আমার নির্মলেন্দু গুণ পাঠ শুরু এক অচেনা নারীর কাছ থেকে। অবোধ-কৈশোরে যখন আমি মানুষমানুষির সম্পর্কের আলোছায়াধোঁয়াশা সম্পর্কে নিতান্তই অজ্ঞ তখন আমার বেড়ে ওঠার কুমিল্লা শহরে এক প্রতিবেশী দম্পতির আগমন ঘটে যাদের নিয়ে পাড়ায় প্রায়ই খিটিমিটি হতো। স্বামীপ্রবরটি হঠাৎ হঠাৎ রাতে উদয় হতো আর স্ত্রী সারাক্ষণ প্রায় ঘরেই থাকত। কবে যেন পাড়ার লোক জানল আসলে স্বামী-স্ত্রী নয়, মহিলাটির সঙ্গে ভদ্রলোকের ছিল সমাজ-অননুমোদিত প্রণয়সম্পর্ক। তারপর একদিন তাদের পাততাড়ি গুটাতে হলো আমাদের পাড়া থেকে।
এ ঘটনা সমাজ-প্রকাশ্য হবার আগের একদিনের ঘটনা মনে পড়ে। আমি শহরের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে ঘরে ফিরছি, দেখি পাশের ঘরের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সেই নারী; কেমন একটা উদাস, এলায়িত ও অসহায় ভঙ্গি। আমাকে ডাকলেন ‘এই বাবু, কী বই দেখি?’ আমি সংকোচে কাছে গেলে আমাকে ঘরে নিয়ে বললেন ‘আমার কাছে কেউ আসে না। কী করে যে সময় কাটে! মাঝে মাঝে তুমি বই দেবে আমাকে! তার বদলে তুমি এই বইটি নাও’ বলে নির্মলেন্দু গুণের ‘শান্তির ডিক্রি’ বইটি হাতে দিলেন। বললেন ‘আমার কাছে এই বইটিই আছে। এটিই ওলটে-পাল্টে পড়ি রাতদিন।’ হ্যাঁ, এরপর আমিও পড়তে লাগলাম যুদ্ধাক্রান্ত পৃথিবীতে শান্তির জন্য আকুলতাময় সেইসব উচ্চারণ যা সমাজ-সংসারের অন্যরকম যুদ্ধে পর্যুদস্ত এক হতভাগা নারীকেও দিয়েছিল শমশান্তি। সেই নারী চলে গেছে বহুদিন, আমি তার নামও জানি না। কিন্তু আমার স্মৃতিপটে রয়ে গেছে সেই আশ্চর্য বিকেল। এরপর বহুদিন ভেবেছি এই সর্বত্রগামী কবি নির্মলেন্দু গুণের কথা, যিনি কবিতাকর্মীর টেবিল থেকে পথে পড়া নারীর একলা মনোকোণেরও সঙ্গী হয়ে উঠতে পারেন।
এরপর সমাজ-সময়-রাষ্ট্রকাঠামোর বদলের প্রত্যাশীদের সঙ্গে ভিড়ে, তারুণ্যের অগ্নি ও জলতরঙ্গে রাজপথে মে দিবসের অনুষ্ঠানে বৃন্দকণ্ঠে ধ্বনিত করেছি ভূমিহীনের পালা; পালাকার-নির্মলেন্দু গুণ। প্রতিটি উচ্চারণের সঙ্গে উপলব্ধি করেছি পুঁজিবাদী শোষণ-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ-সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের কথামালা। ওপাড়ের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর এপাড়ের নির্মলেন্দু গুণই বোধ করি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পর আমাদের সাম্যমুখী অভিযাত্রায় কাব্যিক সঙ্গ দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি।
এক ফাল্গুনসন্ধ্যায় মফস্বল কুমিল্লার পৌরপার্কে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তিননদী পরিষদ’ আয়োজিত অমর একুশের একুশ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের একদিন পথচলতি আমার কানে হঠাৎ ভেসে আসে কবি সৈয়দ আহমাদ তারেকের দরদি কণ্ঠে নির্মলেন্দু গুণের এমত কবিতা—
‘তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হবো
আমাকে কী মাল্য দেবে দাও…
…
কবরের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই কবর
শহীদের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই শহীদ’
প্রথম শ্রুতিতে ভেবেছি কি মিষ্টি প্রেমের কবিতা! পরে তাঁর বইয়ে মিলিয়ে দেখি-একুশের শহিদ স্মরণে লিখিত কবিতা এটি কিন্তু নির্মলেন্দু গুণে কী তফাৎ উত্তাল রাজনীতি আর প্রেমকোমলে? হৃদয় আর রণকে অভিন্ন আলকেমিতে মেলাতে পারেন বলেই তিনি কবি-মহৎ নির্মলেন্দু গুণ।

