বেণীমাধব শীল সম্পর্কে আমার বিশেষ কিছু জানা নেই। তবে এখন প্রতি বছর নিয়ম করে খবরের কাগজ থেকে ডিজিটাল মিডিয়ায় তার ছবি-সহ পঞ্জিকার ছবি দেখে বুঝতে পারি নববর্ষ আসছে। অন্য কিছু দেখে না বুঝলেও বাংলা পঞ্জিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলা নববর্ষের কথা। নতুন বছরে কোন তিথি নক্ষত্রে কি করতে হবে তার নির্দেশ থাকে তাতে। আর থাকে বাঙালির ভবিষ্যতের নির্ভুল খবর। ‘শীল’ পদবী এবং বেণীমাধবের ছবি দেখেই পঞ্জিকা কেনার নির্দেশ দেয় বিজ্ঞাপন। এই বেণীমাধব, গানের বেণীমাধব নয়, তাই দেখেশুনে কিনতে হবে।
ইংরেজি নতুন বছরের ধামাকায় বাংলা নববর্ষ এখন বেশ ম্রিয়মাণ। তার কথা এখন প্রায় কেউ বলে না, কোলাহল তো একেবারেই নেই। যেমন তেমন করে ছাপা সামান্য কিছু বাংলা ক্যালেন্ডার, পঞ্জিকা আর মুদি দোকানের হালখাতা ‘বসন্ত এসে গেছে’ গানটার মত বলে দেয় ‘নববর্ষ’ এসে গেছে। তর্কশীল ও আপাদমস্তক আন্তর্জাতিক বাঙালির তাতে খুব একটা কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না। একটা সময় নববর্ষ মানে ছিল নতুন থিয়েটার আর সিনেমা। পাড়ায় পাড়ায় বসতো থিয়েটার আর গানবাজনার আসর। হত প্রভাতফেরী সহ নানারকমের অনুষ্ঠান। প্রায় সব বাঙালি বাড়িতেই নববর্ষ উপলক্ষ্যে বিশেষ কিছু খাওয়া দাওয়া হত। এখন সবকিছু প্রায় গোল্লায় গেছে। তাতে যে লোকজন খুব একটা মুষড়ে পড়ছেন এমনটাও নয়। ‘শুভ নববর্ষ’র থেকে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলায় আমরা এখন অনেক বেশি স্বছন্দ। তাতে খুব একটা আপত্তি নেই কিন্তু বাংলা নববর্ষকে আমরা কেমন যেন নীরবে একটা অতীতের ব্যাপার করে তুললাম। এটা ভেবে একটু অবাক লাগে!
নববর্ষে পাড়ার দোকানে হালখাতা করতে যাওয়া, মিষ্টির প্যাকেট ও ক্যালেন্ডার নিয়ে বাড়ি ফেরার মধ্যে ব্যাপক একটা উত্তেজনা ছিল। অনেকে অবশ্য বলেন এটা দোকানদারদের ক্রেতাদের নেমন্তন্ন করে বকেয়া আদায়ের এক টেকনিক। যাইহোক না কেন, মিষ্টির প্যাকেট, ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার, ঠাণ্ডা পানীয় খোলার ফটাফট শব্দে নববর্ষের সন্ধ্যা ছিল যে কোন পুজোর সন্ধ্যার মতই জমজমাট। তা হয়ে উঠতো বেশ একটা আকর্ষণীয় ব্যাপার। বাংলা ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করতে তো রীতিমত প্রতিযোগিতা চলতো। নাটকীয় পৌরাণিক ঘটনা থেকে শুরু করে দেশপ্রেম, লাস্যময়ী নায়িকা থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সবারই সেখানে ছিল অবাধ বিচরণ। একটু নাক উঁচু লোকেরা অবশ্য বাংলা ক্যালেন্ডারকে কোনকালেই পাত্তা দিতেন না। ইতিহাসের এটা পরম কৌতুক যে এখন দেশ বিদেশের শিল্পরসিকরা যে কোন মূল্যে তা সংগ্রহ করছেন। সেসব ছবির মধ্যেই পড়ে ফেলা যাচ্ছে বটতলার কাঠখোদাই ছবি থেকে লিথোগ্রাফি, ক্রমো লিথোগ্রাফি কিংবা তারও পরের আমল পর্যন্ত ছাপাই শিল্পের অগ্রগতির ইতিহাস।

পয়লা বৈশাখ থেকে নববর্ষের সূচনা কিনা তা নিয়ে অবশ্য বহুদিন থেকেই মতভেদ রয়েছে। আগে নববর্ষ শুরু হত দশমীর পর থেকে, সে পন্ডিতরা যাই বলুন না কেন, বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব তাতে খুব একটা খর্ব হয়নি। আমাদের বেশিরভাগ উৎসবই পুজোকেন্দ্রিক। নববর্ষের হালখাতা, সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজো ইত্যাদির ব্যাপার থাকলেও এটা ছিল কিন্তু আদতে একটা সামাজিক উৎসব। লোকের বাড়িতে যাওয়া আসা তো ছিলই, তাছাড়াও পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে লাইব্রেরি কিংবা ব্যায়াম সমিতিগুলিও নিজেদের মত করে নববর্ষ উৎসব পালন করতো। কিন্তু ইংরেজি নতুন বছরের গ্লোবাল দাপট বাংলা নতুন বছরের গুরুত্বকে খর্ব করে দিয়েছে।
পাঁজি পুঁথিতে যে বিধানই দেওয়া হোক না কেন এখন জন্মস্থল থেকে কর্মস্থল সব কাজকর্মই চলে ইংরেজি বর্ষপঞ্জী মেনে। পুজোআচ্চা, ভাগ্যগণনা আর বিয়ের তিথি নক্ষত্রেই বাংলা বর্ষপঞ্জী কোনমতে টিঁকে রয়েছে। সেখানে এখনও থেকেই থেকেই ডাক পরে গুপ্ত প্রেস আর বেণীমাধব শীলদের। এক্ষেত্রে এখনও তাদের গুরুত্ব মোটেই খর্ব হয়নি। এমনও দেখছি রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হচ্ছে তিথি নক্ষত্র মেনে। বাংলার মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যে বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ, পৈতে, গৃহপ্রবেশ সহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে বাংলা বর্ষপঞ্জীর একটা গুরুত্ব এখনও রয়েছে। ‘বাংলা’ সেখানে এখনও মোটেই কোন ‘তুচ্ছ’ ব্যাপার হয়ে যায়নি।
‘বাংলা’ ব্যাপারটাকেই একশ্রেণীর মানুষ কেমন যেন একটা ‘নাহলেও চলে’ গোছের ব্যাপার করে তুলেছেন। যে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন মানুষ, যে ভাষার নামে একটা দেশ, যে ভাষার নামে একটা রাজ্য, তাকে একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর ব্যাপার করে তোলা অনেকের যেন একটা মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ভূখণ্ডের মানুষরা নিজেদের কাজের সুবাদে ধারাবাহিকভাবে ঢুকে পড়ছেন ইতিহাসে সেই বাংলার নিজস্ব বর্ষ উদযাপনের উৎসব আজ গুরুত্বহীন। আমাদের দেশের অন্য কোন রাজ্যে এমনটা হয় না।

বাংলার নববর্ষ এবার একটু গুরুত্ব পাক। নববর্ষকে নতুন চোখে দেখার মধ্যে দিয়ে শুরু হোক – আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, সাফল্য ও ব্যর্থতাকে নতুন করে আবিস্কার ও মূল্যায়নের প্রয়াস। এটা ‘জাগো বাঙালি’ মার্কা কোন ব্যাপার নয়, বরং একটা আত্মানুসন্ধান। তা নাহলে আমরা এগোতে পারবো না। আমাদের অবশ্যই বিনয়ী হতে হবে। নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রতিবেশী রাজ্য বা দেশের অন্য প্রান্তের মানুষদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো না আমরা। আবার ‘নীরবে মেনে নেওয়ার অভ্যাস’ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ বিনয় মানে কিন্তু নিজেদের অস্তিত্বহীন করে তোলা নয়। নিজেদের বিশেষত্ব, সাফল্য ও অগ্রগতিকে তুলে ধরাটাকে ‘অভদ্রতা’ ভাবার বদভ্যাসটা ছাড়তে হবে আমাদের। এবং এটা করার মধ্যে কোন অন্যায় নেই।
নববর্ষে বাঙালি এবার একটু নিজের দিকে তাকাক। আমাদের বিনয়, সহনশীলতা, ভদ্রতা নিজভূমে পরবাসী করে দিচ্ছে আমাদের। নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস নিয়ে বিদ্রুপকেও গায়ে মাখিনা আমরা। ভাবিনা এটাকে অনেকে দুর্বলতা ভাবে। আমরা ভুলে যাই নিজেদেরকে আমরা যদি সন্মান করতে না শিখি তাহলে অন্যরা আমাদের সন্মান করবে না। কেউ কায়দা করে বাংলা ভাষার প্যারোডি করে ‘সোনার বাংলা হামি তুমাকে ভালোবাসি’ জাতীয় দু-চারটে কথা ছুঁড়ে দিলেও তা নিয়ে উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করি আমরা। ‘উদার’ হওয়ার মোহে আত্মপরিচয় ভুলে যাওয়ার এমন অপকর্ম ভূভারতে শুধু বাঙালিই করতে পারে।

আসুন, নির্বিচারে সবকিছু মেনে নেওয়ার বদলে এই নতুন বছর থেকে আমরা সবাই নিজেদের দিকে একটু ভালোভাবে তাকাই। নতুন বাংলা বছর থেকে আমাদের এই মানসিকতা বদলের সূচনা হোক। দেখবেন, ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাবা বন্ধ হয়ে গেছে। বিনয়কে আর বোকামি বলে ভাবা হচ্ছে না। সত্যি বলতে কি, কোন দিক থেকেই হীনমন্যতার কোন কারণ আমাদের নেই। এটা যারা মানেনা তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমাদের। দেখবেন, আপনার প্রতি অন্যদের আচরণও বদলে যাচ্ছে। বাংলাকে আর পিছনে তাকাতে হবে না। শুধু অতীত নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাঙালির সাফল্য একালেও কম নয়। নববর্ষ এসে গেছে, আসুন আমরাও নিজেদের একটু বদলাই।