| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

যুক্তিমূলক গদ্য রচনায় উনিশ শতকীয় বাঙালি নারী : শ্যামলী মিশ্র

Reporter
শ্যামলী মিশ্র / ১৬৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৩

বাঙালির চেতনা জগতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল উনিশ শতকে। নব আলোকদীপ্ত বাঙালি সমাজের পাশ্চাত্য ভাবধারার অভিঘাত উপেক্ষা করার ক্ষমতা ছিল না। অচল অনড় প্রাচীন বিশ্বাসের জগতে পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এই পরিবর্তনের সিংহভাগ জুড়ে ছিল কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে অভ্যস্ত নারীরা। বিধি-নিষেধের ঘেরাটোপের আড়ালে বসবাসকারী নারী এতোকাল অশিক্ষা আর সামাজিক নানান ব্যাধির বলি হয়ে এসেছে। পুরুষের ইচ্ছায় এবং প্রয়োজনে গড়ে ওঠা জীবনে স্বাভাবিকভাবেই নারীর আলাদা কোনো অস্তিত্ব, ইতিহাস এতকাল ছিল না। আধিপত্যবাদী এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য আলোকপ্রাপ্ত সচেতন ও সংবেদনশীল প্রগতি পন্থীরা বহন করে নিয়ে আসেন নতুন চিন্তাধারা। তারই ফলস্বরূপ উনিশ শতকে মেয়েদের নিয়ে কয়েকটি সামাজিক আন্দোলনও (সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, স্ত্রী শিক্ষা) গড়ে উঠেছিল।

বাঙালি মাত্রই জানেন উনিশ শতকে সাধারণ গৃহস্থ ঘরের মেয়েরা ছিল জঞ্জালের সামিল। ‘মেয়ে জন্মালে আঁতুড় ঘরের দরজায় পদাঘাত করে তাকে পৃথিবীতে অভ্যর্থনা জানানোই ছিল সেকালের রীতি।’(চিত্রা দেব) সেই অসম্পূর্ণ অল্প বুদ্ধি মেয়েরা লেখাপড়া শিখে পুরুষের সমকক্ষ হতে চাইবে এটা কল্পনা করাও ছিল অবিশ্বাস্য। উনিশ শতকে যে পুরুষেরা অশিক্ষিত ছিলেন তারা নানান কারণে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সুযোগের অভাব নয় তাদের লেখাপড়া শিখতে চাওয়াটাই ছিল ঘোর অপরাধের। রাসসুন্দরীর আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি লেখাপড়া শেখার ইচ্ছে মনে মনে বহন করাটাও ছিল কতটা ভয়ের ! অজস্র প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে শুরু করেন। রাসসুন্দরী দাসীর কথাই ধরা যাক, ‘রাঁধার পর খাওয়া আর খাওয়ার পর রাঁধা’ এক চাকাতে বাঁধায় অভ্যস্ত রাসসুন্দরী দাসীর গতানুগতিক জীবনে হঠাৎ পরিবর্তন আসে। ভোররাতে দেখা স্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। রাঁধাবাড়ার কাজ করতে করতে তিনি আকুল হয়ে মিনতি জানান- ‘হে দীননাথ, আমি কল্য স্বপ্নে যে পুস্তকখানি পড়িয়াছি তুমি ঐ পুস্তকখানি আমায় চিনাইয়া দাও। ঐ চৈতন্যভাগবত পুঁথিখানি আমায় দিতেই হইবে।’ তাঁর স্বপ্ন সত্য হয়। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় অক্ষর পরিচয় ঘটে এবং চৈতন্যভাগবত নিজেই পাঠ করতে পারেন অন্যের সাহায্য ছাড়াই। তারও অর্ধশতাব্দী পরে করিমুন্নেষা অন্যের সাহায্য ছাড়াই লেখাপড়া শিখে ফেলেন। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই মেয়েদের মধ্যে লেখাপড়ার বিস্তার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি বুঝতে পারল শিক্ষার অভাবই বাঙালি মেয়েদের পশ্চিমের মেয়েদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। ‘নব্য শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক সকলে না হলেও কেউ কেউ চাইলেন সহধর্মিনীকে লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলতে’ স্ত্রী শিক্ষা বিরোধী দলের প্রচার এবং বাধাদান সত্ত্বেও মেয়েদের জন্য অবশেষে বিদ্যালয় চালু হলো। ‘নানাভাবে শিক্ষার সুযোগ পাবার ফলে মেয়েদের লেখা চিঠি সাময়িক পত্রে প্রকাশ পেতে পারল উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই, সংখ্যায় খুব অল্প হলেও। এতই অল্প যে, তাতে বলা যাবে না মুদ্রণ সংস্কৃতিতে জায়গা পেয়ে গেলেন মেয়েরা…’(সুতপা ভট্টাচার্য) ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আরও বেশিসংখ্যক মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। শিক্ষিত নারী শিক্ষার আলোয় সমাজে তাদের অবমাননাকর অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করেছিলেন। নিজেদের দুরবস্থা প্রকাশ করার তাগিদ ছিল প্রবল। ইচ্ছের জোরই বুকের মধ্যে সাহস যোগায় আর সেই সাহসেই চিঠি পত্র, গদ্য, কবিতা, গল্পে একটু একটু করে তারা নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেন।

