বাঙালি মননশীল লেখক ও চিন্তাবিদ নীরদ চন্দ্র চৌধুরী সংক্ষেপে নীরদ সি চৌধুরী হিসাবে পরিচিত।
তিনি একজন খ্যাতনামা দীর্ঘজীবী বাঙালি মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ। তাঁর জন্ম ২৩ নভেম্বর ১৮৯৭ এ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলায়, মৃত্যু ১ আগস্ট ১৯৯৯ এ ১০১ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে। স্কলার এক্সট্রাঅর্ডিনারী শীর্ষক ম্যাক্স মুলারের জীবনী লিখে ১৯৭৫ এ নীরদচন্দ্র চৌধুরী ভারত সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা হিসেবে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তির্যক প্রকাশভঙ্গির জন্য বিশেষভাবে আলোচিত সমালোচিত ছিলেন। ১৯৩৭-এ নীরদচন্দ্র চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদ শরৎ চন্দ্র বসুর একান্ত সচিব হিসেবে চাকুরি গ্রহণ করেন। ফলে তিনি সেকালের প্রখ্যাত ব্যক্তি যেমন— মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু-সহ অনেক খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। ভারতীয় রাজনীতির অভ্যন্তরে কাজ করার দরুন ও রাজনীতির সাথে নিবীড় ঘনিষ্ঠতা থাকায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন তিনি। নীরদ চন্দ্র চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
সচিব হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নীরদচন্দ্র চৌধুরী বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক, সাময়িকীগুলোতে প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। এছাড়াও, তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও’র কলকাতা শাখার রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৪১-এ নীরদ চৌধুরী অল ইন্ডিয়া রেডিও’র দিল্লী শাখায় কর্মজীবন শুরু করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রখ্যাত সম্পাদক, ঐতিহাসিক এবং ঔপন্যাসিক খুশবন্ত সিং নীরদচন্দ্র চৌধুরী’র বন্ধু ছিলেন। The Autobiography of an Unknown Indian প্রকাশ করেন ১৯৫১-এ। এই গ্রন্থটি তাঁর লেখা মাস্টার পিস হিসাবে ধরা হয়। ১৯৫৫-তে প্রথমবারের মতো বিদেশযাত্রা করেন। এ দফায় তিনি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি ভ্রমণ করেন। A Passage to England প্রকাশ করেন ১৯৫৯ সালে এবং পরের বই The Continent of Circe। ১৯৬৬ সালে The Continent of Circe : An Essay on the Peoples of India’ বইটির জন্য “Duff Cooper Memorial” পুরস্কার লাভ করেন। The Intellectual in India প্রকাশিত হয় ১৯৬৭-এ।
নীরদ চৌধুরী ভারত ত্যাগ করে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে পাড়ি জমান ১৯৭০-এ। এসময় Scholar Extraordinary বইটি লেখার কাজে হাত দেন। বইটি Scholar Extraordinary. The Life of Professor the Right Honourable Friedrich Max Muller, P.C. প্রচ্ছদনামে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে ভারতীয় জীবনযাত্রার এক অতি সুন্দর প্রতিচ্ছবি সংবলিত গ্রন্থ To Live or Not to Live প্রকাশিত হয় ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৭৬ এবং ১৯৭৯ সালে যথাক্রমে প্রকাশ করেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বই: Clive of India. A Political and Psychological Essay, Culture in the Vanity Bag. Clothing and Adornment in Passing and Abiding India এবং Hinduism. A Religion to Live By Religion to Live। তার লেখায় ইংরেজ প্রীতি প্রদর্শন করেন।
নীরদ চৌধুরীর মহান কীতি Thy Hand! Great Anarch! India : ১৯২১-১৯৫২ নামীয় গ্রন্থটি। এই গ্রন্থটি ১৯৮৭-তে প্রকাশিত হয়। তখন তার বয়স নব্বই। এ বয়সে তার দৈহিক এবং মানসিক কর্মক্ষমতা অটুট ছিল। পাণ্ডিত্য ও মণীষার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। ১৯৯২-এ ইংল্যান্ডের রাণী তাকে কমান্ডার অব দি অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার (সিবিই) উপাধি অর্পণ করেন। নীরদ চৌধুরীর জীবনের প্রথম দিকে ফিরে যাব। উপেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ও সুশীলা সুন্দরী চৌধুরানীর ৮ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় নীরদ চৌধুরী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশের) কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীতে ১৮৯৭ সালের ২৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ এবং কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন। এফএ পরীক্ষা পাশ করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) অন্যতম বাঙালি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে একত্রে ভর্তি হন। এরপর নীরদ কলকাতার অন্যতম খ্যাতিমান স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ১৯১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র হিসেবে তিনি ইতিহাসে সম্মান-সহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মেধা তালিকায় নিজের স্থান করে নেন। স্কটিশ চার্চ কলেজের সেমিনারে ভারতবর্ষের অতিপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাসবেত্তা প্রফেসর কালিদাস নাগের সাথে অংশগ্রহণ করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিতে ভর্তি হলেও ১৯২০-এর অনুষ্ঠিত এম. এ. পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। এখানেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি। ইতোমধ্যে ১৯১৭ সালে Objective Methods in History শিরোনামে একটি তাত্ত্বিক প্রবন্ধ রচনা করেন।
