| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সাঁতার এবং কিছু প্রাসঙ্গিক ও আনুষঙ্গিক কথা : উৎপল আইচ

Reporter
উৎপল আইচ / ৫২৯ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৩ মে, ২০২৩

প্রস্তাবনা

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কি সাঁতার জানতেন? তিনি কি কখনো সাঁতার কাটা শিখেছিলেন? এই ছোট লেখাটার উদ্দেশ্য হচ্ছে সুভাষচন্দ্র বসু বা নেতাজী সম্বন্ধে যেসব বই বা প্রবন্ধ পড়েছি এবং সেগুলোর মধ্যে নদী-জলাশয়ে তাঁর স্নান করা বা সাঁতার কাটা সম্পর্কে যেসব তথ্য পেয়েছি এবং তারমধ্যে যেগুলো মনে আছে, সেগুলো সেইসব বই থেকে আবার খুঁজে বের করে এক জায়গায় লিখে রাখা। আরও দু’একটা পড়েছি বলে মনে পড়ে কিন্তু কোথায় তা খুঁজে পেলাম না। যেহেতু আমার পড়াশুনা সীমিত এবং কয়েকটা পুরানো বই আমার কাছে নেই, তাই পাঠকদের কাছে অনুরোধ আপনারা যদি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্য কোন সাঁতারের বিবরণ কোথাও পড়ে থাকেন, তবে তা তথ্যসূচী সহ (অর্থাৎ প্রবন্ধ এবং/বা বইয়ের নাম, পৃষ্ঠা সংখ্যা জানিয়ে) কমেন্টে লিখে জানাবেন।

দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে বিপত্তি

আমি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রথম নদীতে স্নান করার বিবরণ পড়ি অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘সমকালীন ভারতে সুভাষচন্দ্র, প্রথম খণ্ড’ বইতে [মণ্ডল বুক হাউস, জানুয়ারি ১৯৯৭]। এটা খুব সম্ভব ১৯১৩ বা ১৯১৪ সালের শুরুর কথা। সুভাষচন্দ্র ১৯১৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করে কলকাতা আসেন এবং জুলাই মাসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ম্যাট্রিক পরীক্ষা হয়েছিলে মার্চ মাসের শুরুতে। পরীক্ষার পর তিনি রাঁচি গিয়েছিলেন এবং মে মাসে কলকাতা আসেন। তারপর মে মাসেই সুভাষচন্দ্র আগের বছর (১৯১২ সালের) পূজার সময় হেমন্তের সাথে যেমন স্থির হয়েছিল, সেইমত কৃষ্ণনগর যান। ১৯১২ সালের শেষ দিক থেকেই হেমন্তের মাধ্যমে মেডিকেল পাঠরত শ্রী সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে সুভাষচন্দ্রের পত্রবিনিময় আরম্ভ হয়েছিল। সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯১৩ সালে কলকাতায় ‘ব্রাদারহুড’ নামে একটা বিবেকানন্দ-গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসু শ্রী সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ বসুর স্মৃতিকথা থেকে খুব সুন্দর বর্ণনার উল্লেখ করেছেন। ব্রাদারহুড সদস্যদের দক্ষিণেশ্বর যাত্রার বিবরণ দিতে গিয়ে নৃপেন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন, “তৎকালে প্রায় প্রতি রবিবার আমাদের একটি বিশেষ কর্মসূচী থাকিত। কলিকাতা মহানগরীতে যে যেখানে থাকিতাম, অতি প্রত্যূষে চার ঘটিকার মধ্যে আমরা কলেজ স্কোয়ারে আসিয়া জড়ো হইতাম। সংখ্যায় প্রায় ৮০ জন। দুই লাইন করিয়া পদযাত্রা। গন্তব্যস্থল দক্ষিণেশ্বর। অগ্রভাগে সুরেশদা। তথায় গঙ্গাস্নান, মায়ের মন্দিরে পূজা ও ঠাকুর রামকৃষ্ণের ঘরে ধ্যান। অতঃপর পারস্পারিক আলাপ-আলোচনা, সুরেশদার বক্তৃতা। নিজেরাই মাটির হাঁড়ি কিনিয়া খিচুড়ি রান্না করিয়া প্রসাদ পাইতাম। সন্ধ্যায় পুনরায় পদব্রজে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন।”

