এমন একটা সময় ছিল, যখন এই বাংলায় নভেম্বর বিপ্লব ধুমধাম করে পালিত হতো। না, রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার আসার পরেই তা শুরু হয়েছে এমনটা নয়, নভেম্বর বিপ্লব আকৃষ্ট করেছিল শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামীদেরও। বিপ্লবী ভগত সিংহ ও তাঁর সহকর্মীরা আদালত কক্ষে লেনিন দিবস পালন করে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ১৯২০ সালে শ্রমিকদের প্রথম সর্বভারতীয় সংগঠন গড়ে উঠেছিল রাশিয়ার বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়েই। বাংলায় মুজফ্ফর আহমেদ ও আরও অনেকে লেনিনের শোষণ মুক্তির ডাকে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে তুলেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার পরে নভেম্বর বিপ্লবের বার্তা আরও গতি পেয়েছিল। এ দেশের কমিউনিস্টরা বারবার ভুল না করলে হয়তো তাদের আরও বড় ভূমিকায় দেখা যেত। যা হোক, সেসব এখন ইতিহাস।

প্রশ্ন ওঠে, কেন, কোন মন্ত্রে নভেম্বর বিপ্লব সবার মনে ঢেউ তুলেছিল? তাত্ত্বিক ভাষায় কথাটা হলো, কোনো শোষকদের নেতৃত্বে নয়, সেই প্রথম গড়ে উঠেছিল শোষিতদের সরকার, রাষ্ট্র। তত্ত্ব কথার গভীরে ডুব না দিয়েও যদি কেবল কাজগুলোর দিকে তাকাই, বোঝা যাবে সে বিপ্লবের আকর্ষণ। তার আগে তারিখটা নিয়ে একটু ধন্দের সমাধান করে নিই। তখন চালু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিপ্লবের দিনটি ছিল ২৫ অক্টোবর, তাই একে বলা হতো অক্টোবর বিপ্লব, বছরটা ১৯১৭। পরে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন হলে দিনটি হয় ৭ নভেম্বর ১৯১৭। তখন থেকে নভেম্বর বিপ্লব বলেও ওই দুনিয়া কাঁপানো দিনটিকে চিহ্নিত করা হয়। লেনিন বলেছিলেন, রাশিয়তে ক্ষমতা দখল করেছে শ্রমিক শ্রেণি, তাদের সঙ্গী গরিব কৃষক সহ দরিদ্ররা, নেতৃত্বে বলশেভিক দল। বলশেভিক দলই ছিল সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টি। নয়া সরকারের প্রথম কাজগুলিই গরিবদের সরকারের চরিত্র বুঝিয়ে দিয়েছিল। কল-কারখানা সহ উৎপাদনের সব উপাদান রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। কৃষিতে গড়ে উঠেছিল যৌথ খামার। নিজেদের সরকারকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছিলেন নায়ক। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে সারা বিশ্বকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল রাশিয়া তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই অগ্রগামী অবস্থান কয়েক বছরের নয়, জারি ছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। সারা বিশ্বে প্রথম, সে দেশে চালু হয় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুর বিনামূল্যে সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা। সমস্ত নাগরিক পেতে শুরু করেন বিনামূল্যে চিকিৎসা, যা সে সময়ে অকল্পনীয় ছিল। বিপুলভাবে বাড়ানো হয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো। মনে রাখা দরকার, রাশিয়ার বিপ্লব হয়েছিল সেই সময়ে, যখন চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হয়, সে বছরই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয়ংকর ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি, যাতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৫০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলেন। বিপ্লবী রাশিয়ায় এই অসুখকে মোকাবিলা করা হয়েছিল দক্ষতার সঙ্গে, মৃত্যুহার অন্য পুঁজিবাদী দেশের তুলনায় অনেকটাই কম ছিল। এই লেখা যখন লিখছি, করোনা মহামারিতে হাজার হাজার মানুষ মরছেন রাশিয়াতে। একশো বছর আগে কিন্তু এত ক্ষয়ক্ষতি হয়নি সে দেশে। বিপ্লবের মাত্র দুই দশকের মধ্যে, ১৯৩৬ সালে রাশিয়াতে কর্মহীনতা বিলুপ্ত হয়, সবার কাজের গ্যারান্টি দিয়েছিল রাষ্ট্র। শ্রমিকদের সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ, দু’দিন ছুটি, ছুটির সময়ে বিশ্রাম ও বিনোদনের নানা ব্যবস্থা গড়ে দেয় রাষ্ট্র। সব শ্রমিকের পেনশনের দায় নেয় সরকার। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও নানা সুবিধা দেওয়া হয়, যা তখনকার দিনে কোথাও ছিল না।

গণতন্ত্রের ব্যাপারেও সমাজবাদী রাশিয়ার সাফল্য ছিল চোখ ধাঁধানো। বিপ্লবী রাশিয়াই প্রথম, ১৯১৮ সালে, নারীদের সর্বজনীন ভোটাধিকার দেয়। সমগ্র দুনিয়ায় তা ছিল অকল্পনীয়। রাশিয়ার এই পদক্ষেপে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে নারীদের আন্দোলন শুরু হয়। স্মরণে রাখা ভালো তথাকথিত গণতন্ত্রের পীঠস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের সর্বজনীন ভোটাধিকার চালু হয় ১৯১৯ সালে, ব্রিটেনে ১৯২৮ সালে, রাশিয়ায় নারী ভোটাধিকারের স্বীকৃতির অভিঘাতে। মার্কিন দেশে কালো মানুষদের ভোটাধিকার ছিল না পঞ্চাশ বছর আগেও। কৃষ্ণবর্ণের নারী-পুরুষ ভোটাধিকার পায় ১৯৬৫ সালে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম, লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, ভাষাভাষী নির্বিশেষে সর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়েছিল লেনিনের রাশিয়াতেই। এই তালিকা আরও লম্বা করা যায়, কিন্তু তার মধ্যে না গিয়ে এ কথা বলাই যায়, শ্রমজীবী মানুষকে প্রথম মানুষের মর্যাদা দিয়েছিল সমাজবাদী রাশিয়া।

