“নিশি দিশি দাঁড়িয়ে আছো মাথায় লয়ে জট/ছোট ছেলেটি মনে কি পড়ে ওগো প্রাচীন বট?”
নিবাধই গ্রামের কেন্দ্রস্থলে এক বুড়ো বটগাছ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। আজ থেকে ১৭৫ বছর আগে ইংরেজি সন ১৮৪৮, ৭ই মে এই বটগাছের ছায়ায় এক বিরাট আটচালা ঘরে নিবাধই ইঙ্গ সংস্কৃত বিদ্যালয় বা Nibadhai Anglo Sanskrit School তৈরি হল। কচি কচি কণ্ঠের কলকাকলিতে ভরে উঠল জনবিরল নিবাধই গ্রামের এই বটতলা। তারপর ১৮৬৪ সালে বিধ্বংসী এক ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল বিদ্যালয়ের চালাঘর। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বাবু কালীকৃষ্ণ দত্ত অত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। ১৮৬৫ সালে তিনি রেল লাইন সংলগ্ন কিছুটা জমি কিনে বিদ্যালয়কে স্থানান্তরিত করলেন।আজ পর্যন্ত বিদ্যালয় সেইখানেই আছে। ১৮৮৫ সালে এর নাম হল নিবাধই হাই ইংলিশ স্কুল আর ১৯৫৩ সাল থেকে বিদ্যালয়ের নাম নিবাধই উচ্চ বিদ্যালয়।

১৮৪৮ সালে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বছরে লর্ড ড্যালহৌসি ভারতের গভর্নর জেনারেল, জন এলিয়ট ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন ভারতে এসে council of education এর সভাপতি নিযুক্ত হয়েছেন। কলকাতার বেথুন স্কুল তৈরি হবার ঠিক এক বছর আগে নিবাধই গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষানুরাগী বাবু কালীকৃষ্ণ দত্ত ও তাঁর সহযোগী কিছু বিদ্যোৎসাহী মানুষ বিদ্যাসাগর প্রণীত ত্রিভাষা সূত্র মেনে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম সাতকড়ি দত্ত ছিলেন কলকাতায় নরম্যাল স্কুলের শিক্ষক ও রবীন্দ্রনাথের গৃহ শিক্ষক। যিনি কিশোর কবিকে কাব্য চর্চায় উৎসাহিত করতেন। তিনিই কিশোর রবিকে “রবিকরে জ্বালাতন আছিল সবাই/বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই “— এই দুটি পংক্তির পাদপূরণ করতে দিয়েছিলেন যার পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “মীন গণ হীন হয়ে ছিল সরোবরে/এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে”।
ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় আজ থেকে ১৭৫ বছর আগেও জঙ্গলাকীর্ণ নিবাধই গ্রামে রীতিমত বিদ্যাচর্চা হত এবং বালক বিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি বালিকা বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইংরেজি ১৮৫২ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায় যে “অন্য স্থানে বালিকা বিদ্যালয় সংস্থাপন উপলক্ষে যেরূপ বিবাদ-বিসংবাদ উপস্থিত হইয়াছিল নিবাধই গ্রামে এ বিষয়ে সে রূপ কলহ ঘটনা হয় নাই।” কলকাতার উচ্চশিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কালীকৃষ্ণ দত্তের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রায়ই তাঁরা ঘোড়ার গাড়িতে বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসতেন। স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় একাধিক বার এই বিদ্যালয়ে পুরস্কার বিতরণী উৎসবে এসেছেন এবং ছাত্রদের বহু মূল্যবান পুরষ্কারে ভূষিত করেছেন, এই সংবাদ বিদ্যালয়ের প্রত্যেক বৎসরের বার্ষিক কার্যবিবরণীতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। সাতকড়ি দত্তের অনুরোধে মহর্ষি দেবন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিদ্যালয়কে আট টাকা করে বৃত্তি দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র রবীন্দ্রনাথ এই বৃত্তি চালু রেখেছিলেন। বিদ্যালয় সরকারি grant-in-aid এর আওতায় আসার আগে পর্যন্ত তা চালু ছিল। কথিত আছে বেথুন সাহেব যখন বারাসাত ও ছোট-জাগুলিয়ার বিদ্যালয়গুলি পরিদর্শনে আসেন তিনি নিবাধই বালক বালিকা বিদ্যালয় দু-টিও পরিদর্শন করে যান। লর্ড ডালহৌসি কে লেখা ১৮৫০ সালের একটি পত্রে বেথুন সাহেব নিবাধই বালক বালিকা বিদ্যালয় দুটি সম্পর্কে লিখেছেন। ঈশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাতেও এই বিদ্যালয়ের সপ্রশংস উল্লেখ আছে।

