এই লেখাটা কোনোদিন লিখতে হবে, ভাবতেই পারিনি! উনি থাকলে ওঁকে নিয়ে কেউ প্রশংসা করলে বকাবকি করতেন। কাল রাত তিনটেয় যখন শুতে যাচ্ছি, ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি আজ থেকে জীবনটা একেবারেই পালটে যাবে! এ জীবনে যে মানুষটাকে আজীবনের নেতা, গুরু, বস্ ইত্যাদি বলে মেনেছি…জীবনে আর কোনোদিন তার গলা শুনতে পাবোনা, দেখতে পাবো না, পাশে বসে উষ্ণতা অনুভব করতে পারবোনা, বকা খেতে পাবোনা…ভাবতেই পারছিনা!
দার্জিলিং রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান, স্থানীয়দের কাছে যিনি বড় মহারাজ বলে পরিচিত, যিনি না থাকলে জীবনটা অন্যরকম পথে চলত, আমার জীবনের চরমতম শ্রদ্ধার, ভালোবাসার মানুষ বিশ্বরূপ মহারাজ (স্বামী নিত্যসত্যানন্দ) আজ ভোররাতে শরীর ত্যাগ করে চলে গেছেন!
এই মানুষটি যে কী ছিলেন, এ ওঁর কাছাকাছি যারা গেছে তারা জানেন। বহরমপুরের স্বচ্ছল বাড়ির ছেলে, জমিদারি রক্তের সন্তান, সুপুরুষ এই মানুষটি সব ছেড়ে মানুষের জন্য কাজ করতে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। যেখানে গেছেন সেখানেই প্রবলভাবে “জনপ্রিয়” হয়েছেন প্রচুর মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতার জন্য।

মহারাজের ঘরে কোনো আগামী কর্মসূচী নিয়ে আলোচনার চিরপরিচিত ছবি…
আমি ওঁর সংস্পর্শে এসেছিলাম ১৯৯৭ এ। সবে ২০ বছর বয়স তখন। বেলঘড়িয়া রামকৃষ্ণমিশনের সাদা বাড়িটায় ওঁর ঘরে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ে গেছি আজীবনের জন্য। এই চার দিন আগেও ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। কত রাত কেটেছে কত কত আলোচনায়। আমাদের লীডার হয়ে গাইড করেছেন নানা পরিস্থিতিতে। ব্যক্তিগত জীবনে, প্রফেশনাল বা পারিবারিক জীবনের নানা টালমাটালেও উনি শান্ত থেকে পজিটিভ ভাবে ভাবার আলোর কথা বলেছেন বার বার। মানুষটার মধ্যে কোনোদিন কোনো নেগেটিভিটি, দম্ভ, অহম, চালাকি, বিদ্বেষ, ব্যাঙ্গ দেখিনি। চূড়ান্ত কর্মদ্যোগী মানুষ ছিলেন। দেখেছি, কাজ করতে করতে সারাটা সময়ই ‘আলো’র চর্চা করছেন উনি। এই চর্চাটার নেশা উনি আশপাশেও ছড়িয়ে গেছেন আজীবন।
অথচ, কী আশ্চর্য্য, আজ থেকে উনি নেই! কত যে মানুষ কাঁদবে ওঁর জন্য! কত মানুষকে যে ভালোবেসেছেন উনি। জীবন কী ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত!
লকডাউন ও করোনা প্রভাব কাটলেই দার্জিলিঙে গিয়ে দেখা করার কথা ছিল। সে যাওয়া আর হলোনা। লকডাউনের সময় কিছু মন খারাপির কথা বলেছিলাম ওঁকে। সোসাল নেটওয়ার্কিং কিছু চেনা অচেনা মানুষের নানা আচরণ অবিশ্বাস্য লেগেছিল, বড় যন্ত্রণা পেয়েছিলাম নানা বিদ্বেষমূলক কথাচালাচালি দেখে। সেসব শুনে উনি হেসে বলেছিলেন, সহ্য কর, বহু ক্ষেত্রে সহ্যের দৃঢ়তা যুদ্ধের চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী। আসল যুদ্ধ নিজের মনের সঙ্গে, সেখানে হেরে যাস না। অনেকটাই সামলে নিয়েছিলাম নিজেকে।

দার্জিলিং রামকৃষ্ণ মিশন, সিস্টার নিবেদিতার জীবনের শেষ কদিনের স্মৃতিস্থল…মহারাজ আজ ভোর অব্দি যেখানে কাটালেন…
বার বার আবেগের কবলে পড়ে নানা ভুল করেছি জীবনের নানা অধ্যায়ে, বকা খেয়েছি মানুষটার কাছে, অবাক হয়ে দেখেছি আজীবন কি দারুন ভাবে নানা জটিল পরিস্থিতিতে স্থিতধী রাখতেন নিজেকে। অমন একজন জেনুইন পরোপোকারি মানুষটারও পেছনে লেগেছে কত মানুষ, অপবাদ দিয়েছে, সমালোচনা করেছে, উনি হাসিমুখে সামলে নিয়েছেন সেসব অভিঘাত, বরং যারা বিদ্বেষ দেখিয়েছে ওঁকে তাদেরকেই আবার কাছে ডেকে নিয়ে প্রশ্রয় দিয়েছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন।
কখনো কখনো আমরা রেগে গিয়ে বলেছি, এ আবার কী মহারাজ! আপনাকে এত অপমান করছে, বদনাম রটাচ্ছে, আর আপনি ওকে ভালো বলছেন! উনি হাসিমুখে বলছেন, ওই মানুষটার যে অংশটা আমার বদনাম করছে সেই অংশটা বড় যন্ত্রনায় রয়েছে রে, আমাকে অপমান করছেনা, নিজেকে যন্ত্রনা দিচ্ছে, আমি যে দেখতে পাচ্ছি! মানুষটার বাকি অনেক দিক যে বড় ভালো, সেগুলো দেখতে শেখ তোরা, একটা মানুষের কিছু দিক খারাপ দেখা দিলে পুরো মানুষটাই কী বাজে হয়? ঠাকুর বলেছে জানিস না? মৃন্ময়ী মূর্তির কোনো অংশ ভেঙে গেলে কি পুরো মূর্তিটাই ফেলে দিতে হয়?
সত্যি বলতে কি যৌবনের পর থেকে বাবা মায়ের সঙ্গেও যা না কানেক্ট করেছি, এই মানুষটার সঙ্গে তাই করেছি। পিতৃমাতৃবিয়োগের অনেক বড় বিয়োগ হয়ে গেল আজ।
অনেক দায়িত্ব দিয়ে গেলেন মহারাজ। অনেক কাজ বাকি। যা শিখিয়েছেন, যা ভাবিয়েছেন, তার যতটা সম্ভব পারা যায় রূপায়ন করতেই হবে বাকি জীবনটা দিয়ে। যে কোনো সময় মরে যেতে পারি বুঝতেই পারছি। হাতে আর সময় নেই। উনি সশরীরে না থাকুন, মনের মধ্যে আজীবন থাকবেন “আলো” হয়ে।