আগাছার জঙ্গলে থমকে ইতিহাস। অবহেলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত সপ্তদশ শতকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিমকমহল বা বড়কুঠি। সংস্কার আর সংরক্ষণের অভাবে নিমকমহলের ধ্বংসস্তূপে আগাছার জঙ্গল। তবুও ইতিহাস থেমে থাকেনা। আগাছার জঙ্গলে থমকে ইতিহাস।
ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা ইতিহাসের চুপ কথা জানান দেয়, স্বাধীনতা আন্দোলন বা তারও আড়াই শতক আগে থেকেই মেদিনীপুর জেলার কাঁথির এক গৌরবময় পরিচিতি ও অবদান রয়েছে। ‘বিপ্লবতীর্থ’ নামে পরিচিত কাঁথির প্রথম মহকুমা শাসকের প্রাচীন অফিস ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এই ‘বড়কুঠি’তেই স্থাপিত হয়েছিল। প্রশাসনিক উদাসীনতায় আজ হারিয়ে যেতে বসেছে বা কার্যত হারিয়ে গেছে নিমকমহলের লবণ ব্যবসার সেই প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র বড়কুঠি। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নানা সময়ে প্রশাসনের কাছে বড়কুঠিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা, সংরক্ষণের ও সংস্কারের আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু কাকস্য পলিবেদনা। তারপরেও শুরু হয়নি সংস্কারের কাজ।

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা কাঁথির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রাক্তন কালেক্টর ও প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ ভি বেলিও’র মতে, খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীতে প্রবল বন্যায় ওড়িশার চিলিকা হ্রদের একদিকে যেভাবে বালুকাময় ভূমিখণ্ড গঠিত হয়েছিল, ঠিক তেমনভাবেই এককালে অজস্র বালিয়াড়ি ভরা কাঁথি মহকুমার ভূখণ্ডও গঠিত হয়। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন মানচিত্রে কাঁথি নামে কোনও স্থানের উল্লেখ ছিল না। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ভ্যালেন্টিনের বাংলাদেশের মানচিত্রে বঙ্গোপসাগরের উপকূলভাগে ‘কেন্দুয়া’ নামে যে স্থানকে চিহ্নিত করা হয়, সেই জায়গাটিই হল আদি কাঁথি। ভাষাতত্ত্ববিদ যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে,“কাঁথির বিস্তৃত অঞ্চলে বালিয়াড়ি বা বালির দেওয়াল (কাঁথ) থাকায় সেই নাম থেকেই কাঁথি নামকরণ করা হয়েছে।”
সপ্তদশ শতকের শেষভাগেও কাঁথি তেমন প্রসিদ্ধ জায়গা ছিল না। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে লবণ ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে কাঁথি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে লবণ ব্যবসার স্বার্থে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাঁথির (তখনও কাঁথি নামকরণ হয়নি) পূর্ব কুমারপুর মৌজায় লবণ ব্যবসার এজেন্ট অফিস তৈরি করে। ১৭৮৮ সালে কোম্পানির ‘সল্ট এজেন্ট’ হিসেবে এন ডবলিউ হিউয়েট নিযুক্ত হওয়ার পর কাঁথিতেই লবণ ব্যবসার স্থায়ীকেন্দ্র হিসেবে নিমকমহল তৈরি করে কাঁথি ও হিজলি পরগনায় লবণ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উদ্যোগী হন। হিজলি পরগনার মাজনামুঠার রাজা যাদবরাম রায়ের রানি সুগন্ধা দেবীর কাছ থেকে বার্ষিক এক টাকা খাজনার শর্তের বিনিময়ে পূর্ব কুমারপুর, আঠিলাগড়ি, পশ্চিম কুমারপুর — এই তিনটি মৌজার ৩০৫ বিঘা জমি কিনে নিমকমহল তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। পরে ডনির্থন নামে আরও এক ‘সল্ট এজেন্ট’ ওই জমির উপর তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেন। কথিত আছে, ডনির্থন সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এদেশে আসা বাণিজ্য জাহাজ গুলির ভারসাম্য রাখার জন্য ব্যবহৃত ব্যাসাল্ট ইট দিয়ে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। পরে এই বাড়িটি নিমকমহল বা বড়কুঠি নামে খ্যাতি লাভ করে।