অধ্যাপক শঙ্করীপ্রসাদ বসুর বই থেকে [পৃষ্ঠা ১৭] জানতে পারি যে সেইসময় একদিন “দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে গঙ্গায় স্নান করার সময় একবার এক বিপত্তি ঘটে। সুভাষচন্দ্র তখন একেবারে সাঁতার জানতেন না, ফলে জলে ডুবে যান। সেবার প্রফুল্ল ঘোষ তাঁকে উদ্ধার করেন।” অধ্যাপক বসু এটা হেমন্তকুমার সরকারের মাসিক বসুমতীতে চৈত্র, ১৩৫২, সংখ্যার (মার্চ-এপ্রিল, ১৯৪৬ ইং) লেখা থেকে নিয়েছেন।

হেমন্তের কাছে একটু একটু সাঁতার শেখা

উপরের ঘটনাটার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁরই সে-সময়কার বন্ধু হেমন্তকুমার সরকার পরে তাঁর বহুল সমাদৃত “সুভাষের সঙ্গে বারো বছর (১৯১২-২৪)” বইতে [সরকার এণ্ড কোং, দোল পূর্ণিমা, ১৭ই মার্চ ১৯৪৬] আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি সুভাষচন্দ্রকে ‘একটু একটু’ সাঁতার শিখিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “আমরা মাঝে মাঝে বেলুড় মঠ ও দক্ষিণেশ্বরে যেতাম। বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীরা রাজনীতির প্রশ্রয় দিতেন না। দক্ষিণেশ্বরের পঞ্চবটীর মূলে সুভাষ গিয়ে বসতো। একদিন গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে সে ডুবে গিয়েছিল — প্রফুল্লদা তাকে উদ্ধার করেন। সুভাষ সাঁতার জানতো না। কৃষ্ণনগরে গিয়ে জলাঙ্গী নদীতে নাইতে নাইতে আমার কাছে একটু একটু সাঁতার দেওয়া শিখেছিল।” আমরা উপরে দেখেছি যে সুভাষচন্দ্র ১৯১৩ সালের মে মাসে প্রথমবার কৃষ্ণনগর যান। পরে আরও অনেকবার গিয়েছেন।

দৌলতপুরে নৌকাডুবি এবং সুভাষচন্দ্রের প্রায় ডুবে যাওয়া

আমরা শ্রী ভূপেন্দ্রকুমার দত্তের লেখা থেকে জানতে পারি যে কটক থেকে এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হবার পর অন্যান্য বন্ধুদের সাথে সুভাষচন্দ্র দৌলতপুর কলেজে কয়েকবার গিয়েছিলেন। দৌলতপুর হ’ল খুলনার কাছে একটা মফস্বল শহর। শ্রী ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত তখন দৌলতপুর কলেজে পড়তেন। তিনি ‘ছাত্রজীবনে সুভাষচন্দ্র’ নামের এক প্রবন্ধে লিখেছেন [জয়শ্রী : নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জন্মশতবার্ষিকী গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২৫-২৬], “কলকাতা থেকে বা অন্যত্র থেকে বন্ধুরা দৌলতপুর কলেজে এলে আমরা তাদের আপ্যায়িত করতাম নৌবিহার দিয়ে। ছেলেদের ব্যবহারের জন্য কলেজে দুটো ‘নাও’ ছিল। সুস্থির হয়ে দাঁড় টেনে সে নৌকা চালানো আমাদের ধাতে ছিল না; তুমুল দাপাদাপি চলত তার বুকে, নৌকা বাঁধা দড়ি দিয়েই জলের বুকেই খেলতাম টাগ-অব্-ওয়ার, ডুবিয়ে দিতাম নৌকা, তার উলটো-পিঠে চলত হুটোপাটি, তারপর জল থেকে সেই নৌকা টেনে তুলে দাঁড় বেয়ে তীরে ফেরার পালা। তুমুল ঝড়জলের সন্ধে হলেই খেলা আমাদের জমে উঠত প্রায়শ।

