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল।
বরদাচরণের যোগবিভূতির খবর পেয়ে ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা নজরুলও ছুটে গেলেন লালগোলায়। তিনি যে কিছুতেই সামলাতে পারছেন না নিজেকে। লালগোলায় গিয়ে গুরুকে শোনালেন নিজের লেখা মাতৃসংগীত –শ্মশানে জাগিছে শ্যামা
অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে
জননী শান্তিময়ী বসিয়া আছে ঐ
চিতার আগুণ ঢেকে স্নেহ–আঁচলে।
মনের শান্তির জন্য বরদাচরণের কাছে নিলেন যোগদীক্ষা। বরদাচরণে লেখা ‘পথহারার পথ ওদ্বাদশ বাণী ’ বইটির ভূমিকায় নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন– যাহা কিছু শক্তির প্রকাশ হয়েছে কাব্যে, সংগীতে ও আধ্যাত্ম্যজীবনে তার মূল ছিলেন তিনি।
বরদাচরণকে ব্যথিত পিতা একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, আত্মা কি স্থূলদেহে কখনো ফিরে আসতে পারে? গুরুদেব বললেন অবশ্যই পারে। তাঁর কথাতে ভরসা পেয়ে নজরুল বললেন বুলবুলকে দেখার ইচ্ছা কিছুতেই দমন করতে পারছে না যোগীবর, বুলবুলকে একবার দেখতে পেলে ব্যাথাতুর পিতার আকুল হৃদয় কিছুটা শান্ত হতো।
বরদাচরণ জিজ্ঞেস করলেন,‘ছেলেকে দেখার খুব ইচ্ছা?’নজরুল হতবাক। যোগীবর শিষ্যকে এক বিস্ময়কর প্রতিশ্রুতি দিলেন, ‘দেখতে তুমি পাবে কিন্তু কোন কথা তার সাথে বলো না।’
এক মাসও পেরোলোনা একদিন নজরুল ঘরে বসে চোখ বন্ধ করে একমনে গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত বীজ মন্ত্র জপ করছেন হঠাৎ একটি পায়ের শব্দ নিরবতা ভেঙে দিল সারা ঘরের। ধ্যান ভাঙল নজরুলের।আসন থেকে বসে দেখলেন, আদরের বুলবুল ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে আসছে আলমারির দিকে। ছোট্ট আলমারিটা খুলল, সে নিজের খেলনা ও জামাকাপড় নেড়েচেড়ে আলমারিটা বন্ধ করে দিল। তার দিকে চেয়ে চেনা হাসিটা দিল। চমকে উঠলেন নজরুল।চোখের পলক পড়তেই দেখলেন ঘরে আর বুলবুল নেই।
মহানন্দে পরমবিস্ময়ে নজরুল ছুটে গেলেন লালগোলায়। যোগীরাজ বরদাচরণের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন, অঝোরে কাঁদছেন আর কান্না ভেজা ব্যাকুল স্বরে বলে চলেছেন, আপনার কৃপায় ছেলেকে দেখতে পেয়েছি গুরুদেব। মন এখন শান্ত হয়েছে।
১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লেন যোগীবর। খবর পেয়ে ছুটে এলেন যোগিবরের প্রাণপ্রতীম “কাজী ভায়া”- কাজী নজরুল ইসলাম। দুচোখ ভরে দেখলেন যোগীবর প্রিয় শিষ্যকে, নজরুলের দুচোখ ভরে বেয়ে চলেছে অশ্রুধারা। কান্নাভেজা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, তবে কি আমাদের সত্যি ছেড়ে চলে যাবেন?