নাম পরিচয় গোপন করে ‘অমুকী দেবী’ ছদ্মনামে ১৮৩১ সালে ‘সম্বাদ কৌমুদী’ তে লেখা চিঠিটিই সম্ভবত সাময়িকপত্রে মেয়েদের প্রকাশিত প্রথম চিঠি। কুলীন বিবাহ প্রথার বলি ভাগ্যবঞ্চিত নারীর জীবন কথা শুনিয়েছেন তিনি। আশা করেছেন পত্রপাঠের দ্বারা শিক্ষিত জনমানসে বহুবিবাহ রহিত করার প্রচেষ্টা আরো আন্তরিক হবে। যে নরক যন্ত্রণায় তাঁরা তিল তিল করে নিঃশেষ হয়েছেন আর কোন মেয়ে যেন ‘তাঁদের তুল্য দুখিনী’ না হয়। ১৮৩৫ সালে শান্তিপুর নিবাসী এবং চুঁচুড়া নিবাসী স্ত্রীগণ সাতদিনের অন্তরে দুটি চিঠি লেখেন। চিঠি দুটোর মূল আলোচ্য বিষয় কুলীন বিবাহের কুফল এবং বিধবা বিবাহ প্রবর্তন এর দাবি। ‘একথা ঠিক বিধবা বিবাহের পক্ষে রামমোহন ছিলেন, ‘আত্মীয়সভা’ তে এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এমন নয় যে মেয়েরাই প্রথম কথাটা তুললেন। তবু, যেভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন নারী পত্ররচয়িতারা, তা রীতিমতো মৌলিক, যথেষ্ট সাহসিক।’ কৌলীন্য প্রথা গ্রাম বাংলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়েছিল অশান্তির আগুন। কুলীন কন্যাদের জীবনে এই প্রথাই ছিল সবচেয়ে দুঃখের কারণ। উনিশ শতকের বহুবিবাহকারী ব্রাহ্মণেরা কেউ কেউ একশোরও বেশি বিয়ে করতেও দ্বিধা করেননি। মহামারীর মত জঘন্য এই প্রথার বিরুদ্ধে কুলীন কায়স্থ ব্রাহ্মণ ঘরের অরক্ষণীয়া পতিহীনা নারীরা প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পত্র লিখে। সমগ্র নারী সমাজের এটাই ছিল প্রথম প্রতিবাদ। নারী ও পুরুষের প্রতি সমাজের বিবিধ বিধানের প্রতিকার চেয়ে তাঁরা লেখেন- ‘যদ্যপি ঐ স্ত্রীলোকেরা উপপতি আশ্রয় করে তবে যে কুলোদ্ভবা সে কুল নষ্ট হয়। কিন্তু ঐ উভয় বিশিষ্ট কুলদ্ভব মহাশয়েরা অনায়াসে বেশ্যালয়ে গমনপূর্বক উপস্ত্রী লইয়া সম্ভোগ করেন তাহাতে কুল নষ্ট হয়না।’ শান্তিপুর নিবাসী পত্র লেখিকারা ‘ইংরেজ বাহাদুর’এর কাছে দাবি জানিয়েছেন- বিধবা বিবাহ আইন জারি যদি না করতে পারেন তাঁরা, তবে যেন এমন কোনো আইন প্রণয়ন করেন- ‘বিশিষ্ট কুলোদ্ভব মহাশয়দিগের উপস্ত্রী সহিত সম্ভোগ রহিত করেন।… কেননা স্ত্রীলোক ব্যভিচারী কেবল পুরুষের দ্বারা। যদ্যপি পুরুষ সকল উপস্ত্রী বর্জিত হন, তবে স্ত্রীলোক কুলটা হইতে পারে না।’ চুঁচুড়া নিবাসী মেয়েরা বিধবা বিবাহের সপক্ষে বলতে গিয়ে নারী পুরুষের সমান অধিকারের দাবি জানিয়েছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে- ‘ভার্যার মৃত্যুর পরে স্বামী পুনর্বিবাহ করিতে পারে তবে কেন স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পরে বিবাহ করিতে না পারে।’ বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৫) বলবত হওয়ার কুড়ি বছর আগে এসব চিঠি লেখা হচ্ছে। তখনও বিধবা বিবাহ নিয়ে কোনো আন্দোলন শুরু হয়নি। সমাজপতিদের ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে এমন যুক্তিক্রম সাজাতে কীভাবে সক্ষম হলেন এই সাহসী নারীরা ভাবলে অবাক হতে হয়।

পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরের ঐকান্তিক প্রয়াসে বিধবা বিবাহ আইন প্রচলিত হয়। টিকিধারি ব্রাহ্মণ সমাজ বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে প্রবল বাধা দেয়ার প্রয়াস করেন। এই সময় মেদিনীপুরের এক ভদ্রগ্রামের ব্রাহ্মণ বিধবারা একটি পত্র লেখেন বিধবা বিবাহ বিরোধীদের সমালোচনা করে। তাঁরা যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন- ‘তাঁদের নিজেদের বাড়ির বিধবারা অসহ্য ব্রহ্মচর্য ধর্ম প্রতিপালনে অপারগ হয়ে স্বেচ্ছাচারিণী হচ্ছে- সেও কি এরা চোখে তাকিয়ে দেখেন না?’ আলোচ্য চিঠিগুলি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট উনিশ শতকে অল্পসংখ্যক হলেও নারীর অন্তরমহলে যুক্তিবোধ ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল। একথা স্বীকার্য যে সময়ের সঙ্গে সমাজ মানসিকতার কিছু পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন ততো ঘটেনি। কেননা উনবিংশ শতকের শেষেও কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া ছিল মায়েরই অপযশ, বিবাহের যে উদ্দেশ্য তাকেই সে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। ‘বংশ রক্ষার জন্য বউয়ের আদর নইলে পরের মেয়ে ঘরে এনে জঞ্জাল বৈ ত নয়।’ অর্থাৎ সে সময়ও মেয়েরা পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্র ছাড়া কিছুই ছিল না।

