| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নলিনী বেরা’র আখ্যান : প্রান্তিক জীবনের যাপিত চরিত লিখেছেন সসীমকুমার বাড়ৈ

Reporter
সসীমকুমার বাড়ৈ / ৪৩৫২ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১

‘শালের পাতা জুড়ে তৈরি হয় পিঁপড়েদের ভাতঘর

লাল পিঁপড়ে সাদা ডিম যাকে বলে ‘কুর্‌কুট্‌ পটম্‌’

তাই নিয়ে পিঁদাড়ি লোধানী আমাদের গ্রামে এসেছিল

এক পাতা দু’পাতা করে…

আমার নাম নলিনী বেরা, বাবু গো, আমি মেদিনীপুরের ‘ছানা’

মায়ের নাম শালফুল বাপের নাম শালপাতা বেরা’

নেপাল রাজদরবারের অভিলিপিশালা থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে ‘চর্যাচর্যবিনশ্চয়’ আবিস্কার করে গীতিকবিতাগুলোকে প্রত্ন-বাংলা কবিতা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত কবিতাসমূহ এযাবৎ প্রাপ্ত প্রাচীনতম কবিতা। কবিতাগুলোর বিষয় ভাবনা বস্তুত সাম্প্রতিককালের সাহিত্য ভাবনার অনেকটা কাছাকাছি। সারা পৃথিবীতে এখন অবদমিতবর্গ চর্চা বা সাব-অলটার্ণ স্টাডিজ-এর জোয়ার এসেছে। বিস্ময়করভাবে চর্যাপদের কবিতায়ও প্রান্তিকতার কথা এসেছে। তাঁদের সূক্ষ্ম সাধনাতত্ত্বে প্রকাশ ঘটেছে পুলিন্দ ডোম চন্ডালের কথা, তাদের বাসস্থান এবং জীবন-যাত্রার বর্ণনা। চর্যাগীতির রচয়িতাগণ্ম নিজেরাই ছিলেন ডোম্বী, কামলি, শবর প্রমুখ অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষ এবং পাত্র-পাত্রীগণও ডোমণী, শুন্ডিনী, ব্যাধ, জেলে প্রভৃতি অস্পৃশ্য নিম্নবর্গ ভুক্ত। চর্যাচার্যগণ ছিলেন তান্ত্রিক বৌদ্ধ, ধর্মাচারের দিক থেকে তাঁরা বেদবহির্ভুত, কিন্তু সিদ্ধাচার্যগণ যে উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান ছিলনে তার প্রমাণ মেলে। উল্লেখিত ‘শালপাতা শালফুল’ কবিতাটি একটু গভীরভাবে পড়লে আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না এই কবিতার লেখক নলিনী বেরা যেন চর্যাগীতি ধারার বর্তমান এক পদকর্তা। যে ধারা দশম থেকে দ্বাদশ মতান্তরে অস্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দি পর্যন্ত ব্যপ্ত ছিল, যাপিত জীবনে এবং সৃষ্টির বিষয় বস্তুতে নলিনী বেরা যেন সেই ধারার একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী।