মানুষ ভালোওবেসেছে সমাজবাদী রাশিয়াকে, নিজের পিতৃভূমিকে। তা না হলে, ভাবা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধে ২ কোটিরও বেশি সৈনিক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, তবু একটাও আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটেনি। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে সে দেশে পুরুষদের সংখ্যা কমে যায়, এতই নিহত হয়েছিল যুদ্ধে। তারপর অনেক বছর, কোনো রাশিয়ান পরিবার যখন খাবার টেবিলে খাবার সাজাতো, একটি চেয়ার ফাঁকা রাখা হতো, যুদ্ধে ওই পরিবারে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের স্মরণে। রাশিয়ার সে সময়ের নেতা জোসেফ স্তালিনকে অত সহজেই ভোলা যায়!
তবু রাশিয়ায় বিপ্লব টেকেনি। গত শতকের শেষ দশকে সে দেশে ফিরেছে ধনতন্ত্রই। কেন, সে সন্ধান চলছেই। ওই সময়টাতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়া তথা রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র খতম হবার সময়ে, আমাদের দেশে বামপন্থীদের দিশাহারা দেখিয়েছিল। পরে অবশ্য কিছুটা আমতা-আমতা করে সোভিয়েতের ভুল ত্রুটি নিয়ে কিছু কথা বলেছে সিপিআইএম ও সিপিআই। তবে তাদের কাজকর্ম, ধরন-ধারণ, লেখালিখিতে তেমন পরিবর্তন দেখা গেল কই।
ইতিমধ্যে দুনিয়া জুড়ে দখলদারি চলছে ধান্দার ধনতন্ত্রের। আমাদের দেশে মোদি সরকার ধান্দার ধনতন্ত্রের অন্যতম সেরা নিদর্শন। কেবলমাত্র কোভিড মহামারির সময়টাতে এ দেশে মোদি সরকারের আশীর্বাদ নিয়ে অতি বড়লোক পুঁজিপতি, যাঁরা শতকোটি ডলারের মালিক, তাঁদের সংখ্যা ১০২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০। আর ঠিক এই সময়টাতেই কয়েক কোটি মানুষের কাজ খোয়া গেছে, দারিদ্রে নতুন করে নিমজ্জিত হয়েছেন তাঁরা। এটাই ধান্দার ধনতন্ত্রের ভেলকি!

সমাজবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন আর নেই। সমাজবাদ বলে যে কয়েকটি দেশ সরকার চালাচ্ছে, যেমন চিন, সেগুলিকে একদলীয় শাসনের পুঁজিবাদ বললেই ঠিক বলা হবে। তাহলে পুঁজিবাদ ছাড়া কি কোনো উপায় নেই? পথ খুঁজছে মানুষ। খ্যাপা পরশপাথর খুঁজবেই। তা বলে আজকের দারিদ্র, ক্ষুধা, বৈষম্য, অসম্মান নীরবে মেনে নিতে হবে? কেন? প্রতিবাদ করতেই হবে, অন্য কোনো দেশের অনুকরণে নয়, আমাদের নিজেদের মতো করেই।

বাংলা বিপ্লবের গান গাইছে কতকাল ধরে। বিপ্লবের জোয়ার এসেছে, কালের নিয়মে ভাটাও। কবে কবি গেয়েছিলেন, মনে পড়ে, ‘ভয় কী মরণে, রাখিতে সন্তানে /মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে / তা থৈ তা থৈ থৈ দ্রিমি দ্রিমি দ্রম দ্রম/ ভূত-পিশাচ নাচে যোগিনী সঙ্গে/ দানব দলনী হয় উন্মাদিনী / আর কি দানব থাকিবে বঙ্গে / সাজ রে সন্তান হিন্দু-মুসলমান / থাকে থাকিবে প্রাণ, না হয় যাইবে প্রাণ / নিতে হয় মুকুন্দেরে নিও রে সঙ্গে।।’ শেষ পংক্তিতে ‘মুকুন্দেরে’ সঙ্গে নেবার আবেদন যিনি জানাচ্ছেন, সেই কবি তথা গায়ক চারণকবি মুকুন্দদাসের গান এটি। কত বলব! সেই কবে কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্বশৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে / কে পরিবে পায়।…’ এ সব গান-কবিতার সঙ্গে এক অপূর্ব সঙ্গতে মিশে যায় উত্তরকালের সলিল চৌধুরি, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, গণনাট্যের কত গান, ঋত্বিক, মৃণাল, সত্যজিতের কত সিনেমা, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্যদের কত নাটক! সেসব কি বিলীন হয়ে গেল কালচক্রে? বোধ হয় না। রাতের সব তারাই থাকে দিনের আলোর গভীরে। মনে রাখতে হবে, উপরে উল্লিখিত রঙ্গলালের ‘স্বাধীনতা’ কবিতার শেষ দিকের কথাগুলি, ‘অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে / চল ত্বরা যাই। / দেশহিতে মরে যেই, তুল্য তার নাই হে, / তুল্য তার নাই।।’ বড় সংগ্রামের অপেক্ষায় দেশ।
The article is beautiful