রিপোর্ট বলছে, পৃথিবীর ১৩৮টি দেশ এখন ডেঙ্গি-প্রবণ। প্রতিবছর এইসব দেশে রোগে আক্রান্ত হয় গড়ে ৩৯ কোটি মানুষ, যার ৭৫ শতাংশ (২৫ কোটি ৪০ লক্ষ) সাইলেন্ট ক্যারিয়ার। এই সাইলেন্ট ক্যারিয়ারেরাই ইডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গি ছড়ায়।
কোভিড-পরবর্তী এই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশ্ব-উষ্ণায়ন-সহ বিভিন্ন কারণে দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেঙ্গির সংক্রমণ। পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ শহর সিঙ্গাপুরও আজ ডেঙ্গির সমস্যায় জেরবার। ডেঙ্গি মোকাবিলায় সঠিক কৌশলের সন্ধানে নিরন্তর গবেষণা চলছে পৃথিবীজুড়ে। বিভিন্ন সরকারি, বেসকরারি দফতর এবং জনসাধারণের মিলিত প্রয়াসেই এই সমস্যার সমাধানসূত্র মিলবে বলে আশা বিশেষজ্ঞ মহলের।
চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত কলকাতা পৌর-এলাকায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৬০৫২। যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি। সংক্রমণ বৃদ্ধির নেপথ্য-কারণ অনেক। এখানে তারই একঝলক তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, উত্তর কলকাতায় (বরো ১ থেকে বরো ৭) ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ১৩৭১ (২২.৬ শতাংশ) এবং দক্ষিণ কলকাতায় (বরো ৮ থেকে বরো ১৪) ৪৬২৭ (৭৬.৫ শতাংশ)। অর্থাৎ, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে সংক্রমণ বেশি।
দফতরের গবেষণায় জানা গেছে, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণ কলকাতায় ইডিস মশার সম্ভাব্য মনপসন্দ আঁতুড়ঘর, যেমন খালি জমিসহ নির্মীয়মাণ বাড়ি, পুকুর, পাতকুয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। যেখানে উত্তর কলকাতায় খালি জমির সংখ্যা ৩৮৩টি (৯.৯ শতাংশ) সেখানে দক্ষিণে খালি জমির সংখ্যা ৩০৩৮টি (৭৮.৮ শতাংশ)। তেমনই উত্তরের নির্মীয়মাণ বাড়ি, পুকুর, নর্দমা, পাতকুয়ার সংখ্যা যথাক্রমে ১৬৮৪ (৩৭ শতাংশ), ৪৩৩ (২২.৫ শতাংশ), ১৫৪৫ (১২ শতাংশ) এবং ১৭৬৬ (১৫ শতাংশ); সেখানে দক্ষিণে নির্মীয়মাণ বাড়ি, পুকুর, নর্দমা, পাতকুয়ার সংখ্যা যথাক্রমে ২৮৪৪ (৬৩ শতাংশ), ১৪৯০ (৭৭.৫ শতাংশ), ১১২০৬ (৮৮ শতাংশ) এবং ১০০৪৭ (৮৫ শতাংশ)।

কলকাতার শতাব্দী-প্রাচীন রোগ ডেঙ্গি মোকাবিলার জন্যে বিগত ১০-১২ বছরে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির পাশাপাশি, মশা দমনের কর্মপদ্ধতিরও অভিনব পরিবর্তন ঘটিয়েছে পৌর স্বাস্থ্য বিভাগ। ফিল্ড কর্মীসহ অন্যান্য কর্মীদের হাতে-কলমে মশার লার্ভা চেনানোর জন্য মশা গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠা, ত্রিস্তরীয় নজরদারিতে মশার উৎস বিনাশ, বছরের শুরু থেকেই মশাকে আঁতুড়ে বিনাশের উদ্যোগ, দাঁড়টানা নৌকার সাহায্যে শহরের বিভিন্ন খালে কার্যকরী কীটনাশক স্প্রে করে কিউলেক্স মশাসহ অন্যান্য মশার লার্ভা দমন, ওয়ার্ডভিত্তিক মশার সম্ভাব্য আঁতুড়ঘরের ডাটা ব্যাঙ্ক তৈরি করে তার ভিত্তিতে প্রাক্-বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মশার প্রজননের ওপর নজরদারি, মশার উৎস বিনাশের জন্য বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের নিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক যৌথ অভিযান চালানো, পৌর আইনের ৪৯৬(এ) ধারায় নোটিশ জারি করা এবং সেই ধারায় মিউনিসিপ্যাল কোর্টে মামলা দায়ের করে মশা দমনের উদ্যোগ নেওয়া; জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে রঙিন লিফলেট বিলি করা, হোর্ডিং-ব্যানার, অটো মাইকিং, হ্যান্ড মাইকিং, টিভিতে বিজ্ঞাপন — বিগত একদশক ধরে এইসব নজিরবিহীন কাজ করে আসছে কলকাতা পৌর স্বাস্থ্য বিভাগ।
ডেঙ্গির সংক্রমণ রোধে ন্যাশনাল ভেক্টর বোর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম-এর নিদান : “Controlling dengue is everyone’s responsibility. People need to assume responsibility for inspection and control of Aedes aegypti in and aroud their home. Successful, sustainable Ae. Aegypti control programme must involve a partnership between Government and the community.”
আবার বলি, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গির মতো একটি আন্তর্জাতিক এবং সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
ডেপুটি মেয়র, কলকাতা পৌরসংস্থা, বিধায়ক