নলিনী বেরা’র মতো অন্ত্যজ শ্রেণী থেকে উঠে আসা লেখকদের এখানে আসতে লম্বা পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। লক্ষণীয়, মঙ্গলকাব্যে বিক্ষিপ্তভাবে প্রান্তজনের কথা এসেছে। যেমন মঙ্গলকাব্যের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণকর লিখলেন ‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে।/আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।।’ পরবর্তীকালে সাহিত্য আঙ্গিনায় নিম্নবর্গীয়দের প্রবেশ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বহু শতাব্দী। তবে বাংলা আধুনিক সাহিত্যের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিলেন মহাকবি মধুসূধন দত্ত। তাঁর কলমে রামের বন্দনা নেই, রাবণ মহান সম্রাট: বিদ্যায়, প্রজ্ঞায়, সাম্যে তিনি রামকে অতিক্রম করে যান। রাঘব ভিখারি, লক্ষ্মণের নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশকে চিহ্নিত করে তস্করের আগমণের মতো। তিনি পৌরাণিক কাহিনির উলটো পিঠ পড়ার দৃষ্টিদান করলেন বাঙালি পাঠককে।  মাদ্রাজ অবস্থান কালে মধুসূদন শিখেছিলেন এই কৌশল। দক্ষিণ ভারতে রাবণ শুধু পূজিত বীরই নয় মহান স্রষ্টাও বটে। তার গায়ে আসুরীয় কলঙ্ক নেই। মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে নতুন ভাবনা নিয়ে এলেন এবং পৌরাণিক আখ্যান পাঠের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিলেন। নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে রামায়ন নিগূঢ় পাঠে রাম হয়ে দাঁড়ায়, বিনা অপরাধে শূদ্রঋষি শম্বক হত্যাকারি বা নির্দোষ বালির ঘাতক।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের হাতে সাহিত্য হয়ে ওঠে যাপিত জীবন কাহিনি। একঝাঁক সমাজ সচেতন লেখক : তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় (হাঁসুলী বাঁকের উপকথা), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (পদ্মা নদীর মাঝি), অমিয়ভূষণ মজুমদার (মহিষকুড়ার উপকথা), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (খোয়াবনামা) সতীনাথ ভাদুড়ী (ঢোঁড়াই চরিত মানস), দেবেশ রায় (তিস্তাপারের বৃত্তান্ত), নলিনী বেরা (শবর চরিত, সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা), সসীমকুমার বাড়ৈ (দেড়শো গজে জীবন, সুন্দরবনের মহাল কইন্যা) এবং অন্যান্যরা তুলে আনলেন সমাজের অবহেলিত ব্রাত্যজনের অনালোচিত জীবন যন্ত্রণার কথা। লেখকদের অনেকে প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে এসেছেন, ফলে তাদের লেখা হয়ে দাঁড়াল প্রান্তজনের সমমর্মিতার যাপিত দলিল। অন্ত্যজ পরিবারে জন্ম নেওয়া নলিনী বেরা সেই গোত্রীয় একজন বলিষ্ঠ লেখক। আমেরিকার ব্ল্যাক প্যান্থার মুভমেন্ট থেকে উঠে এসেছিল এক ঝাঁক তরুণ লেখক, তাদের কলম ঝলসে উঠত বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে কালো মানুষের বস্তি যন্ত্রণার বিক্ষুব্ধস্বরে। তাদের আছে শিকড় খোঁজার তাগিদ। কালো মানুষের শিকড় রয়েছে মূলত আফ্রিকায়, তাদের পূর্বপুরুষদের দাস হিসেবে বন্দি করে আমেরিকা, ইউরোপে এনে বিক্রি করা হয়েছিল। তাদের এবং অন্যান্য অভিবাসী জাতিগুলোর প্রবাহমান বিপন্নতা এবং জাতিদ্বন্দ্বের সংকট ধরা পড়ে Nathan Glazer and Daniel P.Moynihan “Beyond the Melting Pot (The Negroes, Puerto Ricans, Jews, Italians, and Irish of New York City)” বইয়ে।

