এক দেশ দুই রাস্তা
দেশ জুড়ে বেজায় প্রচার — স্বাধীন দেশের ইতিহাসে জনপ্রিয়তম প্রধানমন্ত্রী না-কি নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। ব্যাপক প্রচারের আওয়াজে কানে তালা পড়ছে। সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত। রামমন্দির, তারপর বারাণসী, তাজমহল, আরও কত কী! বিলকিস বানো-র গণধর্ষক তথা তাঁর এক ডজন আত্মীয়কে খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন কারদণ্ড পাওয়া অপরাধীদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। আশা, এভাবেই দেশ জুড়ে গড়ে উঠবে মেরুকরণ। এই হট্টগোলে, চেতনায় ধাঁধা লাগানো ঢক্কানিনাদের আড়ালে তীব্র গতিতে চলছে বেসরকারিকরণ, বাজার অর্থনীতি (Market Economy)। স্বাধীনতার সময় থেকে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ জলের দরে বেচে দেওয়া হচ্ছে। একতরফা এই হামলার প্রতিবাদ যারাই করতে গিয়েছেন, আইনি বেআইনি হামলা হয়েছে তাঁদের ওপর। কিন্তু সময়ের ঘড়ি এবার বোধহয় অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার অর্থনীতির গর্ভগৃহে ফুটে উঠছে বাজার বিরোধী সংগ্রামের সবুজ ফুল। আদানি আম্বানিদের রত্ন-খচিত ধান্দার ধনতন্ত্র-মিনারের সামনে স্পর্ধিত কৃষকদের সোচ্চার স্লোগান, চাই ফসলের অধিকার, চাই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি কবচ। কোন পথে যাবে ভারত, তা কিন্তু অনেকটাই নির্ভর করছে, এ ধরনের লড়াই কতটা বড় আকার নেয়।

দেশে আবার শুরু হচ্ছে কিষান আন্দোলন। কৃষকদের অভিযোগ, কথা রাখেনি সরকার। যেসব দাবি নিয়ে গ্রাম ভারত আবার উত্তাল হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের প্রসঙ্গ। সম্ভবত, এটিই সবথেকে বড় ইস্যু। তিন কৃষি আইন ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার, এমনটাই দাবি সংগ্রামী সংগঠনগুলির।
ন্যূনতম সহায়ক মূল্য
* পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো কয়েকটি রাজ্যে গত শতকের ষাটের দশকে চালু হয়েছিল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। সেই সময় দেশে খাদ্য সংকট বড় আকার নিয়েছিল। আমদানি করতে হতো বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য। এই ঘাটতি মেটাতে পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো রাজ্যে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সারের ব্যাপক ব্যবহার, সেচের জল, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চাষ-পদ্ধতি ইত্যাদিকে মিলিয়ে নাম হয়েছিল সবুজ বিপ্লব। বাড়তি ফসল বাজারে আসার পর দেখা গেল, ফসলের দাম পড়ে যাচ্ছে, মার খাচ্ছে কৃষকরা। প্রয়োজন হয়ে পড়ল ন্যূনতমা দাম নিশ্চিত করার। আবার, দেশে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভাণ্ডারে খাদ্য মজুত করার দরকারও ছিল। এই দ্বিমুখী প্রয়োজনেই ১৯৬৬-৬৭ সালে কেবল গমের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য চালু হয়েছিল। কয়েক বছরে মধ্যেই আরও নানা ধরনের খাদ্য শস্য সহায়ক মূল্যের আওতায় আসে। এভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে তা সস্তায় রেশন দোকানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বণ্টন করা হতো। প্রসঙ্গত, এই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলে্ন ইন্দিরা গান্ধি। এক কথায়, সবুজ বিপ্লব সফল করে দেশে খাদ্য সংকট মেটাতে ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার।

* কিন্তু শুরু থেকেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের জন্য কোনো আইন নেই, কেবলই প্রশাসনিক নির্দেশে এই ব্যবস্থা সেই থেকে আজও চলছে। চাষের মরসুমের শুরুর দিকে ওই দাম ঘোষণা করে কেন্দ্র। ওই দামে চাল, গমের মতে খাদ্যশস্য কৃষকরা বিক্রি করতে পারবে সরকারকে। তবে কৃষি পণ্য সরকারকে বিক্রি করতে বাধ্য নয় কৃষকরা, বেচতে পারেন বেসরকারি ক্রেতাকেও। কীভাবে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঠিক হয়, সেটা পরিষ্কার হবে রাজ্যসভায় সরকারের এক প্রশ্নের উত্তরে। ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভায় সরকার জানায়, ‘কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির মতামত নিয়ে, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল কস্টস অ্যান্ড প্রাইসেস ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সুপারিশ করে।’ এই সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতি মরসুমে ফসলের চূড়ান্ত দাম ঠিক করে ক্যাবিনেট কমিটি অন ইকনোমিক অ্যাফেয়ার্স। দাম ঠিক করার সময় চেষ্টা করা হয়, উৎপাদন মূল্যের থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দাম যাতে ঠিক হয়। তবে উৎপাদন মূল্য ঠিক করার বিষয়ে নানা বিতর্ক আছে।
* কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়াও কয়েকটি রাজ্য সরকার, যেমন, কেরালা, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশ কয়েক ধরনের সবজির জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে থাকে।
* ধীরে ধীরে সহায়ক মূল্যের তালিকা বাড়তে থাকে, বর্তমানে ২৩টি কৃষিজাত পণ্য এই সহায়তা পায়। এর মধ্যে রয়েছে ৭ ধরনের খাদ্য শস্য — ধান, গম, জোয়ার, বাজরা, মেইজ, রাগি, বারলি; রয়েছে চানা, অড়হর, মুগ, উরদ ও মসুর — এই ৫ ধরনের ডাল; ৭ ধরনের তৈলবীজ, যথা চিনাবাদাম, সয়াবিন, রেপসিড ও সর্ষে, তিল, সূর্যমুখী, নাইজার, স্যাফ্ফ্লাওয়ার বা কুসুম ফুল। এছাড়া চট, তুলো, আখ ও নারিকেলের শুষ্ক শাঁস, এই ৪ ধরনের বাণিজ্যিক কৃষিজাত পণ্য এখন সহায়ক মূল্যের আওতায়।

* ফসলের দর পড়ে গেলে চাষিরা সহায়ক মূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন, এটাই এই ব্যবস্থাটার কৃষক দরদি দিক। যদিও গ্রামীণ উৎপাদকদের বড় অংশ ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের পুরো সুফল পান না। ২০১৬ সালে নিতি আয়োগের এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছিল, দেশের ৯৪ শতাংশ কৃষক এই ব্যবস্থা বজায় থাকার পক্ষে হলেও ৭৯ শতাংশ বলেছেন, ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়। ২০১৫ সালে শান্তাকুমার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের পূর্ণ সুবিধা পায়।
ন্যূনতম সহায়ক মূল্য — সমস্যা
* ফসল সরকারকে বেচতে হলে নিয়ে যেতে হবে দূরের সরকারি কেন্দ্রে। প্রান্তিক ও মাঝারি কৃষকের পক্ষে সেই খরচ করে নিয়ে যাওয়া অসুবিধাজনক, অলাভজনকও। সব সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ছোটো-বড় লড়ি, ট্রাক ইত্যাদি মেলে না।
* সরকারি বিক্রয় কেন্দ্রে নিয়ে গেলেও অনেক সময় সেখানে নানা দালাল চক্রের পাল্লায় পড়তে হয়।
* তাছাড় রয়েছে মধ্যসত্ত্বভোগী বা ফড়েরা, যারা কৃষকের খেত থেকেই ফসল কেনে, তবে অনেক কম দামে। টাকার জোর না থাকা কৃষকদের অনেকে বাধ্য হয়ে ফড়েদের কাছে ফসল বিক্রি করে দেন।
* এসব পরিস্থিতির কারণে মূলত ধনী কৃষক ও বিশাল জমির মালিকরাই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের পূর্ণ সুবিধা পান।

বিগত ষাট বছর ধরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সমস্যা মেটাতে নানা কথা হলেও তেমন একটা মেটেনি। তিন কৃষি আইন রদের দাবিতে গড়ে ওঠা কৃষক আন্দোলন ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চয়তা চেয়েছিল। কৃষক সংগঠনগুলির দাবি, সরকারের তরফে তেমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র, কিন্তু তারপর সব চুপচাপ। তাই আবার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি স্বীকৃতির দাবি তুলে রাস্তায় কৃষকরা। কী করবে কেন্দ্র? ভারতীয় অর্থনীতিকে পূর্ণ বাজার ভিত্তিক ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে পড়ি-মরি করে দৌড়চ্ছেন নরেন্দ্র মোদি, নির্মলা সীতারমণরা। থাকবে না কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ, সবই চলবে বাজারের জোগান ও চাহিদা অনুসারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, এলআইসি থেকে শুরু করে সব কিছুই তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশাল আকারের কর্পোরেটদের হাতে। গ্রামে উৎপাদিত ফসলকেও এই বাজার তথা বড় কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই মোদি সরকার যথেষ্ট আলোচনা ছাড়া পাশ করেছিল তিন কৃষি আইন। প্রথমে প্রতিবাদ, পরে রাজধানীতে সমাবেশ ও লাগাতার অবস্থানের পথে গিয়েছিলেন কৃষকরা। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যগুলির কৃষকরা বেশি সংখ্যায় সমাবেশে এলেও সারা দেশের চাষিরাই অংশ নিয়েছিলেন। তীব্র গ্রীষ্ম, শীতে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন শতাধিক কৃষক। স্বাধীন ভারতে অন্যতম সাড়া জাগানো কৃষক আন্দোলনের ধাক্কায় তিন কৃষি আইন ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বাজার অর্থনীতির নামে আম্বানি আদানিদের হাতে ভারতীয় অর্থনীতির রাশ তুলে দেবার প্রক্রিয়া একই গতিতে চলছে। এই বাজারমুখী পাগলা ঘোড়ার বিপরীতে দাঁড়াচ্ছে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি স্বীকৃতির দাবি। দুই আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, দুই দার্শনিক বোধের মুখোমুখী সংঘর্ষের ক্ষেত্র প্রস্তুত। হয়তো তিলে তিলে গড়ে উঠতে চলেছে আরও এক মহাভারত, আবার কুরুক্ষেত্র।