সস্নেহে উত্তর দিলেন যোগীরাজ, বললেন–শিক্ষা দিতে তো কার্পণ্য করিনি, তবে দুর্বলতা কেন? আসন্ন বেলায় যোগীবর শুনতে চাইলে সেই প্রিয় গানখানি– ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা’।১৩৪৭ সালের ১লা অগ্রহায়ণ অনন্তের পথে যাত্রা করলেন যোগীরাজ বরদাচরণ ।
গুরুদেব বরদাচরণের কাছে দীক্ষা পেয়ে নজরুলের জীবনে এসেছিলো আধ্যাত্বিক পরিবর্তন। একসময় তিনি থাকতেন উত্তর কলকাতায় হরিঘোষ স্ট্রিটের একটি দোতলা বাড়িতে। সেই বাড়ির একতলায় তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ভাস্কর গোষ্ঠ পালকে দিয়ে একটি সুন্দর কালীর মূর্তি গড়ান। কখনো সারারাত ধরে রাশি রাশি জবা ফুল দিয়ে তিনি মায়ের পূজা করতেন কিংবা ১০৮ রুদ্রাক্ষমালা জপতে জপতে সমাধিস্থ হয়ে যেতেন। আহার করতেন একবেলা।এই মাতৃসাধন পর্বে নজরুল অজস্র ভক্তিগীতি লেখেন। শ্যামা সংগীত, বৈষ্ণবীয় ভাবের সঙ্গীত, বাউল, কীর্তন, স্বদেশ প্রেম.…. বহু বিষয়ের উপর গান রচনা করেন নজরুল। একই ব্রহ্মশক্তির বিভিন্ন রূপের অনবদ্য ব্যাখ্যা করে নজরুল লিখলেন ‘দেবী স্তুতি’,উচ্চস্তরের মাতৃসাধক ছাড়া যা অসম্ভব।
‘পথহারার পথ ও দ্বাদশ বাণী’ বইয়ে নজরুল লিখেছিলেন, ‘..ধর্মরাজ আমার পুত্রকে শেষবার দেখাইয়া হাসিয়া চলিয়া গেলেন’।
গভীর বেদনার সময় নজরুলের এই উপলব্ধি যুক্তি তর্কের উর্ধ্বে। ধর্মীয় বিদ্বেষের যুগে নজরুলের এই বেড়াবিহীন ঈশ্বর ভাবনা উদারতার কথা বলে। বরদাচরণ নজরুলের মনকে শান্ত করেছিল এক ভিন্ন উপায়ে।আসলে গুরু যে কোন ব্যক্তি বিশেষ নয় তিনি করুণাময় শক্তির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। যেমন পোলাও কালিয়া সকলের পেটে সহ্য হয় না তখন মা ছেলেকে মাছের ঝোল রেঁধে দেয়। তেমনি আধার বিশেষের সদগুরু তার শরণাগত ভক্তদের ভবরোগ বিকার বিনাশ করেন এবং সর্বদা দয়া করেন দীনজনে।
*গুরু গুরু গুরু কৃপা বল* গুরুপূর্ণিমায় আপনার অতুলনীয় প্রতিবেদনে গুরু শিষ্য
পরম্পরায় আজ উদ্ধৃত আজ মহাকবি নজরুল ও যোগীবর বরদাচরণ আলোকিত
করলেন পাঠক হৃদয়।ঈশ্বর ও ভক্তের মাঝে যোগসুত্র বা সেতু বন্ধন করে ভক্তকে
ঈশ্বরের নিকটতম করতে পারেন একমাত্র গুরুদেব।গুরুদেব দয়া করো দীনজনে”
স্বামীজীর বিখ্যাত গানে শ্রী রামকৃষ্ণ আদৃত প্রণমিত শ্রদ্ধায়।
বিখ্যাত গুণীজনেরা গুরুকৃপা লাভে আজও আলোচিত উদ্ধৃত উদাহরণে।আপনার
এই প্রতিবেদন গুরু ভক্তির উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে মনে মননে।
প্রথমে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
যোগীবর বরদাচরণের সান্নিধ্যে নজরুল পেয়েছিলেন শাশ্বত শান্তিপথের দিশা। একজন আদর্শ গুরুই শিষ্যকে সঠিক পথের দিশা দেখান।