দেশের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মোদীর মুখে উঠে এল বীর সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা। তিনি জানান, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র, বীর সাভারকর স্বাধীনতার জন্য নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, কর্নাটক সরকার সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য খবরের কাগজে যে বিজ্ঞাপন দেয়; সেখানে সাভারকরের ছবি থাকলেও ব্রাত্য রয়ে যান জওহরলাল নেহরু। বিজেপির মুখপাত্র রবি কুমার বলেন, দেশভাগের জন্য নেহেরুই দায়ী। তাই বিজ্ঞাপন থেকে ওঁর ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪-র পর থেকে বিজেপি ও আর এস এস ‘দেশপ্রেম’–এর এক নয়া প্রয়াস চালাচ্ছে যেখানে তারা সংঘ পরিবারকেই সাচ্চা দেশপ্রেমিক খাড়া করতে চাইছে৷ এমন প্রয়াস স্বাধীন ভারত বিগত দশকগুলিতে দেখেনি। বোঝা যাচ্ছে মোদীরা ‘ভারত’ এই ধারণাটিকে বদলে ফেলতে সচেষ্ট। আর সেই প্রচেষ্টায় তাদের প্রধান আয়ুধ ‘দেশপ্রেম’। যে কারণে মোদীরা যে ভারতকে উদ্যাপন করেন, তা গান্ধীর নয়, নেতাজির নয় এমনকি নেহরু, অম্বেডকরেরও নয়। সেই ভারত কেবল গোলওয়ালকরের, দীনদয়াল উপাধ্যায়ের, সাভারকরের।
মোদীদের এই দেশপ্রেমের আড়ালে রয়েছে আরএসএস-এর স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধীতা। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধীরা আজ দেশপ্রেমিক সাজছে অথচ যুক্তিবাদী লেখক–সাংবাদিক হত্যা হলে তারা চুপ করে থাকছে। এ দেশে একমাত্র দেশপ্রেমিক বিজেপি–আরএসএস- মোদীদের এই প্রচারে কিন্তু দেশের প্রকৃত ইতিহাসটা বদলে যায়না। বরং বিজেপি–আর এস এস–হিন্দু মহাসভা তথা হিন্দুত্ববাদীদের ‘দেশপ্রেমের’ আসল চেহাড়াটা বেরিয়ে আসে। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতকে মুক্ত করতে যখন দেশের তরুণেরা মুক্তির মন্দির সোপান তলে আত্ম বলিদান দিচ্ছেন, তখন আরএসএস–এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ হেডগেওয়ারের পরে এম এস গোলওয়ালকর বলছেন, ‘‘ব্রিটিশ বিরোধিতাকে ভাবা হচ্ছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সমার্থক৷ এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলন, তার নেতৃবর্গ ও সাধারণ মানুষের উপর বিনাশকারী প্রভাব ফেলেছিল’’ (চিন্তাচয়ন, ১ম খণ্ড)৷ বুঝতে আসুবিধা হয়না যে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন আরএসএস–এর কাছে ছিল একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন’৷ ফলত তারা যে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল তা বিষদ বলার অপেক্ষা রাখেনা।
গোলওয়ালকর তাঁর চিন্তাচয়ন, ২য় খণ্ডে লিখছেন, ‘‘আমাদের দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এই কথাই বলে যে, সব কিছু করেছে একমাত্র হিন্দুরা৷ এর অর্থ কেবল হিন্দুরাই এই মাটির সন্তান হিসেবে এখানে বসবাস করেছে’’। অন্যদিকে বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘কোনও সভ্যতা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে, এরূপ দৃষ্টান্ত একটিও পাওয়া যায় না৷ একটি সুসভ্য জাতি আসিয়া কোনও জাতির সহিত মিশিয়া যাওয়া ছাড়াই যে জাতি সভ্য হইয়া উঠিয়াছে–এরূপ একটি জাতিও জগতে নাই৷’’ রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘ভারতবর্ষের কেবল হিন্দু চিত্তকে স্বীকার করলে চলবে না৷ ভারতবর্ষের সাহিত্য, শিল্পকলা, স্থপতিবিজ্ঞান প্রভৃতিতেও হিন্দু–মুসলমানের সংমিশ্রণে বিচিত্র সৃষ্টি জেগে উঠেছে৷ তারই পরিচয়ে ভারতবর্ষীয়ের পূর্ণ পরিচয়’’৷তার মানে আরএসএস ভারতীয় জাতীয়তাবাদকেই স্বীকার করে না৷ জাতি গঠনের বৈজ্ঞানিক নিয়মকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বীকার করেনা বলেই তারা হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি করে৷ তাই তাদের কাছে পরাধীন ভারতে ব্রিটিশরা শত্রু না হয়ে, ছিল মুসলমানরা৷ দেশভাগের জন্য তারা মুসলিম লিগকে দায়ী করে৷ অথচ ইতিহাস বলছে অন্য কথা। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা হওয়ার ৩৪ বছর পর লাহোরে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে প্রথম পৃথক দেশের দাবি তোলে৷ তার অন্তত এক দশক আগে ১৯২৩ সালে হিন্দু মহাসভার নেতা বি ডি সাভারকার তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ নামক গ্রন্থে ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলিম দুটি পৃথক জাতির তত্ত্ব পেশ করে ধর্মভিত্তিক পৃথক দেশের ধারণা তৈরি করেছিলেন৷
১৯২১–২২ সালে ধর্ম–বর্ণ–সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ ভুলে গোটা দেশে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতা সহ হাজার হাজার সত্যাগ্রহীকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে৷ কিন্তু সেদিনের ওই গণসংগ্রামের মধ্যে আর এস এস প্রতিষ্ঠাতা ডা. হেডগেওয়ার ‘অশুভ শক্তির জাগরণ’ দেখতে পেলেন৷ তাঁর কথায়, ‘‘মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে দেশে উৎসাহ (জাতীয়তাবাদের জন্য) ক্রমে শীতল হয়ে যাচ্ছিল এবং এই আন্দোলন সৃষ্ট অশুভ শক্তিগুলি সমাজজীবনে বিপজ্জনকভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছিল৷’’ এই ভাবে ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন থেকেও তারা দূরে থাকে৷ ১৯৩০ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং–এ বিনয়–বাদল–দীনেশের অলিন্দ যুদ্ধ, ১৯৩০–৩২ সালে চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেনের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, শহিদ হন প্রীতিলতা, ১৯৩১ সালে ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরুকে ফাঁসি, সব ঘটনাই আরএসএস-এর কাছে সন্ত্রাস। এমনকি ১৯৪২–এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন, ১৯৪৫ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজের অফিসারদের বিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে নৌ–বিদ্রোহ, ওই বছরের ২৯ জুলাই দেশব্যাপী ধর্মঘট, গোটা দেশ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে উত্তাল কিন্তু কোথায় আরএসএস? তারা সব দিক থেকেই ইংরেজ প্রভুদের খুশি করেছে৷
একদা আন্দামান সেলুলার জেলে থাকা সাভারকর ব্রিটিশ সরকারের কাছে বারবার ক্ষমাভিক্ষা চেয়ে মুক্তি পেয়ে পরবর্তীতে বিদ্বেষমূলক, বিভেদমূলক আদর্শের আঁতুড়ঘর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তৎকালীন ভারতের আরেকটি সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণমনা রাজনৈতিক-ধার্মিক দল, হিন্দু মহাসভার দীর্ঘকালের সভাপতি হিন্দুত্বের আদর্শ দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিরোধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। ভারত ছাড় আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যখন কংগ্রেসের সমস্ত প্রথম সারির নেতারা কারারুদ্ধ, সেই সময়ে হিন্দু মহাসভা সাভারকরের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিন্ধ আর বাংলা প্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। উত্তর-পূর্ব ভারতে ঢুকে পড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের “কচুকাটা” করতে স্রেফ এক বছরে তিনি এক লাখ হিন্দুকে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনিতে ভর্তি করান হিন্দু মহাসভার সামগ্রিক প্রচেষ্টায়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সেইসব কুখ্যাত খুনিদের আজ মোদীরা দেশপ্রেমী সাজাচ্ছেন।