নীরদ চৌধুরীর কর্মজীবনের সূত্রপাত হয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তরে একজন কেরাণী হিসেবে। চাকুরির পাশাপাশি একই সময়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ রচনা করতে থাকেন। জনপ্রিয় সাময়িকীগুলোতে নিবন্ধ পাঠানোর মাধ্যমে লেখার জগতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। তার প্রথম নিবন্ধটি ছিল অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি কবি ভারত চন্দ্রের উপর। এই নিবন্ধটি ঐ সময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ইংরেজি সাময়িকী “মডার্ন রিভিউ”-তে স্থান পায়। ইতোমধ্যে ১৯২৪ সালে তার মাতা সুশীলা সুন্দররানী চৌধুরানী পরলোকগমন করেন।
নীরদ চৌধুরী হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে অল্প কিছুদিন পরই চাকুরি ত্যাগ করেন এবং সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন। ঐ সময়ে কলকাতা কলেজ স্কয়ারের কাছাকাছি মির্জাপুর স্ট্রিটে অন্যতম লেখক – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সাথে একত্রে বোর্ডার হিসেবে ছিলেন। তিনি তখনকার সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইংরেজি ও বাংলা সাময়িকী হিসেবে মডার্ন রিভিউ, প্রবাসী এবং শনিবারের চিঠিতে সম্পাদনা কর্মে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও, তিনি দুইটি ক্ষণস্থায়ী অথচ উচ্চস্তরের সাময়িকী – সমসাময়িক এবং নতুন পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯২৬ সালে দ্য মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় রমানন্দ চ্যাটার্জির অধীনে সহকারী সম্পাদকের চাকুরি গ্রহণ করেন। ১৯২৭-এ বাংলা সাময়িকী শনিবারের চিঠি সম্পাদক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছরই রবীন্দ্রনাথের সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘটে।
নীরদ চৌধুরী ১৯৩২ সালে লেখিকা অমিয়া ধর (পরবর্তীতে অমিয়া চৌধুরানী)-এর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে তিনটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তার মধ্যম পুত্র কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ। জ্যেষ্ঠ পুত্র ধ্রুব নারায়ণ পিতার অনেক অপ্রকাশিত লেখা সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন। পৃথ্বী তাদের কনিষ্ঠ সন্তান।
১৯৩৭ সালে নীরদচন্দ্র চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদ শরৎ চন্দ্র বসুর একান্ত সচিব হিসেবে চাকুরি গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে তিনি খ্যাতিমান মহাপুরুষ যেমন— মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু-সহ অনেক খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শ পান। ভারতীয় রাজনীতির অভ্যন্তরে কাজ করার দরুন ও রাজনীতির সাথে নিবীড় ঘনিষ্ঠতা থাকায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি সম্বন্ধে সন্দিহান হন। নীরদ চন্দ্র চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এ পর্যায়ে তিনি বাংলা ভাষায় লেখালিখি ছেড়ে দেন।
১৯৫৫ এ ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং বিবিসি যৌথভাবে নীরদ চন্দ্র চৌধুরীকে ৮ সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড ভ্রমনের আয়োজন করে। তিনি বিবিসিতে বক্তৃতা পাঠ করতে সম্মত হন। ব্রিটিশ জীবনধারার উপর নীরদ চৌধুরী আটটি বক্তৃতামালা প্রদান করেন। পরবর্তীতে ঐ বক্তৃতাগুলোই একত্রিত করে প্যাসেজ টু ইংল্যান্ড বইয়ে প্রকাশ করা হয়। ই.এম.ফরস্টার এ বিষয়ের সমালোচনা-ভাষ্য ও তার দৃষ্টিভংগী দ্য টাইমস্ লিটারেরী সাপ্লিমেন্টে প্রকাশ করেন।
নীরদ সি. চৌধুরী মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একজন সৃষ্টিশীল এবং স্বাধীনচেতা লেখক হিসেবেই পরিগণিত ছিলেন। ৯৯ বছর বয়সে তার শেষ বই প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে তার স্ত্রী অমীয়া চৌধুরী অক্সফোর্ডে মারা যান। ১৯৯৯ এ ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডেই নিজের ১০২তম জন্মদিনের দু’মাস পূর্বে পরলোকগমন করেন ক্ষণজন্মা সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ নীরদ চন্দ্র চৌধুরী।
মনোজিৎকুমার দাস, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