মনে আছে পারুল কক্করের কথা? ২০২১ সালের মে মাসের কথা? করোনায় মৃতদের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে গঙ্গায়। সে দৃশ্য দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন পারুল কক্কর। গুজরাটের এই শান্তশিষ্ট গৃহবধূ কবিতা লিখতেন। তবে সে কবিতায় ভক্তি থাকত, থাকত না রাজনীতি। তার উপর তাঁর শ্বশুরাল বিজেপি সমর্থক। কিন্তু গঙ্গায় ভাসমান শব দেখে তিনি পরম বেদনায় লিখে ফেললেন ১৪ লাইনের কবিতা :
দাও সকলে জয়ধ্বনি ওড়াও রে তেরঙ্গা।
মহারাজের রামরাজত্বে শববাহিনী গঙ্গা।।
উপচে ওঠে শ্মশান-মশান ফুরিয়ে দিয়ে কাঠ।
শূন্য করে উঠোন মড়ায় ভরেছে সব ঘাট।।
নাচছে উদোম মৃত্যুদূতী বাজছে মরণডঙ্কা।
রাজা তোমার রামরাজত্বে শববাহিনী গঙ্গা।।
চিতার আগুন গিলছে হাজার ভাঙছে হাজার ঘর।
হাজার ভেলায় যায় ভেসে যায় হাজার লখিন্দর।।
পাড় থেকে তাও রাজা হাঁকে—নেই কোন আশঙ্কা।
রাজারে তোর রামরাজত্বে শববাহিনী গঙ্গা।।
রাজার সাজের ভড়ং কথার বাহার দেখে লোকে।
ভাবিস আজও তাক লেগেছে ঘোর লেগেছে চোখে।।
আজকে দেশে উঠছে আওয়াজ –রাজারে তুই নাঙ্গা।
ল্যাংটো রাজার রামরাজ্যে শববাহিনী গঙ্গা।। (অনুবাদ / মানস সরকার, শারদ্বত মান্না)

নেহা সিং রাঠোর
ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল এই কবিতা, নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছিল, কিন্তু তারপরে চুপ করিয়ে দেওয়া হল প্রতিবাদী কবিকে। রাজাকে নাঙ্গা বলছেন কবি, রাজার রাজত্বকে ‘রামরাজ্য’ বলে ব্যঙ্গ করছেন! এ জিনিস চলতে পারে না।
কিন্তু পারুল কক্করকে থামিয়ে দেওয়া গেলেও থামানো যাচ্ছে না নেহা সিং রাঠোরকে। গান লেখেন তিনি, নিজের গানে সুর দেন, উৎকট বাজনা ছাড়াই নিজে গান করেন। ভাযা ভোজপুরী। সে ভাষার যে সব গান ছিল, তাতে আধুনিক রাজনৈতিক বিষয় ছিল না। কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও নেহা ভোজপুরী গানে নিয়ে এসেছেন নতুনত্ব।
বিহারের কাইমুর জেলার জলদহন গ্রামে নেহার জন্ম ১৯৯৭ সালে। এক রাজপুত পরিবারে। বাবা রমেশ সিং একজন স্থপতি, মা গৃহবধূ। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষালাভ করেন রামগড় থেকে, কানপুর থেকে বিএসসি। ছোটবেলা থেকে সংগীতে অনুরাগ। ফেসবুকে সংগীত পোস্ট করার ইচ্ছে। কিন্তু একটা স্মার্ট ফোন নেই। ভাই-এর ফোন আছে। সে দেবে না। মা-বাবারও উৎসাহ নেই। মেয়ে হয়ে জন্মেছে, দু-দিন বাদে শ্বশুরাল চলে যাবে, তার আবার এসবে কি দরকার!
কিন্তু নেহার পাশে এসে দাঁড়ালেন হিমাংশু। হিমাংশু সিং রাঠোর। তিনি নিজেও একজন লেখক। এই হিমাংশুর সঙ্গে নেহার বিয়ে হয়। আপত্তি ছিল নেহার পরিবারের। কিন্তু নেহার দৃঢ়তায় সে আপত্তি টেকে নি।
বিহারের ভোটের সময় তাঁর গান লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিহার মে কা বা, অর্থাৎ বিহারে হচ্ছেটা কি? ভ্রষ্টাচার, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অবনতি তাঁর গানের বিষয়।

পারুল কক্কর
বিহারের মতো উত্তরপ্রদেশের ভোটের সময়ও তিনি গান লিখলেন : ইউ পি মে কা বা। ভোজপুরী সিনেমার সুপারস্টার, বিজেপি নেতা নেহার গানের জবাব দিয়ে লিখেছিলেন : ইউ পি মে সব বা। কিন্তু নেহার গানের অন্তর্নিহিত আর্তি সে গানে ছিল না। যোগীর বুলডোজার নীতি, বেআইনি বাড়ি উচ্ছেদের উদ্যোগ, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাই যোগীর পুলিশ তাঁকে নোটিশ দিয়েছে। পারুল কক্করের মতো ভয় পান নি নেহা। মধ্যপ্রদেশে প্রবেশ শুক্লা নামে এক ব্যক্তি দশমেশ রাওয়াত নামে এক আদিবাসীর উপর প্রস্রাব করে। নেহা তাই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন। তাই সুরজ খারে ভারতীয় দণ্ডবিধির ধারা ১৫৩ (এ) এর অধীনে ভোপালের হাবিবগঞ্জ থানায় নেহার বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের করেন।
আবার আসছে লোকসভার নির্বাচন। নেহা তাঁর পুরানো গানের লাইন কি তুলে ধরে বলবেন :
কাইসন বা তোহার চৌকিদারিয়া হো
নিজেকে দেশের চৌকিদার হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কেমন চলেছে তাঁর সময়কালের চৌকিদারি! দলের নয়, মানুষের মুখপাত্র হয়ে নেহা নরেন্দ্র মোদিকে কি প্রশ্ন করবেন :
ইণ্ডিয়ামে কা বা // ভারতে হচ্ছেটা কি?