নাগেশং দারুকাবনে
পুণ্যভারতভূমির দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অষ্টম জ্যোতির্লিঙ্গ নাগেশ্বর। এই জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থানও বিতর্কিত। অষ্টম জ্যোতির্লিঙ্গের দাবিদার মন্দিরগুলি হলো উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার কাছে জাগেশ্বর, গুজরাতের দ্বারকা ও মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার আউন্ধা নাগনাথ। যদিও সব শিবলিঙ্গের মধ্যেই সেই একই দেবাদিদেবের অধিষ্ঠান, তবুও প্রকারভেদে অন্যরকম হয়।
গোদাবরী অববাহিকায় নাগনাথ উপত্যকায় আউন্ধ অতী প্রাচীন জনপদ। গোদাবরী এখান থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে গঙ্গাখের নামক স্থানে প্রবাহিত। পার্বনি জেলায় এই লুপ্ত জনপদ এখন ‘ঔণ্ডা’ নামে পরিচিত।

ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম নাগনাথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। দূর দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত পাহাড়-বনরাজি। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে যে ঘন নীল বনরাজি এখানে শোভা পেত সেই দারুকাবণ এখন আর নেই। ঘাতকের কুঠারাঘাতে সে কবেই নিশ্চিহ্ন হয়েছে। শুধু এখন পাহাড়ের কোলে একটি ছোট্ট সাইনবোর্ড দেখা যায়। তাতে লেখা আছে — পার্বনি বনবিভাগ হিঙ্গলি বনক্ষেত্র ‘ঔণ্ডা (নাগনাথ)।
১৩ শতকে যাদব রাজবংশ দ্বারা নির্মিত বর্তমান মন্দির। অনেকেই মনে করেন পুরনো মন্দিরটি মহাভারতের সময়কার। পঞ্চপান্ডব যখন হস্তিনাপুর থেকে চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গিয়েছিলেন, সেই সময় যুধিষ্ঠির এই মন্দির নির্মাণ করেন। মূল মন্দিরটি ৭,২০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে রয়েছে। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট ।
ধর্মীয় তাৎপর্য ছাড়াও মন্দিরটি হেমাদপন্থি স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। ঔরঙ্গজেবের আক্রমণের আগে মন্দিরটি সম্ভবত সাততলা ছিল। বর্তমানে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেন অহল্যাবাই হোলকার। মন্দিরটি হিন্দুধর্মের বারকরি সম্প্রদায়ের শ্রদ্ধেয় সন্ত নামদেব, বিসোবা খেচরা, জ্ঞানেশ্বরের জীবনের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে জড়িত।

জ্ঞানদেব গাথা গ্রন্থ অনুসারে — জ্ঞানেশ্বর এবং মুক্তাবাই নামদেবকে সঠিক গুরুর সন্ধানে আউন্ধা নাগনাথ মন্দিরে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। মন্দিরে নামদেব বিসোবাকে শিবের প্রতীক পবিত্র লিঙ্গের উপর পা রেখে বিশ্রামরত দেখতে পান। শিবকে অপমান করার জন্য নামদেব তাকে তিরস্কার করেন। বিসোবা নামদেবকে তার পা অন্য জায়গায় রাখতে বললেন, যেখানেই নামদেব বিসোবার পা রাখলেন সেখানে একটি লিঙ্গ ফুঁড়ে উঠল। এইভাবে বিসোবা তাঁর যোগশক্তির মাধ্যমে পুরো মন্দিরটিকে শিব-লিঙ্গ দিয়ে পূর্ণ করে দেন এবং নামদেবকে ঈশ্বরের সর্বব্যাপীতার শিক্ষা দেন।
শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরুনানক আউন্ধা নাগনাথ মন্দিরে এসেছিলেন এবং তিনি রামদেবের জন্মস্থান নরসিবামানিও পরিদর্শন করেছেন বলে জানা যায়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে শিখ ধর্মে নামদেবকে ভগৎ নামদেও হিসেবেও শ্রদ্ধা করা হয়। অন্যান্য গ্রন্থে বিসোবাকে নামদেবের গুরু হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।
৬০,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত মন্দিরে ১০৮টি মন্দির আছে যার মধ্যে ৬৮টি মন্দির ভগবান শিবের। মূল মন্দিরের চৌহদ্দির মধ্যেই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের বারোটি ছোট ছোট মন্দির আছে। ভক্তদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য চারিদিক লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। তারই সামনে চার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট কালো কোষ্ঠী পাথরের একটি দুর্লভ বিষ্ণু মূর্তি। বিষ্ণমূর্তির সামনেই একটি জলপূর্ণ কূপ। এই সেই অমরোদক পূর্ণা। মন্দিরের পান্ডারা বলেন, এই মন্দিরের নিচে শুধু জল আর জল–যা বাইরে থেকে দেখে কারো বোঝার উপায় নেই। বিষ্ণমূর্তির ডানদিকে ঘন অন্ধকারে ছোট্ট একটি সুরঙ্গ পথে সিঁড়ি বেয়ে নামতেই দর্শন হয় নাগেশ্বরের।

