মার্চ মাস ত্রিপুরা বিজেপি আর মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের জন্য এক ক্রান্তিকাল হয়ে সামনে আসছে। বিজেপির দুই বিক্ষুব্ধ বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন আর আশিস সাহা বিধায়ক পদ ছেড়ে দিল্লি গিয়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর ত্রিপুরায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। আগরতলায় যে কংগ্রেস ভবনে এতোদিন বাতি জ্বালানোর কেউ ছিল না সেই বাড়িতে জ্বলল হাজারবাতি, পুড়লো আতসবাজি। পোড়ো বাড়ির আঙ্গিনায় বসেছে নো পার্কিং বোর্ড। নির্মম সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজেপি আইপিএফটি জোট সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও শুরু হয়ে গেছে শঙ্কা, প্রশ্ন। বিশেষ করে একজন মন্ত্রী যখন অভয় দিচ্ছেন, আশঙ্কা নেই। সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও কোন প্রশ্ন নেই তখন সাধারণ্যে প্রশ্ন ত উঠবেই।
নানান জটিল সমীকরণ আর রাজনৈতিক সংখ্যার হিজিবিজিতে সরকারি অফিস থেকে চায়ের দোকান, প্রাতঃভ্রমনের উদ্যান থেকে রাজপথের জটলা সবই ঘোলাটে। দিল্লিতে সুদীপ বাবুদের কংগ্রেসে যোগদানের দিনেই আগরতলায় সিপিএমের সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী বললেন, “ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে নতুন হাওয়া বইছে।প্রতিকূলতার মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অনুকূল পরিস্থিতি। শুরু থেকেই শাসক দলের ভেতরে রক্ত ক্ষরণ চলছে। ধীরে ধীরে রক্তশূণ্য হবে।”

তাহলে কি সিপিএম অনাস্থা প্রস্তাব আনছে বলে যে হিসাব শোনা যায় তা সঠিক? আরও এক বড় প্রশ্ন উস্কে দিলেন কিন্তু জিতেন চৌধুরী। সুদীপ বাবু আর আশিস সাহা যে দিন দিল্লিতে এআইসিসি ভবনে গিয়ে কংগ্রেসে ফেরার ঘোষনা দিলেন সেদিন বিজেপির আরো দুই বিধায়ক দিবাচন্দ্র রাঙ্খল এবং বুর্বমোহন ত্রিপুরা সোনিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। তারা এখনো পদত্যাগ না করলেও সুদীপবাবুদের সঙ্গেই যে রয়েছেন এবং অনুসারী সেই ইঙ্গিত দিয়ে এসেছেন। ঘটনা যা দাড়াচ্ছে তাতে ১০ মার্চে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল ত্রিপুরার রাজনীতিতে অন্য ঝড় আনবে। পাঁচ রাজ্য বা উত্তর প্রদেশের ভোটে বিজেপি জিতছে না এই হিসাব ধরেই কি পদত্যাগ করলেন সুদীপ বাবুরা? হয়তো তাই।
ক্ষেত্র যে অনেকটাই তৈরি সেই আভাস এ দিন পাওয়া গেল বিপ্লব দেব মন্ত্রিসভার নতুন মন্ত্রী রামপ্রসাদ পালের কথায়। তার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বুধবার। তাতে তিনি বলছেন, ‘যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। মা ত্রিপুরেশ্বরী আগামী দিনেও যা করবেন ভালোই করবেন।’ রামপ্রসাদ পাল একজন আদি বিজেপি হিসাবে বিপ্লব কুমার দেবের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে সুদীপ বাবুদের সংস্কারবাদী বিধায়ক গোষ্ঠিতে এসে যান। সুদীপ বাবুর চেয়েও বেশি শুনিয়েছেন বিপ্লব বিরোধী কথাবার্তা। সুদীপ বাবুদের গোষ্ঠীকে দুর্বল করতে মাস চার আগের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারনে রামপ্রসাদ পালকে দমকল মন্ত্রী করেন। মন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম স্বভাবসুলভ তীর্যক মন্তব্য করলেন তিনি।

তার এই দিনের কথা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না সুদীপ বাবুদের অনুসারীর সংখ্যা বিজেপিতে বেশ বড়সড়। আবার কোন দিন সংস্কারবাদী গোষ্ঠীতে না থেকেও দিল্লিতে সুদীপবাবুদের আশেপাশে রয়েছেন সঙ্ঘের পুরানো লোক হিসাবে পরিচিত বিজেপি বিধায়ক ডা. অতুল ত্রিপুরা। আপাত অদৃশ্য এই সংখ্যাটা কত হতে পারে এ নিয়ে অনেকের চোখেই ঘুম নেই। সিপিএমের এক বিধায়কের মৃত্যু, এর আগে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ আশিস দাসের বহিস্কার মিলিয়ে এই মুহুর্তে ৬০ আসনের ত্রিপুরা বিধানসভায় সদস্য সংখ্যা ৫৬। বিজেপির এক বিধায়ক বৃশকেতু দেব্বর্মা আগেই বিজেপি ছেড়ে তিপ্রা মথায় যোগ দিয়েছেন। এই দলত্যাগ মৌখিক, কারন পদত্যাগের কাগজ গ্রহন করারা সাহস দেখান নি বিধানসভার অধ্যক্ষ।কারন মথা ভীতি ।
ফলে আট বিধায়কের ছোট শরিক আইপিএফটি্র সবাই এবং বিজেপির এক বিধায়ক মিলিয়ে নয়জনই অঘোষিত ভাবে মথার বিধায়ক। এক বিধায়কের মৃত্যুর পর সিপিএমের সদস্য সংখ্যা ১৫। ৩৬ বিধায়কের বিজেপির এক বিধায়কের বহিস্কার, দুই বিধায়কের দলত্যাগ এবং এক বিধায়কের মথায় যোগদান এর পর তাঁদের সংখ্যা রয়েছে ৩২ ।দশ মার্চে পাঁচ রাজ্যের ফলাফলের পর নিয়ম মাফিক ওই মাসেই বসছে বিধানসভার বাজেট অধিবেশন। রাজনৈতিক যে ধরনের ব্যাখ্যা চলছে তাতে ওই অধিবেশনে সিপিএম যদি অনাস্থা আনে তাহলে সরকার সঙ্কটের সম্মুখীন হতে পারে। এই মুহুর্তে দুইজনের পদত্যাগ, একজনের মৃত্যু, একজনকে বহিস্কারএর ফলে বিধানসভায় আস্থা জিততে ম্যাজিক ফিগার হবে ২৯। বিজেপির একারই রয়েছে ৩২। আইপিএফটি সঙ্গে না থাকলেও সঙ্কটের কারন নেই। কিন্তু মথা যদি ভোটাভুটি থেকে বিরত থেকে যায় এবং বিজেপির অন্যুন আরো চার বিধায়ক সুদীপ বাবুদের অনুসারি হয়ে যান তাহলে?
যদিও সবই যদি কিন্তু তথাপিতে ভরা।আবার বলা হয়ে থাকে রাজনীতিতে সবই সম্ভব। সব মিলিয়ে মার্চ মাস ত্রিপুরার রাজনীতিতে বড়ো জটিল, বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মাস।