আমেরিকার প্রান্তিক জাতিগুলোর সমস্যা মূলত অভিবাসন জনিত সমস্যা কিন্তু ভারতে ভূমিপুত্ররা হিন্দু ধর্মের মধ্যেই বর্ণবাদী অত্যাচার অবহেলায় জর্জরিত। ধর্মীয় গঠনতন্ত্রে অবাঞ্চিত নিম্নস্তরীয়। তাদের সমস্যা পুরাণ আরোপিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক। তারা নিজভূমেই পরবাসী। পেশা জাত ভিত্তিক। ভারতীয় শ্রম ব্যবস্থায়ও জাতপাতের যে মুখ্য ভূমিকা আছে তা কার্ল মার্কসও অনুধাবণ করতে পারেননি। তাঁর বর্ণিত শ্রমিক আর ভারতীয় শ্রমিক হুবহূ এক নয়। এখানে বর্ণব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে শোষণ শাসন জিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্ল্যাক প্যান্থার লেখকদের কথা ও ভাষার সঙ্গে ভারতীয় সাহিত্যের বিষয় আশয় আলাদা। সংগঠিত দলিত সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক থেকে। প্রথম দিকে ড. বি আর আম্বেদকর-এর দলিত বৌদ্ধ আন্দোলনের অনুসারী ছিলেন মহারাষ্ট্রের দলিত লেখকরা। তাদের মধ্যে এ দ্বন্দ্বও ছিল যে, বৌদ্ধ লেখক সঙ্ঘ হবে না দলিত লেখক সঙ্ঘ হবে। পরে তাঁরা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠেছে। বেদ পুরাণ কোরান, মনিসংহিতা বর্জনের ডাক উঠল, তাঁরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেন যে দলিত সাহিত্য হবে দলিতদের বিষয় আশয়, দলিতদের জন্য এবং দলিতদের দ্বারা লিখিত। উঠে এলেন অনন্ত দয়া, অর্জুন ডাঙলে, আন্না ভাউ সাঠে-র মতো এক ঝাঁক শক্তিশালী দলিত সাহিত্য আন্দোলনকারীপন্থী লেখক। এখন মারাঠী সাহিত্য মূলত এঁদের পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও তাঁরা অনেকটা মূল ধারার সাহিত্যের কাছাকাছি চলে এসেছে। কর্ণাটকের দলিত সাহিত্য আন্দোলনে যে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষই যুক্ত হতে পারে। শুধু তাদের বিষয় আশয় হবে প্রান্তিক মানুষের আর্থো-সামাজিক সংকট কেন্দ্রিক।

বাংলার দলিত সাহিত্যিকরা মহারাষ্ট্রের আদি দলিত সাহিত্য আন্দোলনকে অনুকরণ করতে গিয়ে আটকে থাকলেন উনবিংশ শতাব্দীর শৈশবে। তাঁরা ব্যক্তিগত বা সমাজের দারিদ্র, দৈন্যতা বিক্রি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, সমাজের মহামূল্যবান লোকজ  সম্পদকে সাহিত্যের উপাদান করে তুলতে পারলেন না। মহারাষ্ট্রের দলিত লেখকরা কিন্তু তাঁদের আগের অবস্থানে দাঁড়িয়ে নেই, এখন বুঝেছেন চতুর্দশ শতাব্দীর মাহার সাধক কবি চোখামেলাকে অস্বীকার করা তাদের ঠিক হয়নি। চোখামেলার অভঙ্গে বিট্টল ভজনার আড়ালে যে বলিষ্ঠস্বর ছিল তা বর্তমান সময়ের প্রতিবাদকেও অতিক্রম করে যায়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা নয়, মেধা এবং লড়াইয়ে সুচারুভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিকল্প স্বরে কথাই হবে সাহিত্যে প্রতিবাদের ভাষা। ইতিহাস বেদ পুরাণ কোরান বিনির্মাণে নতুন ব্যখ্যা আনতে হবে। বাংলার বিকল্প ধারার লেখকরা হলেন মধুসূদন দত্ত-অদ্বৈত মল্লবর্মণ অনুসারী। নলিনী বেরা নীরবে সেই বিনির্মাণ করে চলেছেন সাহিত্য কর্মে। তিনি সরাসরি দলিত সাহিত্যে আন্দোলনের অনুসারী নন, তিনি প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার কথা সমাজের মূলধারাকেই শোনাতে এবং প্রতিকার চান।

যদিও বর্ণবাদী সমাজ তাঁকে আত্মীকরণ (সংস্কৃত্যায়ন) করতে চায়-“মুহূর্তে কে যেন আমার কানের কাছে কালের ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে দিল। কংসাবতী শিলাবতী ময়ূরাক্ষী দ্বারকেশ্বর টটককুমারী রাড়ু-কঙ্কর ডুলুং সুবর্ণরেখা নদীবিধৌত ঝারিখন্ডের বঢ় বহড়াশাল পিয়াশাল বা আসন কুচলা কইম করম শিমূল জঙ্গলাকীর্ণ জঙ্গলমহালের আসনবনি কুড়চিবনি জামবনি শালবনি কেঁদবনি বনকাটি মুরাকাটি আমডিহা নিমডিহা ভালুকঘরা ল্যাকড়াগুড়ি বাঘুয়াশোল বাছুরখোয়াড় গ্রাম অধ্যুষিত কোনো এক গ্রামে ভূমিজ মুণ্ডা কুম্ভার মাল সাঁওতাল হাড়ি বাউড়ি জনগোষ্ঠীতে আমার জন্ম, আমি জাতিতে বোধ করি শূদ্রই হব। কিন্তু উৎকল ব্রাহ্মণ টুনিঠাকুর আজ আমার কানে ফুঁ দিয়ে যেন বলেছেন, ‘তুই আদিবাসী শূদ্র নোস্‌ নলিন, তুই ‘ব্রাহ্মণ’, ‘ব্রাহ্মণ’।“ নলিনী কিন্তু থেকে যান রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত ভূমিপুত্র শূদ্রদের দলে। কুমোর জেলেদের অর্থনৌতিক অবস্থান, হাড়ি, বাগধি, ডোম, সাঁওতাল, মুন্ডাদের থেকে সামান্য ভাল হলেও বৃহত্তর অন্ত্যজ জনগোষ্ঠীর ভাষাই নলিনীর ভাষা এবং প্রাণের কথা। তিনি তীব্র শ্লেষে বিদ্ধ করেন শূন্যগর্ভসার বর্ণাশ্রম প্রথাকে, চারটে বিড়ালের বাচ্চার নাম রাখা হয় “ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র”। তেমনি টুনিঠাকুর যে হোস্টেলের রাঁধুনি, সে মোটা দরে রাখীপূর্ণিমার দিন পৈতে বিক্রি করে, হাঁসদা, হেমব্রম, মাইতি, মাহাতোদের; নকল বামনাই-এর ভেক ধরতে। এ যেন অঞ্চলে আসা ব্রাহ্মণ-গোস্বামীরা সামন্ত রাজাদের রাতারাতি  ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় হিসেবে বংশলতিকা বানিয়ে প্রভূত ভূস্পত্তি অর্জন করত। সেই ধারা এখনও বহমান, তেমনই টুনিঠাকুর নলিনকে নতুন বংশলতিকা বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় চাল চুরির ঘটনা গোপন রাখার শর্তে। নলিন তা প্রত্যাখান করে।

অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার লোধা-ভুঁইঞা-ভূমিজ-কাম্‌হার-কুম্‌হার-সাঁওতাল অধ্যুষিত অখ্যাত গ্রাম বাছুরখোঁয়াড়-এ কুম্ভকার (কুম্‌হার) সম্প্রদায়ের এক পরিবারে নলিনী বেরার জন্ম। অনার্য প্রধান গ্রামের মানুষজন মূলত প্রান্তিক শ্রেণীর। নলিনীর স্কুল রোহিণী চৌধুরণী রুক্মিণী দেবী হাই স্কুলের হোস্টেলের ছাত্রদের নামের তালিকায় ভীড় করে: টুডু, সিং, হেমব্রম, হাঁসদা, মুর্মু, বাউরি, সোরেন , বিশুই, মুন্নডা, বেরা, রাণা, হাটুই, ভুঁইঞা, পানি, বেহেরা, হাটুই, মাঝি, পৈড়া’র মতো অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পদবিসমূহ। লক্ষ্যণীয় যে, পদবিগুলো মঊলত তপশিলি জাতি, উপজাতি শ্রেণিভুক্ত এবং শিক্ষাঙ্গনে এসেছে তাদের প্রথম প্রজন্মের সন্তানরা,, যারা ভারতীয় সমাজে শাস্ত্রে এবং শিখায় ব্রাত্যজন ছিল বৈদিক অনুশাসনে। তবে এ অঞ্চল বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবমুক্ত নয়। শ্রীচৈতন্য নীলাচলে যাওয়ার পথে এই অঞ্চলে শুনিয়েছেন, হরিনামে চন্ডালও ব্রাহ্মণ হতে পারে। নলিনীও সেই আঞ্চলিক অনার্য সমাজের প্রথম প্রজন্মের সন্তান যার মেধা আছে, হাতের লেখা মাছের কাঁটার মতো।

গ্রামটি সুবর্ণরেখার তীরে উড়িষ্যা সংলগ্ন। সে অঞ্চলের ভাষাও স্বাভাবিক বাংলা নয়, হাফ বাংলা হাফ উড়িয়া। সব হাটুয়া লোকজনের কথ্যভাষা। সেই ভাষাকেই নলিনী সাহিত্যে প্রাণরস সঞ্চার করলেন। স্বাভাবিকভাবেই ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’র নলিনকে বা লেখক নলিনী বেরাকে শৈশব থেকেই পাঠ্যভাষা থেকে ক্রমান্বয়ে বাংলা চলিত ভাষা শিখতে হল। কুম্ভকার (কুম্‌হার) সম্প্রদায়ের বালককে শুধু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার বিরুদ্ধেই লড়তে হয়নি,  জীবন সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ভাষাগত প্রান্তিকতা নিয়েও। সামাজিক বা ভাষাগত সংঘাত অবশ্য তখনও শুরু হয়নি কারণ আঞ্চলিকভাবে  জনঘনত্বে এবং ভাষায় হাটুয়াদের আধিক্য ছিল। কিশোর নলিনীর আত্মসম্মানে প্রথম আঘাত লাগে সেদিন, যেদিন তাঁর এক তথাকথিত উচ্চবর্গের বাড়িতে খাওয়ার পর প্রাণ প্রিয় বন্ধুর মা তাঁকে এঁটো থালাটি ধুইয়ে রাখতে বলে। দুঃখ যন্ত্রণা এবং অভিমানের ক্ষত কিশোর নলিনীর আত্মবিক্ষণের পথ খুলে দেয়। বাস্তবতার মুখোমুখি হন নলিনী, এবং অনুভবের যাত্রায় ভারতবর্ষের সামাজিক কাঠামোতে তথাকথিত নিম্নবর্গের সঙ্গে নিজের সহাবস্থান নির্ণয় করেন। অভিঘাতই তাঁকে চিনতে সাহায্য করে তথা কথিত শূদ্র সমাজের প্রতি ভদ্দরলোকদের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বেছে নেন যাপিত জীবন।

আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির আকর লোকভাষা, লোকখাদ্য, লোকবাদ্য, লোকগান আয়ত্ত করতে শুরু করেন। উপন্যাসে বর্ণিত স্থানটির ভৌগোলিক অবস্থানটিও অন্য রকম। এখানে বাংলা, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ডের পূণ্যার্থীরা বালিজাত্‌ উৎসব পালন করে। লোকবিশ্বাস, মহাভারতের অজ্ঞাতবাস পর্বে যুধিষ্ঠির এখানে বারিতপর্ণ করেছিল, তার স্মৃতি উৎসব। যা হয়ে ওঠে নলিনী সাহিত্য চর্চার উপাদান। চেনা মানুষজনই ঘুরে ফিরে আসতে থাকে তাঁর লেখায়।  যাপন চরিত্র নিয়েই সৃষ্টি হয়, সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা, মাটির মৃদঙ্গ বা শবর চরিত-এর মতো উপন্যাস। সচেতন ভাবে যে ধারার শুরু করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে। মালো পরিবারের সন্তান লিখেছিলেন তিতাস নদী কেন্দ্রিক জেলে-মালোদের জীবন যাপনের ধ্রুপদী উপন্যাস। সেটি ছিল সমমর্মিতার (empathy) বাস্তব জীবনের সাহিত্য ভাষ্য, অন্যদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ যা সহানুভূতির (sympathy) অনেকাংশে কাল্পনিক উপাখ্যান। তাই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর উপস্থানার সঙ্গে ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’র শুরুর কোথায়ও একটি অন্তর্লীন সুর বাজতে থাকে “কোনো মধ্যমানের মালভূমি থেকে বেরিয়ে নানা গ্রাম্য জনপদের পাশ দিয়ে বইতে বইতে এই নদী সাগরে গিয়ে মিশেছে নীরবে। এই অবোলা নদীর কপালে জোটেনি কোনো হিমবাহ বা তুষারশৃঙ্গের আশির্বাদ, মাত্র চারটি রাজ্যের মাটি ছুঁয়েই এর যাত্রা শেষ। এ পাড় ভাসায় না, এতে জাহাজও চলাচল করে না; পণ্যবাহী নৌকা আর প্রান্তিক মানুষজনকে পারাপার করিয়েই এর দিন কাটে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ লেখেন—তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। …মেঘনা পদ্মার বিভীষিকা তার মধ্যে নেই। আবার রামু মোড়লের মরাই, যদু পণ্ডিতের পাঠশালার পাশ দিয়া বহিয়া যাওয়া শীর্ণ পল্লীতটিনীর চোরা কাঙ্গালপনাও তার নেই। তিতাস মাঝারি নদী। দুষ্ট পল্লীবালক তাকে সাঁতরাইয়া পার হইতে ভয় পায় না। আবার ছোট নৌকায় ছোট বউ নিয়া মাঝি কোনোদিন ওপারে যাইতে ভয় পায় না। দু’টি নদীই শেষমেশ বড় নদীতে সমর্পিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যায়। তাদের প্রবাহমান পথের পাশের প্রান্তজনেরা হয়ে ওঠে নদী জীবনের কুশিলব।

পশ্চিমবঙ্গে শবর একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি। তারা মূলত ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া জেলায় থাকে। নলিনী বেরা’র উপন্যাসে যেমন নয়াগ্রাম ও গোপীবল্লভপুর থানার বড় বড় লোধা জনবসতি বিবরণ আছে। রয়েছে লোধাদের কথা। লোধারা কোথায়ও নিজেদের লোধা-শবর হিসেবে পরিচয় দেয়, কোথায়ও খেড়িয়া-শবর। আদমশুমারি অনুসারের লোধা এবং শবরদের আলাদা পরিসংখ্যান আছে। শবর হিসেবে চিহ্নিত জনসংখ্যা মোট আদিবাসী জনসংখ্যার এক শতাংশের মতন। শবর লোধাদের পরিচয় এবং পরিসংখ্যানে লুকিয়ে থাকে গভীর গন্ডোগোল। ব্রিটিশ শাসনে লোধা উপজাতিকে ‘অপরাধ প্রবণ’ জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের আরোপিত কলঙ্কের দাগ লোধা-শবরদের গায়েও বর্তমানেও সমানভাবে বহমান। পাহাড় প্রমাণ অর্থনৈতিক বঞ্চনা পেরিয়ে লোধা সমাজের প্রথম গ্রাজুয়েট মেয়ে চুনি কোটালদের এখনও জীবন বিসর্জন দিতে হয় ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষক শিক্ষিকাদের তাচ্ছিল্য-অবজ্ঞার কাছে। কমিশনের বিচারপতি মৃত্যুর ঘটনাকে নগণ্য/তুচ্ছ (trivial) ঘটনা বলে ফুৎকারে উড়িয়ে দেন। আদিবাসী ডাক্তার পায়েল তাদভি বা গবেষক রোহিত ভেমুলার মতো মেধাবী দলিতদের মৃত্যু চলতেই থাকে বর্ণবাদী অত্যাচারে।

নলিনী কিন্তু দায়বদ্ধ থাকেন সেই শবর-লোধা সমাজের কাছে। তিনি চুনি কোটালের আদলে নির্মাণ করেন লক্ষ্মীরানি মল্লিককে। পরোক্ষে নির্মাণ হয়ে যায় প্রতিবাদের ভাষা। এবং কঠোর পরিশ্রমে শবর-লোধাদের সীমাহীন জীবন যন্ত্রণা নিয়ে লিখে ফেলেন মহাকাব্য সাদৃশ উপন্যাস “শবর চরিত”। গুড়গুড়িয়া, গুরভা, লোধানী ফুলটিসি, সাবেত্রী, চাঁমেলী, শিশুবালা, লোধা রাইবু, শতুরা, বঙ্কা মাহাত, কুম্ভার ব্রহ্মকুমার, বসন্ত কামিল্যা, গোবরা সাঁওতালদের মতো অসীম প্রাণসম্পদে ভরপুর মানুষজনের চরিত্র ভীড় করে উপন্যাসে। চরিত্ররা কথা বলে-সুবর্ণরেখা তীরবর্তী সাঁকরাইল, কেশিয়াড়ি, নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর এলাকার বহুবিধ শব্দ-আঙ্গিক-রূপে। বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিক অন্তঃসার শূন্য জড়তা ছেড়ে সন্ধান পায় এক অপার বিস্ময়কর জগতের। অফুরন্ত শব্দভাণ্ডার: কেঁদ, মহুয়া, কাঁকর, ভুড়রু, সুদখোরী বা পদ্মল ঘা, কুঁইরানো, গাড়িয়া, বুড়ে যাওয়া, মাগ্‌নে, কচিকুসুম, বাহা ঘর, দেড়ইয়া, মেঘপাতাল-এর মতো শব্দ যোগ হল বাংলা সাহিত্যে। কলকাতা থেকে সামান্য দূরে এই শব্দ-বিশ্বের কথা আমাদের অজানা। এ যেন এক বহুত্বের জানালা খুলে দিলেন নলিনী।

অথচ চরিত্র মানুষগুলোর প্রায় কারোরই ঘর বাড়ি নেই। বন-জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে, নদী নালা, খালের পাশে ঝুপড়ি, ঝুগগি বানিয়ে থাকে। তারা ‘ঘর ঘর করে বটে, তবে ওই ঘরই খুঁজে মরে আজীবন’। ভূমিহীন লোধারা সারাজীবন বনে বনেই ঘুরে বেড়ায়, বন থেকে বেরলে অন্যের মাঠে মাঠে ধান কাটে। কিন্তু বনের দরজাও একে একে বন্ধ হয়ে যায়। জঙ্গলে থাকা এবং বনসম্পদ ব্যবহারের যে অনাদিকাল থেকে অধিকার ছিল অরণ্যবাসীদের তাও বন্ধ হয়ে যায় নরসিংহদের মতো ফরেস্ট গার্ডের অত্যাচারে। গার্ডরা তাদের ঝুপড়ি গুড়িয়ে দেয়, চালান করে দেয় আদালতে। শবর মেয়েরা বাবুদের যৌন লালসা এবং শোষণের শিকার হয়। ফুলটুসি, সোমবারি, চাঁদবদনীদের মতো মেয়েরা খসে পড়ে জীবন বৃত্তের বাইরে। পুনই, যে মেয়েটি একটু আলো দেখতে স্কুলে যায়, সে স্কুলেই মাস্টারের বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়। পুনই অসম লড়াইয়ে হেরে ফিরে আসে স্কুলের ত্রিসীমানার বাইরে: লোধা পাড়ায়। অরণ্যেরর অধিকার হারিয়ে, আগের মত জঙ্গল থেকে বেঁচে থাকার রসদ-আলু, কঁদ, ফলমূল না পেয়ে তারা ক্রমান্বয়ে কৃষি মজুরে পরিণত হয়ে দলীয় রাজনীতি, পঞ্চায়েত, পুলিশ, আদালত, কাঠ-মাফিয়ার মতো রাষ্ট্রীয় জটিল আবর্তে নিস্পেশিত হয়। অথচ প্রবাহমান জাতিধারা চলতেই থেকে সমাজের মুখে মুখে ‘আজকালকার ছাউছানারা মনে রাখ-পদবি ভক্তা হলে গোত্র হবে চিরকা আলু, মল্লিক মকর, কোটালদের চাঁদ আর কাছিম, নায়েক হলে শালমাছ, আড়িদের চাঁদামাছ, ভুইয়াদের শোলমাছ। মাছ আছে, পাখি আছে, বাঘ-হরিণ ইঁদুরও আছে …’। দেশটা ভারতবর্ষরূপেই স্থবির হয়ে যায় লোধা-শবরদের কাছে এসে। নলিনী নখদর্পনের মতো চেনেন এই সমাজ, অরণ্যচারীদের: তাদের ব্যথা বেদনা বঞ্চনার ঘাত প্রতিঘাতগুলো জানেন। ফলে চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হন নিজের ফেলে আসা শৈশব এবং লেখক নলিনীর চেতনায়।