সুবিশাল মন্দির প্রাঙ্গনটির চারদিক প্রশস্ত দালান দিয়ে ঘেরা। সেই দালানের মধ্যেই পায়রার খোপের মতো ছোট ছোট আটটি ঘর। শোনা যায় এই ছোট্ট আটটি ঘরে আট জন সুন্দরী দেবদাসী থাকতেন। তাদের সুলোলিত কণ্ঠসঙ্গীত ও নৃত্যের সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠতো।তারা হলেন পদ্মা, রম্ভা, ভ্রমরী দিবাকরী, সাত্যকী, অনুভা, গার্গী ও চম্পা। মুঘল আক্রমণের সময় আওরঙ্গজেবের রোষবহ্নী যখন এই মন্দিরের উপর পড়ে, বহুমূল্য সম্পদের সঙ্গে এই দেবদাসীরাও লুন্ঠিত হন। তবে অনেকেই বলেন দেবদাসীরা আগে থেকেই সেখান থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন।
উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার জাগেশ্বর মন্দির :
জাগেশ্বর উত্তরাখণ্ডের আলমোড়া থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা একটি শৈব ঐতিহ্যের তীর্থস্থান। স্থানটি ভারতীয় আইনের অধীনে সুরক্ষিত, এবং ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ (ASI) দ্বারা পরিচালিত। মন্দির চত্বরে মধ্যে রয়েছে দণ্ডেশ্বর মন্দির, চণ্ডী-কা-মন্দির, জাগেশ্বর মন্দির, কুবের মন্দির, মৃত্যুঞ্জয় মন্দির, নন্দা দেবী বা নৌ দুর্গা, নব-গ্রহ মন্দির, একটি পিরামিডাল মন্দির এবং সূর্য মন্দির। এখানে শ্রাবণ মাসে জগেশ্বর বর্ষা উৎসব এবং বার্ষিক মহা শিবরাত্রি মেলা ধুমধামের সাথে পালন হয়।

পৌরাণিক কাহিনী বলে পাণ্ডবদের স্বর্গ যাত্রার সময় মোক্ষ প্রদানের জন্য স্বয়ং দেবাদিদেব তাদের দর্শন দেন। তিনি দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে ছিলেন। এরপর শিব কৈলাসে ধ্যানে মগ্ন হওয়ার জন্য ভীম ও অন্যান্য পান্ডবদের প্রস্থানের জন্য বলেন। কিন্তু পান্ডবরা তাদের রাজি হন না। তারা সকলেই দেবাদিদেবের সান্নিধ্য চান। উপায় না পেয়ে তিনি ভীমকে বিশ্রাম নিতে বলে অন্যান্য পাণ্ডবদের চোখে ধুলো দিয়ে কৈলাসে চলে যান। যাবার আগে তিনি তাঁর পদচিহ্ন সেখানে রেখে যান। প্রায় এক ফুট লম্বা তাঁর পদচিহ্ন এই মন্দিরে দেখা যায়।
গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত জ্যোতির্লিঙ্গ :
গুজরাতের জামনগরে অবস্থিত এই মন্দিরের শিবলিঙ্গকে বহুজন সমগ্র ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বলে বিবেচনা করেন। পৌরাণিক কাহিনী বলে দারুক নামে এক রাক্ষস এখানে রাজত্ব করতো। তার উৎপাত থেকে পরিত্রাণের জন্য সকলে মিলে মধুসূদনের শরণাপন্ন হন। দারুকের পত্নী ছিল দারুকী । তিনি দেবী পার্বতীর উপাসিকা। পার্বতী দারুকীর উপাসনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাদের রাজত্ব করা অরণ্যটির নাম দেন দারুকবন এবং আশীর্বাদ প্রদান করেন দারুকী যেখান দিয়ে যাবে দারুকবনও সেই স্থান দিয়ে গমন করবে। যুদ্ধের সময় দেবতারা দারুকের রাজ্য আক্রমণ করলে দারুক তার পত্নীর বরের সুপ্রয়োগ করেন ও দেবতাদের হারিয়ে দেন।

একবার দারুণ সুপ্রিয় নামে এক ব্যক্তি এবং তার সহচরদের অপহরণ করে বন্দী করেন দারুক। সুপ্রিয় ছিল মহাদেবের পরম ভক্ত। বন্দীগৃহে সুপ্রিয় এতটুকু বিচলিত না হয়ে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করে মহাদেবের ধ্যান করেন। মহাদেব সুপ্রিয়র প্রার্থনাতে সন্তুষ্ট হয় দারুককে বধ করার জন্য অস্ত্র প্রদান করেন। এরপর মহাদেবের বরদানে ধন্য সুপ্রিয় দারুকে বধ করতে সক্ষম হন এরপর সুপ্রিয় অনুরোধ করেন মহাদেবকে তাঁর জ্যোতি দ্বারা সেখানে স্থাপন হওয়ার। ভগবান ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ করেন। এই মন্দিরে মহাদেব নাগেশ্বর রূপে (সাপ)এবং দেবী পার্বতী নাগেশ্বরী রূপে বিরাজিতা আছেন বলে ভক্তরা বিশ্বাস করে।

তবে গুজরাতে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান নিয়ে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে, বিশেষ করে মহাকাব্যে বর্ণিত দারুকবনের সঠিক অবস্থান নিয়ে। দারুকাবন শব্দটি আসলে দারু-বণ অর্থাৎ দেবদারু কাছে পরিপূর্ণ বনানী থেকে এসেছে। কিন্তু দেবদারু গাছের আধিক্য গুজরাতে দেখা যায় না। দেবদারু গাছে পরিপূর্ণ বনে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থান বিবেচনা করতে গেলে হিমালয় পাদদেশে উত্তরাঞ্চলে মন্দিরটি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
সে যাই হোক ভক্তের ভগবান দেবাদিদেব সর্বত্র বিরাজমান। অনুমান করা হয় সারা ভারত জুড়ে মোট ৬৪ টি জ্যোতির্লিঙ্গ বর্তমান। তার মধ্যে বারটি পবিত্রতম। তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি ভরে পুজো করলেই সন্তুষ্ট হন। হর হর মহাদেব।।
*তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যতদুরে আমি ধাই*শিব মহাশিব কাল মহাকালের
ঐশ্বরিয়ক মহিমা কীর্তনে জাগরিত হলো কুণ্ডলীনি শক্তি।দর্শণে বৃদ্ধি পেলো জ্ঞান
পূণ্যার্জন করলাম পাঠ মহিমায়*ভালো থাকুন ভালো রাখুন পাঠককে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয় ????