২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে জাতীয় স্তরে বিরোধী জোট যে খুবই দরকার সে কথা কোনও দলই অস্বীকার করে না। কিন্তু সেই জোটের নেতৃত্ব দেবে কোন দল, তা নিয়ে নানা চর্চা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। যদিও ২০২৩ সালেই রয়েছে নটি বিধানসভা ভোট যা ২৪-এর লোকসভা ভোট এবং দেশের আগামি দিনগুলির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, নীতীশ কুমার, তেজস্বী যাদব, এম কে স্ট্যালিনের মতো আঞ্চলিক দলগুলির নেতারা মুখে বলছেন, কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোট গড়ে তোলার এখনই সময়, অতএব আর দেরি না করে কংগ্রেস নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসুক। অন্যদিকে তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, আম আদমি পার্টি, টিআরএস বা অধুনা বিআরএস আবার কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোটে শামিল হতে নারাজ। প্রসঙ্গত, তৃণমূল নেত্রী জাতীয় স্তরে বিরোধী জোট বা বিকল্প তৃতীয় শক্তি নিয়ে অনেক আগেই বলেছিলেন, আঞ্চলিক দলগুলি যে যেখানে শক্তিশালী, তাদের সেখানে নেতৃত্ব দিতে দেওয়া হোক। আবার কংগ্রেস যেখানে শক্তিশালী, সেখানে কংগ্রেস বিরোধী শক্তির নেতৃত্ব দিক।
সম্প্রতি রায়পুরে দলের প্লেনারি অধিবেশন শেষে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস জাতীয় স্তরে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ খারিজ করে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার পক্ষে রায় দিল কংগ্রেস। সেখানে গৃহীত প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে এক করাই কংগ্রেসের লক্ষ্য। সেখানে এ কথাও বলা হয়েছে, যারা কংগ্রেসের মতাদর্শের সঙ্গে সহমত পোষণ করে, সেই ধর্মনিরপেক্ষ আঞ্চলিক দলগুলিকে তারা সঙ্গে নেবে। তাদের বক্তব্য বিজেপিকে একা হারানো কোনও একটি দলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এই মুহূর্তে বিজেপি তথা এনডিএকে রুখতে সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু কংগ্রেস মনে করছে, কোনও তৃতীয় শক্তির উত্থান বিজেপি কিংবা এনডিএকে সুবিধা করে দেবে। অধিবেশনে বিজেপিকে কীভাবে রোখা যায়, মোদিকে কীভাবে হারানো সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা চললেও দলের ৮৫ তম অধিবেশনে হাজির প্রায় ১৫ হাজার দলীয় কর্মীদের কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে আসার স্পষ্ট কোনও দিশা তুলে ধরতে ব্যর্থ হলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে কিংবা প্রাক্তন সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। দলের প্লেনারি অধিবেশনে ইউপিএ সরকারের স্মৃতি চর্চা হলেও, ভারত জোড়ো যাত্রার কথা বারবার উঠলেও এমনকি বিজেপি বিরোধী জোট জরুরি বলে সওয়াল করলেও তার নেতৃত্বের জায়গাটি কংগ্রেস স্পষ্ট করতে পারলো না। বরং নেতৃত্বের জায়গাটি কংগ্রেস এড়িয়ে গেল।
কংগ্রেস আঞ্চলিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়েই বিজেপি বিরোধী জোট চায় অথচ নেতৃত্বের প্রশ্নে তারা সম্পূর্ণ নীরব। এমনকি সেই জোটে তৃণমূলের প্রশ্নেও ধোঁয়াশা থেকে গিয়েছে। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কে সি আর বা অখিলেশ যাদব প্রমুখ নাম সরাসরি না করেও তৃতীয় ফ্রন্টের সমালোচনা করে জানায়, তৃতীয় ফ্রন্টের উদ্যোগ আদতে বিজেপি-এনডিএ’কেই সুবিধে করে দেওয়া। রায়পুর অধিবেশন রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রার ছবিতে ভর্তি থাকলেও, সোনিয়া গান্ধী রাহুলের ভুরিভুরি প্রশংসা করলেও রাহুলই ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী, এমন কথাও শোনা যায়নি। তার চেয়ে কংগ্রেস হাইকমান্ড মনে করছে আগামী বছর লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী ঐক্যের চেয়ে ২০২৩-এ যে আধ ডজন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে সেই সব ভোটে দলের মধ্যে ঐক্য অনেক বেশি জরুরি। কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী কর্নাটক, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়, তেলঙ্গানায় আসন্ন বিধানসভা ভোটে যদি দলের নেতারা যদি নিজেদের মধ্যে বিবাদ ভুলে এককাট্টা হয়ে লড়াই দিতে পারেন তবেই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে কর্নাটক-সহ অন্তত তিনটি রাজ্যে কংগ্রেসেরও ক্ষমতায় আসা সম্ভব। আর তেমনটা হলে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন কংগ্রেসের পক্ষে অনেকটাই ঘুরে যাবে। তখন বিরোধী দলগুলি এমনিতেই কংগ্রেসের পাশে এসে দাঁড়াবে।
রায়পুরে দলের প্লেনারি অধিবেশন শেষে কংগ্রেসের সাংগঠনিক সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল মুখে যতই বলুন, “আমরা যথেষ্ট প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরছি। কংগ্রেসের কর্মীরা উজ্জীবিত।” বাস্তব ছবিটা কিন্তু অন্যরকম। রাজস্থানে অশোক গহলৌত বনাম সচিন পাইলটের বিবাদ থামার কোনো লক্ষ্মণ এখনও দেখা যায়নি। মধ্যপ্রদেশে কমল নাথ ফের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা মাত্র বাকিরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তেলেঙ্গানাতেও কংগ্রেস দল দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। ছত্তীসগঢ়ে ভূপেশ বাঘেলের মুখ্যমন্ত্রীর আসন টলোমলো না হলেও বিধানসভা ভোটে আসন কমলেই অন্য নেতারা অশান্তি শুরু করবে। পাশাপাশি কর্নাটকে সিদ্দারামাইয়া ও ডি কে শিবকুমার ভোটে জিততে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় কংগ্রেসের কাছে বিরোধী ঐক্যের চেয়ে দলীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখা জরুরি।
Congress এর সাংগঠনিক জোর বাড়লে, TMC, AAP প্রভৃতি আঞ্চলিক দলের প্রভাব কমবে তাই, TMC, AAP রা, তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই কংগ্রেসের ভোট কেটে BJP-কেই লুকিয়ে সমর্থন চালিয়ে যাবে।