নলিনী বেরা’র গল্প উপন্যাস নিয়ে পাঠকমহলে মাঝে সাঝে শোনা যায় যে তাঁর লেখায় বেশ কিছু পুনরাবৃত্তি থাকে। বক্তব্যে একই কথা ঘুরে ফিরে আসে। বস্তুত এই সমালোচনার খুব বেশি যৌতিকতা বা ভিত্তি নেই, কারণ তিনি এমন অচর্চিত এবং অপাঙক্তেয়  সমাজের চর্চা করেন যা নাগরিক সমাজ প্রায় জানেই না, চেনেও না।  এই নরগোষ্ঠীর ভাষা-কথা নাগরিক সমাজকে চেনাতে হলে কিছু কথা, শব্দ বা ঘটনার পুনঃপুন ব্যবহার প্রায় অনিবার্য। হ্যাঁ, তাঁর সাঁওতাল দিদি ও চটির গল্প এখন অনেকের প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে, তেমনি পরিচিত নলিনীর গাওয়া সুবর্ণরেখাপারের লোকগান। একটু গভীর ভাবে দেখল দেখা যাবে এই অনার্য সমাজের দুঃখ যন্ত্রণা প্রায় অবিচ্ছেদ্য সুরের মতো বিরামহীন এবং চলমান। তাকে এক একটি ঘটনায় বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সেখানে ভারতবর্ষ স্থবির। স্বাভাবিকভাবেই তাকে ভাঙতে হলে পুনঃ পুনঃ চর্চা দরকার। সেই চর্চায় নলিনী যেন আচ্ছন্ন: শবর, লোধা, মুন্ডা, মাঝি, সাঁওতাল, বাগদি, জেলে, কুমোর, নায়েকদের প্রবহমান বিপন্নতার সঙ্গে।

বাংলাকে বলা হতো পাণ্ডব বর্জিত দেশ, বস্তুত এখন পশ্চিবঙ্গ তার উল্টোটা। ব্রাহ্মণ্যবাদের সর্বব্যাপি আধিপত্যে ভূমিপুত্র অনার্যরাই এখানে অপাঙক্তেয়। নাগরিক শিল্প সাহিত্যে তথাকথিত কৌলিন্যের একচেটিয়া মনোপলি। লোকসংস্কৃতি এখনো কিছুটা নিম্নবর্গের কালচার করে রাখা হয়েছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে নলিনী ২০০৮ সালে ‘শবর চরিত’-এর জন্য বঙ্কিম পুরস্কার পান। সরকারি স্বীকৃতি। ২০১৯সালে আনন্দ পুরস্কার পান ‘সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা’ উপন্যাসের জন্য। এটা  অনিস্বীকার্য যে তাঁর মতো এক প্রান্তিকের পুরস্কার প্রাপ্তি একটি বড় ঘটনা।  ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ এতদিন ভাবতেই পারত না যে ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়েস্থ বাদে বঙ্গে কারও মননশীলতা আছে বা ‘বেরা’র মতো অপাঙক্তেয় পদবিধারীরা সাহিত্য রচনা করতে পারে। নলিনী বেরার উত্তরণ সেই আধিপত্যবাদী বৃত্তের প্রথম ভাঙ্গন। এখন হয়তো বলার সময় এসেছে, গণ-সাহিত্যের যে মৌলিক উপাদান, শক্তি এবং প্রাণরস দরকার তা কেবলমাত্র নলিনীদের মতো প্রান্তিকতা নিয়ে কাজ করা সাহিত্যিকদের কলমেই আছে।

প্রকৃতির চেয়ে বড় শিল্পী সাহিত্যি আর কেউ নেই। তার সত্তাই শিল্প সত্তা, সৃষ্টিই তার শিল্প। তাকে নতুন করে শিখতে হয় না শিল্পের নির্মাণ বিনির্মাণ ভাবনা। প্রান্তিক শ্রেণির মানুষজন মূলত প্রকৃতি পূজারী। তাদের গোত্র বা টোটেম হল- বৃক্ষ, পশু, পাখি, নদী-নালা, মাছ-কচ্ছপ। তাদের জীবন ব্যপ্ত থাকে দেশজ/ভূমিজ উপাদানে। তারা নিজেরা এক সঙ্গে প্রকৃতির অঙ্গ এবং সেবায়েত। যা নলিনী নিজেও যেন বহন করেন সত্তায়। তাই নলিনী স্বীকার করে নেন তাঁর ‘মায়ের নাম শালফুল বাপের নাম শালপাতা বেরা’। ফলে তাঁর সাহিত্য সম্ভার হয়ে যায় সুফি-বাউল গানের সহজিয়া কথকি ধারা।

লেখক নলিনী বেড়ার সৌজন্যে প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হলো, প্রবন্ধটি আরাত্রিক বইমেলা ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev