‘অর্থ’ শব্দটার যেমন টাকা পয়সা মানে হয়, তেমনি অর্থ শব্দের আরও একটা মানে প্রয়োজন। আমি বিদ্যালয়ে বিদ্যা লাভার্থে যাইতেছি। মানে হল— আমি বিদ্যালয়ে বিদ্যা অর্জনের জন্য যাচ্ছি। তাহলে ‘অর্থ’ শব্দের অর্থ হল জন্য, প্রয়োজন ইত্যাদি। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’—এই বাক্যটার অর্থ পুত্র লাভ করার জন্যেই বিয়ে করা। এটা একটা মত মাত্র। অনেকেই এই মানে করে থাকেন। আমাদের শাস্ত্রটাকে ভুল ব্যাখ্যা করে ধিক্কার দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফ্রয়েডও এসব কথা বলছেন। তিনি বলছেন সংসার ইত্যাদি করার প্রাথমিক অর্থ হল রিপ্রোডাকশান। এর মানেটা কী দাঁড়ায়? এর মানেটা কী পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা দাঁড়ায় না? তাছাড়া পুত্রার্থে বলতে পুত্রই বোঝায় এমন একটা মত আছে। কিন্তু কালিদাস যখন বলছেন জগতের দুই পিতাকে বন্দনা কর— ‘জগতঃ পিতরৌ বন্দে…’ সেখানে মাও আছে। পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলতে হয়, শব্দ এবং অর্থকে যেমন পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা করা যায় না, তেমনি জগতের জননী এবং জনক-পার্বতী ও মহেশ্বরও সতত পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত।
এটা যারা বলে তারা বিন্দুমাত্র শাস্ত্র বোঝে না। সেকালে পুত্র বলতে মেয়েও বোঝাত। দেবী পুজার সময় পুত্রাং দেহি… এই যে বহুবচন বলছে, তার অর্থ ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই বোঝাচ্ছে। সেকালে মেয়ে বোঝাতে অনেক জায়গাতেই পুংলিঙ্গ ব্যবহার হত। এগুলো লোকে বুঝবে না; প্রাচীন শাস্ত্রকারেরা শব্দ ব্যবহারটা খুব ভালই জানত। তারা মনে করতেন, স্ত্রী এবং পুরুষ এরা আলাদা আলাদাভাবে পূর্ণ নয়, অর্ধাংশ। এরা যখন একত্রিত হবে, তখনই হবে পূর্ণ মানুষ। তাছাড়া সন্তান হাজার হাজার জায়গায় ব্যবহার হয়েছে, অনেকেই সেটা জানে না। এখানে পুত্রার্থের জায়গায় সন্তান শব্দটা বসবে কী করে? এটা তো একটা নির্দিষ্ট শ্লোক। কিন্তু সন্তান শব্দটা ব্যবহার করা হয় নি তো এমন নয়। এই শ্লোক যখন লেখা হয়েছে, তখন সন্তান শব্দটা হাজার হাজার বার ব্যবহার করা হয়েছে। মহাভারতেই এটা আছে; এই শ্লোকটা তো মহাভারতের আগে রচনা হয় নি। শান্তনু বলছেন— রাজনী, ধর্মাবিকষস্য সন্তানায় কুলচ্চনা আমাদের কুলের সন্তানের জন্যে আপনি ধর্মের দিকে পাঠান, আমাদের পুত্র কন্যা কিছু নেই। এই বংশে সন্তান বৃদ্ধি হতে হবে। এখানেই তো সন্তান শব্দটা ব্যবহার হয়েছে।
এসব যারা বলেন, তারা অধিকাংশ ইংরেজি জানা স্বল্পবিদ্যা মানুষ। আমি শাস্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল নই; তারা কী বলেছেন, সেটা তো বুঝতে হবে। শোনামাত্রই গালি দিলাম, শব্দ নিয়ে এমন ভাবনা সহজ নয়। সংস্কৃতে শব্দ খুব গভীরে যায়। এটা যে পুত্র-কন্যা দুটো অর্থেই বোঝাত, সেটা কালিদাসেই আছে। কালিদাস যখন রঘুবংশ আরম্ভ করছেন, সেখানে তিনি প্রণামের সময় বলছেন— ‘বাগর্থাবিব সংপৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে’ সেই বাক্যের প্রতিপত্তির জন্যে, জগত পিতরৌ বন্দে, পিতা শব্দটার দ্বিবচন হল পিতরৌ। আমি জগতের দুই পিতাকে বন্দনা করছি — তারা কারা? পার্বতী পরমেশ্বর। এই পার্বতী এবং পরমেশ্বর রূপ দুইপিতাকে বন্দনা করছি। শ্লোকটা হলো— ‘বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে।/জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ।।’ এটায় আরও মূল্য দিয়ে দিলেন।