“সুভাষের বোধহয় সেবার দ্বিতীয়বার দৌলতপুরে আসা। সঙ্গে এসেছে বিধু আর শশাঙ্ক, একটা নৌকায় করে ওদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যুগলদাও ছিলেন। জোয়ারে ভেসে বহুদূর চলে গেলাম। বন্ধুদের সাবধান করে দিয়েছিলাম যে সুভাষ সাঁতার জানে না। তবু তাদের কথায় বিশ্বাস নেই। তাই সুভাষের পাশেই আমি বসেছিলাম। সাঁতারে বেশ দড় ছিলাম সেকালে। স্তব্ধ সন্ধ্যার প্রকৃতি। আকাশে চাঁদ। শশাঙ্ক গাইতে গাইতে চলল — ‘ও তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে।’ অনেক দূরে চলে গেলাম, ফিরতি পথে ভাটার অপেক্ষায়। অস্বাভাবিক রকমে দিব্যি শান্তশিষ্ট ছেলেদের মতোই সময় কাটাচ্ছিলাম আমরা।

“কিন্তু ভাটার টান পড়তে-না-পড়তে বন্ধুদের শিষ্টতা হঠাৎ উবে গেল। শুরু হল দড়ি ধরে টানা-হ্যাঁচড়ার খেলা। নৌকা গেল ডুবে। সুভাষ জলে পড়ে গেল আমি নজর রেখেছিলাম। সেখানটা অন্ধকার, ছায়াঘন তীরের কাছাকাছি তখন আমরা। চট করে সুভাষের কোমরের কাছের ধুতি চেপে ধরলাম। জল সেখানে যথেষ্ট গভীর। টেনে তীরে তুললাম।

“ভাটার অনুকূল স্রোতে আমাদের ফিরে আসতে তেমন সময় লাগল না। নৌকা তুলে বাঁধাছাঁদা করছি, ততক্ষণে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে সুভাষ কোথায় উধাও হয়ে গেল। খুঁজতে শুরু করলাম। কোথাও নেই সুভাষ। শেষ অবধি শশাঙ্ক আর আমি, কলেজের জমিতে মন্দির ছিল একটা, সেখানে গেলাম খুঁজতে। দাওয়ার এককোণে ডাঁই করা ছিল একটা ভাঙা বেড়ার বাঁশ চাটাই। তারই মাঝে খানিকটা আড়াল হয়ে সুভাষ দেখি ধ্যান করছে, দু-চোখে অজস্র ধারা। পরনে ভিজে ধুতি। টেনে তুলে তাকে নিয়ে এলাম হস্টেলে।”

যদিও ভুপেন্দ্রকুমার দত্ত নদীর নাম লেখেন নি, সেটা খুব সম্ভব ছিল দৌলতপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদ।

ভুপেন্দ্রকুমার দত্তও একদিন সাঁতার শিখিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে

ভুপেন্দ্রকুমার দত্ত সেই একই প্রবন্ধে [জয়শ্রী : নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জন্মশতবার্ষিকী গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২৮] জানাচ্ছেন, “সুভাষ ও হেমন্ত, দুজনেই আমায় ভালোবাসত। মাঝে মাঝে আমায় ওরা ডাকত কৃষ্ণনগরে; সেখানকার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ – বেণীমাধব দাস, হেম সরকার এবং রমেন্দ্র ঘোষ (শৈলেন ঘোষের দাদা), আমাদের কার্যকলাপের প্রতি সহানুভূতি পোষণ করতেন। সে-যুগে বেণীবাবু সুপরিচিত ছিলেন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে, এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্যেও। কটকে তিনি বসু পরিবারের সবকটি ছেলেরই শিক্ষক ছিলেন, সে-বাড়িতে সকলেই তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। প্রধানত এই ঋষিতুল্য ব্যক্তিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠটা থাকার দরুনই হেমন্ত অতগুলো সেরা ছাত্রকে দলে টানতে পেরেছিল। আমাদের প্রায়ই দেখা হত এবং আমাদের আলোচনা চলত ধর্ম ও রাজনীতি নিয়েই মূলত। সুভাষ সেখানে যেত কলকাতা থেকে, আমি দৌলতপুর থেকে। একবার সুভাষ আমায় ওখানে বলল সাঁতার শিখিয়ে দিতে। খোড়ে নদীর অগভীর স্বচ্ছ জলে একদিনের চেষ্টাতেই সে মোটামুটি সাঁতার শিখে নিল।”

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে জলঙ্গী ও খড়ে একই নদী। জলঙ্গী নদীর নাম আগে ছিল খড়ে বা খোড়ে নদী।