১৭৫ বছর এক সুদীর্ঘ যাত্রাপথ। এই পথের বাঁকে বাঁকে ছিল অপ্রত্যাশিত বাধাবিপত্তি। কখনো ভয়ংকর কোন ঝড়, কখনো মহামারীর করাল গ্রাস, কখনো বা অগ্নিকাণ্ড। এই সব কিছুকে আত্মস্থ করে বিদ্যালয়ের মেরুদন্ড আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা ছাড়াও শ্রমজীবী, দরিদ্র, সমাজের এক কোণে পড়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের সন্তানও মাথা উঁচু করে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করে। এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক স্বর্গীয় সুব্রত বসু যখন ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মার হাত থেকে ‘জাতীয় শিক্ষক’ পুরষ্কার লাভ করেন, তাঁর শংসাপত্রে স্বীকৃত হল “স্কুল ছুট” ছাত্র-ছাত্রীদের বার্ষিক হার এই বিদ্যালয়ে সর্বনিম্নে, ‘সকলের জন্য শিক্ষা’র যা নাকি প্রধানতম শর্ত। বর্তমান প্রধানশিক্ষক শ্রী অপূর্ব পালের সুদক্ষ পরিচালনায় বিদ্যালয় ১৭৫ তম বর্ষ পার করে উন্নততর আগামীর দিকে এগিয়ে চলেছে। বিদ্যালয়ে পাঠদান এর সঙ্গে সঙ্গে কিশোর মনের সুকুমার বৃত্তিগুলির যথাযথ চর্চা হয়। বিদ্যালয়ের পূর্বতন ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা হয় এবং শরীর শিক্ষাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৭৫ বৎসরে পদার্পণের উৎসবে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরী ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তারই সাক্ষ্য বহন করে।

বিদ্যালয়ের ১৭৫ বৎসরে (dodransbicentennial) পদার্পণের উৎসব ৭ই মে, ২০২২ ও ৮ই মে, ২০২২ মহাসমারোহে পালিত হয়েছে। উদ্বোধক ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের মন্ত্রী শ্রী রথীন ঘোষ। প্রধান অতিথি ছিলেন আমডাঙ্গার বিধায়ক জনাব রফিকুর রহমান সাহেব, সভাপতি ছিলেন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক শ্রী সুনির্মল বিশ্বাস। সারা বছরব্যাপী অনুষ্ঠান চলার পর ২০২৩ সালে পূর্তি উৎসব এর মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আশা ‘জীবন্ত ইতিহাস’ এই বিদ্যালয় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সার্থক সমন্বয়ে একদিন সাফল্যের শিখর স্পর্শ করবে।
লেখিকা নিবাধই উচ্চ বিদ্যালয়-এর শিক্ষিকা
দারুন দিদি লেখাটা।
ছবিতে দেখলাম আমিও এসে গেছি।????????????
I am really to be the part of this school and the progarmme as a teacher and student…????????????
খুব গর্ভবোধ হয় এই বিদ্যালয় এ পড়তে পেরে। খুব প্রিয় জায়গা এটা একটা ❤ mam অসাধারণ লেগেছে লেখাটা ❤