নিমকমহলের নির্মাণ শৈলী থেকেই বোঝা যায়, সওদাগরি অফিসের ধাঁচেই এই কুঠিটি তৈরি হয়েছিল। ওই কুঠীর এক তলায় অফিসের কাজকর্ম চলত। দোতলা আর তিনতলায় ছিল লবণ ব্যবসার কাজে নিযুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের বাসভবন। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি কাঁথি, খেজুরি, রামনগর এগরা আর পটাশপুর এই ৬টি থানা নিয়ে কাঁথি মহকুমা গঠিত হল। ১৮৫৭ সালে রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণা অনুসারে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হল ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ শাসন। তবে তারপরেও বেশ কিছুদিন বর্তমান এগরা মহকুমার নেগুয়াতেই কাঁথির মহকুমা শাসকের অফিস চালু ছিল। প্রায় ১১ বছর পরে ১৮৬৩ সালে নেগুয়া থেকে মহকুমা শাসকের অফিস পাকাপাকি ভাবে উঠে আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিমক মহলের পরিত্যক্ত বড়কুঠিতে। ইংরেজ সরকার ওই জমি ও বড়কুঠি লবণ এজেন্ট ডনির্থনের কাছ থেকে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ২৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে মহকুমা শাসকের কাছারী, বাসভবন ও উদ্যান তৈরি করা ছাড়াও হিজলির যুদ্ধে (১৬৮৭) ব্যবহৃত চারটি কামান হিজলি থেকে নিয়ে এসে সৌন্দর্যায়নের জন্য বসানো হয়েছিল। বর্তমাননে নিমকমহলের ধ্বংসস্তূপের সামনে দুটি কামান দেখা গেলেও বাকি দুটি কামানের কোন হদিস নেই।

১৯৪২ সালে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বড়কুঠির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বড়কুঠির প্রথম ও দ্বিতীয় তলার একাংশ ভেঙে পড়ে। ক্ষতি হয় তৃতীয় তলারও। বর্তমান কাঁথি মহকুমা শাসকের অফিস চত্বরের পাশে অতীত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বড়কুঠি। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বড়কুঠিতে কাঁথির ফৌজদারি আদালত ও মহকুমা শাসকের কিছু দফতরের কাজকর্ম চলত। অবহেলা, উপেক্ষা আর দীর্ঘ দিন সংস্কারের অভাবে ইতিহাস বিজরিত নিমকমহলের বড়কুঠি আজ খন্ডহর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের নীরব নির্মম সাক্ষী ‘ হয়ে। হিজলীনামা’ গ্রন্থের লেখক, ইতিহাসবিদ ও কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রেমানন্দ প্রধানের কথায়, “প্রশাসনিক উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের উদ্যমের অবাবে শতাব্দী প্রাচীন এই বড়কুঠির গৌরবময় ইতিহাস আজ বতর্মান প্রজন্মের কাছে নক্কারজনক উপহাসে রূপান্তরিত হয়েছে। অবিলম্বে সরকার ও হেরিটেজ কমিশনের পক্ষ থেকে কাঁথি ও হিজলি পরগনার ঐতিহাসিক স্মৃতি বিরজিত বড়কুঠিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে উপযুক্ত সংরক্ষণ করার দরকার।” প্রেমানন্দ প্রধানের কথায়,”অনেক দেরি হয়ে গেলেও এক্ষুনি করা দরকার অন্তত ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য”।
আমরাও কী পারিনা,,যারা আঞ্চলিক ইতিহাসে র কথা নিয়ে আলোচনা সভা করি,,,,একটু হাত লাগানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেওয়ার জন্য,,,,,,।ওখানে গিয়ে,,,,ওখানে তো একটি সভার আয়োজন করতে পারি,,,,,,,স্বচ্ছতা অভিযান তো অনেক ভাবেই হল হচ্ছে ও আমাদের স্বচ্ছতা অভিযান এ ভাবেই হোক,,,,, খেজুরী তে ও ,,,