ইংল্যান্ডের পোর্টমাউথ শহরে একটি রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ওশন্ অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য লেন’। নীল গাইম্যান (Neil Geiman) এর ঐ নামেরই বিখ্যাত উপন্যাসের নামে ২০১৩ সালে এই নামকরণ। নিঃসন্দেহে এটি ঐ শহরের নাগরিকদের বইপ্রেমের পরিচয়। কিন্তু আমরা ক’জন খেয়াল রেখেছি যে আমাদের কলকাতায় প্রায় এক শতক আগেই রাস্তার নামকরণ হয়েছে বইয়ের নামে ? একটি নয়, দু-দুটি রাস্তা।
একটি হলো ‘স্বর্ণলতা স্ট্রীট’, প্রায় দেড়শো বছর আগে লেখা তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের এক সময়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া উপন্যাসের নামে। আর অপর যে রাস্তাটিও এক বইয়ের নামে , সেটি আমাদের আজকের বিষয়।

নবজাগরণের আলোর কিরণ তখন এসে পড়ছে বাঙালীর জীবনের আনাচে কানাচে। শিক্ষায়, জ্ঞানচর্চায় জাগছে জোয়ার। উত্তর চব্বিশ পরগণার শ্যামনগরের কাছে রাহুতা গ্রাম নিবাসী শিক্ষক রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলায় বিশ্বকোষ রচনার। এই ধরনের প্রচেষ্টা অবশ্য আগেই শুরু হয়েছিল। যেমন, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত তেরো খন্ডের “বিদ্যাকল্পদ্রুম” অথবা শরচ্চন্দ্র দেব ও রাজকৃষ্ণ রায়ের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ভারতকোষ’। কিন্তু এগুলিকে প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক বিষয়সমৃদ্ধ বিশ্বকোষ বলা যায় না। রঙ্গলালের পরিকল্পনা ছিল তাঁর বিশ্বকোষকে
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সমগোত্রীয় করে তোলা।
তাঁর ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সক্রিয় সহযোগিতায় তিনি তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোগী হলেন। অবশেষে বাংলা ১২৯৩ সালে (১৮৮৫-৮৬ খৃষ্টাব্দ) রাহুতা গ্রামে তাঁর নিজস্ব ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হলো কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফসল— বাংলায় প্রথম বিশ্বকোষের প্রথম খন্ডটি। ছবি ও মানচিত্র সমৃদ্ধ প্রায় সাতশো পাতার এই খন্ডে সংকলিত বিষয়গুলি দেখলেই এর ব্যাপ্তি বোঝা যায়।

কিন্তু রঙ্গলাল আর এগোতে পারলেন না। ত্রৈলোক্যনাথ কর্মসূত্রে বিদেশ চলে যাওয়ায়, ছাপাখানা চালানোর ব্যয় সাধ্যের অতীত হয়ে যাওয়ায় ও আরো বিভিন্ন সাংসারিক, পারিপার্শিক কারণে বিশ্বকোষ এর কাজ বন্ধ হয়ে গেল।
নিজে আর এগোতে না পারলেও, আশাহত রঙ্গলাল তাঁর স্বপ্ন ভুললেন না। কয়েক বছর পরে তাঁর যোগাযোগ হলো পূর্ব পরিচিত বিদ্যোৎসাহী বছর বাইশের এক তরুণের সঙ্গে, যিনি ইতিমধ্যেই ‘শব্দেন্দু মহাকোষ’ নামে ইংরেজি -বাংলা অভিধান রচনা করে খ্যাতি লাভ করেছেন। রঙ্গলাল নিঃস্বার্থ ভাবে নিঃশর্তে “বিশ্বকোষ” এর স্বত্ব অর্পণ করলেন তরুণ নগেন্দ্রনাথ বসুকে, দিলেন তাঁর স্বপ্নপূরণের গুরুভার।

নগেন্দ্রনাথ বসুর বাগবাজারের কাঁটাপুকুর বাই লেনের বাড়ি।
‘প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব’ নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর বাগবাজারের কাঁটাপুকুর বাই লেনের বাড়িতে শুরু করলেন তাঁর পূর্বসূরীর অসফল স্বপ্নকে সফল করার মহা যজ্ঞ। এ সম্পর্কে নগেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “১২৯৫ সালে ভগবানের দুর্জ্ঞেয় বিধানে আমারই উপর এই সংখ্যা প্রকাশের ভার পড়িল।” শুরু হলো নগেন্দ্রনাথের অমানুষিক লড়াই, দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রবল আর্থিক অনটন, বন্ধু ও আত্মীয়দের উপহাস ও অবহেলা, প্রবল শারীরিক মানসিক পরিশ্রম, সকল প্রতিকূলতা সহ্য করে প্রায় একক উদ্যমে নগেন্দ্রনাথ নিজেকে উৎসর্গ করলেন “বিশ্বকোষ”-এর কঠিন ব্রতে, গ্রীক বীর হারকিউলিসের মতোই। অবশেষে ১৯১১ খৃষ্টাব্দে শেষ করলেন সতের হাজার পৃষ্ঠার বাইশ খন্ডের বিশ্বকোষ প্রকাশের কর্মযজ্ঞ। বাইশটি খন্ডের বাংলা বিশ্বকোষের একুশটি খন্ডই তাঁর সঙ্কলিত ও সম্পাদিত। কয়েক বছরের মধ্যেই এই বিশ্বকোষের প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়।
এই ঐতিহাসিক বিরল কীর্তিকে সম্মান জানাতে দ্বিধা করেনি কলকাতা। নগেন্দ্রনাথ যে গলিতে বাস করতেন, সেই কাঁটাপুকুর বাই লেনের নতুন নামকরণ হয় “বিশ্বকোষ লেন”। পথের নামের মধ্যে অমর হয়ে থাকল একজনের স্বপ্ন ও অপরজনের সারস্বত সাধনা। লেখক নয়, উপন্যাস নয়, কাহিনীর জনপ্রিয় কোন চরিত্র নয়, বিশ্বকোষের মতো গ্রন্থাবলীর সম্মানে পথের নামকরণে পথিকৃত হল কলকাতা। এখনো পর্যন্ত কলকাতার এই উদাহরণ বিশ্বে একক।
কভার ছবি : বিশ্বকোষ লেন :১৭ ই মার্চ ১৯১৫ সালের অধিবেশনে কলকাতা পৌরসভা কাঁটাপুকুর বাই লেনের নাম বদলে রাখেন বিশ্বকোষ লেন।
তথ্যঋণ : বিশ্বকোষ প্রবর্তক রঙ্গলাল মুখোপাধ্যায় স্মরণিকা: সম্পাদনা সিরাজুল হক, . বাঙালী চরিতাভিধান : সংসদ