বিশপ হিভার এ দেশে মেয়েদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন- ‘The roughest words, the poorest garments, the scantiest alms, the most degrading labour, and the hardest blows, are generally their portion.’ তবে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। ঐতিহ্য, সংস্কার, দেশজ রীতি প্রভৃতির দুর্লঙ্ঘ্য বাধা অতিক্রম করে মেয়েরা অল্প অল্প করে শিক্ষা লাভ করতে শুরু করেন। এর চেয়েও বড় পরিবর্তন দেখা যায় মেয়েদের নিজেদের যুক্তিবোধ প্রকাশের তাগিদের মধ্যে। কুণ্ঠিত পদচারণা থেকে নারী ক্রমশ উত্তীর্ণ হয় এক আত্মপ্রত্যয়ী দৃঢ়তার স্তরে। ‘১৮৬০ ‘সোমপ্রকাশ পত্রিকা’য় বামাসুন্দরী গদ্য রচনা প্রকাশিত হয়, সম্ভবত বাঙালি মেয়ের লেখা প্রথম প্রকাশিত গদ্য প্রবন্ধ।’(সুতপা ভট্টাচার্য) ‘কী কী কুসংস্কার তিরোহিত হইলে শীঘ্র এ দেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে পারে’ এ বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেছেন তিনি। ‘স্ত্রীলোকের বিদ্যা শিক্ষা’র প্রচলন, কৌলীন্য প্রথা দূরীকরণ, বিধবা বিবাহের প্রচলন, বাল্যবিবাহ রহিত হওয়া প্রসঙ্গে বামাসুন্দরী বিস্তৃত মনোগ্রাহী আলোচনা করেছেন। লেখাটি ভাবাবেগ বর্জিত হওয়ায় পাঠককুলের সন্দেহ হতে পারে আশঙ্কা করে সম্পাদক বিশেষভাবে প্রমাণ দিয়ে জানান, লেখিকা সম্পাদকের পরিচিত। ১৮৬২ সালে লেখিকার অপর একটি লেখা ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানেও সম্পাদককে বলে দিতে হয়েছিল যে লেখাটি সত্যিই ‘কোমল কর হইতে বিনির্গত।’ নারি অন্তরের ক্রুদ্ধ, পরিণামহীন আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছে লেখাটির প্রতি ছত্রে। সর্বক্ষেত্রে নারীর পরাধীনতার, অবমাননা অসহ্য যন্ত্রণাবদ্ধ রূপ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রচনায়। বামাসুন্দরী লিখেছেন, নারীর বেদনাতে পুরুষের বেদনা পাওয়ার কথা নয়, কেননা তাঁদের ‘চাকরানির কাজ, রসুইয়ের কাজ, অনায়াসে চলিয়া যাইতেছে।’ব্যঙ্গের তীব্র কষাঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে। বামাসুন্দরী প্রমাণ করেছেন, নারী কেবল ভাবাবেগপূর্ণ লেখায় নয়, ভাবনামূলক গদ্যেও নিজস্ব যুক্তিবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কৈলাসবাসিনী দেবীর রচনাগুলি পড়লে বোঝা যায় শিক্ষা কতো গভীরভাবে প্রবেশ করেছিল তাঁর জীবনে। তিনি শিক্ষাকে শুধুমাত্র নিজস্ব গন্ডিতে আবদ্ধ করে রাখেননি।ছড়িয়ে দিয়েছেন নানান লেখায়। ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয় কৈলাসবাসিনীর প্রথম প্রবন্ধ পুস্তক ‘হিন্দু মহিলাগণের হীনাবস্থা।’ তিনি লক্ষ করেছেন, ‘এই বঙ্গদেশ নানা প্রকার অনিয়মে পরিপূর্ণ রহিয়াছে, পরিবর্তন করিতে হইলে তাহার সমুদয় পরিবর্তন করিতে হয়, নতুবা একের উপর টান পড়িলে অন্য আসিয়া উপস্থিত হয়; যেমন বিধবা বিবাহ প্রচলিত হইয়াছে, কিন্তু বাল্যবিবাহটি উঠিল না এবং বহুবিবাহ নিবারণের আইন প্রচলিত হইবে কিন্তু কৌলীন্য মর্যাদাটি থাকিবে।…যেহেতু কারণ থাকিতে কার্য কখনই একেবারে নিবারিত হয় না… আপনারা অগ্রে কারণ নষ্ট করিয়া পরে কার্যের প্রতি দৃষ্টি করিবেন।’ কার্যকারণ সম্বন্ধে এই যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ঊনিশ শতকীয় সমাজব্যবস্থায় বিরল। সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থার ক্ষুরধার বিশ্লেষণের মাধ্যমে কৈলাসবাসিনী মেয়েদের দুঃখ-যন্ত্রণা, অভাব-অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন তার অপর দুটি গ্রন্থেও। যার প্রথমটি ‘হিন্দু অবলা কুলের বিদ্যাভ্যাস’- মেয়েদের শিক্ষা বিষয়ে নানা সমস্যার আলোচনা। দ্বিতীয়টির নাম ‘বিশ্বশোভা।’ এই গ্রন্থে প্রবন্ধের সাথে সাথে কবিতাও আছে, আর আছে আত্মজৈবনিক নানান ভাবনাকণিকার প্রকাশ।

