অনাবাসী ভারতীয়রা যাতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারেন তার জন্য সম্প্রতি আইনমন্ত্রকের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে অনাবাসী ভারতীয়দের দেশে এসে ভোট দিতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। তাই অনেকেই ভোট দিতে আসেন না। তাই কমিশন জানিয়েছে, আইন মন্ত্রক যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় তাহলে সামনের বছর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা, তামিলনাডু ও পুদুচেরির ভোটে ইলেক্ট্রনিক্যালি ট্রান্সমিটেড পোস্টাল ব্যালট সিস্টেমের মাধ্যমে অনাবাসী ভারতীয়রা ভোট দিতে পারবেন। এর প্রস্তুতিও নির্বাচন কমিশন সেরে রেখেছে।
১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে সংশোধনী এনে এনআরআই-দের ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছে। অনাবাসী ভারতীয়রা চাইলে দেশে ফিরে তিনি যে অঞ্চলের বাসিন্দা সেখানে ভোটের সময় পাসপোর্ট দেখিয়ে ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রসংঘের ২০১৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১ কোটি ৭লক্ষ ভারতীয় বিদেশে বাস করেন। যা পৃথিবীর মধ্যে অনাবাসীর সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ১ লক্ষ অনাবাসী ভারতীয় ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গত লোকসভা নির্বাচনে ২৫ হাজার অনাবাসী ভারতীয় গাঁটের কড়ি খরচ করে দেশে এসে ভোট দিয়েছিলেন। অনাবাসীদের পকেটের ভার লাঘব করে সবাইকে ভোট দেওয়ানোর জন্যই নির্বাচন কমিশনের এই পরিকল্পনা।
শিল্পপতি এবং রাজ্যসভার সদস্য নবীন জিন্দাল অনাবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেন। এখন আইনমন্ত্রক যদি ১৯৬১ সালের কন্ডাক্ট অফ ইলেকশন রুলসে সংশোধনী আনে তাহলে আর কোনও বাধা থাকবে না। রজক মুদ্রা আর প্রভাব প্রতিপত্তির এই হলো বড়ো গুণ। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তাঁরা ভোটবাজারে দৃশ্যমান। আর ঘরের ভিতরে বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে থেকেও পরিযায়ী শ্রমিকরা— অর্থনীতিবিদ মৈত্রেয়ী ঘটকের বর্ননায় ‘চলমান অশরীরি’- কেউ এদের চোখেও দেখে না, এদের কথা ভাবেও না। মৈত্রেয়ী ঘটকের কথায়, ‘তাঁরা সর্বত্র আছেন। কিন্তু আমরা দেখেও দেখিনা, তাই এরা অশরীরি’। এদের ভোট নিয়ে কারুর মাথা ব্যাথা নেই। ভিটে, মাটি ছেড়ে যে বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক দেশের এপ্রান্তে ও প্রান্তে ঘুরে দু-মুঠো অন্ন জোগাড় করে তাদের জন্য রাষ্ট্রেরও মাথা ব্যথা নেই, রাজনৈতিক দলগুলোরও নেই।
যে রাজ্যে এঁরা থাকেন সেখানে তাঁদের অনেকেরই ভোটার তালিকায় নাম আছে। কিন্তু পেঠ-পিঠ এক হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে গাঁটের কড়ি খরচ করে ভোটের সময় ভিটেতে ফিরে ভোট দেওয়া হয় না। অথচ অনাবাসী ভারতীয়দের জন্য পরিকল্পনা হলেও পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট দেওয়ার জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করার কথা কেউ ভাবে না। সেই আথেন্সের গণতন্ত্রের দিন থেকেই সব আইন প্রভাবশালীদের জন্য। তাই অনাবাসী ভারতীয়দের জন্য পোস্টাল ব্যালটের এত তৎপরতা। আর কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের অবস্থা চলমান অশরীরির মতো। অবশ্য পরিযায়ী শ্রমিকদের সঠিক সংখ্যা রাষ্ট্রও জানে না, রাজনৈতিক দলগুলোও জানে না। গৃহস্থের বাড়ির কাজ থেকে কলকারখানা, রাস্তাঘাট পরিষ্কার, নির্মাণ শিল্পে এরা সবাই কাঁচামাল, এদের ভোট থেকে দূরে রাখাই ভালো।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি ২০২০ সাল ভারতবর্ষে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের শতবর্ষ। ১৯২০ সালে মুম্বাইতে লালা লাজপৎ রায়ের সভাপতিত্বে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে বামপন্থীরাই বড়ো ভূমিকা নেয়। অথচ তার শতবর্ষ নৈশব্দের মধ্যেই রয়ে গেল। বোধহয় হাইওয়ের ধারে, রেললাইনে, স্টেশন চত্বরে পরিযায়ী শ্রমিকদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা শবদেহের ছবিটায় বামপন্থীরা লজ্জা পেয়েছেন ট্রেডইউনিয়ন আন্দোলনে শতবর্ষ উদযাপনে।
ট্রেড ইউনিয়ন শতবর্ষের কথাটা উল্লেখ করার জন্য ধন্যবাদ।