বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজভবনে বামফ্রন্ট সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। সেটা ছিল ২০০৬ সাল। দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও ২৩৫টি আসন জেতা বামফ্রন্ট সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো দেখা গিয়েছিল এক অন্য ছবি- এ রাজ্যের তো বটেই এমনকি ভিনরাজ্য থেকে আসা প্রথম সারির শিল্পপতিদের মুখ দেখা গেল বাম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে। সেদিনই বৈদ্যুতিন মাধ্যমে এবং পরেরদিন পত্রপত্রিকায় সেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ছবি থেকে প্রত্যক্ষভাবেই বোঝা গিয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সরকার রাজ্যবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা খুব স্পষ্টভাবেই জানাতে চেয়েছিল। ধুতি-পাঞ্জাবি এবং কোলাপুরি চপ্পলে আপাদমস্তক বাঙালি ভদ্রলোক রাজ্যে খুব দ্রুত শিল্পায়নের সরণি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এখানেই শেষ নয়, একদিন পরেও বাংলার প্রায় সবকটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মুজফর আহমেদ ভবনের সিপিএমের সদর দপ্তরে রাজ্যের প্রথম সারির শিল্পপতিদের। সেদিন উপস্থিত শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন।
প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে বামফ্রন্ট জমানায় শিল্পদপ্তরটির দায়ভার পেত ছোট শরিক দল ফরওয়ার্ড ব্লক। (হয়তো) সেদিন বামফ্রন্টের সর্ববৃহৎ দল মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এ রাজ্যে শিল্প বা শিল্পন্নয়নকে এতটাই অচ্ছেদ্দা বা তাৎপর্যহীন মনে করত যে ওই দপ্তরটিকে গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই কনিষ্ঠ শরিক দল ফরওয়ার্ড ব্লককে ছেড়ে দিয়েছিল। তা নাহলে ১৯৭৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বামফ্রন্ট সরকারের বড় শরিক সিপিএমের কাছে শিল্পদপ্তরটি কেন দুয়োরানীর সমান ছিল অন্যদিকে ভূমি ও ভূমিরাজস্ব দপ্তর ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর ছিল সুয়োরানীর মর্যাদায়। যদিও নয়ের দশকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উদার অর্থনীতিতে লাইসেন্স প্রথা উঠে গেলে বামেদের বড় শরিক সেই সিপিএম দলই সেই সুযোগ নেওয়ার কথা বলেছিল। উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও তাঁর সরকার কেন্দ্রীয় ওই নীতির পটভূমিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যের নতুন শিল্পনীতি ঘোষণা করেছিল এবং সেই শিল্পনীতি নিয়ে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও আলোচনা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে পুঁজি আকর্ষণের জন্য বামফ্রন্ট সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এমন প্রস্তাবও নেওয়া হয়েছিল। তখন থেকে জ্যোতি বসুর সরকার বেসরকারি বিনিয়োগের পথে এগোতে চেয়েছিল ঠিকই কিন্তু সরকারের অভিমুখ পুরোপুরি বদলাতে পারেনি। বামফ্রন্ট সরকার সেই অভিমুখ বদলায় ২০০৬ সালে এবং শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহনের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে। কৃষকের হাতে জমি দেওয়ার আন্দোলন থেকে বেসরকারি শিল্পের জন্য কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ নীতি ছিল একটি বড়সর লাফ।
বাংলার রাজনীতির বিশিষ্ট ভদ্রলোকটি আন্তরিকভাবেই এ রাজ্যের শিল্পায়নের চেষ্টা করে সেদিনের বিরোধী নেত্রী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ও তাঁর দলের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কেবল সমালোচনা নয়, প্রতিরোধ থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন যার অবসান ঘটে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম-এ পৌঁছে। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম বিতর্কে ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে বুদ্ধদেব সরকারের প্রায় সব দপ্তরই হাত গুটিয়ে নিয়েছিল। একমাত্র শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেনের ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টায় রাজ্যের শিল্প দপ্তর প্রায় পাঁচ ছ’হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে পানাগড়, অন্ডাল ও খড়্গপুরে একাধিক শিল্প পার্ক গড়েছিল। উল্লেখ্য, স্পেশাল ইকোনমিক জোন সম্পর্কে সিপিএমেরও অনীহা ছিল। শেষ পর্যন্ত নিরুপম সেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটিকে এসিজে বিষয়টি সম্পর্কে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। যদিও ২০০৩ সালে বিধানসভায় বামফ্রন্ট সরকার এসিজে আইন পাস করিয়েছিল কিন্তু শরিকদের চাপে বুদ্ধদেবের সরকার এসিজে নিয়ে বেশি দূর এগোতে পারেনি। অর্থাৎ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সমালোচনা কেবল বিরোধীরা নয়, দলেও হয়েছে। কারণ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দলের নানা নীতি, পুরনো মূল্যায়নের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছিলেন। তিনি বামপন্থীদের ধর্মঘট ডাকার সংস্কৃতির প্রবল বিরোধী ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ এবং সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে মূল্যায়নেও যে ভুল ছিল, সেটাও প্রকাশ্যে বলেছিলেন। তবে তাঁর ব্যক্তিগত সততা নিয়ে বিরোধীরাও কখনও কোনও প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
মহাকরণ থেকে বেরিয়ে তিনি প্রায় রোজই নন্দন যেতেন।কিন্তু সপ্তাহে অন্তত তিনদিন পারলে রোজ বণিকসভার অনুষ্ঠানে যাওয়াটা অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন। বারে বারে তাঁর বলা একটি কথা ‘ডু ইট নাও’ প্রায় শব্দবন্ধ হয়ে উঠেছিল যদিও বাম জমানায় বঙ্গের ‘স্থানূ’ শিল্পায়ন ও ‘গতিহীন’ কর্মসংস্কৃতিকে তিনি উপড়ে ফেলতে পারেনি। কিন্তু এ রাজ্যের শিল্প নামক জগদ্দল পাথরটিকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, রাজ্যে বাম রাজনীতির চাষবাস অনেককাল হল, এবার প্রয়োজন শিল্পের।শিল্প বা শিল্পোন্নয়ন যে অত্যন্ত জরুরি তা নিয়ে ওঁর যেমন কোনও সন্দেহ ছিল না, অন্য কেউই সে বিষোয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন না। কিন্তু যে পদ্ধতিতে জমি নিয়ে তার সরকার শিল্প গড়তে গিয়েছিল, তা নিয়ে প্রবল সমালোচনা ছিল। নিজেও বুঝেছিলেন, কৃষককে জমির বদলে শুধুই মূল্য ধরে দিলে হবে না। তার ভবিষ্যৎ আয়ও সুনিশ্চিত করতে হবে।
যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এদেশে কম্পিউটার চালুর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন সেই তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে রাজ্যে উচ্চমানের মেধার প্রাচুর্যকে হাতিয়ার করে লগ্নি টানতে রাজ্যে প্রথম পৃথক তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর তৈরি করেন। কলকাতায় এখন যে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলির দপ্তর রয়েছে, আইবিএম থেকে শুরু করে টিসিএস, কগনিজ্যান্ট থেকে উইপ্রো এগুলিকে কলকাতায় আনার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ তাঁরই। যে কারণে উইপ্রো-র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আজিম প্রেমজি তাঁকে ‘ভারতের সেরা মুখ্যমন্ত্রী’-র সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর সময় থেকেই দেশের লগ্নি আকর্ষণ ও কর্মসংস্থানের নিরিখে ‘তথ্যপ্রযুক্তি রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত বেঙ্গালুরুকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তারই সুফল সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। তবে সেদিন তাঁর দলের অনেকেরই বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উদ্যোগে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষে নাক সিটকে ছিলেন, তারা সত্যি সত্যিই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। সেদিক থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেবলমাত্র মায়কোভস্কি কিংবা মার্কেজেই আটকে থাকেননি, শিল্পোন্নয়নের স্বপ্নেও বিভোর ছিলেন।