বীজ ছাড়া মরুভূমিতে ফল ফলবে না। পিতৃতন্ত্র ছিল, আছে। আমাদের মাঠ আছে, সেখানে যদি আমি বীজ বপন না করি, ফল ফলবে কি করে? তাহলে মাঠ পড়ে থাকবে, অনন্ত কাল পড়ে থাকবে। স্ত্রীলোককে ক্ষেত্র মনে করা হত। এটা শুধু আমরাই মনে করি নি, বিদেশেও আছে। সেক্সপিয়ারে দেখা যায়। সিজার ক্লিওপেট্রাকে বলেছে। আমাদের এখানে কতগুলো উইমেন ফেমিনিস্ট আছে, তারা এ সব নিয়ে চর্চা করে। তারা কিছু জানা না, বোঝে না। আমাদের শাস্ত্রকে যদি বুঝতে হয়, তাহলে গভীরে প্রবেশ করতে হবে। তোমাকে তো পাঠ নিতে হবে গুরু-পরম্পরায় শিখতে হবে। অতো সোজা নয়।
তোকে বললাম, হাজার হাজার বার সন্তান কথাটা ব্যবহার হয়েছে। সন্তান শব্দটার মানে জানিস? চুপ করে রইলাম। ‘তন’ ধাতুর অর্থ হল বিস্তার করা। ‘তনৌতি’ সম্যকভাবে যা বিস্তার করে সেই হল সন্তান। অর্থাৎ একটা বংশকে সম্যকভাবে বিস্তার করছে। ছেলেও যেমন বিস্তার করতে পারে, তেমনি মেয়েও বিস্তার করতে পারে। এই অর্থে সন্তান শব্দটা ব্যবহার করা হয়। সন্তান বলতে কেন পুত্র-কন্যা বোঝায় সেটা আমার এই বক্তব্যে পরিষ্কার। বংশ বিস্তারে দুজনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শাস্ত্র কর্তারা পুত্র বা পিতা শব্দটা এই জন্যে ব্যবহার করেছেন, কারন ক্ষেত্র থেকে বীজের গুরুত্ব বেশি হয়। গাছের যদি বীজ না থাকে, তাহলে শুধু মাঠ পড়ে থেকে কী হবে? সেই মাঠে তো বীজ তৈরি হবে না। ক্ষেত্রে যতক্ষণনা বীজ পড়ছে, ততক্ষণ সেটি অনুর্বর। জৈবিকভাবে এটাই বীজের গুরুত্ব। কারই বা কী করার আছে?
প্রাচীন শাস্ত্রকারেরা বিষয়টা গভীরভাবে দেখতে অভ্যস্ত। তখনকার দিনে তো আর ফেমিনিস্ট ছিল না; যা সত্য সেটা বিচার করা হত। সত্য হল মাঠ যদি না থাকে তাহলে বীজ পড়ে থাকতে পারে। তাই জৈবিকভাবে ছেলেদের গুরুত্ব দিতে হয়েছে। কী আর করা যাবে! বিশ্বের সৃষ্টি তো এইভাবে আরম্ভ হয়েছে। প্রকৃতি-পুরুষ একই ধারণা। প্রকৃতি নিস্তরঙ্গ, তার কোনও ভূমিকা নেই। যতক্ষণনা সেখানে পুরুষরূপী চৈতন্যের দৃষ্টিপাত ঘটছে। অর্থাৎ বীজের অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে। পৃথিবীর সৃষ্টি হবে না। সৃষ্টিক্রিয়ার মানেই হচ্ছে, সেখানে এই ঘটনাটা ঘটছে। তাই তারা পুত্র পুত্র করেছে। কিন্তু পুত্রের মধ্যে কন্যাও তো আছে! একটা জায়গায় একটা সূত্র ধরলেই হয় না। আরও অন্যান্য জায়গায় সেটাকে তুলনা করে দেখে বুঝতে হতে এটা এখানে এরকম বলেছেন যখন এটা এরকমও হতে পারে।
শাস্ত্র তো একটা নয় — বেদ আছে, পুরাণ আছে, উপনিষদ আছে — বৃহদারণ্যকের মত উপনিষদ খ্রি.পূ ৬০০/৭০০ শতাব্দী আগে লেখা হয়েছিল। এটা গদ্যে লেখা। এর মধ্যে কোনও শ্লোক নেই। সে জন্যেই বলা হয় এটা প্রাচীনতম উপনিষদ। এখানে বলছে—‘যথা ঐ প্রেয়য়া সমপরিসক্ত’, একজন প্রিয়ার সঙ্গে প্রিয়ের মিলন হলে তখন সম্পূর্ণ মানুষ হবে; অথবা এখানে দ্বিদল শন্দটা বলা হচ্ছে — দ্বি মানে দুই আর দল মানে গাছের ডাল। তুমি যদি মটরদানার ওপরের খোসাটা ছাড়িয়ে ফেল ভেতরে দুটি অর্ধেক অর্ধেক কোয়া দেখতে পাবে। উপনিষদকার বলছেন, ছেলে আর মেয়ে হল এই রকম। ওপরের আস্তরণটা দিলেই তবে পূর্ণ মানুষ হবে। আজ যে অর্ধেক আকাশ বলা হয় — সেটা বৃহদারণ্যকে প্রথম বলা হয়েছে। আধুনিকেরা কী আমাদের শেখাবে?