সালটা ১৮৯৮। জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ। ‘মো্ম্বাসা’ জাহাজে ইংল্যান্ড থেকে রওয়ানা হয়ে এই দিনই কলকাতা পৌঁছান মার্গারেট, ‘ভারতের নিবেদিতা’ হবার জন্য। খিদিরপুর ডকে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। প্রথমে কিছুদিন ৪৯ পার্ক স্ট্রিটে একটি বাড়িতে থাকেন তিনি। তারপর ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতে এসে প্রথম দক্ষিণেশ্বর দর্শন করেন মার্গারেট। একই দিনে পরিচিত হন অঘোরমণি দেবীর সঙ্গে, যাঁকে শ্রীরামকৃষ্ণ ‘গোপালের মা’ বলে অভিহিন করতেন।
লন্ডন। ১৮৯৫। ১০ নভেম্বর। শহর শীতে কাঁপছে। মেরুবাতাসের শিহরন। কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ। থেকে থেকে বৃষ্টি। কোনটা সকাল, কোনটা বিকেল, বোঝার উপায় ঘড়ি। হঠাৎ রোদের দেখা মেলা যেন মহা এক উৎসব। সাহেবরা এতেই অভ্যস্ত। শহরে সম্প্রতি এক ভারতীয় যুবক এসেছন। রাজকুমারের মতো দেখতে। সিংহের মতো বিক্রম। সিসিলি দ্বীপের অলিভ ফলের মতো গায়ের রং। দুটি চোখ যেন দুটি সমুদ্র — প্যাসিফিক, অ্যাটলান্টিক। তাঁর ভাষণ শোনার জন্য মানুষ পাগল। পরাধীন ভারত থেকে ভগবানের মতো স্বাধীন এক সন্নাসী এসেছেন। তাঁর বক্তৃতার বিষয়ও বিচিত্র, গতানুগতিক নয়। উক্ত দিন সকালে কনওয়ে এথিক্যাল সোসাইটির উদ্যোগে মনকিওর সাউথ প্লেস চ্যাপেলে বক্তৃতা। বিষয় ‘বেদান্ত-নীতিবাদের ভিত্তি’। সন্ধ্যায় লেডি ইসাবেল মার্গেসনের ৬৩, সেন্ট জর্জেস রোডের বাড়িতে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ভারতীয় যোগী এসেছেন বক্তৃতা দিতে। তিনি এসেছেন তাঁর কর্মসূচি অনুসারে। আর উনত্রিশ বছরের এক নারী এসেছেন তাঁর জীবনদেবতাকে খুঁজে নিতে। একটি স্পার্ক, যা পরবর্তীকালে রচনা করবে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের অভুতপূর্ব সমন্বয়ের ইতিহাস। এক শ্বেতাঙ্গিনীর জীবনের সবস্ব ত্যাগ ও মহাতিতি৭আর সূচনা পর্ব। তাঁর নামটিও বদলে যাবে, তাঁর ধামটিও বদলে যাবে। এই বদলে যাবার দিন-ক্ষণের সূচনা প্রবন্ধের শুরুতে রয়েছে।
১৮৯৮ সাল। ১১ মার্চ। কলকাতার স্টার থিয়েটার। গিরিশতীর্থ। শহরে আলোড়ন। প্রচারিত হয়েছে — বিশ্ববিশ্রূত স্বামী বিবেকানন্দের নবাগত বিদেশিনি শিষ্যা মিস মার্গারেট নোবল বক্তৃতা করবেন। বিষয় : ‘ইংল্যান্ডে ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রভাব’। সভায় পৌরোহিত্য করবেন স্বামী বিবেকানন্দ। সভায় তিল ধারণের স্থান রইল না। স্বামীজি উপস্থাপনায় বলেলন, ‘ভারতে মিস্ মার্গারেট নোবল ইংল্যান্ডেরই আর একটি দান।’ মার্গারেট বললেন, ‘দীর্ঘ ছ-হাজার বছর ধরে রক্ষণশীল হয়ে থাকার আশ্টর্য নৈপুণ্য আপনাদের আছে। কিন্তু এই রক্ষণশীলতার ফলে আপনাদের জাতি বিশ্বের সর্বোত্তম অধ্যাত্ম-সম্পদগুলিকে এতকাল ধরে অবিকৃতভাবে রক্ষা করতে পেরেছে। এই জন্যেই আমি ভারতবর্ষে এসেছি — জ্বলন্ত আগ্রহে তাঁর সেবা করব বলে।’ নিবেদিতা ভারতের জন্য কী কী করেছেন তার থেকে বলা সোজা তিনি ভারতের জন্য কী কী করেন নি।নিবেদিতার কর্মযজ্ঞ ছিল এক হীরক দ্রুতির মতো। যেখানে একাধিক রং দেখতে পাওয়া যায়।

আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় নিবেদিতার দৃষ্টিতে ভারতীয় নারী। এক শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, খ্রিস্টান রমণী হয়ে নিবেদিতা ভারতে এসে শুধুমাত্র হিন্দুঘর্ম গ্রহণ করেননি, সেই ধর্মের গুণগানও করেছন, যেটা তখন পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে ছিল অসহনীয়। এমনকী ভারতেও তাঁর কাজের তখনও যোগ্য সমাদর হয়নি। তবু তাঁর কাজ থেমে থাকার বদলে গতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভারতে এসে নিবেদিতা তাঁর সূক্ষ্ম অন্তদৃষ্টিতে উপলব্ধি করেন যে ভারতের নারী সমাজ এদেশের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাঁদের মধ্যে আছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবোধ ও ধর্মচেতনা। স্বামীজি ছিলেন ভারতময় আর নিবেদিতা স্বামীজির সেই সত্তাটি গ্রহণ করেছিলেন হৃদয় দিয়ে। তাই ভারতের সব কিছুই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল মদুময়। বিশেষ করে ভারতের নারিদের তিনি দেখেছিলেন গভীর ঐকান্তিকতা ও ভালবাসা দিয়ে। তাঁর একটি পত্রাংশে থেকে আমরা নারীদের প্রতি তাঁর মনোভাব বুঝতে পারি — ভারতীয় সংস্কৃতি যেন এক বিশাল বনস্পতি, যার শিকড় অদৃশ্যভাবে মাটির নীচে বহুদূর বিস্তৃত। বহুযুগ ধরে বহু জাতির সংস্কৃতি ও প্রথা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিত হয়ে কাজ করে চলেছে। এই সভ্যতার উপর নারীজাতির প্রভাব অনেক বেশি। এই সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে নারীর স্নেহের স্বর্গ। সন্তানের কোনো আর্তি তাঁরা উপেক্ষা করতে পারেন না, যে কোনো রূপে তাঁরা মুখ বুজে সহ্য করেন (অসামান্য পত্র লেখিকা, পৃষ্ঠা ৮৪)। এই পত্রাংশ থেকে এটি প্রামাণিত হয় যে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কিন্তু একটি ভিনদেশের সংস্কৃতিকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। আর এটির জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও সাধনার। আমাদের মনে হয় নিবেদিতার মধ্যে সেই শিক্ষা ও সাধনার অভাব ছিল না। স্বামীজি বলেছিলেন, ‘হে ভারত ভুলিও না তোমার নারী জাতির আদর্শ — সীতা, সাবিত্রী-দয়মন্তী। নিবেদিতাও ভারতীয় নারীর আদর্শ রূপে প্রথমেই সীতার নাম উল্লেখ করলেন। নারী চরিত্রের যতরকম ভারতীয় আদর্শ আছে সবই এক সীতা চরিত্র থেকে উদ্ভুত। সীতা চিরকালই সকলের পূজা পাবেন। যে জাতি সীতা চরিত্র সৃষ্টি করেছে ওই চরিত্র যদি কাল্পনিকও হয় তবু স্বীকার করতে হবে, নারী জাতির উপর সেই জাতির যেমন শ্রদ্ধা জগতে তার তুলনা নেই। নিবেদিতা সীতার চারিত্র্যমহিমা উল্লেখ প্রসঙ্গে বলেছেন, “ভারতবর্ষের মানস চেতনায় সীতাই কেন্দ্রীয় চরিত্র।” (শ্রীশ্রীসারদা মহিমা — স্বামী প্রভানন্দ)।
মহাকাব্যের সাবিত্রী এই পৌরাণিক চরিত্রের কোনো ঐতিহাসিকতা আছে কিনা জানি না, কিন্তু ভারতীয় নারী হিসেবে সাবিত্রী নারী-আদর্শের মূর্ত প্রতীক এই মহীয়সী নারীর জীবনাদর্শ সুউচ্চ মহিমায় চির ভাস্রব এবং গার্হস্থ্য জীবনচর্যার নারীদের প্রধান চালিকা শক্তি। আবার মহীয়সী দময়ন্তীর চরিত্র থেকে নারী আদশ৪এর মধু সমূহ সংগ্রহ করে পরিবার-কল্যাণে বিতরণে সকলের মঙ্গল। নিবেদিতা রানি রাসমণি, গৌরী মা, গোপালের মা, যোগিন মা, গোলাপ মা — এঁদের কথা নানাভাবে শুনেছেন। নিবেদিতা এঁদের ভারতীয় মহীয়সী নারী রূপে নিবেদন করেছন। একই সঙ্গে স্বামীজির জননী ভুবনেশ্বরী দেবীর মধ্যে ভারতীয় সনাতন আদর্শের ত্যা ও সেবার সার্থক রূপায়ণ দেখে নিবেদিতা মুগ্ধ হয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর দেখভাল করেছন স্বয়ং নিবেদিতা। অন্যদিকে সারদাদেবী নিবেদিতাকে খুবই আন্তরিকভাবে ভালোবেসেছেন। তাঁর প্রতি গভীর স্নেহে তাঁকে ‘খুকী’ বলে ডাকতেন। নিবেদিতা তাঁকে ‘মাতাদেবী’ বলতেন।