নির্মলেন্দু গুণকে সাক্ষাতের চেয়ে বেশি চিনি তাঁর অনন্য আত্মকথা আমার কণ্ঠস্বর পড়ে। ‘কনফেশনাল পোয়েট’ বলে দেশের অনেক কবিকেই জানি কিন্তু দেখে চলেছি নিজেদের মেলে ধরার ব্যাপারে লোকলজ্জা ও সামাজিক সৌজন্যের কথা মাথায় রেখে কী ভয়াবহ প্রকাশকুণ্ঠা তাদের। কিন্তু গুণ এক্ষেত্রে বিরল ব্যতিক্রম যিনি তাঁর আত্মকথায় অবলীলায় ‘গঞ্জিকা ও গণিকা’র প্রতি অকুণ্ঠ পক্ষপাতের কথা ঘোষণা করতে পারেন। সুরজিৎ দাশগুপ্ত যথার্থই চিহ্নিত করেন “বহুদিক থেকেই নির্মলেন্দু গুণের ‘আমার কণ্ঠস্বর’ অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক জাঁ জাক রুশোর লেখা ‘স্বীকারোক্তি’ নামে বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থের সঙ্গে তুলনীয়। স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত কিন্তু প্রবৃত্তির নাগপাশে জর্জরিত।”
গুণের ‘কসাই’ কবিতা পড়ে আমরা যেমন মনে মনে ছুরি বসাই সাম্প্রদায়িক গুন্ডাদের গলায় তেমনি তাঁর অভিভূতি-উদ্রেকি প্রেমের কবিতার অরুণ অঞ্জলি মুঠোফোনের কাব্য পড়ে চিরকালের প্রেমিকপ্রেমিকা যেন নিজেদের অন্তর্গত প্রেমসত্তা অণুকাব্যের আধারে আদিম প্লাবনের জোয়ারে রূপবদ্ধ করতে থাকে। প্রেম কি রাজনীতি সব বিষয়েই গুণের যে বৈশিষ্ট্যটি ভালোলাগার তা তাঁর আড়ম্বরহীন-খোলামেলা প্রকাশ। সুচিত্রা সেন তো সবারই হার্টথ্রুব কিন্তু ‘সুচিত্রা সেন-হে চিরযৌবনা, চিরঅধরা আমার’ বলে বই উৎসর্গ করা নির্মলেন্দু গুণকেই মানায়।
গুণকে আরো কাছ থেকে দেখেছি দেশের সর্বশেষ সামরিক প্রভাবামলে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আরণ্যক নাট্যসম্প্রদায়ের মহান মে দিবসের অনুষ্ঠানে ঝলসে উঠতে দেখেছি রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে। তেমনি টেলিভিশন টকশোতে দেশের একটি বিশেষ বাহিনির নামের পূর্বে ‘দেশপ্রেমিক’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের বিরুদ্ধেও তাঁকে উচ্চকিত দেখেছি। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন তাহলে ‘দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, দেশপ্রেমিক কবি, দেশপ্রেমিক শ্রমিক ও দেশপ্রেমিক কৃষক’ বলাই সঙ্গত সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে।
নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি তাঁর আজিমপুর ছাপড়া মসজিদের পাশের অতিসাধারণ বাড়িতে। এক জন্মদিনে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি উপহার দিয়ে দেখেছি তাঁর ‘আনন্দকুসুম’ময় মুখচ্ছবি। দেখেছি পাড়ার ছিন্নমূল শিশুকিশোরদের সাথে কবির সাবলীল সম্পর্ক। আর তাঁর অসুস্থাবস্থায় প্রত্যক্ষ করলাম এক কবির জন্য সারা জাতির উদ্বেগাকুল অবয়ব। ফেসবুকে কবিকে আমরা যখন থেকে পেয়েছি দেখেছি, দেশের ‘খ্যাতিমান কবি’র ভাব বজায় রাখা ট্যাবু ভেঙে সমাজ-রাজনীতি-ব্যক্তিগত বিষয়ে তাঁর বিশ্বাস অকপটে-অবলীলায় কোনো পূর্বাপর না ভেবে প্রকাশ করতে।
নির্মলেন্দু গুণ কয়েকটি বিষয়ে কখনো ছেড়ে কথা বলেন না-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু। তিনিই তো কবিতাকারে জানান ‘স্বাধীনতা,এই শব্দটি কী করে আমাদের হলো।’ আর গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রোইকা-গর্বাচেভ চক্রের আঁতাতবাদী উল্লাসে লেনিনের মূর্তি ও স্বপ্ন খান খান হয়ে ভেঙে পড়লেও এখনো প্রগাঢ় বিশ্বাস তাঁর- সাম্যবাদে, মানুষের অজেয় সমাজতান্ত্রিক উত্থানে।
নির্মলেন্দু গুণ এগিয়ে যান, সাথে সাথে আমরাও যেন একটু একটু এগোই।
লেখল বাংলাদেশের স্বনামধন্য কবি ও প্রাবন্ধিক