ময় দানবের সাহায্যে খাণ্ডবপ্রস্থকে ইন্দ্রপ্রস্থে রূপান্তরিত করে তার রাজা হলেন যুধিষ্ঠির। একদিন দেবর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। তিনি বললেন, “বুঝলে যুধিষ্ঠির, কেবলমাত্র ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা হয়ে থাকলেই চলবে না। তোমাকে ভারতবর্ষের সম্রাট হতে হবে। তুমি রাজসূয় যজ্ঞের ব্যবস্থা কর। রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজারা তোমার বশ্যতা স্বীকার করলে তুমিই হবে ভারতবর্ষের সম্রাট”।
রাজসূয় যজ্ঞ মুখের কথা নয়। যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন। সব শোনার পরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “শোনো যুধিষ্ঠির, অন্যান্য ছোটখাটো রাজারা সহজেই তোমার বশ্যতা স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু তোমার পথের প্রধান কাঁটা হলেন মগধের রাজা জরাসন্ধ। তাঁকে রাস্তা থেকে হঠাতে হবে। তবেই তুমি সম্রাট হতে পারবে”।
কে এই জরাসন্ধ? পূর্ব ভারতে অবস্থিত মগধের এই শক্তিশালী রাজা (যদিও মহর্ষি ব্যাস এবং শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতে তাঁকে ভিলেন বানিয়ে ছেড়েছেন) তাঁর জন্মবৃত্তান্তের জন্য বহুচর্চিত। বলা হয় মগধের রাজা বৃহদ্রথের দুই স্ত্রীর গর্ভে অর্ধেক অর্ধেক করে জন্ম হয় জরাসন্ধের। জরা নামক এক রাক্ষসী এই দুই অংশকে এক সঙ্গে জুড়ে দেন এবং এই কারণেই তাঁর নাম হয় জরাসন্ধ। সে যাই হোক, জরাসন্ধ ছিলেন অমিত শক্তিধর, গদাযুদ্ধ এবং দ্বন্দযুদ্ধে পারদর্শী। তিনি ছিলেন মথুরার রাজা এবং শ্রীকৃষ্ণের মামা কংসের শ্বশুর। অতএব লতায় পাতায় তিনি শ্রীকৃষ্ণের দাদু। জরাসন্ধ সেই সময়ে পূর্ব ভারতের ছোট বড় সমস্ত রাজাকে কারাগারে বন্দী করে মহাদেবের সামনে বলি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। অর্থাৎ তখন পূর্ব ভারতের একচ্ছত্র অধিপতি জরাসন্ধ।
উল্টোদিকে তৎকালীন উত্তর ভারতের ছবিটা কল্পনা করুন। জ্ঞাতি কলহের ফলে উত্তর ভারতের প্রধান রাজ্য কুরু তখন হস্তিনাপুর এবং ইন্দ্রপ্রস্থে বিভক্ত হয়ে গেছে। দ্রোণের টিউশন ফি মেটাতে পাণ্ডবেরা দ্রুপদকে ধরে এনে উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী রাজ্য পাঞ্চালকে ভাগ করে দিয়েছেন। সাবেক পাঞ্চাল ভাগ হয়ে তৈরী হয়েছে অহিচ্ছত্র (যার রাজা অশ্বত্থামা) এবং কাম্পিল্য (যার রাজা দ্রুপদ)। অর্থাৎ উত্তর ভারতের রাজাদের মধ্যে তখন একতা’র চিহ্নমাত্র নেই….স্পষ্ট দুটো লবি তৈরী হয়ে গেছে। এক লবিতে রয়েছেন ধৃতরাষ্ট্র, অশ্বথামা, সুশর্মা প্রভৃতি রাজারা এবং অপর লবিতে রয়েছেন যুধিষ্ঠির, দ্রুপদ, বিরাট প্রভৃতিরা…কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা। প্রশ্ন হল, শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরামের তৎকালীন বাসস্থান মথুরা’র অবস্থা তখন ঠিক কি রকম?
আশা করি আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা “থ্রি ইডিয়টস” আপনারা সকলেই দেখেছেন। সেই সিনেমায় আমির খানের নাম ছিল ‘রণছোড়দাস চাঁচর’। রণছোড়দাস অর্থাৎ রণছোড় এর দাস। রণছোড় অর্থাৎ যে রণক্ষেত্র অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায়। রণছোড় শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। প্রশ্ন হল, শ্রীকৃষ্ণের মতো একজন মহাভারতীয় সেন্ট্রাল এবং পজিটিভ ক্যারেক্টারের এমন অপমানজনক নাম কেন রাখা হল?
নিজের জামাই কংসকে শ্রীকৃষ্ণের হাতে বেঘোরে মরতে দেখে জরাসন্ধ রাগে অন্ধ হয়ে আঠারো বার মথুরা আক্রমণ করে ছিলেন! প্রথম সতেরো বার শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরাম জরাসন্ধকে প্রতিহত করেন। কিন্তু শেষ বার শ্রীকৃষ্ণ বলরাম এবং মথুরার সমস্ত নাগরিকদের নিয়ে মথুরা থেকে দ্বারকাতে চলে যান এবং সেখানেই নিজের রাজধানী স্থাপন করেন। ফাঁকা মথুরার দখল নেন জরাসন্ধ। জরাসন্ধের হাত থেকে বাঁচতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন বলে শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম রণছোড়। ভাবুন একবার! শ্রীকৃষ্ণের মতো একজন রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা এবং ম্যাজিশিয়ান দাদুর বয়সী জরাসন্ধের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না বলে নিজের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে ছিলেন! এই ঘটনাই বলে দেয় যে মহাভারতের সময়ে জরাসন্ধের প্রতিপত্তি ঠিক কতটা ছিল।
সুতরাং এই কথা বলাই যায় যে ঠিক যে সময়ে দেবর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরকে রাজসূয় যজ্ঞ সম্পন্ন করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করবার বুদ্ধি দিচ্ছেন, সেই সময়ে উত্তর ভারতের বড় রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে ছোট ছোট রাজ্যে পরিণত হয়ে দলাদলি জিইয়ে রাখছে এবং অপরদিকে পূর্ব ভারতে ছোট ছোট রাজ্যগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটা বড় রাজ্যে পরিণত হচ্ছে। তাই আমার বিশ্বাস, মহাভারতের সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কাঁটা উত্তর ভারত নয়, বরং পূর্ব ভারতের দিকে বেশ কিছুটা হেলে ছিল। একই সঙ্গে আমার এটাও মনে হয় যে শ্রীকৃষ্ণ এই কথা বুঝেছিলেন যে এই কাঁটাকে যদি পুনরায় উত্তর ভারতের দিকে ঘোরাতে হয় তবে দুটো জিনিস দরকার। এক…জরাসন্ধকে মারতে হবে যাতে ‘গ্রেটার মগধ’ পুনরায় ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং দুই…একটা ‘কুরুক্ষেত্র’কে আহ্বান করতে হবে যেখানে উত্তর ভারতের বাকি সমস্ত রাজার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটিয়ে একমাত্র যুধিষ্ঠিরের হাতে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া যায়।
এরপরের ঘটনাবলী আপনারা সবাই অল্পবিস্তর জানেন। শ্রীকৃষ্ণ ভীম এবং অর্জুনকে নিয়ে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মগধে গিয়ে জরাসন্ধকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্বান করলেন। দাদুর বয়সী জরাসন্ধকে দ্বন্দযুদ্ধে চিরে ফেলতে মহাবলী ভীমসেনেরও সাতাশ দিন লেগে গেল। জরাসন্ধের কারাগার থেকে পূর্ব ভারতের সমস্ত রাজাদের মুক্তি দিয়ে মগধের সিংহাসনে জরাসন্ধের ছেলে সহদেবকে বসালেন শ্রীকৃষ্ণ। তারপরে দু’বার পাশা খেলা, বারো বছর বনবাস, এক বছর অজ্ঞাতবাস, কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিনের যুদ্ধ…যুদ্ধের শেষে যুধিষ্ঠির বাদে ভারতের প্রায় সব রাজাই খতম এবং যুধিষ্ঠিরের সিংহাসন নিষ্কণ্টক। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কাঁটা পূর্ব ভারত থেকে পারমানেন্টলি হেলে পড়লো উত্তর ভারতের দিকে।
এরপরের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহাসিকদের গবেষণার বিষয়। আমার মতো ইতিহাসে অনভিজ্ঞ লোকের কাছে মহাভারত পরবর্তী উল্লেখযোগ্য ভারতীয় রাজা কারা? ইতিহাসের পাঠ্য বইতে কাদের নাম স্বর্নাক্ষরে লেখা আছে? বিম্বিসার, অজাতশত্রু, মহাপদ্মনন্দ, ধননন্দ, চাণক্য, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, বিন্দুসার এবং অশোকের নাম, এবং তারও পরে গুপ্ত বংশের রাজাদের নাম। অর্থাৎ প্রায় পাঁচশো খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে প্রায় ছ’শো খ্রিষ্টাব্দ। এদের রাজধানী ভারতের ঠিক কোথায় ছিল? মগধ এবং পাটলিপুত্র অর্থাৎ আজকের পাটনা। অর্থাৎ কুরুক্ষেত্রের প্রায় আড়াই হাজার বছর পরে ভারতের ‘পলিটিকাল পাওয়ারহাউস’ পুনরায় ‘শিফট’ করে গেছে উত্তর ভারত থেকে পূর্ব ভারতের দিকে! কেমন করে শিফট করলো? এর উত্তর অন্তত আমার জানা নেই।
আরও খানিকটা এগিয়ে যাওয়া যাক। ১১৬২ সাল। সিংহাসনে বসলেন পৃথ্বিরাজ চৌহান। রাজধানী কোথায়? আজমের এবং দিল্লী। পৃথ্বীরাজের পরে সুলতানি শাসন এবং তারপরে মুঘল সাম্রাজ্য… ক্ষমতা এবং ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু দিল্লী। ‘পলিটিকাল টিল্ট’ পুনরায় ইস্ট টু নর্থ ইন্ডিয়া!
এরপরে ভারতে পদার্পণ করল ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’। নামের শুরুতেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’… অর্থাৎ পুনরায় ‘পলিটিকাল টিল্ট’…এবারে ফ্রম নর্থ টু ইস্ট ইন্ডিয়া। ১৯১১ সাল অবধি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা।
1947 সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে স্বাধীন ভারতের রাজধানী হল নতুন দিল্লী। গণতান্ত্রিক ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন পন্ডিত জহরলাল নেহেরু। ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে লাগলো উত্তর ভারতকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ মহাভারত থেকে আধুনিক ভারত…প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পেন্ডুলামের কাঁটার মতো পর্যায়ক্রমে একবার উত্তর ভারত এবং একবার পূর্ব ভারতে স্থিতি লাভ করেছে, এবং একটু খেয়াল করে দেখুন, পেন্ডুলামের সেই সরল দোল গতি কিন্তু আজও অব্যাহত রয়েছে।
পুনশ্চঃ : শ্রী নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির একটি বক্তৃতার সাহায্য নিয়ে এবং ওনার বক্তব্যের সঙ্গে কিছু নিজস্ব চিন্তা ভাবনা মিশিয়ে আমি এই লেখাটি লিখেছি। আমি ঐতিহাসিক নই, হয়তো এই লেখায় অনেক ভুল থেকে গেল। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজবংশের বিস্তার এবং ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের অবদান সম্পর্কে আমার বিশেষ কিছু জানা নেই। এ ছাড়াও মারাঠা সাম্রাজ্য, শিখ সাম্রাজ্য, সাতবাহন সাম্রাজ্য আকারে বড় হলেও ভারতের রাজনীতিতে তাদের ঠিক কতটা অবদান ছিল সেটাও আমি জানি না।
এই প্রবন্ধটি লেখার সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমার নজরে এসেছে যেটা আমি না লিখে পারছি না। যুধিষ্ঠির যে সময়ে রাজসূয় যজ্ঞ করবেন বলে মনস্থির করে ছিলেন, সেই সময়ে ‘ভারত সম্রাট’ হওয়ার অন্যতম দাবিদার ছিলেন জরাসন্ধ। যুধিষ্ঠির ছিলেন ইন্দ্রপ্রস্থ অর্থাৎ উত্তর ভারতের রাজা। জরাসন্ধ ছিলেন মগধ অর্থাৎ পূর্ব ভারতের রাজা। জরাসন্ধের সঙ্গে ‘হ্যান্ড তো হ্যান্ড’ কমব্যাটের বুদ্ধিটা ছিল শ্রীকৃষ্ণের, যিনি ছিলেন দ্বারকা অর্থাৎ আজকের গুজরাটের রাজকুমার। আধুনিক ভারত যখন স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলেছে, তখন পূর্ব ভারতের আমাদের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’র জনপ্রিয়তা ছিল উত্তর ভারতের পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর চাইতে ঢের বেশি। তবুও ঘটনা পরপম্পরায় স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জহরলাল নেহেরু। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ভালো করে পড়লে এটা হয়তো বুঝতে পারা যায় যে মতের অমিল হওয়ার জন্য নেতাজির কংগ্রেস ত্যাগ এবং পন্ডিত নেহেরুর লাইমলাইটে আসার পিছনে জাতির জনক গান্ধীজির অবদান কিছুটা হলেও ছিল এবং গান্ধীজি গুজরাটের লোক ছিলেন।
প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দিই, শ্রীকৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা ছিল যে তিনি কুরুক্ষেত্রে অস্ত্র ধরবেন না, এবং গান্ধীজির আন্দোলনের নীতিও ছিল “অহিংস”।
লেখাটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। লেখা বেশ মজবুদ। লেখা পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।