আগামী ১৮ জুলাই শুরু হতে চলেছে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। ঠিক তার কয়েক দিন আগে লোকসভা সচিবালয় এক পুস্তিকা প্রকাশ করেছে, যাতে ৬৫টি নতুন শব্দের তালিকা রয়েছে, যে শব্দগুলি সদস্যরা ভাষণের সময় উচ্চারণ করতে পারবেন না। করলে তা ‘অসংসদীয়’ বলে গ্রাহ্য হবে। আমাদের সংসদ ও বিধানসভার ভিতরে সদস্যদের ভাষায় লাগাম টানার নতুন ঘটনা নয়। বরং বলা যায়; বহুদিন ধরে এ ধরণের রেওয়াজ চালু আছে। ‘অসংসদীয়’ শব্দের তালিকা আগেও ছিল। তাতে মাঝে মধ্যে নতুন শব্দ সংযোজিতও হয়েছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি সেই তালিকায় এমন বেশ কিছু শব্দ সংযোজিত হয়েছে, যা দেখে মনে হচ্ছে কেন্দ্রের সরকার চাইছেন আইনসভায় সদস্যরা বলা ভাল বিরোধীরা যাতে সরকারের কোনও সমালচনা না করেন। বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই অসংসদীয় শব্দ উচ্চারণের অপরাধে যে দোষী হতে হবে তা সেই তালিকায় একবার চোখ বোলালেই স্পষ্ট হয়। তার মানে তো কেন্দ্র এটাই চাইছে যে বিরোধীরা কথা না বলে মুখে কুলুপ এঁটে থাকুক।
পুস্তিকাটিতে অংসদীয় শব্দের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে ‘অ্যানারকিস্ট’, ‘ডিকটোরিয়াল’, ‘শকুনি’, ‘তানাশাহ’, ‘তানাশাহী’, ‘জয়চাঁদ’— শব্দগুলি ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়াও বিতর্কের সময় ‘বিনাশ পুরুষ’, ‘খালিস্তানি’ এবং ‘খুন সে খেতি’ ব্যবহার করলেও তা বাদ দেওয়া হবে। তাছাড়া ‘দোহরা চরিত্র’, ‘নিকাম্মা’, ‘নৌটঙ্কি’, ‘ধিন্ডোরা পিটনা’ এবং ‘বেহরি সরকার’ শব্দগুলি অসংসদীয় অভিব্যক্তি হিসাবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী সংসদকক্ষে সরকার বা কোনো মন্ত্রীকে ‘অহংকারী’ বলা যাবে না। বলা যাবে না, জনতা ‘নির্যাতিত’ হচ্ছে। সরকার বা প্রধানমন্ত্রীকে ‘নৈরাজ্যবাদী’ অভিহিত করা যাবে না। ব্যবহার করা যাবে না ‘অপমান’, ‘লজ্জিত’ শব্দও। সংসদ সদস্যরা এত দিন ধরে কারও বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ বলার অভিযোগ আনতে পারতেন না। কেননা, ইংরেজিতে ‘লাই’ শব্দটি ছিল অসংসদীয়। যদিও ‘অসত্য’ শব্দটি উচ্চারণযোগ্য ছিল। কিন্তু এবার নতুন ‘লাই’ এবং ‘অসত্য’ শব্দদুটিকেও সংযোজিত করা হয়েছে।
শব্দের তালিকা দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে ইংরেজি ও হিন্দির পাশাপাশি প্রচলিত অন্যান্য ভাষা, এমনকি বিদেশি শব্দকেও জায়গা দেওয়া হয়েছে। যেমন ‘চামচা’, ‘চামচাগিরি’, ‘চেলা’, ‘বেচারা’, ‘বেহরি’ (বধির) সরকার, ‘বাল (শিশুসুলভ) বুদ্ধি’, ‘ঢিন্ঢোরা পিটনা’ (ঢেঁড়া পেটনো), ‘গাদ্দার’ (বিশ্বাসঘাতক)। এত দিন সংসদ সদস্যরা এই শব্দগুলি আকছার ব্যবহার করে এসেছেন। কিন্তু নতুন শব্দ তালিকা অনুযায়ী ওই শব্দগুলি ছাড়াও ইংরেজি শব্দ ‘ড্রামা’, ‘আইওয়াশ’, ‘ফুলিশ’, ‘হিপোক্রেসি’ বা ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’–এর মতো শব্দও আর ব্যবহারযোগ্য নয়! ‘আচ্ছে দিন’–এই স্লোগান বাস্তবায়িত হোক বা প্রহশন হোক ‘কালা দিন’ শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না। এমনকি ‘কালোবাজারি’ শব্দটিও বলা যাবে না।
‘জুমলাবাজি’, ‘গুন্ডাবাজি’ কিম্বা ‘ভাঁওতাবাজি’র অভিযোগ আনলেও এবার থেকে কাউকে ‘জুমলাজীবী’, ‘গুনস’ বলা যাবে না, এবং ব্যবহার করা যাবে না ‘হুলিগানিজম’ শব্দটি। বহুকাল ধরেই সরকারের বিরুদ্ধে ‘কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন’— কথাটি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে কিন্তু এবার থেকে কেউ আর ইংরেজিতে ‘ক্রোকোডাইল টিয়ার্স’ অথবা হিন্দিতে ‘ঘড়িয়ালি আঁশু’ ফেলার তুলনা টানতে পারবেন না। এমনকি উচ্চারণ করতে পারবেন না ‘দালাল’, ‘দাঙ্গা’, ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ‘ডিসগ্রেস’ শব্দগুলি। কাউকে ‘গাধা’ও বলা যাবে না। এমনকি সদস্যরা তাদের ভাষণে ‘কোভিড স্প্রেডার’, ‘ব্লাডি’, ‘ব্লাডশেড’, ‘বিট্রে’, ‘অ্যাশেমড’, ‘কাওয়ার্ড’, ‘করাপ্ট’, ‘ক্রিমিনাল’ শব্দ ব্যবহার করলেও তার ভাষণ থেকে তা বাতিল হবে।
প্রসঙ্গত, বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের সংসদে একটি শব্দবন্ধ ব্যবহার নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন এক সাংসদ বিরোধীপক্ষের এক সাংসদকে বলেছিলেন, ‘বেশি চুদুর-বুদুর কইরেন না তো’। তখনও পর্যন্ত কথাটি বাংলাদেশের অভিধানে ছিল না। কিন্তু ওই কথাটি বাংলাদেশে আকছার ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু বিচার বিবেচনার পরও স্পীকার ওই সাংসদকে শাস্তি দেন নি। তিনি তাঁর বক্তব্যা জানান, ‘চুদুর-বুদুর’ কথাটি অভিধানে নেই ঠিকই কিন্তু কথাটি অসংসদীয় নয়। কারণ কথাটি উপভাষা যা ভাষারই আঞ্চলিক রূপ মাত্র। তাই এক্ষেত্রে শাস্তি দেওয়া যায় না।
‘জুমলাবাজি’, ‘গুন্ডাবাজি’, ‘ভাঁওতাবাজি’, ‘গুনস’ ইত্যাদি শব্দগুলি হিন্দি, ছত্তিশগড়ি, অওধি, বুন্দেলখন্ডি ইত্যদি ভাষারই রূপ। ‘কোভিড স্প্রেডার’, ‘ব্লাডি’, ‘ব্লাডশেড’, ‘বিট্রে’, ‘অ্যাশেমড’, ‘কাওয়ার্ড’, ‘করাপ্ট’, ‘ক্রিমিনাল’, ‘ড্রামা’, ‘আইওয়াশ’, ‘ফুলিশ’, ‘হিপোক্রেসি’ বা ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’-এই শব্দগুলি ইংরেজি। এমনকি ‘চামচা’, ‘চামচাগিরি’, ‘চেলা’, ‘বেচারা’, ‘বেহরি’ (বধির), ‘বাল (শিশুসুলভ) বুদ্ধি’, ‘ঢিন্ঢোরা পিটনা’ (ঢেঁড়া পেটনো), ‘গাদ্দার’ (বিশ্বাসঘাতক) এই শব্দগুলিও স্ল্যাং নয়। আসলে বিরোধীরা এই সব শব্দ ব্যবহার করে সরকারের সমালোচনা করে সে কারণেই এগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মোদী সরকার বিরোধীদের কাছ থেকে কোনও ধরনের সমালচনা চায়না, তারা সংসদ সদস্যদের কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। এই তালিকা মোদী সরকারের ‘স্বৈরাচারী’ মনোভাবেরই প্রতিফলন। ফ্যসিস্টরাই শব্দ বা শব্দবন্ধের উপর নিষেধাঙ্গা চাপিয়ে ভাষাসন্ত্রাস সৃষ্টি করে।