জয়পুরের মহারানী কোচবিহারের রাজকন্যা ইন্দিরাদেবী থেকে শুরু করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নালেঝোলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান চিকন মাছ বোরোলির প্রেমে। কবি সাহিত্যিকদের লেখাতেও বারে বারে উঠে এসেছে এই মাছের প্রসঙ্গ। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তিস্তার এই ইলিশের জন্য একবার বাতিল করে দেন কলকাতায় ফেরা। কারণ ফেরার পথে আদিবাসী দুই রমণী টাটকা বোরোলি মাছ ধরছিলেন, কবিকে তাঁরা কথা দিয়েছিলেন এই মাছের ঝোল খাওয়াবেন বলে।
জ্যোতি বসুর বোরোলি প্রেম তো সর্বজনবিদিত। উত্তরবঙ্গে এলেই তাঁর লাঞ্চে সাজানো হতো হরেক রকমের বোরোলি মাছের পদ। বন দফতরের পাচক অধীর দাস তাঁর জন্য জিরে-আদা বাটা দিয়ে সুন্দর করে বোরোলির ঝোল বানাতেন। শোনা যায় কোচবিহারে মহারানী ইন্দিরা দেবীর এতটাই পছন্দের আইটেম ছিল বোরোলি, বোম্বে কিম্বা কলকাতায় থাকলে বিমানে করে তোর্সার বোরোলি যেত তার কাছে।

তিস্তা-তোর্সার এই অলিখিত মাছের রাজা এক পংক্তিতে বসিয়ে দেবে হেবিওয়েট রাজনীতিবিদ, রাজ পরিবার থেকে শুরু করে হরিপদ কেরানিকে। উত্তরবঙ্গের বোরোলি মাছের আকর্ষণ এমনই। একবার যে খেয়েছেন অথচ এ মাছে মজেননি এমন বাঙালি পাওয়া দুষ্কর।
শিলিগুড়ির মহার্ঘ্য পাইস হোটেলগুলির জনপ্রিয় পদ ভাপা বোরোলি, বোরোলি সরষে, দই বোরোলি বোরোলির ঝাল, বোরলির পকোড়া, টক, কালিয়া কিম্বা স্রেফ কাঁচালঙ্কা কালোজিরে দিয়ে বোরোলির ঝোল। খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে এ স্বাদ মুখে লেগে আছে অনেকেরই। বোরোলির সাধের জোর এতটাই যে তিস্তা পারে একাধিক রেস্তোরা তৈরি হয়েছে কেবলমাত্র এই মাছের পদ দিয়ে পর্যটকদের রসনা তৃপ্তি করার জন্য। ডুয়ার্স ভ্রমণ করার সময় অনেকেই মালবাজার কিংবা গজলডোবায় এইসব রেস্তোরায় একবার ঢুঁ দিতে ভোলেননা।
শুধু স্বাদেই নয় অন্যান্য চুনো মাছের মতই বোরোলি প্রাণীজ প্রোটিনের একটি বড় উৎস। এই মাছে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-ডি, আয়রন ম্যাগনেসিয়াম জিংক ইত্যাদি নানান ধরনের পুষ্টিগুণে ভরপুর মিনারেল। সাধারণত বর্ষার আগে এপ্রিল-মে মাসে এবং বর্ষার পরে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এদের দেখা মেলে। কালী পূজার পর হালকা শীতের পরশ গায়ে মেখে জলে নেমে পরে মৎস্যজীবীরা বোরোলি শিকারে, সঙ্গে বিশেষ ধরনের ছোট জাল। নদীর কোথায় কোন বাঁকে ঘাপটি মেরে তারা বসে আছে সেই গোপন খবরটি জানেন জেলেরা। ভোররাতে সেই ঘাটিতে হানা দিয়ে তুলে আনে চার থেকে ছয় ইঞ্চি সাইজের এই মাছ। ইলিশের মতোই নদীর স্রোতের বিপরীতে ঝাঁক বেঁধে আসে বোরোলি।

মাছ পেতেই তিস্তাপাড়ে বাজার বসে যায় বোরোলির। হামলে পরে পর্যটক থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা। কিছু মাছ চলে যায় আড়তে তারপর নিমেষের মধ্যে শেষ হয়ে যায় বোরোলি। নদীর এই রুপোলি ফসল কিনতে দরদামের তোয়াক্কা করেননা মাছ প্রিয় বাঙালি। উত্তরবঙ্গের ভোজন রসিকদের কাছে বোরোলির স্বাদ ও আল্লাদ এই দুটোই উঁচু তারে বাঁধা। ৬০০- ১২০০ টাকা কেজি দরে অনায়াসে বিক্রি হয় মহার্ঘ্য এই মাছটি।
সবচেয়ে সমস্যা বাজারে লোক ঠকাতে বোরোলির বহুরূপীও রয়েছে — নাম পিয়ালি। বিহারের কোশি নদীতে প্রায় একই দেখতে এই মাছটি পাওয়া যায়। যারা খুব ভালো করে চেনেন তারা হয়তো ঠকবে না কিন্তু অধিকাংশ মানুষকেই ঠকে যেতে হয়, ভুল ভাঙ্গে রান্নার পর মুখে দিলে।

কিন্তু ইলিশের মত উত্তরবঙ্গের এই ইলিশও ক্ষণস্থায়ী। জলঢাকা কালজানি তিস্তা তোর্সা মহানন্দা রায়ডাক — নদীর মিঠা জলে বোরোলির সংসার। প্রতিটি নদীর ক্ষেত্রেই মাছের স্বাদ একটু আলাদা হলেও স্বাদে গন্ধে রায়ডাকের বোরোলি সবার সেরা।
কিন্তু নদীতে জল দূষণ — কীটনাশক প্রয়োগ, ব্যাটারির মাধ্যমে বিদ্যুতের শক দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরা প্রবণতা, বর্ষায় নেট ব্যবহার করে ডিম ভর্তি মাছ ধরা ইত্যাদি কারণে চাপলা, নেদস, কাজলী, মৌরলার মত ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বোরোলি। বোরোলির স্বাদ থেকে বঞ্চিত যাতে না হয় কেউ, তার জন্য বেশ কয়েক বছর আগে থেকে উদ্যোগ নিয়েছেন মৎস্য দপ্তর। উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে বোরোলিকে পুকুরে কিভাবে মাছটিকে বাঁচিয়ে রাখা যায় সে নিয়েও চলছে গবেষণা।
অবশেষে বহু গবেষণার পরে পুকুরের জলে চাষ করা যাচ্ছে বোরোলি। কোলাঘাটের পুকুরে দিব্যি বাড়ছে সুস্বাদু এই ইলিশ। কোচবিহারের সমীর কুমার দত্ত পুকুরে বোরোলি চাষ করে সারা ফেলে দিয়েছেন।
১০ জুলাই বুধবার ছিলো জাতীয় মৎস্য চাষী দিবস। মাছের প্রোটিনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখার ক্ষেত্রে মাছ চাষিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্বীকার করার জন্য দিবসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এই জাতীয় মৎস্য চাষী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠান থেকে মৎস্য চাষীদের মৎস্য চাষে উৎসাহ বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিসারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিফরি) দেশের ১০ জন মৎস্য চাষীকে পুরস্কৃত করেন। সেই তালিকায় বাংলা থেকে রয়েছেন কোচবিহারের তুফানগঞ্জের সমীর।
১৯৮২ সালে সমীর নিজের ছোট্ট জলাশয় তৈরি করে মাছের ডিমপোনা তৈরির কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ১২০ বিঘা বিস্তৃত ছোট মাঝারি জলাশয়ের নানান জাতের মাছ এবং চারা তৈরি হয়েছে যার মধ্যে বিঘা দেড়েক জমিতে বোরোলির সংসার।

কিন্তু এখনো যেটা হয়নি তা হল পুকুরে বোরোলির ডিম ফোটানো, প্রাকৃতিক স্রোত ছাড়া আপাতত যেটি অসম্ভব। তাই রাজ্য মৎস্য দপ্তর এবং সিফরির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গোরুবাথানে পাহাড়ের ঢালের উপরে নদীতে যেখানে বোরোলি ডিম পাড়ে, সেখান থেকে মিন সংগ্রহ করে পুকুরে চাষ শুরু করেন সমীর। পুকুরে কৃত্রিম স্রোত তৈরি করে, অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রেখে স্বাভাবিক খাবার দিয়ে বোরোলি বড় করতে অসুবিধা হয়নি সমীরের।
পাহাড়ি নদীতে মাছেরা অক্সিজেন বেশি পায়। তাই বদ্ধ জলাশয় যাতে বোরোলির অক্সিজেন ঘাটতি না হয়, প্রয়োজনে যন্ত্র বসিয়ে নিশ্চিত করতে হয়েছে অক্সিজেনের মাত্রা।
সিফরির পক্ষ থেকে সুজিত চৌধুরী বলেন, ‘বোরোলির মতো মাছ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন সমীর।’ আপাতত মৎস্য বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য বোরোলির কৃত্রিম প্রজনন ঘটানোর। এ ব্যাপারে তারা যথেষ্ট আশাবাদী। হয়তো কোন একদিন উত্তরবঙ্গের এই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডারের দেখা মিলবে কলকাতার গড়িয়ার বাজারে। আপাতত অপেক্ষা সেই দিনের।
তথ্য ঋণ : নিউজ ‘এই সময়’ ও অন্যান্য মিডিয়া মাধ্যম।