মান্দালয় জেলের ছোট পুকুরে সাঁতার কাটা

এরপর আমরা মান্দালয় জেল থেকে ৭/৮/১৯২৫ তারিখে মেজবৌদিদিকে লেখা একটা চিঠি থেকে সুভাষচন্দ্র বসুর সাঁতার কাটার কথা জানতে পারি। তিনি লিখেছেন, “উঠানের মধ্যে একটা ছোট পুখুর আছে। তাতে আমাদের নাক পর্য্যন্ত জল ধরে। সেই পুকুরের জল পরিষ্কার থাকলে আমরা লম্ফঝম্ফ করে, একটু সাঁতার কাটবার চেষ্টা করি। অবশ্য যেখানে ডোববার ভয় নাই – সেখানে সাঁতার ভাল হয় না। কিন্তু আমি গোড়ায় বলেছি মধুর অভাবে লোকে গুড় খায় — আমরাও নদীর অভাবে বড় চৌবাচ্চায় সাঁতার দিয়ে মনকে প্রবোধ দিই।”

প্রসঙ্গত জানাই যে এই চিঠিটার শুরুর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে তিনি অন্য এক প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “আমাদের শাস্ত্রে একটা কথা আছে — মধ্বভাবে গুড়ং দদ্যাৎ। অর্থাৎ যেখানে মধুর অভাব, সেখানে গুড় দিয়ে মধুর কাজ সারা উচিত।” সেটাই উপরে লিখেছেন মধুকে নদীর সাথে আর গুড়কে ‘বড় চৌবাচ্চার’ সাথে তুলনা করে। [এটা ‘পত্রাবলী ১৯১২-১৯৩২’ বইয়ের ৮০ নং চিঠি; এম-সি-সরকার অ্যান্ড সন্স; জানুয়ারী ১৯৬৪]

এরপর (মান্দালয় জেল থেকেই) ১১/৯/১৯২৫ তারিখে মেজবৌদিদিকে অন্য চিঠিতে লিখেছেন, “পুখুরের জল বাড়বার উপায় নাই। কারণ বাড়লেই উপছে নর্দ্দমা দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর মধ্যে মধ্যে পুখুর খালি করে নূতন জল ভরতে হয়। বস্তুতঃ চৌবাচ্চা না বলে পুখুর বলবার কোন কারণ নাই। তবে ব’লে মনকে বোঝান যায় যে পুখুরে স্নান করেছি।” [এটা ‘পত্রাবলী ১৯১২-১৯৩২’ বইয়ের ৮৩ নং চিঠি]

দেশের বাড়ীতে বড় পুকুরে স্নান

এরপর আমরা শ্রীমতি গীতা (বসু) বিশ্বাসের লেখা ‘স্মৃতির আলোয়’ বইতে [জয়শ্রী প্রকাশন, ১৪০৬] দেখতে পাই সম্ভবত ১৯৩০ সালের পূজার সময়কার এক ঘটনা। গীতা বসুর জন্ম ১৯২২ সালে। ১৯৩০ সালে তিনি ৮ বছরের বালিকা। তিনি লিখেছেন, “একবার মনে আছে (বোধহয় ১৯৩০ সাল) আমরা দেশের পুজোয় সকলে গিয়েছি। রাঙাকাকাবাবুও সঙ্গে ছিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে খুব হৈচৈ করতেন। তিনি খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারতেন। বাড়ির অদূরে মালঞ্চে দাদাভাইয়ের একটি বাগান ছিল। তার মধ্যে অতি সুন্দর বড়ো পুকুর ছিল। রাঙাকাকাবাবু পুকুরে সাঁতার কাটতে নামলেন। আমি পাড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে বললেন তাঁর পিঠের ওপর শুয়ে কাঁধে হাতটা রাখতে। এইভাবে আমাকে পিঠে নিয়ে তিনি পুকুর পারাপার করলেন, খাবার সময় সে কী আনন্দ। বারান্দায় লম্বা খাওয়ার জায়গা করা হোল। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খেলাম।”

১৯৩৯ সালের মহাষ্টমীর দিন সুভাষচন্দ্রের কোদালিয়ায় গ্রামের বাড়ির পুকুরে সাঁতার কেটে স্নান

শেষবার কারাবন্দী থাকার সময় [২রা জুলাই থেকে ৫ই ডিসেম্বর ১৯৪০] কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে তিনমাস [সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে কারাবাসের শেষ অবধি] সুভাষচন্দ্রের কারাসঙ্গী ছিলেন শ্রী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী। তিনি অনেক বছর থেকেই সুভাষচন্দ্রের অনুগামী। এই বইতে তিনি সুভাষচন্দ্রকে ‘নেতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। সেই তিন মাস তাঁর সাথে মন খুলে অনেক কথা বলেছিলেন সুভাষচন্দ্র। শ্রী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী তাঁর ‘নেতাজী সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে [গ্রন্থপ্রকাশ; ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৬] সেসব কথা আমাদের জন্য লিখে গেছেন। সেবার জেলের মধ্যে মান্দালয়ের মত দুর্গাপূজা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র। ১৯৪০ সালে মহাষ্টমী ছিল ৮ই অক্টোবর। এবার আমি শ্রী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর বই থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ —

“মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন: ‘গত অষ্টমীর কথা মনে আছে?’

‘ভুলবো কেমন করে?’

না, ভুলিনি। এই অষ্টমীর দিন আমরা গেল বছর গিয়েছিলাম কোদালিয়া। নেতার পৈতৃক বসত বাড়িতে। নেতা, ইলা আর আমি।

সকাল আটটায় আমরা রওনা হলাম। মোটরে। যেতে ঘণ্টা খানেক লাগল। সোজা গিয়ে আমরা একটা ছোট বাগানের সামনে। বাগান শুধু নামেই। শ্রীও নেই, ছাঁদও নেই। নেড়া। এক ধারে ছোট একটা পুকুর। ঘাট বাঁধা। সামনে একটু মাঠ। ঘাসে ঢাকা। একটু দূরে কয়েকটা আম-জামের গাছ। মাঝে-মধ্যে মাথা খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে নিরাভরণ নারকেল গাছ। বেশ পুরনো। বুড়ো গাছে ঝুলছে নারকেলের কাঁদি। বড় একটা ঝাঁপড়া আম গাছের তলায় একটা ইঁটের পাঁজা। সেটাও অনেক দিনের। গায়ে ছ্যাদলা পড়ে গেছে।

মাঠে বসে ছিলেন সুরেশবাবু। নেতার দাদা। আর কয়েকটি ছেলে। ওঁরা কলরব করে উঠলেন। পেট খাই-খাই করছে। পাশের রাস্তা ধরে মুড়ির বস্তা-মাথায়-লোক যেতে দেখেই হৈ-হৈ করে উঠলেন সবাই। মুড়ি কেনা হল। গায়ের চাদর বিছিয়ে নেয়া হল মুড়ি। মন খুঁতখুঁত করে। সঙ্গে কিছু চাই। নিদেন লঙ্কা আর তেল। কিন্তু মিলবে কোথায়? সুরেশবাবু চোখ তুলে চান ওপরের দিকে। চোখ লোভাতুর হয়ে ওঠে। কিন্তু নিরুপায়। অত উঁচুতে কে উঠবে?

বাইরে লোক জমেছে। ছেলে ছোকরাই বেশি। নেতা এগিয়ে গিয়ে একটিকে ধরে আনলেন। তর তর করে ছেলেটি গাছে উঠে গেল। ধপাধপ ফেলে দিল কয়েকটা ঝুনো নারকেল। পকেট থেকে পয়সা বের করে নেতা এগিয়ে গেলেন ছেলেটির দিকে। এক ছুটে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। নেতাকে ও চিনতে পেরেছে।

কিলিয়ে নারকেল ভাঙা হল। নারকেল আর মুড়ি নিমেষে সব উবে গেল।

এর পরই স্নান পর্ব। গায়ের জামা খুলে নেতা একেবারে তৈরী। পুকুরে নাবছেন। আমি ঘাবড়ে গেছি। এই জলে? জলের ওপরটা লালচে। ভাং-এ ঢাকা। অবলীলায় নেতা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সাঁতার কাটলেন বেশ অনেকক্ষণ।

স্নানান্তে জামা-কাপড় বদলাবার পরক্ষণেই ডাক এল বাড়ি থেকে। মাজননীর ডাক। ওঁরা এসেছেন আগেই। মাজননী আর অন্যান্য বধূরা। সঙ্গে ছেলে-মেয়ে।

একটানা আনন্দে কেটেছিল সারাটা দিন। খাওয়া হল ভেতর দালানে। কোদালিয়ার বিখ্যাত খাস্তা কচুরী আনাতে মাজননী ভোলেননি। সঙ্গে রসকরা।

বেলা চারটা নাগাদ আমরা এলগিন রোডে ফিরেছিলাম। ঘুম ভাঙল ইলার ডাকে। চায়ের কাপটা সামনে ধরে ইলা বলে উঠলঃ ‘বাবাঃ! কী ঘুম!’

হাসতে হাসতে যাবার সময় বলে গেলঃ ‘রাঙা কাকাবাবু ডাকছেন।’ (বলত রাঙা কাকাবাবু কিন্তু বলত একটু জড়িয়ে। শোনাত, ‘রাংকু’।)

ভুলিনি। কোনদিন ভুলবও না।

সেই অষ্টমী। কিন্তু এবার কারাগারে।”

ইচ্ছে করে পুরোটাই উদ্ধৃত করলাম। জানি অনেকের ভালো লাগবে তাই। আমি খুঁজে দেখেছি যে ১৯৪০ সালের মহাষ্টমীর দিন যখন তাঁরা জেলের ভেতর পূজো করেছিলেন এবং তার আগের বছরের এই দিনটার কথা স্মরণ করছিলেন, সেই দিনটা ছিল ১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসের ৮ তারিখ, মহাষ্টমী। আর নেতাজী ১৯৩৯ সালের যেই মহাষ্টমীর দিন কোদালিয়া ‘ছোট’ পুকুরে সাঁতার কেটে স্নান করেছিলেন, সেই দিনটার তারিখ আগেই বলা হয়েছে, সেটা ছিলে ১৯৩৯ সালের অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ। শ্রীমতি গীতা বিশ্বাস ৮ বছর বয়সের স্মৃতি রোমন্থন করে সেই একই পুকুরকে ‘অতি সুন্দর বড়ো পুকুর’ বলেছিলেন কিনা, নাকি দুটো আলাদা পুকুর ছিল তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমি লেখাগুলোর বানানের কোন পরিবর্তন করিনি। শুধু শ্রী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর লেখায় ‘খাস্তা কুচুরী’ কে ‘খাস্তা কচুরী’ করেছি এই ভেবে যে ওটা বোধহয় ছাপার ভুল ছিল।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালের মে মাসের ২৯ তারিখে কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতির (প্রেসিডেন্ট-এর) পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং পরদিন তাঁর পদত্যাগ গৃহীত হয় এবং তাঁকে ওয়ার্কিং কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে ১১ই আগস্ট ১৯৩৯ তারিখে তাঁকে বাঙলা প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং কিছু পরে কংগ্রেস থেকে তিনি বহিষ্কৃত হন।

কিছু আনুষঙ্গিক কথা

কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বিদগ্ধ পাঠকদের অতি সংক্ষেপে একটা কথা জানাতে চাই। সুভাষচন্দ্র বসুর বিরোধী বাঙলাতেও অনেক ছিল। যে দু’জন সুভাষচন্দ্র বসুকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন বলে দাবী করেছেন, এবং যে দু’জন তাঁকে নদীতে জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন, তাঁরা সবাই (তিনজনই) পরে কোন না কোন সময়ে সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতা করেছেন। (১) বন্ধু হেমন্তকুমার সরকারের সাথে মতান্তর শুরু হয়েছিল ১৯২৪ সালে। সে বছর দেশবন্ধুর আদেশে সুভাষচন্দ্র যে কলকাতা কর্পোরেশনের সি-ই-ও হয়েছিলেন, তাতে হেমন্তকুমার সরকারের প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে হেমন্তকুমার সরকার কিছু কথা গোপন করেছেন, সুভাষচন্দ্রও কখনো বলেননি সেসব কথা। (২) গান্ধীপন্থী এবং খাদীবাদী ডঃ প্রফুল্ল ঘোষ স্বাভাবিক কারণেই সুভাষ-বিরোধী হন। (৩) আর শ্রী ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত অন্যান্য অনেক বয়োজ্যেষ্ঠদের মত একসময় নিজেকে সুভাষচন্দ্রের থেকে বড় ও উপযুক্ত মনে করতেন। এসব কথা বিশদভাবে অন্যত্র আলোচনা করা যেতে পারে।

এই লেখাটা তিন বছর আগে, ১২ মে, ২০২০, তারিখে লেখা হয়েছিল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev