‘‘আমার ৩৫ বছর বয়সে বইটি লিখেছি। তখন আমি রিপোর্টার। এটি অসম্ভব জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বিক্রিত বই। আমার লেখা বইয়ের মধ্যে এটি এখনও পর্যন্ত সমানভাবে জনপ্রিয় বই।’’ মেমসাহেব উপন্যাস প্রসঙ্গে এই কথা বলেছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। আমার সঙ্গে শেষ দেখা ২০১৯। প্রফুল্লদার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে নিমাইদার বাড়িতে গেছিলাম পূজা সংখ্যার লেখা চাইতে। বেশ অসুস্থ, বললেন লিখতে পারবো না। আর আমি তো ছোটগল্প বিশেষ লিখি নি। বলেছিলাম, অন্য কিছু, আপনি বলবেন আমি লিখে নেব। পরে এসো। সেই পরে আর হয়ে ওঠে নি। আজ সংবাদটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
যেটুকু সময় ছিলাম সেই ফাঁকেই মেমসাহেব নিয়ে দু-একটা কথা হয়েছিল। আমি এখনও সময় পেলে দেবদাস যেমন পড়ি, তেমনি মেমসাহেবও পড়ি। কেমন যেন মনটা ভালো হয়ে যায়। কিভাবে লিখলেন মেমসাহেব? তখন আমি দিল্লিতে। রিপোটিংয়ের কাজে কখনো দিল্লি, কখনো ব্যাঙ্গালোর, কখনো নেপাল বা অন্য কোথাও যেতে হতো। রিপোর্ট লিখে পাঠানোর তাড়া থাকতো। যেখানে বসে রিপোর্ট লিখতাম, এর ফাঁকে ফাঁকেই লিখেছি উপন্যাসটি। একটা উপন্যাসের ৫০ বছর হয়েগেল এখনও সেই উপন্যাস সমান জনপ্রিয় এটা ভেবেই খুব ভালো লাগে। বইটা ১৯৬৮ সালে প্রকাশ হয়। মেমসাহেব কে? ‘‘রিপোর্টার যেমন বই, মেমসাহেবও তেমনি। এটি পাঠক সমাজ ভেবে নিক। তবে মেমসাহেব চরিত্রটি একেবারেই কাল্পনিক।’’
নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ উপন্যাসটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। মেমসাহেব চলচ্চিত্র রূপ পায় ১৯৭২ সালে। তাতে কেন্দ্রীয় বাচ্চু চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। মেমসাহেব হয়েছিলেন অপর্ণা সেন। ‘মেমসাহেব’ ছাড়াও ‘রিপোর্টার’, ‘ডিপ্লোম্যাট’, ‘বংশধর’, ‘পিকাডেলি সার্কাস’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘কয়েদী’সহ অসংখ্য বই লিখেছেন নিমাই ভট্টাচার্য। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দেড়শ’র অধিক। বার্ধক্যজনিত কারণে বৃহস্পতিবার ২৫ জুন রানীকুঠিতে নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শোকপ্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিশিষ্ট সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের প্রয়াণে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি আজ কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
সাংবাদিক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে নিমাইবাবু সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রায় দেড়শোটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মেমসাহেব’ চলচ্চিত্রায়িত হয়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ডিপ্লোম্যাট’, মিনিবাস, ‘ব্যাচেলর’, ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’, ‘পথের শেষে’ ইত্যাদি। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্য জগতে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হল। রাজ্য সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রদান করেছে। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ দীর্ঘদিনের। আজকের দিনে তাঁর এই চলে যাওয়ায় আমি ব্যক্তিগত বেদনা অনুভব করছি। ওনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকার ফলে খুব খারাপ লাগছে। আমি নিমাই ভট্টাচার্যের পরিবার-পরিজন ও অনুরাগীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
নিমাই ভট্টাচার্য ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার (বর্তমান জেলা) শালিখা থানার অন্তর্গত শরশুনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যশোরের সম্মিলনী ইন্সটিটিউশনে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। তারপর ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় চলে আসেন কলকাতায়। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার নাড়ি বাংলাদেশেই পোঁতা। বাবা-দাদার ভিটে যশোরের শুরশুনা গ্রামে। ছায়াঢাকা গ্রাম ছিল শুরশুনা। আমাদের বাগান ছিল। পুকুর ছিল। তবে রাস্তাঘাট ছিল খুব খারাপ। আমি আমার বাবা-দাদার সেই শুরশুনা গ্রাম আর সম্মিলনী ইনস্টিটিউটের কথা কোনো দিন ভুলব না। এখানে আমার মায়া জড়িয়ে রয়েছে। তবে আমার জন্ম কিন্তু কলকাতা নারকেলডাঙ্গার রেল কোয়ার্টারে ১৯৩১ সালে। বাবা রেলে চাকরি করতেন। এরপর ১৯৪৪ সালে বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যাপক মহিতোষ রায়চৌধুরী যশোরে প্রথম কলেজ গড়ার উদ্যোগ নিলে বাবা সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্ব নেন। কলকাতায় আসার পর লোন অফিসপাড়ায় থাকতাম আমরা। তখন ইংরেজবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে।”সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর দিল্লিতে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-সংসদীয় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর কথায় ‘সাংবাদিকতার জীবন সম্পর্কে বললেন, “১৯৫০ সালে ‘লোকসেবক’ পত্রিকার মাধ্যমে আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। শুরুতে আমার বেতন ছিল ১০ টাকা। এরপর কয়েকটি কাগজে কাজ করেছি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক রিপোর্ট লিখেছি। সাংবাদিক হতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়। আর থাকতে হয় দূরদর্শিতা। একজন সৃজনশীল মানুষ ভালো সাংবাদিক হতে পারে’’।
উপন্যাস লেখার অনুপ্রেরণা, ‘‘আমি তখন রিপোর্টার। একদিন দিল্লিতে ‘অমৃত’ পত্রিকার তুষার কান্তি ঘোষের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে বললেন, তুমি গল্প-উপন্যাস লেখা শুরু করো। তাঁরই উৎসাহে আমি উপন্যাস লেখা শুরু করি। আমার প্রথম উপন্যাস ‘রাজধানীর নেপথ্যে’। উপন্যাসটি ‘অমৃত’-এ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। তুষারবাবুর অনুরোধে পরে আমি ‘রিপোর্টার’ নামের আরেকটি উপন্যাস লিখি। এটিও ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। এরপর ছাপা হয় ‘ভিআইপি’ উপন্যাসটি। ১৯৬৪ সালে রাজধানীর নেপথ্যে উপন্যাসটি বই আকারে বের হয়। বরেণ্য অধ্যাপক, দার্শনিক একসময় ভারতের রাষ্ট্রপতি সর্বোপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন।’’ তিনি অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের খুব কাছে এসেছিলেন যেমন জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ভি কে কৃঞ্চমেনন, মোরারজী দেশাই, ইন্দিরা গান্ধী-সহ অনেকের স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলন, কমনওয়েলথ সম্মেলন-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও বিখ্যাত নেতৃবৃন্দের সফরেসঙ্গী হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। তাঁর কথায়, ‘মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে আমার মা মারা যান। আমি বাবার কোলেই মানুষ হয়েছি। তবে আমাদের খুব অভাব ছিল। দারিদ্র্য আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। খাবারের কষ্ট ছিল। তবে আমি হারতে চাইনি।’