১৮৭৬ সালে প্রকাশিত রাসসুন্দরী দাসীর ‘আমার জীবন’ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মচরিত। ‘আমার জীবন’ সম্পর্কে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন- ‘এই পুস্তকখানি লিখিত না হইলে বাঙ্গালা সাহিত্যের একটি অধ্যায় অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইত।…যিনি নিজের কথা সরলভাবে কহিয়া থাকেন, তিনি অলক্ষিত ভাবে সামাজিক চিত্র অঙ্কন করিয়া যান। ‘আমার জীবন’ পুস্তকখানি শুধু রাসসুন্দরীর কথা নহে, উহা সেকেলে হিন্দু রমণীগণের সকলের কথা, এই চিত্রের মত যথাযথ ও অকপট মহিলা চিত্র আমাদের বাঙ্গালা সাহিত্যে আর নাই।’ আত্মজীবনী হলেও গ্রন্থটিতে রাসসুন্দরীর যুক্তিবাদী মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মজীবনী না লিখলেও মেয়েদের সকরুণ অবস্থার বর্ণনা করেন নিজের কথা বলতে গিয়ে- ‘লোকে আমোদ করিয়া পাখি পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া রাখিয়া থাকে, আমার যেন সেই দশা ঘটিয়াছে। আমি ঐ পিঞ্জরে জন্মের মত বন্দি হইলাম। আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই। গ্রামের প্রায় অশিক্ষিত গৃহবধূ হয়েও অসামান্যতার সমাজ বিশ্লেষণ- ‘তখনকার মেয়েছেলেগুলো নিতান্ত হতভাগা, প্রকৃত পশুর মধ্যে গণনা করিতে হইবেক। বাস্তবিক মেয়ে ছেলের হাতে কাগজ দেখিলে সেটি ভারী বিরুদ্ধ কর্ম জ্ঞান করিয়া বৃদ্ধ ঠাকুরানীরা অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন।’ স্ত্রী শিক্ষার প্রতি সে সময় সমাজের বিরোধিতা কতোটা প্রবল ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে জানা যায় তাঁর লেখায়- ‘তখন মেয়েছেলেরা লেখাপড়া শিখিত না, সংসারে খাওয়া-দাওয়ার কর্ম সারিয়া যে কিঞ্চিৎ অবকাশ থাকিত, তখন কর্তাব্যক্তি যিনি থাকিতেন তাঁহার নিকট অতিশয় নম্রভাবে দণ্ডায়মান থাকিতে হইতো। যেন মেয়েছেলের গৃহকর্ম বৈ আর কোন কর্ম নাই। তখনকার লোকের মনের ভাব এইরূপ ছিল।’ রাসসুন্দরীর মা মৃত্যুশয্যায় তাঁকে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তাই আক্ষেপ করে তিনি লিখেছেন- ‘আমি যদি পুত্র সন্তান হইতাম, তবে আমি যেখানে থাকিতাম পাখির মত উড়িয়া যাইতাম। কি করিব আমি পিঞ্জরবদ্ধ বিহঙ্গ।’ নারী বলেই যে তাঁকে পরাধীনতার মধ্যে থাকতে হয়েছে এটা তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন। আপন প্রাণের টানে রাসসুন্দরী আত্মজীবনী লিখেছিলেন, কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাননি, অথবা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও করেন নি। তবু তাঁর এই আত্মজীবনী মুক্তচিন্তা, মুক্তভাবনা,মুক্ত মানসিকতার দলিল, যা তাঁকে অমরত্বের আসনে বসিয়েছে। বাঙালির ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

সেঞ্চুরি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দেবেন্দ্রনাথ স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনীকে বিলেতে নিয়ে গিয়েছিলেন ১৮৮২ সালে। কৃষ্ণভাবিনী বিলেতে বসেই লেখেন ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা।’ ১৮৮৫ এই গ্রন্থের প্রকাশ মেয়েদের গদ্যের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। বাংলা ভাষায় এমন বিস্তৃত ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনী ইতিপূর্বে আর কেউ লেখেননি। তিনি মনে করতেন ইংরেজ মহিলাদের দৃষ্টান্তকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করলে দেশীয় মহিলাদের যথার্থ উন্নতি হবে। ইংরেজ মহিলাদের উন্নত জীবন এবং স্বাধীনতা প্রসঙ্গে উচ্ছ্বসিত কৃষ্ণভাবিনী বাঙালি মেয়েদের জানিয়েছেন সমস্ত শৃঙ্খল ছিন্ন করে অন্তপুরের অন্ধকার থেকে তাঁরা যেন বেরিয়ে আসেন। এই গ্রন্থেই প্রথম কোন বাঙালি নারী দেশের রাজনৈতিক পরাধীনতা বিষয়ে সচেতনতা প্রকাশ করেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য মেয়েদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি প্রথম ভেবেছেন। সুতপা ভট্টাচার্যের মতে প্রায় সমসময়ে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘ইউরোপ প্রবাসীর পত্র’তে ইংল্যান্ডের সমাজকে যেভাবে দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ, তার তুলনায় কৃষ্ণভাবিনী দেখা কিছু কম গভীর নয়। কিন্তু অল্প জনের জানা ছিল এই বইয়ের নাম। কৃষ্ণভাবিনীর প্রধান লক্ষ্যই ছিল স্বদেশের নারীদের হীন দশা থেকে টেনে তোলা।

রমাবাঈ এর বক্তৃতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ একটি পত্র প্রকাশ করেছিলেন ভারতী পত্রিকায় ১২৯৬ সালের আষাঢ়ে। রমাবাঈ এর বক্তব্য বিষয় ছিল মেয়েরা সব বিষয়ে পুরুষের সমকক্ষ, কেবল মদ্যপানে নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে মেয়েরা পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে না, কেননা মেয়েদের ধারণ শক্তি থাকলেও সৃজনশক্তি নেই। স্বয়ং স্বর্ণকুমারী দেবী এই মতের বিরোধিতা করে একটি রচনা প্রকাশ করেন। সঙ্গতভাবেই তিনি দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে নারী রচিত উপন্যাসের। রবীন্দ্রনাথের পূর্বল্লিখিত ভাবনার প্রতিক্রিয়ায় কৃষ্ণভাবিনী ‘স্ত্রীলোক ও পুরুষ’ (১২৯৬ ফাগুন) নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানান নারী সমস্ত ক্ষেত্রে অর্থাৎ শিক্ষায়, বুদ্ধিতে, ধর্মে, নীতি ক্ষমতায়, পুরুষের সমকক্ষ। উভয়ের মধ্যেই মানব চরিত্র ও স্বভাব একরকমের। পরবর্তীকালে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের নানান আলোচনায় কৃষ্ণভাবিনীর একাধিক রচনার বিরূপ সমালোচনা। ‘সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত কৃষ্ণভাবিনী ‘শিক্ষিতা নারী’ প্রবন্ধটির বিরূপ সমালোচনা করেন রবীন্দ্রনাথ বেশ তীব্র ভাষায়। কৃষ্ণভাবিনী এই সমালোচনা হজম করেননি। জোরালো উত্তর দিয়েছিলেন- ‘স্ত্রী জাতি এ জগতে কেবল জ্ঞানবুদ্ধিহীনা হইয়া দাসত্ব করিবার জন্যই সৃজিত হয় নাই, কিংবা পুরুষের ক্রীড়ার নিমিত্ত গঠিত নহে। পরোপকার ও অন্যের জন্য জীবনধারণ করা যেমন নারীর উদ্দেশ্য, রমণী তেমনি নিজের নিমিত্তও বাঁচিয়া থাকে।’ অসামান্য বলিষ্ঠ এবং চিন্তাশীল লেখনীর অধিকারী ছিলেন তিনি। কৃষ্ণভাবিনীর রচনাতেই নারীবাদ বাংলা আলোচনা জগতে সম্যক প্রতিষ্ঠা পায়।

রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যের সমস্ত ক্ষেত্রে নিজের অনায়াস দক্ষতা প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ভাবনামূলক গদ্যেও তিনি যুক্তিবোধের নিদর্শন রেখেছেন। স্বর্ণকুমারী সচেতনভাবেই ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে নিয়েই জানিয়েছিলেন ‘বিজ্ঞান এর মাত্রা’ তিনি বাড়াতে চান পত্রিকায়। তার প্রথম সম্পাদকীয়তে স্বর্ণকুমারী যেভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন বিজ্ঞানের প্রণালী আর সাহিত্যের প্রণালীর পার্থক্য, তা যুক্তিমূলক গদ্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়-‘পদ্মে কল্পনাশক্তির বিলক্ষণ প্রয়োগ হইয়া থাকে, তবে পদ্ম প্রভৃতির প্রয়োগ আর বিজ্ঞানের কল্পনা এই দুইয়ে একটি প্রধান প্রভেদ এই যে বিজ্ঞানে সাধারণতঃ দ্রব্যগুণের সামান্য গুণগুলি অর্থাৎ যে সকল গুণ কতকগুলি দ্রব্যের মধ্যে সাধারণ সেই সকল গুণ ঐ দ্রব্যগুলি হইতে স্বতন্ত্র করিয়া কল্পনা করিতে হয়, আর কবিতা প্রভৃতিতে (সত্য,ন্যায়,বীরত্ব ইত্যাদি কোন বিশেষের চিত্র অঙ্কিত করিবার অভিপ্রায় থাকিলেও) তাহা উদাহরণে দেখাইবার নিমিত্ত আমরা রূপরসস্পর্শগন্ধাদি সর্বগুণ বিশিষ্ট কোন বিশেষ দ্রব্যের কল্পনা করি।’ বিজ্ঞান বিষয়ের গভীরতা এবং তাকে সহজবোধ্য ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা স্বর্ণকুমারী দেবীর ছিল।

উনিশ শতকের ইতিহাসে মেয়েদের স্থান না থাকলেও মেয়েরা ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছিলেন। কেউ কেউ ইতিহাস বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ‘বিগত শতবর্ষে ভারত রমণীদিগের অবস্থা’ বর্ণনা করতে গিয়ে মানকুমারী বসু ভারতের বিদুষী নারীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছেন। মেয়েদের শিক্ষিত হওয়ার পিছনে ইংরেজদের যে বড় ভূমিকা রয়েছে এ কথা সে সময়ে আলোকপ্রাপ্ত নারীরা মনে করতেন । মানকুমারী বসুও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর মতে- ‘এই রূপে জগদীশ্বরের কৃপায়, ইংরাজ রাজের অনুগ্রহে এবং দেশীয় ও বিদেশীয় নারী হিতৈষীগণের যত্ন, চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে গত শত বৎসরে ভারতে মহিলাদিগের অবস্থা অভাবনীয় উন্নতি লাভ করিয়াছে।’ যুক্তিদীপ্ত চিন্তার বিপরীত চিন্তাস্রোতও সেই যুগে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। শিক্ষিত সেই নারীরা মনে করতেন বঙ্গমহিলা নাকি যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করছেন। ‘ইংরাজি ধরনের স্বাধীনতা তাঁরা চান না, তাঁরা সেই যথার্থ স্বাধীনতা চান, যে স্বাধীনতা তাঁদের ‘সংসারযাত্রা নির্বাহের উপযুক্ত করিতে পারে।’

শুধু ইতিহাস নয়, দেশ-কাল-জাতির নানান সমস্যা নিয়েও সে সময়ে নারীদের ভাবনায় যথেষ্ট নিজস্বতা ছিল। এ প্রসঙ্গে অনুরুপা দেবীর ‘বঙ্গ দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপনোপায়’ (১৮৯৯) প্রবন্ধের নাম সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। তিনি হিন্দু মুসলমান সমস্যা নিয়ে ভেবেছেন। অনুরুপার রচনায় যুক্তিদীপ্ত মুক্ত চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর মতে- ‘বঙ্গদেশে অসাম্প্রদায়িক সম্মিলনের কথা ভাবিলে প্রথমে বড়ই অসম্ভব এবং দুরাশা বলিয়া বোধ হয়। যেখানে হিন্দু হিন্দুর অন্ন স্পর্শ করে না, অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া আপনাদের অতি সংকীর্ণতম গণ্ডির বাহিরে কখনো বৈবাহিক বন্ধনে বদ্ধ হয় না, এক স্থানের অধিবাসী অপর স্থানের ভাষা পর্যন্ত সম্যক বুঝিতে না পারিয়া বিদেশী বলিয়া জ্ঞান করে এবং আচার-ব্যবহার সব বিষয়ে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকে, সেখানে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের সদ্ভাব নিতান্তই কল্পনামূলক বলিয়া প্রতীত হইয়া থাকে।’ তবে তিনি যে কেবল সমস্যা বিষয়ে ভেবেছেন তা নয়, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিকল্পনা পর্যন্ত হাজির করেছিলেন।

পিতৃতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতাপে নারীর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ ঘটানো ঊনিশ শতকীয় সমাজ পরিস্থিতিতে সহজ ছিল না। এ প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদের মন্তব্য স্মরণীয়-‘বাঙালি মহিলাদের ‘মুক্তি’র আন্দোলন শুরু করেন পুরুষরা। সুতরাং সত্যিকার অর্থে, এ আন্দোলন পুরুষদের শাসন থেকে নারীদের পুরোপুরি স্বাধীন করার আন্দোলন ছিল না। উল্টে, বরং বলা যায়, পুরুষরা অংশত তাদের নিজেদের জগতকে আধুনিক করে তোলার জন্যই এই আন্দোলন শুরু করেন।’ পিতৃতন্ত্রের পরিসরেই নারীর ভাববিশ্ব তখনও আবর্তিত হচ্ছিল। শিক্ষিত মহিলারাও চিরাগত অভ্যাসের প্রতি মান্যতা অটুটু রেখেছেন। আলোকপ্রাপ্ত নারীরা সমাজের প্রতি যতটা দায়বদ্ধ হতে পারতেন তা তাঁরা হননি। ফলে পুরুষতন্ত্রের প্রতিবেদনে নির্মিত নারীর ভাবমূর্তি তাদের বাস্তব মানসিকতাকে আবৃত করে রেখেছে। তাই উনিশ শতকে মেয়েদের লেখা বইয়ের তালিকা করলে দেখা যাবে কাব্যগ্রন্থের সংখ্যাই বেশি। উপন্যাস, গল্প গ্রন্থও বেশকিছু প্রকাশিত হয়েছে, তুলনামূলকভাবে মেয়েদের লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা কম। যেসব গল্পগ্রন্থের নাম পাওয়া যায় তার একটা বড় অংশের শিরোনামগুলি এই জাতীয়- ‘সতীর পতিভক্তি’, ‘গার্হস্থ্য ধর্ম’, ‘আদর্শ রমণী’ ইত্যাদি। অর্থাৎ পিতৃতন্ত্রের নিরেট এবং অবাধ কর্তৃত্ব শিক্ষিত মেয়েদের ভাবনাচিন্তাকেও প্রভাবিত করেছিল। তবু উনিশ শতকীয় পরিস্থিতিতেও পিতৃতন্ত্রের উদ্ধত প্রতাপের বিরুদ্ধে মেয়েরা সম্পূর্ণরূপে নিঃশব্দ ছিলেন না। সংখ্যায় নগন্য হলেও পিতৃতান্ত্রিক অধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত নারীরা তাঁদের আর্তি ও অভিযোগ গ্রন্থিত করেছেন বিভিন্ন রচনায়। পিতৃতন্ত্রের নির্বাধ কর্তৃত্ব সত্ত্বেও তাঁদের উপস্থিতি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। আলোচ্য নিবন্ধে উনিশ শতকীয় যুক্তিবাদী নারীর ভাবনা জগতের পরিচয় পাওয়া যাবে আশা রাখছি।

লেখিকা : কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষিকা। বাংলা সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন নারীবাদ নিয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev