১৯২১ এর ডিসেম্বর থেকে ১৯২২ এর জানুয়ারির ২০ তারিখের মধ্যে কোনও এক সময় কাজী নজরুল ইসলাম ‘কারার ওই লৌহকপাট’ কবিতাটি লেখেন। সদ্য কারান্তরালে যাওয়া দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীর অনুরোধে তিনি এই দেশাত্মবোধক কবিতাটি লেখেন। ১৯২১-এর ১০ ডিসেম্বর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে গ্রেফতার করে ব্রিটিশ প্রশাসন। দেশবন্ধু ‘বাঙ্গালার কথা’ পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন। তিনি কারারুদ্ধ হওয়ার পর ‘বাঙ্গালার কথা’-র সম্পাদনার দায়িত্ব নেন তাঁর সুযোগ্যা পত্নী বাসন্তী দেবী। ১৯২২-এর ২০ জানুয়ারি ‘বাঙ্গালার কথা’ পত্রিকায় ছাপা হয় কবিতাটি। ১৯২৪-এ এটি ‘ভাঙার গান’ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।
লোকশ্রুতি এই যে, কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৩-এ কারারুদ্ধ থাকাকালীন সহবন্দীদের সঙ্গে কবিতাটি আবৃত্তি করতেন দৃপ্ত কণ্ঠে।
মুজফফর আহমেদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’-তে বলেছেন, ১৯২৩ সালে হুগলি জেলে থাকার সময় নজরুল কবিতাটিতে (কারার ঐ লৌহকপাট) সুর দিয়েছিলেন এবং নজরুল নিজে তা গাইতেন।
১৯৪৯ সালে প্রকাশিত গিরিন চক্রবর্তীর গাওয়া এই গানের রেকর্ডে ‘কথা ও সুর : কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ উল্লেখ করা হয়েছিল। স্বরলিপিতেও সুরকারের নাম নজরুল। একাধিক লেখায় আছে ‘এই শিকল পরা ছল’ গানটিও নজরুল হুগলি জেলে থাকাকালীন লিখেছিলেন এবং সেখানে তা গাইতেনও। হুগলি জেলে অন্যান্য বন্দীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়লে তাঁর হাতে শেকল বা বেড়ি পরিয়ে রাখা হতো এবং বন্দীদের উপর নানাভাবে অত্যাচারও করা হতো। গরাদে হাতের বেড়ি দিয়ে ঘা মেরে মেরে নজরুল এই গানটা গাইতেন। মানিক মুখোপাধ্যায়ের ‘উন্নত মম শির’ এবং নজরুলের সহবন্দী নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তীর ‘নজরুলের সঙ্গে কারাগারে’ বইয়ে এরকম তথ্য আছে।
এহ বাহ্য। বিদ্রোহী কবি জেলের মধ্যে কারার ঐ লৌহকপাট গাইলেও কোনও স্বরলিপিবদ্ধ সুর ছিল না তাতে। তিনি ও সহবন্দীরা কবিতাটি দৃপ্তকণ্ঠে আবৃত্তি করতেন শুধু। লোকমুখে কবিতাটির একটা চালু সুর ছিল অবশ্য। ১৯৪২-৪৩ থেকেই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ প্রশাসন ‘ভাঙার গান’ বইটি বাজেয়াপ্ত করলে এই কবিতা বা গানের চালু সুরটি জনমানস থেকে মুছে যায় অনভ্যাসে। তারপর ব্রিটিশশাসনের সমাপ্তি হলে ১৯৪৯-এ লোকগীতিশিল্পী ও নজরুলগীতিগায়ক তথা সুরকার গিরীন চক্রবর্তীর গলায় গানটি রেকর্ড করে কলম্বিয়া রেকর্ডস। এই গানটির রেকর্ডে গীতিকার ও সুরকার হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামের নামই আছে। রেকর্ডে উল্লিখিত হয়েছে রেকর্ডিংয়ে সংগীত-পরিচালনা করেছেন সুরকার নিতাই ঘটক। নিতাইবাবু নিজেও নজরুলগীতির বিশিষ্ট সুরকার ছিলেন। ৫১টি নজরুলগীতিতে সুর দিয়েছিলেন। গিরীনবাবু নিজেও ছিলেন প্রসিদ্ধ লোকগীতিগায়ক ও নজরুলগীতিশিল্পী। তিনি ২৫টিরও বেশি নজরুলগীতিতে সুরারোপ করেন। কারার ঐ লৌহকপাট-এর সুর তাঁরই করা। এমনটাই দাবি করছেন তাঁর কন্যা নজরুলগীতিশিল্পী ছন্দা চট্টোপাধ্যায়। কেন রেকর্ডে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি সুরকার হিসেবে, সেটাই রহস্য। মনে হয় গানটির সংগীতপরিচালক নিতাই ঘটকের সঙ্গে গিরীনবাবুর রেষারেষি ছিল। ব্যক্তিগত আকচাআকচির জন্যেই তিনি সুরকারহিসেবে গিরীনের নাম বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন রেকর্ডকোম্পানিকে। তাই শিল্পী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হলেও সুরকার হিসেবে নজরুল ইসলামের নামই রাখা হয়েছে। নিতাই ঘটকের পরশ্রীকাতরতা ও দ্বিমুখীচরিত্রের কথা, তাঁর শঠতা ও ভণ্ডামির কথা অনেকেই জানত। কবির অনেক আদিসুর বাদ দিয়ে তিনি নিজে তাতে সুরারোপ করেছিলেন। বিদ্রোহী কবির সঙ্গে তঞ্চকতা করতেও তাঁর বাধেনি। গিরীনের নাম বাদ দিতে তাঁর হাত কাঁপেনি। কলম্বিয়া রেকর্ডসও কাজী নজরুল ইসলামের ব্র্যান্ডভ্যালু কাজে লাগিয়েছে। গিরীনবাবুর সুরকরা ২৫টি নজরুলগীতির মধ্যে ১২টির খোঁজ মেলে। বাকিগুলির হদিশ দিতে পারেননি গবেষকরা। অঙ্কের হিসেব বলে এগুলিকে নজরুলের সুর বলেই চালিয়ে দিয়েছে রেকর্ডকোম্পানিগুলি।
নজরুল-সংগীতের নির্মোহ গবেষক ড. ব্রহ্মমোহন ঠাকুরের মতে, তিনটি পর্যায়ে কবিকৃত সুরের আংশিক কিংবা আমূল পরিবর্তন সাধন করা হয়েছিল। ১৯৪৩-১৯৬৩ সময়ের মধ্যে পরিবর্তিত সুরগুলোকে তিনি দ্বিতীয় পর্যায়ে বিকৃত অর্থাৎ কবির অসুস্থ অবস্থায় বিকৃত সুর বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, নিতাই ঘটকের মতো কবির স্নেহধন্য সহচরদের দ্বারাই প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এই অনৈতিক কাজটি সম্পাদিত হয়েছিল।
শ্রীরাধা-শ্রীকৃষ্ণের দোলযাত্রার কাহিনী অবলম্বনে রচিত হোলী গান চল সখি খেলি সবে হোরী ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে এইচএমভি হতে এন ৭০৮৬ সংখ্যক রেকর্ডে “শ্যামের সাথে চল সখি” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। শিল্পী ছিলেন মিস মানিকমালা। রেকর্ডের জুড়ি গানটিও ছিল যথারীতি দোলযাত্রাবিষয়ক … আজকে দোলের হিন্দোলায় …। কিন্তু দুভার্গ্যবশত দুটি গানই সুর বিকৃতির কবলে পড়ে পর্যুদস্ত হয়েছে।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, চল সখি খেলি সবে হোরী … গানের সুর পরিবর্তিত হয়েছিল কবির প্রিয় ছাত্র ও তাঁর সংগীত জীবনের ঘনিষ্ঠ সহচর নিতাই ঘটকের দ্বারা। কবিকৃত সুর থাকা সত্ত্বেও গানটিতে পুনরায় সুরারোপ করে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে কলম্বিয়া থেকে হোলি পার্টির (রাধারাণী, গৌরী কেদার ভট্টাচার্য ও পূরবী দেবী) শিল্পীদের কণ্ঠে রেকর্ডে প্রকাশ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, কবির অনুমোদন ব্যতিরেকে (বাকরুদ্ধ হওয়ার কারণে অনুমোদন সম্ভবও ছিল না) আদি রেকর্ডে গীত বাণীর সঙ্গে নিচের পঙতিগুলোও জুড়ে দেন : —
আগুন-রাঙা ফুলে ফাগুন লাগে লাল,
কৃষ্ণচূড়ার পাশে অশোক গালে-গাল।
আকুল করে ডাকি
বকুল বনের পাখি,
যমুনার জল লাল হল আজ
আবীর ফাগের রঙে ভরি।।
তবে কলম্বিয়ার রেকর্ডের জুড়ি গান হিসেবে আজকে দোলের হিন্দোলায় … রাখা হয়নি। পবিত্র মিত্রের কথা ও নিতাই ঘটকের সুরে আজ এলো হোলী নিধুবন ছায়ে … গানটি রাখা হয়েছিল।
অথচ সুস্থাবস্থায় নিতাই ঘটক ছিলেন কবির একান্ত অনুরক্ত। আশির দশকে সিরাজুম মুনীর কর্তৃক গৃহীত এক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, “কবির নিকট ছাড়া প্রকৃতপক্ষে আমি আর কারো কাছে গান শিখি নাই। তিনি আমাকে সাধারণত তাঁর নিজের লেখা গানই শেখাতেন-ওই সঙ্গে সেই গানটি প্রধানত যে রাগাশ্রয়ী হতো সেই রাগ সম্বন্ধে কিছু শিক্ষাদান করতেন। বিশেষত অপ্রচলিত রাগগুলির তালিম দিতেন।” [তথ্যসূত্র: কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক সাক্ষাৎকার, প্রকাশক নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৯৭)]
নিতাই ঘটকের দাবি অনুযায়ী তিনি কবিকৃত সুর প্রচার ও প্রসারের একমাত্র কাণ্ডারী ছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে তাঁর লিখিত একটি স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করতেই হয়,-
“আজ জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে অনুভব করছি নুরুদার সৃষ্ট সংগীতকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য আমরা কি কিছুই করতে পারি না। পৃথিবীর একমাত্র কবি বোধ হয় নুরুদাই যার গানের কথা বিকৃত হয়, গায়কেরা যে যা খুশী সুরে গান করেন, তাঁর জীবনের অনেক ঘটনা বিকৃত হয়। পৃথিবীর সব সংগীতজ্ঞ যেমন-মোজার্ট, ভাগনার, বোটাফেন অনেকদিন মারা গেছেন। কই তাঁদের গানের কথা বা সুরের পরিবর্তন তো আমরা দেখি না। নুরুদার গান নিয়ে শুধু বিশৃঙ্খলা।” [তথ্যসূত্র: নুরুদার স্মৃতি ও আমার করা নজরুল গীতির স্বরলিপি, লেখক নিতাই ঘটক, শত কথায় নজরুল, সম্পাদনা কল্যাণী কাজী, সাহিত্যম, ১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩, পৃষ্ঠা-৩৫৪, ৩৫৫]
বলাবাহুল্য, কবির প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে নিতাই ঘটক কবিকৃত সুরকে কাছে টেনে তো নেননিই; বরং অবহেলা আর অনাদরে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। কবিকৃত বাণী ও সুর বিকৃতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি নিজেই অবলীলাক্রমে কবির দেওয়া সুরের আমূল পরিবর্তন সাধন করেছেন। সুর পরিবর্তন সাধন ছাড়াও কবিকৃত সুরকে নিজের নামে গ্রহণ করার নজির আছে এবং তা কবির সুস্থাবস্থায়ও হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত উদার স্বভাবের কবির পক্ষে এসবের প্রতিবাদ করা সম্ভব ছিল না।
এহেন নিতাই ঘটক যে ১৯৪৯-এ কলম্বিয়া রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত গিরীন চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির সুরকারের ভূমিকা থেকে গিরীনবাবুর নাম বাদ দেবেন সংগীত পরিচালনায় থাকার সুযোগ নিয়ে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!