প্রতিবেশীর মধ্যে থাকে ভালো মন্দ পাঁচমিশালী বৈচিত্র্য। দরকারে যেমন সাহায্য পাওয়া যায় তেমনি কূটকচালি আর প্রতিবাদ করার চরিত্রটি বিশেষভাবে প্রস্ফুটিত। এরা রাস্তায় জল জমার বিরুদ্ধে, কারো পাঁচিলের এদিক থেকে ওদিকে ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে, ছোট ছেলেটার বল দিয়ে কাঁচ ফাটানোর প্রতিবাদে, মিস্তিরির ড্রিলের আওয়াজের বিরুদ্ধে….এমনকি আপনার বাড়িতে আসা অতিথি যদি ভুল করে গাড়িটি একটু বেঁকে রেখেছেন, ব্যস আর রক্ষে নেই। টায়ার থেকে হওয়া বের করে দিয়েও এর প্রতিবাদ করতে পারে।
ছোটবেলায় ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে’ পড়ি বলে আমাদের এক প্রতিবেশী র খুব খারাপ লাগতো। এতটাই যে, চেঁচিয়ে পড়ার সুফল বুঝিয়ে পরিবারের মধ্যে যে কতবার গৃহযুদ্ধ লাগিয়েছে। আসলে এদের কাজই ছিল অন্যের ঘরে ঝগড়া লাগিয়ে কখনো সময় কাটানো, পরচর্চা করে অন্যকে দলে টানা, প্রয়োজনে তৈলমর্দন বা ‘কখনো ধাক্কা মারা, কখনও বেমাক্কা ধাক্কা খাওয়া।’ এই নিয়ে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কিছু অংশ আপনাদের বলি…
‘বাড়ির বাইরে পা রেখে চোখে পড়ল প্রতিবেশী দুর্গাবাবুর বড় ছেলে বিশাল এক ব্যাগ বাজার হাতে হেলেদুলে বাড়ি ফিরছে। প্রমাণ সাইজের একটি মাছের ন্যাজা অনুচ্চারিত অহংকারের মতো ব্যাগের পাশ দিয়ে বাতাসে সোচ্চার। ঠোঁটে একটা সিগারেট ঝুলছে। আমার দিকে আবার আড়চোখে তাকানো হলো। মন ওমনি তরফদার সেতারের মতো বেজে উঠলো, ওঃ খুব চলছে। কেন চলবে না বাছাধন, দু-নম্বরি পয়সা। বাড়িতে কালার টিভি। মারুতি বুক করেছে। বাড়ির বাইরে চড়াপরদার রং। জানলায় জানলায় বাহারি পরদা। টবে টবে ফুলগাছ। অমন এক পুরুষে বড়লোক অনেক দেখেছি। যেদিন ইনকাম ট্যাক্স কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে, সেদিন বেলুন তোমার চুপসে যাবে মানিক।
ঈর্ষা অতি বদ জিনিস। বাঙালি ব্যবসা করে দু-পয়সা করেছে, কেন তোমার চোখ টাটাচ্ছে! কেন টাটাবে না! দুশো গ্রাম মাছ, একটি কপি, গোটা-ছয় কড়াইশুঁটি কিনতে যাকে দশবার পাঁয়তাড়া কষতে হয়, কেন তার ঈর্ষা হবে না! এর নাম সাম্যবাদ। আমার হাজার টাকা রোজগার হলে, ওর নশো টাকা হওয়া উচিত। আমার পাঁচশো টাকা হলে ওর চারশো। আমি সুখে থাকব, সবাই দুঃখে। আমি দূর থেকে দেখবো আর চুকচুক করব। জগতের এই তো নিয়ম হওয়া উচিৎ!’
‘মেরে সামনেওয়ালি খিরকি মে এক চাঁদ কা টুকরা রেহেতা হ্যায়’— পড়োসান সিনেমার বিখ্যাত গান। হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্মিত সেরা কমেডি চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। সায়রা বাণুর গানের শিক্ষক ছিলেন মেহমুদ।

মনে পরে সন্ধ্যেবেলায় এক প্রতিবেশীর বাড়িতে সংগীতশিক্ষক আসতেন ঘরে গান শেখানোর জন্য। ‘তিনি যে ঘরে বসিয়া সংগীত শিক্ষাদান করতেন সেইমুখী আমাদের বারান্দায় যথাসমারোহে পাঁচফোড়নের ব্যঞ্জন প্রস্তুত করা হইত। ব্যঞ্জনের ঝাঁঝে ছাত্রী এবং শিক্ষকের নাসারন্ধ্রে যে আকুতি উপস্থিত হইতো তাহাতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হইলেও সংগীত ওষ্ঠাগত হইতো না। কিন্তু ইহাতেও কিছু হইলো না। একদিন আমাদের অসাবধানতার সুযোগে শীতের অপরাহ্নে তাহারা আমাদের লেপগুলি ভিজাইয়া দিল।’ (তারাপদ রায়) একেই বলে ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ’।
সাধারণত শহুরে ফ্ল্যাট গুলোয় কেউ কারোর খোঁজ নেয় না তবে কিছু সিআইডি প্রতিবেশী আছে যারা আপনার বাড়ির হাঁড়ির খবর নিতে তৎপর।
ফ্ল্যাট জীবনে থাকতে থাকতে আরো অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। চা, চিনি, নুন…. চাইতে চাইতে এমন অভ্যাস হয়ে যায় যে দরকারে আপনার একটি কিডনি চাইতেও হয়তো দ্বিধা বোধ করবেনা!! কিন্তু যদি আপনার বা আগত অতিথির জুতো যদি ভুল করে পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে চলে যায়, তবে জুতো খোলা নিয়ে যে কত ভাষণ শুনতে হবে!!!
গতবছর পুজোর সময় উত্তর শহরতলির একটি পুজোর থিম ছিলো করোনাসুর বধ। করোনার সঙ্গে অসুরের তুলনা!!! তর্ক গিয়ে পৌঁছল বাংলার তাত্ত্বিকস্তরে। মূলত অসুর একটি জনজাতির নাম যারা বহুবছর ধরেই প্রান্তিক ও বিপন্নপ্রায়। তাই কোন মারণ ভাইরাসের সঙ্গে এর তুলনা অসম্মানজনক। এই বিষয়ে আমাদের বিল্ডিংয়ের হোয়াটসআপ গ্রূপ প্রতিবাদ করেছে। দু-একজন প্রতিবেশী আবার গ্রূপে প্রতিবাদ জানিয়েছে ছবি, কবিতার মাধ্যমে। একটু খুঁটিয়ে বুঝলাম যে বেশির ভাগ প্রতিবেশীর প্রতিবাদ আসলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এতে মিলনক্ষেত্রের বার্তা লঙ্ঘিত হয়। করোনাকে বধ করতে পারেন একমাত্র দেবীই। সেই প্রথমবার বোধহয়, ম্যাসেজ প্রবেশ করার টুংটাং শব্দ-ভাষা মনে আনন্দে উদ্রেক করেছিলো।
পরিস্থিতি অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনের থেকে প্রতিবেশী বেশি উপকারে আসে। দরকার একটু সুসম্পর্কের, কিছু দায়িত্ব-কর্তব্যের। এইভাবেই বেঁচে থাকুক প্রতিবেশীর সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্ক।
‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’— কামিনী রায়।
Neighborhood relationship.. it’s effect and adverse effects,,
Absolutely true. Thanks ????