কবি লিখেছিলেন, “ঐ নূতনের কেতন ওড়ে, কালবোশেখীর ঝড়”। সমাজবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ ‘নতুন’ কথাটা সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। তারা বলছেন, সব নতুনই পুরনো হয় তাই তা দিয়ে আর পরিবর্তিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায়না। ‘পুরাতন’ কথাটার মত ‘নতুন’ কথাটাও একটা স্থির ব্যাপার। তাই তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহার করছেন ‘নেক্সট’ কথাটা। কোভিড সংক্রমণ পরবর্তী সময়ে এই ভাবনার হাত ধরেই এসে গেছে ‘নেক্সট নর্মাল’ বাক্যবন্ধটি।
লকডাউন, রিকভারি, নিউ নর্মাল পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছেছি নেক্সট নর্মালে। নিউ নর্মাল কথাটা অবশ্য ততটা নতুন নয়, ২০০৭-৮ পরবর্তী আর্থিক সঙ্কটকে বোঝাতে নিউ নর্মাল বা নতুন স্বাভাবিকতা কথাটা প্রথম ব্যবহৃত হয়। তারও পরবর্তী সময়ে ২০০৮-১২ আর্থিক পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হত, ‘নিউ নিউ নর্মাল’ কথাটি। গত বছরের প্রায় গোড়ার দিক থেকেই নিউ নর্মাল শব্দটি আবার শোনা যেতে থাকে। এখন কোভিড সংক্রমণ পরবর্তী কালপর্বকে বোঝাতে পরিচালন বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা ব্যবহার করছেন ‘নেক্সট নর্মাল’।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে নিউকে হঠিয়ে নেক্সট এল কেন? সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘পুরনো’ কথাটা-র মতো ‘নতুন’ কথাটাও একটা স্থির অবস্থা বা বিষয়কে বোঝায়। বহতা সময়ের গতিশীলতাকে তাতে ধরা যায়না। কারণ কোন কিছুই চিরনূতন নয়। ব্যাক্তি, সময়, পরিস্থিতি, বিষয় কোন কিছুই সবসময় নতুন থাকেনা। তাই নতুন বা নিউ’র বদলে নেক্সট বা পরবর্তী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তী শব্দটির মধ্যে রয়েছে একটা সতত পরিবর্তনশীলতা।
হালফিল লোকের মুখে মুখে ফেরা নেক্সট নর্মাল কথাটা প্রথম ব্যবহার করে মার্কিন মুলুকের বিখ্যাত পরিচালন সংস্থা ম্যাকিনসে। যাতে বোঝাতে চাওয়া হয়েছিল কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরের সময়কার কথা বা কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবী। এটা ঘটনা কোভিডের আগের আর পরের পৃথিবীর ফারাকটা এখন বেশ স্পষ্ট। নেক্সট নর্মাল কথাটা এই পরিবর্তনকে সঠিকভাবেই ধরছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ২০২১ হবে বদলে যাওয়ার বছর, ‘ইয়ার অফ ট্রানজিশন’। নেক্সট নর্মাল কথাটা ধরবে এই গতিশীলতাকে। মানুষ, রাজনীতি, অর্থনীতি, অবস্থা সবকিছুতেই এবছর একটা বিরাট পরিবর্তন আসবে। বদলাবে মহাদেশগুলির আর্থ সামাজিক বিন্যাস ও পৃথিবীতে শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্য। বিভিন্ন দেশের মানুষের মনোভঙ্গী এবং জীবনযাপনের অভ্যাসে বিরাট বদল আসবে। মানসিকতার এই পরিবর্তন দেশগুলির অগ্রগতিতেও ছাপ ফেলবে। তার লক্ষণও ইতিমধ্যেই পরিস্কার।
যেমন ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানির মত দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি। তারা মোটেই অবস্থা সম্পর্কে খুব একটা আশাবাদী নন। তাদের কাজ ও ভাবনাচিন্তাতেও এই মানসিকতা ফুটে উঠছে। অন্যদিকে ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার অগ্রগতিকে প্রভাবিত করবে এক আশাবাদ। কারণ এই দেশগুলিতে তরুণদের সংখ্যা বেশি। তারুণ্যের আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত হবে দেশের অগ্রগতিতে। এই কনফিডেন্স ‘নেক্সট নর্মাল’ এর একটা জরুরি বিষয়।
একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। আমেরিকার মানুষদের ছুটি ও উপহার বাবদ ব্যয় কমেছে। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে খরচ করছেন জনসংখ্যার মাত্র এক তৃতীয়াংশ। চিনে তা ৮০ শতাংশ। ম্যাকিনসে বিশ্বে ১৩টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে কমপক্ষে সে দেশগুলির দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নতুন ধরণের জিনিস কিনতে চান। অর্থাৎ তাদের প্রয়োজনীয়তার ধরণ ও বিষয়গুলিও বদলেছে।
নেক্সট নর্মালে সামাজিক সংগঠনগুলির চেহারাও বদলাবে। এই প্রভাব রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সবরকম সামাজিক সংগঠনের ওপর পড়বে। কমবে ম্যানেজমেন্ট নির্ভরতা, জোর বাড়বে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের ওপর। এই নেতারাই এ পর্বের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আদর্শ, অর্থনীতি, সংগঠনের কাঠিন্য সরিয়ে মানুষ খুঁজবেন মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন এবং বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা নেতা। আর্থ-সামাজিক সমস্যা নয়, পৃথিবীকে প্রভাবিত করবে কোভিড পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বিশেষ সমস্যাগুলি। এ ঘটনা ঘটবে সারা বিশ্ব জুড়ে। সংক্রমণ কমলেও কোভিড চলে গেছে এমন বলা যাবে না। নানা সমস্যার মধ্যে তার অস্তিত্ব থেকেই যাবে। এ হল নেক্সট নর্মাল।